বিক্রয় প্রসার উদ্দেশ্য ও পদক্ষেপ

বিক্রয় প্রসার উদ্দেশ্য ও পদক্ষেপ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর  “ব্যক্তিক বিক্রয়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিক্রয় প্রসার উদ্দেশ্য ও পদক্ষেপ

Table of Contents

বিক্রয় প্রসার উদ্দেশ্য ও পদক্ষেপ

 

বিক্রয় প্রসার হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের কৌশলের সমন্বয়, যার মাধ্যমে দ্রুত এবং জোরালো বাজার প্রতিক্রিয়া অর্জন করা সম্ভব। বিক্রয় প্রসার পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিচিত্র ভূমিকা পালন করে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিনামূল্যে পণ্য বিতরণের ফলে ভোক্তারা পরবর্তীতে ঐ পণ্য ক্রয়ে অধিক আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। বিক্রয় প্রসার কৌশল বিজ্ঞাপনের চেয়ে অধিক দ্রুত ক্রেতার মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, আবার বিক্রয় প্রসার যখন বিজ্ঞাপনের সাথে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয় তখন বিক্রয় প্রসার থেকে সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ফল পাওয়া যায়।

আবার ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে উৎপাদনকারী এবং মধ্যস্থকারীদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সুসম্পর্ক গড়ে উঠে। বিপণন প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে বিজ্ঞাপন যেখানে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয় আহ্বান জানায়, সেখানে বিক্রয় প্রসার ক্রেতাসাধারণকে এখনই পণ্য ক্রয় করতে উৎসাহিত করে। নতুন পণ্য প্রবর্তন অথবা ক্রমহ্রাসমান চাহিদা বিশিষ্ট পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির জন্য বিক্রয় প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

বিক্রয় প্রসার (Sales Promotion ):

প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো বিক্রয় প্রসার। এর মাধ্যমে ক্রেতাগণকে পণ্য বা সেবা গ্রহণে হঠাৎ দৃষ্টি আকর্ষণ ও ক্রয় প্রেরণা সৃষ্টি করা হয়। সাধারণ অর্থে বিক্রয় প্রসার বলতে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বহুল পরিমাণে বিক্রয় করাকে বুঝায়। কিন্তু বিপণনের ভাষায় এটি স্বল্প সময়ের জন্য ব্যবহৃত প্রসার কৌশল যা প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। অন্যভাবে বলা যায় প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য গৃহীত স্বল্পকালীন উদ্দীপনামূলক কার্যক্রমকে বিক্রয় প্রসার বলে। তবে বিজ্ঞাপন, প্রচার ও ব্যক্তিক বিক্রয় ব্যতীত পণ্য বা সেবার বিক্রয় বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রমকেও বিক্রয় প্রসার বলা হয়।

যেমন- ক্রেতাদের মনে পণ্য সংক্রান্ত বিষয়ে অনুকূল মনোভাব সৃষ্টির জন্য ক্রেতাদের বিভিন্ন জিনিস উপহার হিসেবে প্রদান করা যায়। এরূপ উপহারের গায়ে উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা লিখা থাকে। যেমন- ক্যালেন্ডার, কলম, চাবির রিং, ডাইরি, পেপার ওয়েট ইত্যাদি। উপহারসামগ্রী পাওয়ার পর ক্রেতাদের ঐ প্রতিষ্ঠানের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং অন্য ক্রেতারাও আকৃষ্ট হয়ে থাকে। নিম্নে কয়েকটি সংজ্ঞার মাধ্যমে বিক্রয় প্রসারের ব্যাখ্যা প্রদান করা হলো ।

Philip Kotler, “Sales promotion is a short-term incentive to encourage purchase or sale of a product or service.” (বিক্রয় প্রসার হলো স্বল্পকালীন উদ্দীপনা যা পণ্য বা সেবার ক্রয় কিংবা বিক্রয়কে বৃদ্ধি করে।)

