প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ: গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ” ইউনিট ৭ এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ: গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য
বিক্রয় প্রক্রিয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ। বিক্রয়বিদ্যায় যে সকল মানুষ পণ্য ক্রয় করতে চায় কিন্তু বর্তমানে তারা পণ্য ক্রয় থেকে বিরত আছে তাদের প্রত্যাশিত ক্রেতা বলা হয়। এই সকল ক্রেতাদের খুঁজে বের করাকেই প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ বলা হয়। বিক্রয়কর্মী যাদের উদ্দেশ্যে পণ্য বা সেবা বিক্রয় উপস্থাপন করে তারা সকলেই চুড়ান্ত ক্রেতা নয়। ফলে বিক্রয়কর্মীকে তার চূড়ান্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রত্যাশিত ক্রেতাদের সঠিকভাবে নির্বাচন করতে হবে। একজন সফল বিক্রয়কর্মী কেবল মাত্র প্রত্যাশিত ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে অন্যদিকে একজন দুর্বল বিক্রয়কর্মী সকলের নিকট পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে।
বর্তমান ক্রেতাদের ক্রয় আচরণ পরিবর্তন হলে অথবা কোন ক্রেতা মারা গেলে বা অন্যত্র চলে গেলে বিক্রয়কর্মী বর্তমান ক্রেতার স্থলে সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ করতে হয়। বিভিন্ন উৎস থেকে এবং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে বিক্রেতা প্রত্যাশিত ক্রেতা অনুসন্ধান করে থাকে। বিক্রেতাকে প্রথমত ক্রেতাদের বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংগ্রহ করতে সঠিক ক্রেতা চিহ্নিত করার জন্য। অনুমানিক ক্রেতা থেকে প্রত্যাশিত ক্রেতার পার্থক্য নির্ণয়ের জন্যই ক্রেতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। একজন বিক্রয়কর্মী তখনই সফলতা অর্জন করবে যখন সে সঠিক ভাবে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ করতে পারবে এবং প্রত্যাশিত ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করতে পারবে।
প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণের অর্থ (Meaning of Prospecting):
প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণের আলোচনার পূর্বে জানা দরকার প্রত্যাশিত ক্রেতা কারা। যে সকল ক্রেতারা বর্তমানে পণ্য ক্রয় করছে না কিন্তু ভবিষ্যতে তাঁদের পণ্য ক্রয় করার সম্ভাবনা রয়েছে এরূপ ক্রেতাদের প্রত্যাশিত ক্রেতা বলা হয়। এখানে আর একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্রেতাদের যোগ্যতা। প্রকৃত ক্রেতা হবার জন্য একজন মানুষের কিছু যোগ্যতার প্রয়োজন। কারণ সব মানুষকেই ক্রেতা বলা যাবে না। ক্রেতা হবার জন্য একজন মানুষের তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। প্রথমত তার পণ্যের চাহিদা থাকতে হবে, দ্বিতীয়ত পণ্য ক্রয় করার জন্য তার প্রয়োজনীয় অর্থ থাকতে হবে এবং তৃতীয়ত পণ্য ক্রয়ের জন্য তার অর্থ ব্যয় করার ইচ্ছা থাকতে হবে।
একজন দরিদ্র মানুষের একটি গাড়ির প্রয়োজন থাকতে পারে কিন্তু অর্থ না থাকার জন্য সে গাড়ির ক্রেতা বলে বিবেচিত হবে না। আবার ক্রেতা হবার যোগ্যতা থাকলেই তাকে সবসময় সম্ভাব্য ক্রেতা বলা যায় না। চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরে এক খণ্ড জমি বিক্রয় হবে এই ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের একজন মানুষকে সম্ভাব্য ক্রেতা বলা যাবে না। কারণ চট্টগ্রামের একজন মানুষের চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরে জমি ক্রয়ের কোন উজ্জ্বল সম্ভাবনা নেই ৷