American marketing Association 4, “Sales promotions are those activities other than personal selling, advertising and publicity that stimulate consumer purchasing and dealer effectiveness.” (ক্রেতাদের ক্রয়কে প্ররোচিত করা এবং ডিলারদের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য বিক্রয়িকতা, বিজ্ঞাপন ও প্রচার ছাড়া অন্যান্য বিপণন কার্যাবলীকে বিক্রয় প্রসার বলে।)

Association of National Advertisers, USA 4, “Sales promotion is a short-term incentive to the trade or consumer to induce purchase of the product.” (বিক্রয় প্রসার হলো স্বল্পকালীন উদ্দীপনা যা ব্যবসা বা ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বৃক্ত করে।

উপরের আলোচনা এবং সংজ্ঞার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য ক্রয় বা ব্যবহারের জন্য ক্রেতা বা ব্যবহারকারীদের প্রতি অতিরিক্ত উদ্দীপনামূলক সাময়িক পন্থা হিসেবে বিক্রয় প্রসারকে আখ্যায়িত করা যায়। পণ্যের চাহিদা হঠাৎ করে নিম্নগামী হলে পুনরায় পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধিতে এই প্রসার পদ্ধতি খুব কার্যকর ভূমিকা রাখে।

আবার বাজারে নতুন পণ্য প্রবর্তনের সময় বিপণনকারীগণ এই পদ্ধতির সহায়তা গ্রহণ করে থাকে। উৎপন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয়ের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ যাবতীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্রেতাকে পণ্য ক্রয় উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রমকে বিক্রয় প্রসার বলা যায়। বিপণন প্রসারের বিভিন্ন পদ্ধতি যেমন- বিজ্ঞাপন, বিক্ৰয়িকতা, গণসংযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি বিক্রয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে সকল অনিয়মিত প্রসারমূলক কার্যক্রম সীমিত সময়ের জন্য গ্রহণ করা হয় তাকে বিক্রয় প্রসার বলে । উপরের আলোচনা এবং সংজ্ঞার বিশ্লেষণ করে বলা যায়, নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য ক্রয় বা ব্যবহারের জন্য ক্রেতা বা ব্যবহারকারীদের প্রতি অতিরিক্ত উদ্দীপনামূলক সাময়িক পন্থা হিসেবে বিক্রয় প্রসারকে আখ্যায়িত করা যায়।

পণ্যের চাহিদা হঠাৎ করে নিম্নগামী হলে পুনরায় পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধিতে এই প্রসার পদ্ধতি খুব কার্যকর ভূমিকা রাখে। আবার বাজারে নতুন পণ্য প্রবর্তনের সময় বিপণনকারীগণ এই পদ্ধতির সহায়তা গ্রহণ করে থাকে। উৎপন্ন পণ্যসামগ্রী বিক্রয়ের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ যাবতীয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্রেতাকে পণ্য ক্রয় উদ্বুদ্ধ করার কার্যক্রমকে বিক্রয় প্রসার বলা যায়। বিপণন প্রসারের বিভিন্ন পদ্ধতি যেমন- বিজ্ঞাপন, বিক্ৰয়িকতা, গণসংযোগ ইত্যাদির পাশাপাশি বিক্রয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে সকল অনিয়মিত প্রসারমূলক কার্যক্রম সীমিত সময়ের জন্য গ্রহণ করা হয় তাকে বিক্রয় প্রসার বলে ।

 

 

বিক্রয় প্রসারকার্যের উদ্দেশ্যসমূহ ( Purposes of Sales Promotion):

বিক্রয় প্রসারের আলোচনা থেকে দেখা যায় যে, বিক্রয় প্রসারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি। ভোক্তা এবং মধ্যস্থতাকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য এই কার্যক্রম চালানো হয়। বর্তমানে বিক্রয় প্রসারের গুরুত্ব বিপণন প্রসারের অন্যান্য হাতিয়ারগুলোর চেয়ে অনেকাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পণ্য বিক্রয়ের জন্য বিক্রয় প্রসারকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যাচ্ছে যে যেখানে বিক্রয় প্রসারের খরচ বছরে ১২% বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে বিজ্ঞাপনের খরচ বাড়ছে মাত্র ৭.৬%। নানাবিধ কারণে বিপণন ব্যবস্থাপকগণ বিক্রয় প্রসারের জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করছে। পৃথিবীব্যাপী বড় বড় প্রতিষ্ঠানসমূহ বিক্রয় প্রসারকে গুরুত্বপূর্ণ বিপণন, প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছে। নিম্নে বিক্রয় প্রসারের বিভিন্ন উদ্দেশ্যসমূহ আলোচনা করা হলো :

 

১. দ্রুত বিক্রয় বৃদ্ধি (Rapid increase in sales):

বিক্রয় প্রসারের প্রধান উদ্দেশ্য হলো দ্রুত বিক্রয় বৃদ্ধি । তড়িৎ বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির গুরুত্ব অনেক বেশি। শাড়ির দোকানে বা জুতার দোকানে প্রায় বিশেষ মূল্যহ্রাস কর্মসূচি দিয়ে তড়িৎ বিক্রয় বৃদ্ধি করা হয়।

 

২. নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করা (Attracting new customers):

বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য প্রথমে নতুন ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের চিহ্নিত করতে হবে। দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য ক্রেতা গ্রুপ কারা এবং তাদের বৈশিষ্ট্য কি। বিক্রয় প্রসার কৌশলের মাধ্যমে নতুন ক্রেতারা পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী হয়।

 

৩. নতুন পণ্য প্রবর্তন (Introducing new product):

বাজারে যখন নতুন পণ্য প্রবর্তন করা হয় তখন তার বাজার চাহিদা অনেক কম থাকে । নতুন পণ্যের পরিচিতি এবং চাহিদা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। যেমন বলা যায়, নমুনা বিতরণের মাধ্যমে নতুন পণ্যকে আকর্ষণীয় করা যেতে পারে।

 

8. পরীক্ষামূলক ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা (Encouraging trial purchase):

ক্রেতাদের পরীক্ষামূলক ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিক্রয় প্রসারের সহায়তা নেয়া হয়ে থাকে। আকর্ষণীয় মূল্য ছাড়ের কারনে অনেক ক্রেতা পরীক্ষামূলকভাবে পণ্য ক্রয় করে। পরীক্ষামূলক পণ্য ক্রয়ে ক্রেতা সন্তুষ্টি লাভ করলে সে নিয়মিত ক্রেতায় পরিণত হয়।

 

৫. পুনঃ ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা (Encouraging repeated purchase):

প্রতিষ্ঠান তখনই সফলতা লাভ করবে যখন প্রথম ৫. বার ক্রয় করার পর সেই ক্রেতাকে নিয়মিত ক্রেতায় পরিণত করা যাবে। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের মাধ্যমে একজন নতুন ক্রেতা বার বার পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহ প্রকাশ করে এবং অন্য ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে।

 

৬.পতন স্তরের কৌশল (Strategy in decline stage):

পতন স্তরে পৌঁছে গেলে পণ্যের বাজার চাহিদা কমে এবং পণ্য বিক্রয়ের পরিমাণ কমে যায়। এই স্তরে দ্রুত পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করা ৬. হয়। ক্রেতাদের জন্য আকর্ষণীয় ও লোভনীয় অফারের মাধ্যমে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি করা হয়।

 

৭. প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা (Stay in competition):

সমজাতীয় প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সাথে টিকে থাকার জন্য অথবা প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করার উদ্দেশ্যে বিক্রয় প্রসারের সহায়তা নেওয়া হয়। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম বিবেচনা করে নতুন বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম নেওয়া হয়। ফলে ক্রেতারা নতুন কার্যক্রমের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে।

 

৮. ব্যাপক ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা (Encouraging large purchase):

স্বল্প সময়ে পণ্যের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। যেমন- ১০টি নুডুলসের প্যাকেট কিনলে ১টি টিফিন বক্স ফ্রি অথবা টুথপেস্টের সাথে টুথব্রাশ ফ্রি ইত্যাদি বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম ক্রেতাদের বেশি বেশি পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে যার ফলে পণ্যের মোট বিক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