বিক্রয়কর্মীদের অনেক ধরণের কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকতে হয়। তার মধ্যে একটি অন্যতম কাজ হলো সম্ভাব্য ক্রেতাদের খুঁজে বের করা। প্রতিদিন বিক্রয়কর্মীদের অসংখ্য ক্রেতাদের মুখোমুখি হতে হয় তাদের সবাই চুড়ান্ত ক্রেতা নয়। এই সকল ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে তার মেধা ও কর্মশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে চূড়ান্ত ক্রেতাকে নির্ধারণ করতে হয়। ফলে যারা বর্তমানে দ্রব্য ক্রয় করে না, অথচ ভবিষ্যতে দ্রব্য ক্রয় করতে পারে এরূপ ব্যক্তিদের প্রত্যাশিত ক্রেতা বলে। এসকল প্রত্যাশিত ক্রেতাদের অনুসন্ধান করার জন্য বিক্রয়কর্মী যে সকল কর্মপন্থা ও প্রচেষ্টা গ্রহণ করে তাকেই প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ বলা হয়।
Pride & Ferrell এর মতে, “Developing a list of customer is called prospecting.” (ক্রেতাদের একটি তালিকা তৈরি করাকে সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ বলা হয়। )
C.L Bovee বলেন, “Prospecting is the process of finding qualifying potential customers.” (প্রত্যাশিত ক্রেতা- অন্বেষণ হলো যোগ্য সম্ভাব্য গ্রাহকদের খোঁজার প্রক্রিয়া।)
E. J. McGarthy, “Prospecting involves following all the ‘leads’ in the target market to identify potential customers.” (ক্রেতা অনুসন্ধান টার্গেট মার্কেটে সমস্ত লিডকে অনুশরা করে সম্ভাব্য ক্রেতা চিহ্নিত করার জন্য।)
Philip Kotler, “Prospecting is the step in selling process in which the sales persons identify potential customers.” (ক্রেতা অন্বেষণ হলো বিক্রয় প্রক্রিয়ার ধাপ যেখানে বিক্রয়কর্মীরা সম্ভাব্য গ্রাহকদের সনাক্ত করে।)
উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে, যারা পণ্যের প্রকৃত ক্রেতা তাদের খুঁজে বের করাকে ক্রেতা অন্বেষণ বলে। একজন সফল ও দক্ষ বিক্রয়কর্মী শুধুমাত্র অনুকূল প্রত্যাশিত ক্রেতার নিকট পণ্য বিক্রয় করার চেষ্টা করে কিন্তু একজন দুর্বল বা অদক্ষ বিক্রয়কর্মী যে কোন লোকের নিকট পণ্য বিক্রয় করার চেষ্টা করে। বিক্রয়কর্মীদের ক্রেতা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান ও তথ্য না থাকলে কোন মতেই তার পক্ষে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ সম্ভব নয়। কারণ যে কোন মতেই সাধারণ ক্রেতা ও সম্ভাব্য ক্রেতার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারবে না। যেমন আমরা একজন বীমা পলিসির বিক্রয়কর্মীর কথা বলা যায়। তিনি যদি একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রের কাছে পলিসি বিক্রির জন্য প্রস্তাব করেন তবে নিঃসন্ধেহে এটা বিফলে যাবে।
কারণ একজন ছাত্রের জীবন বীমার প্রিমিয়াম পরিশোধ করার সামর্থ্য নেই। তার জন্য সম্ভাব্য ক্রেতা বলে বিবেচিত হবে যারা নতুন চাকুরীজী বা স্বচ্ছল কর্মজীবি বা যারা পলিসি গ্রহণ ও প্রিমিয়াম পরিশোধ করার মত ক্ষমতা রাখে। আর এই সক্ষম ক্রেতাকেই খুঁজে বের করাই হচ্ছে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ ।

প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণের গুরুত্ব (Importance of Prospecting):
আধুনিক বিপণন ব্যবস্থায় ক্রেতা অন্বেষণের বিষয়টি কোন ভাবেই উপেক্ষা করা যায় না। যে কারণে ক্রেতা অন্বেষণ বিপণনে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অধিকন্তু বর্তমানে একজন সফল বিক্রয়কর্মীর আধুনিক হাতিয়ার হিসেবে এটাকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একজন ভাল বিক্রয়কর্মীর প্রধান লক্ষ্য হলো যারা আনুমানিক ক্রেতাদের তাদের বিভিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিয়মিত ক্রেতায় পরিণত করা। আর এই কার্যক্রমের সফলতার জন্য প্রধান একটা বিষয় হলো সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ।