 

৯. ব্র্যান্ডের বিশ্বস্ততা অর্জন (Achieving brand loyalty) :

যে সকল ব্র্যান্ড বাজারে সুনামের সাথে অবস্থান করছে ক্রেতাদের কাছে তাদের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য বিক্রয় প্রসারের বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়। যেমন বিক্রয় প্রসারের স্লোগান হিসেবে বলা হচ্ছে “বিফলে মূল্য ফেরত” যা ক্রেতাদের মনে পণ্য সম্পর্কে আস্থার সৃষ্টি করে ব্র্যান্ডের বিশ্বস্ততা অর্জিত হয়।

 

১০. প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি (Create company image):

বিক্রয় প্রসার প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা প্রদান করে। বিক্রয় প্রসার পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি ও বিক্রয় বৃদ্ধি করে এবং প্রতিযোগিদের তুলনায় নানাবিধ সুবিধা প্রদান করে ক্রেতাদের কাছে পণ্যের ও প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। বিক্রয় প্রসার ক্রেতার মনে আস্থার সৃষ্টি করে এবং নিজে পণ্য ক্রয় করে এবং অন্যকে ক্রয়ে উঃসাহিত করে।

 

১১. বিক্রয়কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি (Increase the morale of salesperson):

বিক্রয়কর্মীদের উপর সমগ্র বিক্রয় কার্যক্রম নির্ভর করে। বিক্রয়কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয়ের জন্য যাতে আরো উৎসাহিত হয় সে জন্য তাদের উদ্দেশ্যেও বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বিক্রয়কর্মীদের বোনাস প্রদান, বিক্রয়কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, বিক্রয়কর্মীদের সভা, বিভিন্ন রকমের পুরস্কার প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীদের উৎসাহিত করা হয়।

 

১২. আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ (Expand international market) :

এখন ওয়েবসাইট, ইন্টারনেট ও সোশাল মিডিয়ার মাধ্যমে যে কোন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরণের প্রসার কার্যক্রম ঘরে বসেই জানা যায়। বহুজাতিক কোম্পানিগুলি সারা পৃথিবীতে তাদের বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে পণ্যের চাহিদা কেবল দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং এর আবেদন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে।

 

১৩. অফ-সিজনে বিক্রয় বৃদ্ধি (Sales increase in off season):

কিছু পণ্য রয়েছে যাদের মৌসুমী বলা হয়, যেমন- শীতবস্ত্র। গ্রীষ্মকালে এসকল শীতবস্ত্রের কোন চাহিদা থাকে না। আকর্ষণীয় বিক্রয় অফারের মাধ্যমে অফ সিজনে পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধি করা হয় । গ্রীষ্মকালে শীতবস্ত্রের বিরাট মূল্য হ্রাস করা হলে অনেক ক্রেতা শীতের জন্য আগাম পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী হবে। এভাবে বিক্রয় প্রসার দ্বারা অফ সিজনে পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধি করে থাকে।

 

১৪. হারানো ক্রেতদের উজ্জীবিত করা (Encourage lost customer):

অনেকে ক্রেতা রয়েছে যারা একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড ক্রয় করার পর অন্য ব্র্যান্ড ক্রয় করে অথবা এই ব্র্যান্ডের প্রতি কোন কারণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই হারানো ক্রেতাদের পুনরায় পণ্য ক্রয়ের আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য বিক্রয় প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সৃষ্টি করে। হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা কিছু সেবা প্রতিষ্ঠান এই কার্যক্রমের জন্য ডিসকাউন্ট কার্ড বা মেম্বারশিপ কার্ড সরবরাহ করে থাকে ।