এই অনুসন্ধান হঠাৎ কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নয় বরং নিয়মিত ভাবেই পরিচালনা করতে হয়। তা নাহলে যে বিক্রয় কাজে কোন সময় সফলতা অর্জন করতে পারবে না। প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য একজন বিক্রয়কর্মীকে একটি সুন্দর ও সৃষ্টিশীল সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণে বিক্রয়কর্মী এবং উৎপাদক উভয়ে বিভিন্ন ধরণের সুবিধা ভোগ করে থাকে। প্রত্যাশিত ক্রেতা অনুসন্ধানকারীর মাধ্যমে উৎপাদক যেমন তার পণ্য বিক্রয়ের নিশ্চয়তা পায় তেমনি বিক্রয়কর্মী বেশি পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে নিজে আর্থিক সহ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা ভোগ করে। নিম্নে পর্যায়ক্রমে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণের গুরুত্ব আলোচনা করা হলো :
১. সময় অপচয় রোধ করা (To protect the waste of time):
প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ বিক্রয়কর্মীর সময় ও শ্রম অপচয়কে রোধ করে। অনেক ক্রেতা অযথা বিক্রয়কর্মীর সাথে গল্প বা অন্য কাজ নিয়ে বিক্রয়কর্মীর সাথে ব্যস্ত থাকে, তাদের উদ্দেশ্য পণ্য ক্রয় করা নয়। কিন্তু বিক্রয়কর্মীর সময় ও শ্রম দুটোই মূল্যবান। ৩০ মিনিট ধরে ক্রেতা বিক্রেতার সাথে গল্প করে পণ্য ক্রয় না করেই চলে যায় তবে এখানে বিক্রেতার সময় ও শ্রম দুটোই নষ্ট হয়। সেই ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে দেখতে হবে ক্রেতার পণ্য ক্রয় করার ইচ্ছা এবং সমর্থ্য আছে কিনা। যদি না থাকে তবে তার পেছনে সময় নষ্ট করা বিক্রয়কর্মীর উচিত নয়।
২. কর্মশক্তির সঠিক ব্যবহার (To appropriate use energy) :
প্রত্যাশিত ক্রেতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিক্রেতার কর্মশক্তির সঠিক ব্যবহার করা যায়। একজন বিক্রেতাকে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহকের মুখোমুখি হতে হয়। তাদের নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় এবং তাদের বিভিন্নভাবে পরিচালনা করতে হয়। ফলে সারাদিন ক্রেতার নিকট কর্মশক্তি ব্যবহারের ফলে তার কর্মশক্তি হ্রাস পেতে থাকে। আমরা জানি যে প্রতিটি মানুষের মতো বিক্রয়কর্মীদেরও কর্মশক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
এ কারণে যারা প্রকৃত ক্রেতা নয় তাদের সাথে বিক্রয়কর্মী যদি সর্বদাই কথাবার্তা ও অন্যান্য কাজে ব্যস্ত থাকে তবে তার কর্মশক্তি এবং মেধা ক্রমেই কমতে থাকে। অন্যদিকে যদি বিক্রয়কর্মী প্রকৃত ক্রেতা অনুসন্ধান করতে পারে তবে তাকে কম সময় ও শ্রম ব্যয় করে পণ্য বিক্রয় করতে পারে ফরে তার কর্মশক্তি অপচয় হয় না।
৩. সম্ভাব্য ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করা (Covert potential buyer into a buyer):
একজন বিক্রয়কর্মীকে তখনই সফল বলা হয় যখন সে একজন সম্ভাব্য ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করতে পারে। সে কারণে একজন বিক্রয়কর্মী প্রথমত চেষ্টা হলো তার পণ্য বা সেবার সম্ভাব্য ক্রেতা কারা তা চিহ্নিত করা এবং পরে বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য করা।
যখন একজন জীবন বীমা কর্মী কোন নতুন চাকুরীজীবিকে দেখে তখন তাকে তাদের পলিসির জন্য একজন উজ্জ্বল সম্ভাব্য ক্রেতা মনে করে। এরপর তারা তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং বিভিন্ন কৌশলের মাধ্যমে তাদের কাছে পলিসি বিক্রয় করে। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতার অন্বেষণ করতে পারলে বিক্রয়কর্মীর পক্ষে তাদের প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করা সহজ হয়।
৪. আয় বৃদ্ধি (To increase income):
বিক্রয়কর্মী এবং উৎপাদক উভয় উপকৃত হয় প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ দ্বারা। প্রত্যাশিত ক্রেতারা দুভাবে প্রভাবতি হয়ে থাকে। প্রথমত উৎপাদকগণ দ্বারা এবং বিক্রয়কর্মী দ্বারা। উৎপাদকগণ সরাসরি যারা একসাথে ব্যাপক পণ্য ক্রয় করে তাদের প্রভাবিত করে থাকে এবং বিক্রয়কর্মীগণ সর্বদা সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রভাবিত করে থাকে।
ফলে সঠিকভাবে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ করতে পারলে উৎপাদকগণ যেমন সঠিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে তেমনি বিক্রয়কর্মীগণ সঠিক কৌশল অবলম্বন করতে পারে। তাই প্রত্যাশিত ক্রেতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীগণ অল্প সময়ে অল্প পরিশ্রমে অধিক দ্রব্য বিক্রয় করতে পারে। সামগ্রিক প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। এখানে উৎপাদক এবং বিক্রয়কর্মীর উভয়ের স্বার্থ পূরণ হয়। উৎপাদকের এবং বিক্রয়কর্মীর আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
৫. কার্যকর বিক্রয় পরিবেশ (Effective selling environment):
সকলেই পণ্য ক্রয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রয়কর্মীদের নিকট আসে না। কিছু ক্রেতারা শুধু গল্প করেই বিক্রয়কর্মীর সময় নষ্ট করে না বরং অনেক ধরণের ঝামেলা ও হয়রানির সৃষ্টি করে। অনেকে বিক্রয়কর্মীদের প্রতারণা করে এবং বিভিন্ন ধরণের ধোঁকার মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীর সময় ও বিক্রয় পরিবেশ নষ্ট করে। সুষ্ঠু ক্রেতা অন্বেষণ থেকে প্রকৃত ক্রেতাদের চিহ্নিত করলে তাদের কাছে বিক্রেতা নিরাপদে ও পারিবারিক পরিবেশে পণ্য বিক্রয় করতে পারে। প্রকৃত ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রয় করে বিক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে এবং ঝামেলা মুক্ত থাকে। তাই প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ কর্যকর বিক্রয় পরিবেশের সৃষ্টি করে থাকে।
৬. সঠিক বিক্রয় পূর্বানুমান (Accurate sales forecost) :
বিক্রয়কর্মীগণ তাদের পণ্যের সঠিক বিক্রয় পূর্বানুমান নিয়ে ভীষণ বিপদের মধ্যে থাকে। কোন সময় অনেক পণ্যের অর্ডার দেওয়া পরে পণ্য অবিকৃত থাকে আবার কম অর্ডার দেওয়ার পর ক্রেতারা ঠিকমত পণ্য সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। সঠিক পুর্বানুমান করতে না পারায় পণ্যের চাহিদা এবং সরবরাহের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বড় ধরণের অমিল দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধান করার জন্য সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ করা হয়।
সম্ভাব্য ক্রেতাদের ক্রয় অভ্যাস, প্রকৃতি, আয়, চাহিদার ধরণ ইত্যাদি জানা থাকলে সেই দিক বিশ্লেষণ করে পণ্যের সঠিক বিক্রয় পূর্বানুমান করা যায়। যার ফলে ক্রেতা এবং বিক্রেতার সুন্দর সম্পর্ক বজায় থাকে এবং বিক্রেতা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারে।
৭. কার্যকর গ্রাহক সম্পর্ক (Effective customer relationship ) :
ক্রেতা বা গ্রাহক ক্রয়কৃত পণ্য ও সেবা থেকে সর্বোচ্চ যে উপযোগ লাভ করে তাকে ক্রেতা সন্তুষ্টি বলা হয়। ক্রেতার উপযোগের সাথে অনেক বিষয় জড়িয়ে থাকে। তার মধ্যে একটি অন্যতম বিষয় হলো বিক্রেতার উপযোগ। ক্রেতারা কেবলমাত্র পণ্য থেকেই নয় বরং বিক্রেতাদের নিকট থেকে সর্বোচ্চ উপযোগ আশা করে। একজন ক্রেতার সম্পর্কে সামগ্রিক তথ্য যদি বিক্রেতার কাছে থাকে তবেই বিক্রেতা ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করতে পারে। বিক্রেতা যদি জানে ক্রেতা একজন ডায়াবেটিক রুগী তবে তিনি তাকে ডায়েট কোক দিয়ে আপ্যায়ন করবেন। এতে করে বিক্রেতার উপযোগ ক্রেতার কাছে অনেক গুণ বৃদ্ধি পায়। এটা তখনি সম্ভব যখন বিক্রেতা সঠিকভাবে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ করতে পারবে।
৮. সম্ভাব্য ক্রেতা তৈরি (Creating potential customer):