সার্বিক আলোচনা থেকে বিক্রয় প্রসারের অনেক ধরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে একটি পরিস্কার ধারণা লাভ করা যায়। এই সকল উদ্দেশ্য সফলভাবে অর্জন করতে হলে বিপণন নির্বাহীদের যথেষ্ট কৌশলী হতে হবে। এখানে মনে রাখা দরকার সকল পণ্য বা সেবার জন্য একই ধরণের বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম প্রয়োজন হবে না। তাই বিক্রয় প্রসারের সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারলে প্রতিষ্ঠান তার উদ্দেশ্যসমূহ সফলভাবে অর্জন করতে সমর্থ হবে।

 

বিক্রয় প্রসার উদ্দেশ্য

 

বিক্রয় প্রসারের পদক্ষেপসমূহ (Steps in Sales Promotion):

বিক্রয় প্রসার আধুনিক বিপণনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। অনেকগুলো উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম থেকে বিভিন্ন সুবিধা এবং বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্যসমূহ সফলভাবে অর্জন করতে হলে একটা সুন্দর পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। যখন প্রয়োজন তখন হঠাৎ করে একটি বিক্রয় কার্যক্রম প্রণয়ন করলে তা দিয়ে বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্য সফল হবে না। প্রত্যেকটা বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম ঘোষণার পূর্বে একটা সুষ্ঠু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপে অগ্রসর হতে হয়। বিক্রয় প্রসারের পদক্ষেপসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:

 

১. বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্য নির্ধারণ (Determining sales promotion objectives) :

বিক্রয় প্রসারের প্রথম পদক্ষেপ হলো উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা। বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্যসমূহ বিপণনের মৌলিক উদ্দেশ্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত। বিক্রয় প্রসারের সাথে অনেক গ্রুপ জড়িত থাকে। প্রথমেই ঠিক করতে হবে কাদের জন্য এই প্রসার কার্যক্রম পরিচালিত হবে। সকল গ্রুপের জন্য একজাতীয় উদ্দেশ্য নির্ধারণ সঠিক হবে না। যেমন- ভোক্তাদের জন্য যে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে ডিলারদের জন্য একই কর্মসূচি কার্যকর হবে না। যদিও বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম বিভিন্ন উদ্দেশ্যে চালানো হয় তথাপি বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের জন্য একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্যসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো।

 

ক) ক্রেতাদের জন্য ( For Customer )

i. ক্রেতাদের ব্যাপক ক্রয়ে উৎসাহ প্রদান। স্বল্প সময়ে মোট বিক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম চালানো হয়।

ii. ক্রেতাদের পুঃণক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। প্যাকেটের মধ্যে ডিসকাউন্ট অফার, কুপন, উপহার ইত্যাদি ক্রেতাদের পুনঃক্রয়ে উৎসাহিত করে।

iii. নতুন ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহ সৃষ্টির জন্য প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এতে পণ্য ক্রয়ের ঝুঁকি হ্রাস করে ।

iv. নতুন পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ সৃষ্টির জন্য প্রসার কার্যক্রম চালানো হয়। নমুনা প্রদানের মাধ্যমে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে অনুপ্রাণীত করা হয়।

v. অনিয়মিত ক্রেতাদের নিয়োমিত ক্রেতায় পরিণত করার জন্য প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। আকর্ষণীয় অফার প্রদান ক্রেতাদের নিয়মিত পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে।

 

খ) বিক্রয়কর্মীদের জন্য (For Salesperson):

i. নতুন পণ্যকে গ্রহণ করা এবং নতুন বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য বিক্রয় কর্মীদের উৎসাহ প্রদান করা

ii. অফ সিজনে পণ্যসামগ্রী বিক্রয়ের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

iii. বিক্রয়কর্মীদের সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। শ্রেষ্ঠ বিক্রেতা পুরস্কার বিক্রেতাকে অধিক পণ্য বিক্রয় করতে উৎসাহিত করে।

iv. বিশেষ বিক্রয় অফার খুচরা বিক্রেতার দোকানে ক্রেতাদের বার বার আসতে বাধ্য করে ।

v. বিক্রয়কর্মীদের স্টোর এবং প্রমোশনাল ডিসপ্লে ক্রেতদের সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে।

vi. এছাড়া বিভিন্ন মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম ও কর্মসূচির মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় কাজে মনোযোগী হতে বাধ্য করে।