ক্রেতা অন্বেষণ প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য ক্রেতার পরিমাণ অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। ক্রেতা তালিকা তৈরির সময় বিক্রয়কর্মীগণ ক্রেতাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে যে কার্যক্রম পরিচালনা করে তাতে অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা সৃষ্টি হয়ে থাকে। যে সকল ক্রেতা পণ্য সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিলো তাদের পণ্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হয়। বর্তমানে ফেসবুক পেজে অনেক পণ্য প্রদর্শন করা হয় এবং লাইক বা কমেন্ট বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ক্রেতার পরিমাণ বুঝা যায়। আবার যাদের কাছে ইমেইল পাঠানো হলো তাদের কতজন সাড়া দিলো সেখান থেকে সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা জানা যায়। এই সকল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনেক অনেক নতুন ক্রেতার সৃষ্টি হয়, একজন সম্ভাব্য ক্রেতা প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত হয় এবং সে আবার নতুন সম্ভাব্য ক্রেতা তৈরি করে। এইভাবে ক্রেতা অন্বেষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতার পরিমাণ বৃদ্ধি পায় ৷
৯. হারানো ক্রেতা ধরে রাখা ( Retain lost customers) :
যারা একবার পণ্য ক্রয় করার পর আর কোম্পানির পণ্য বা সেবা ব্যবহার করে নাই তাদেরকে হারানো ক্রেতা বলে। বিশেষ করে কিছু টেকসই বা আধা টেকসই জাতীয় পণ্য রয়েছে যাদের ইউনিট মূল্য অনেক বেশি সে সকল পণ্যসমূহ মানুষ প্রথমবার ক্রয় করার পর তারা পণ্যের ব্র্যান্ড বা পণ্য সম্পর্কিত বিষয় খুব একটা মনে রাখে না। যেহেতু এই সকল পণ্য অনেক দিন পর পর ক্রয় করতে হয় সেহেতু প্রত্যাশিত ক্রয় অন্বেষণ ক্রেতাদের আবার কোম্পানির পণ্য সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেয় যার ফলে ক্রেতা আবার উক্ত পণ্য ক্রয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে থাকে।
১০. প্রতিযোগিতামূলক অন্তর্দৃষ্টি অর্জন (Gain competitive insights):
প্রতিযোগিতামূলক অন্তর্দৃষ্টি অর্জনের একটি সহজ উৎস হলো প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ। বিভিন্ন কারণে বিক্রয়কর্মী প্রতি মাসে বা বছরে দুইবার ক্রেতা অনুসন্ধান করে থাকে। বর্তমান ক্রেতা মৃত্যুবরণ করলে, দ্রব্য ক্রয়ে ব্যর্থ হলে, দ্রব্য ক্রয় থেকে অবসর গ্রহণ করলে, ক্রেতা অন্যত্র চলে গেলে, প্রতিযোগী দ্রব্য ক্রয়ে আকৃষ্ট হলে, অর্থনৈতিক কারণে দ্রব্য ক্রয়ে অসমর্থ হলে, বর্তমান দ্রব্য যদি ক্রেতার উপযোগ মেটাতে না পারে তবে বিক্রয়কর্মীকে বর্তমান ক্রেতার স্থলে সম্ভাব্য ক্রেতা খুঁজে বের করতে হয়। এছাড়া পণ্যের অবস্থান গ্রহণ, ও বিপণন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ক্রেতাদের বিভিন্ন তথ্যাদি প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ থেকে সংগ্রহ করা যায়।
অতএব, সার্বিক আলোচনা থেকে এটা বলা যায় বিভিন্ন কারণে সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণ বিপণনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একজন সফল বিক্রয়কর্মী প্রত্যাশিত ক্রেতার নিকট পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে এবং একজন সাধারণ বিক্রয়কর্মী সকল ক্রেতার নিকট পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে। সফল বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের সকল তথ্য সংগ্রহ করে পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে কিন্তু সাধারণ বিক্রয়কর্মীদের নিকট কোন ক্রেতা তথ্য থাকে না। তাই যারা সন্দিহান ক্রেতা তাদের বর্জন করে প্রকৃত ক্রেতাদের নিকট পণ্য বিক্রয় ও মুনাফা অর্জনের জন্য প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ একান্ত অপরিহার্য।

একজন ভাল প্রত্যাশিত ক্রেতার বৈশিষ্ট্যসমূহ (Characteristics of a Good Prospect):
যারা বর্তমানে পণ্য ক্রয় করছে না কিন্তু যেকোন সময়ে পণ্য ক্রয় করতে পারে তাদেরকে প্রত্যাশিত ক্রেতা বলা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে সকল মানুষকে সম্ভাব্য ক্রেতা বলা যেতে পারে। বিপণনের ক্ষেত্রে এভাবে সবাইকে সম্ভাব্য ক্রেতা বলা হয় না। অনেক সময় আমরা লিডের (lead) সাথে প্রসপেক্টকে এক করে বিবেচনা করি। আসলে যাদের পণ্য ক্রয়ের সম্ভাবনা আছে তাদের লিড বলা হয় আর যেসকল লিডদের পণ্য ক্রয়ের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে তাদের প্রসপেক্ট বলা হয়।
ফলে সকল প্রসপেক্টকে লিড বলা যেতে পারে কিন্তু সকল লিড প্রসপেক্ট নয়। কোন পণ্য যদি ক্রেতাদের ইমেইলে পাঠানো হয় আর যেসকল ক্রেতা এটাকে দেখে থাকে তাদের সবাইকে লিড বলা যায় কিন্তু যারা এই ইমেইলের উত্তর দিয়ে কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করে তাদের প্রসপেক্ট বলে। তাই সবাই প্রসপেক্ট হতে পারে না। একজন ভাল প্রসপেক্ট হওয়ার জন্য একজন মানুষকে অনেকগুলো গুণাবলী অর্জন করতে হয়। নিম্নে একজন ভালো প্রসপেক্টের বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করা হলো:
১. ক্রয় চাহিদা (Need to buy):
ক্রেতার নিকট পণ্য বিক্রয় উপস্থাপনের পূর্বে বিক্রেতাকে বুঝতে হবে ক্রেতার আসলে ঐ পণ্যটির চাহিদা রয়েছে কিনা। যদি বিক্রয়কর্মী আন্দাজ করতে পারে যে ক্রেতার পণ্যটি ক্রয়ের কোন চাহিদা নেই তবে সে তার কাছে ভিন্নভাবে পণ্য উপস্থাপন করবে। কারণ এই সকল ক্রেতার পিছনে সময় ও শ্রম কোনটাই ব্যয় না করে সুকৌশলে তাদের এড়িয়ে যাওয়ায় বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যদি কোন ক্রেতার পণ্যের কোন চাহিদা না থাকে তবে সে ঐ পণ্যের জন্য অবশ্যই একজন ভাল প্রসপেক্ট হবে না। তবে বিপণনকারীগণ ক্রেতাদের পণ্য চাহিদা না থাকলেও বিভিন্ন বিপণন কৌশলের মাধ্যমে ক্রেতাদের চাহিদার সৃষ্টি করে থাকে।
অন্যদিকে যদি ক্রেতাদের পণ্য চাহিদা থাকে তাদেরকে একজন ভালো প্রসপেক্ট বলা হয়। এই ক্ষেত্রে তাদের চাহিদার ভিন্নতা অনুযায়ী বিক্রয়কর্মীকে সেইভাবে পণ্য বিক্রয় উপস্থাপনা করতে হয়। যেমন ক্রেতার প্রয়োজন নির্ধারণে বয়স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ বিভিন্ন বয়সের ক্রেতাদের চাহিদার ধরণ বিভিন্ন হয়ে থাকে । আবার পুরুষদের এবং মহিলাদের চাহিদার ভিন্নতাদেখা দেয়। ধর্ম, পেশা, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদির কারণে চাহিদার ভিন্নতা দেখা দেয় ।
২. ক্রয়ের সামর্থ্য (Ability to buy):
ক্রেতার পণ্য ক্রয় করার ইচ্ছা আছে কিন্তু তার ক্রয়ের সামর্থ্য নেই তখন তাকে একজন ভালো প্রসপেক্ট বলা যাবে না। একজন ভিক্ষুকের একটা গাড়ি ক্রয়ের ইচ্ছা থাকতে পারে কিন্তু গাড়ি ক্রয়ের মত আর্থিক সমর্থ্য তার নেই। যে কারণে গাড়ি বিক্রয়ের জন্য একজন ভিক্ষুক কোন মতেই প্রসপেক্ট হতে পারে না । পণ্য বিক্রয়ের সময় একজন বিক্রেতাকে তার ক্রেতার আর্থিক সমর্থ্যের দিকটি বিবেচনা করে পণ্য বিক্রয় উপস্থাপনা করতে হবে। ক্রেতার আর্থিক সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করতে হয়। যেমন- পেশাগত কারণে একজন ক্রেতার আর্থিক সমর্থ্যের পার্থক্য দেখা যায়।
একজন ডাক্তারের আর্থিক সামর্থ্য একজন ব্যাংক কর্মচারীর চেয়ে অনেক গুণ বেশি হয়। আবার একই পেশায় দুইজন মানুষের ক্রয় সামর্থ্য দুই রকম হয়ে থাকে। দুইজন অফিস সহকারী একজন পারিবারিক ভাবে খুব অবস্থা সম্পন্ন এবং একজন পারিবারিক ভাবে অবস্থা সম্পন্ন নন। এই ক্ষেত্রে দুই জনের মাসিক বেতন এক হওয়া সত্ত্বেও একজনের ক্রয় সামর্থ্য অন্য জনের চেয়ে অনেক বেশি হবে। এছাড়া অভ্যাস, জীবনযাত্রার মান, সামাজিক মর্যাদা ইত্যাদি ক্রেতার ক্রয় ক্ষমতাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। কারণ মর্যাদা বা জীবনযাত্রার মান অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থেই ক্রেতাকে অর্থ উপার্জন ও ব্যয় করতে হয়।
৩. ব্যয় করার ইচ্ছা (Willingness to spend ):