বিক্রয় প্রসার উদ্দেশ্য ও পদক্ষেপ

গ) মধ্যস্থকারীদের জন্য (For Middlemen):

i) বিক্রয় প্রসারের প্রাথমিক কাজ হলো বণ্টন প্রণালী প্রতিষ্ঠিত করা। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম প্রাথমিকভাবে বণ্টন প্রণালী প্রতিষ্ঠা, প্রতিযোগিদের স্থান দখল এবং পণ্যের অবস্থান দখলের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখে।

ii) বণ্টন প্রণালীর অন্যান্য সদস্যরা যাতে মজুদের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে সেজন্য বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম ব্যাপক পরিমাণ মজুদ পণ্যের প্রাপ্তির নিশ্চয়তা সৃষ্টি করে।

iii) মৌসুমী পণ্যের ক্রয়ের জন্য ডিলারদের উৎসাহ প্রদান করা। তাই অফ সিজনে ডিলারদের জন্য ব্যাপক মূল্য ডিসকাউন্ট প্রদান করা হয়।

iv) পাইকারী এবং ডিলারগণ যাতে ব্যাপক পরিমাণ পণ্য সংগ্রহ করে তার জন্য যথাযথ বিক্রয় প্রসারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। ফলে তাদের পণ্য বণ্টন খরচ অনেকাংশে কমে আসে। ।

v) সর্বোপরি বিক্রয় ব্যবস্থাকে সচল রাখার নিমিত্তে ডিলার ও পাইকারদের জন্য বিভিন্ন ধরণের মোটিভেশন ও বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম হাতে নেয়া ।

সুতরাং বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালনার শ্রেণী নির্ধারণ পূর্বক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সেই সাথে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সাথে সঙ্গতি রেখে বিপণন কর্মসূচি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির লক্ষ্য নির্ধারণ করা আবশ্যক।

 

২. বিক্রয় প্রসারের কৌশল নির্বাচন (Selecting sales promotion tools):

বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্য নির্ধারণের পর দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো বিক্রয় প্রসারের কৌশল নির্বাচন। বিক্রয় প্রসারের কৌশলগুলোকে সাধারণত তিন ভাগ করা যায়। যেমন- ভোক্তা, ডিলার এবং বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিক্রয় প্রসার। এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে কাদের জন্য কি ধরণের বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। বিক্রয় কৌশল নিয়ে বিক্রয় প্রসার পদ্ধতি অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। প্রাথমিক ভাবে উল্লেখিত তিনটি গ্রুপের জন্য নিম্নলিখিত কৌশলসমূহ গ্রহণ করা যায়:

 

ক) ক্রেতার জন্য বিক্রয় প্রসার (Sales promotion for costumer):

ক্রেতাদের বিক্রয় প্রসার কৌশলে প্রধানত ক্রেতাকে তথ্য প্রদান, ক্রেতা শিক্ষা, ও ক্রেতাকে ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে। ভোক্তাদের জন্য বিক্রয় প্রসারের কৌশলসমূহ হলো স্যাম্পল, কুপণ, অর্থ ফেরত দান, প্রিমিয়াম, পুরস্কার, ক্রয় স্থান প্রদর্শন, প্রতিযোগিতা, মূল্য ছাড়, লটারী, গ্যারান্টি কার্ড প্রদান ইত্যাদি ।

 

খ) ডিলারদের জন্য বিক্রয় প্রসার (Sales promotion for dealers):