একজন ক্রেতার পণ্য চাহিদা রয়েছে এবং আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু তিনি অর্থ ব্যয় করে ঐ পণ্য ক্রয় করতে মানসিকভাবে ইচ্ছুক নয় তবে তাকে একজন ভাল প্রসপেক্ট বলা যাবে না। একজন ভাল প্রসপেক্ট হতে হলে তার অবশ্যই অর্থ ব্যয় করে পণ্য ক্রয়ের ইচ্ছা থাকতে হবে। একজন ধনী মানুষ যার একটা গাড়ির প্রয়োজন রয়েছে এবং তার গাড়ি ক্রয়ের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু তিনি টাকা খরচ করে গাড়ি ক্রয় করতে মোটেও আগ্রহী নয়। তাকে কোন মতে একজন ভালো প্রসপেক্ট বলা যাবে না। তবে যাদের টাকা খরচ করার ইচ্ছা নেই তাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের বিপণন কৌশল প্রয়োগ করা যেতে পারে।
পণ্য বিক্রয় গবেষণা থেকে দেখা গেছে এই ধরণের ক্রেতাদের জন্য কিছু মটিভেশনাল কৌশল খুবই কার্যকরী। কিছু ইমোশনাল বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই শ্রেণীর ক্রেতাদের পণ্যের পিছনে ব্যয় করার আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়। তাই যদি পণ্য ক্রয়ে কারো সকল বিষয় অনুকূলে থাকে এবং সে যদি পণ্যে ক্রয়ের জন্য ব্যয় করতে আগ্রহী না হয় তবে তাকে ভাল প্রসপেক্ট বলা যায় না।
৪. ক্রয়ের অধিকার (Authority to buy):
একজন ভাল প্রসপেক্টের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো পণ্য ক্রয়ে তার অধিকার থাকতে হবে। প্রথমে বিক্রয়কর্মীকে বিবেচনা করতে হবে যে ক্রেতার নিরাবিচ্ছিন্ন ক্রয় অধিকার আছে কিনা। যদি না থাকে তবে তার জন্য সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করা যুক্তিযুক্ত হবে না। যেমন- একজন ক্রেতা বিক্রয়কর্মীর নিকট থেকে বিভিন্ন ধরণের তথ্য সংগ্রহ করার পর যদি বলে আগামীকাল আমার অফিস বস এসে পণ্যটি ক্রয় করবে আমি কেবল তথ্য সংগ্রহ করলাম।
এই ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীকে প্রথমেই খেয়াল করতে হবে তিনি প্রকৃত ক্রেতা কিনা। আবার কিছু বিষয় আছে যেমন- ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অনেক দেশে ঔষধ বিক্রয় করা যায় না। চুক্তি আইন অনুযায়ী নাবালকের সাথে কোন সম্পদ ক্রয় বিক্রয় সম্পাদন করা যায় না। সরকারি অফিসে ক্রয় বিক্রয় করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে থাকে। পণ্য বিক্রয়ের পূর্বে একজন বিক্রয়কর্মীকে গভীর ভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে যারা পণ্য ক্রয়ের জন্য এসেছে তাদের যথাযথ পণ্য ক্রয়ের অধিকার আছে কিনা। যদি না থাকে তবে তাদেরকে কখনই একজন ভাল প্রসপেক্ট বলা যাবে না ।
৫. প্রবেশযোগ্যতা (Accesibility):
একজন ব্যক্তির প্রয়োজন, আর্থিক সামর্থ্য এবং ক্রয় অধিকার থাকা সত্ত্বেও যদি তার যথাযথ প্রবেশযোগ্যতা না থাকে তবে তাকে একজন ভালো প্রসপেক্ট বলা যায় না। ভালো প্রসপেক্ট হবার জন্য অবশ্যই ক্রেতার প্রবেশযোগ্যতা থাকতে হবে। বিক্রয়কর্মীর সাথে যদি ক্রেতার যথাযথ যোগাযোগ না হয় এবং যদি বিক্রয়কর্মীর ক্রেতার কাছে পৌছানোর প্রবেশযোগ্যতা না থাকে তবে তাকে ভালো প্রসপেক্ট বলা যাবে না। একজন বিক্রয়কর্মীর পক্ষে সবসময় একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভবপর হয় না। সকলের পক্ষে প্রধান বিচারপতি বা একজন মেজর জেনারেলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা সম্ভব হয় না। ফলে এদের প্রত্যাশিত ক্রেতা বলা যায় না।
যে সকল ক্রেতারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে তাদের সাথে সকল ক্ষেত্রে যোগাযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয় না। পেশাগত কারণে অনেকেই বিক্রয়কর্মীকে সময় দিতে পারে না। এ জাতীয় ক্রেতাদের একজন ভাল প্রসপেক্ট বলা যায় না। অন্যদিকে যদি কোন ক্রেতার উপর অনেক বিষয় একই সাথে প্রভাব বিস্তার করে তখন তিনি তার প্রবেশযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেন। যেমন- একজন নামকরা নায়িকা ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করলে তার আশেপাশের মানুষ, দোকানের বিক্রয়কর্মী, বিভিন্ন শ্রেণীর লোকজন তাকে যেভাবে প্রবাবিত করে ফলে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সে তার গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলে। সে কারণে যে সকল ক্রেতাদের সাথে বিক্রেতার সুষ্ঠু যোগাযোগের অসুবিধা রয়েছে তাদেরকে একজন ভাল প্রসপেক্ট বলা যায় না ।
৬. অন্যান্য বিষয় (Other factors):
এছাড়াও একজন ভাল সম্ভাব্য ক্রেতা অন্বেষণের জন্য একজন বিক্রয়কর্মীকে অনেকগুলো বিষয় বিবেচনা করতে হয়। আবার একজন ভাল সম্ভাব্য ক্রেতা হবার জন্য ক্রেতার নিজস্ব কিছু গুণাবলীর প্রয়োজন হয়ে থাকে। একজন ক্রেতার যদি নিজস্ব কোন সম্পত্তি না থাকে তবে সে ব্যাংক থেকে দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ করতে পারে না। আবার একজন ব্যক্তির বয়স যদি ৬০ বছরের বেশি হয়, তিনি যদি অবসরপ্রাপ্ত এবং হৃদরোগে আক্রান্ত হন তবে জীবন বীমার পলিসির জন্য তিনি অবশ্যই একজন ভাল সম্ভাব্য ক্রেতা বলে বিবেচিত হবে না। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে কিছু শারীরিক গুণাবলী গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়ে থাকে।
অন্যদিকে একজন ক্রেতার পণ্যজ্ঞান পণ্য ক্রয়ে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। একজন কম্পিউটার ক্রেতার যদি কম্পিউটার সম্পর্কে প্রাথমিক কোন ধারণা না থাকে তবে তার কাছে কম্পিউটার বিক্রি করা কষ্টকর হয়। এ ধরণের ক্রেতাদের একজন ভালো সম্ভাব্য ক্রেতা বলা যাবে না ।
উপরের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, ভালো সম্ভাব্য ক্রেতা হবার জন্য একজন ক্রেতার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন হয়। বিক্রয়কর্মীদের এই সকল বৈশিষ্ট্যসমূহ চিহ্নিত করে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে। সঠিক সম্ভাব্য ক্রেতা নির্বাচন কার্যকর বিক্রয় কার্যক্রমের অপরিহার্য বিষয়। এর মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীগণ দক্ষতার সাথে তাদের বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত করতে পারে। একজন বিক্রয়কর্মীর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে প্রকৃত যথাযথ সম্ভাব্য ক্রেতা অনুসন্ধান ও নির্বাচনের উপর।

সারসংক্ষেপ :
যে সকল ক্রেতারা বর্তমানে পণ্য ক্রয় করছে না কিন্তু ভবিষ্যতে তাদের পণ্য ক্রয় করার সম্ভাবনা রয়েছে এরূপ ক্রেতাদের প্রত্যাশিত ক্রেতা বলা হয়। বিক্রয়কর্মী যাদের কাছে পণ্য উপস্থাপনা করে তারা সকলেই প্রকৃত ক্রেতা নয়। বিক্রয়কর্মীর একটি অন্যতম কাজ হলো সম্ভাব্য ক্রেতাকে খুঁজে বের করা। বিক্রয়কর্মীকে অনেক শ্রম এবং মেধা নিয়োগ | করে সম্ভাব্য ক্রেতা নির্বাচন করতে হয়। বর্তমান ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণের গুরুত্ব অপরিসীম। যথাযথ উপায়ে প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ বিক্রয়কর্মীর সময়, শ্রম ও মেধার অপচয় রোধ করে এবং বিক্রয়কর্মী তার কর্মশক্তির সঠিক ব্যবহার করতে পারে।
এছাড়া প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ বিক্রেতার আয় বৃদ্ধি করে, কার্যকর বিক্রয় পরিবেশ বজায়ে রাখে, সঠিক বিক্রয় পূর্বানুমান করে, কার্যকর গ্রাহক-সম্পর্ক স্থাপন করে, হারানো ক্রেতা ধরে রাখে এবং প্রতিযোগিতামূলক অন্তর্দৃষ্টি অর্জনে সহায়তা করে। সবাই ভালো সম্ভাব্য ক্রেতা হতে পারে না। একজন ভালো সম্ভাব্য ক্রেতার কিছু বৈশিষ্ট্য থাকে। যেমন- তার ক্রয় চাহিদা থাকতে হবে, পণ্য ক্রয়ের সামর্থ্য এবং ইচ্ছা থাকতে হবে, পণ্য ক্রয়ের অধিকার ও প্রবেশযোগ্যতা থাকতে হবে। একজন বিক্রয়কর্মীর সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো সম্ভাব্য ক্রেতাকে প্রকৃত ক্রেতায় পরিণত করা ।

১ thought on “প্রত্যাশিত ক্রেতা অন্বেষণ: গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্য”