যারা বণ্টন অংশগ্রহণকারী হিসেবে পরিচিত যেমন ডিলার, পাইকারী ব্যবসায়ী, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি তাদের জন্য এক ধরণের বিক্রয় প্রসার কৌশল গ্রহণ করা হয়। সাধারণত ডিলারদের বিভিন্ন বিক্রয় কার্যক্রমে আগ্রহ সৃষ্টি করাই হলো এসকল কৌশলের প্রধান লক্ষ্য। সাধারণত ডিলার বা মধ্যস্থতাকারীদের জন্য যে সকল বিক্রয় প্রসার কৌশল গ্রহণ করা হয় তা হলো ক্রয় ভাতা, মূল্য ডিল, প্রদর্শনী ভাতা, পুশ মানি, পণ্য বিক্রয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, উপহার প্রদান, মূল্য অফ, অফ ইনভয়েস, বিজ্ঞাপন ভাতা ইত্যাদি।

 

গ) বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিক্রয় প্রসার (Sales promotion for salesperson):

বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরণের বিক্রয় প্রসারের ব্যবস্তা করা হয়ে থাকে। সাধারণত বিক্রয়কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা হলো এই বিক্রয় কৌশলের প্রধান লক্ষ্য। বিক্রয়কর্মীদের জন্য প্রধানত যে সকল বিক্রয় কৌশল গ্রহণ করা হয় তা হলো বোনাস প্রদান, পণ্য বিক্রয়ের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি, কমিশন প্রদান, সভা ও কনফারেন্সের আয়োজন, বিক্রয় প্রশিক্ষণ, পুরস্কার প্রদান ইত্যাদি।

 

৩. বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি উন্নয়ন (Developing sales promotion program) :

বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্য বির্ধারণ এবং বিক্রয় প্রসার কৌশল নির্বাচন করা সম্পন্ন হলে পরবর্তী পদক্ষেপ হলো বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির উন্নয়ন। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের জন্য একটি সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পরিকল্পনার সামগ্রিক কাঠামো নির্ধারণ করা প্রয়োজন। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমকে স্পষ্ট করে বুঝানোর জন্য বিপণনকারীকে কিছু অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি উন্নয়নের জন্য বিপণন প্রতিষ্ঠানকে যে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় তা নিম্নে আলোচনা করা হলো:

 

ক) বাড়তি সুবিধার পরিমাণ (Size of incentives):

বিক্রয় প্রসারের ক্ষেত্রে বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ভোক্তাদের কি জাতীয় সুবিধা প্রদান করবে সে ব্যাপারে পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে বিক্রয় প্রসার কর্মসূচিকে সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত যে সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে তার চেয়ে অতিরিক্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করা প্রয়োজন ।

 

খ) শর্তাবলী নির্ধারণ (Determining the condition):

বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমে কারা অংশগ্রহণ করবে অথবা কাদের জন্য পরিচালিত হবে তা নির্ধারণ করতে হবে। যারা অংশগ্রহন করবে তাদের কোন শর্ত পালন করতে হবে কি না তাও বিবেচনায় আনতে হবে। যেমন বিক্রয় প্রসারের শর্ত এমন হতে পারে যে, ১০টি পণ্য ক্রয় করলে আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে শর্ত হলো ক্রেতাকে অবশ্যই ১০টি পণ্য ক্রয় করতে হবে।

 

গ) বণ্টন মাধ্যম নির্বাচন (Determining the channel):

যে সকল মাধ্যমের দ্বারা বিক্রয় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে যে মাধ্যমগুলো নির্বাচন করতে হবে। বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিজেদের বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে অথবা মধ্যস্থকারীদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে পারে। অন্যদিকে মধ্যস্থকারীদের মাধ্যমে বণ্টনে কিছু ঝুঁকি রয়েছে। তাই বণ্টনের কোন মাধ্যম যুক্তিযুক্ত যেটা নির্ধারণ করতে হবে।

 

ঘ) বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি স্থায়িত্ব (Duration of Sales promotion):

বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির স্থায়িত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি খুব স্বল্প সময়ের জন্য প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তবে অনেক ক্রেতা বিক্রয় প্রসারের সুবিধাসমূহ গ্রহণে সক্ষম নাও হতে পারে। আবার যদি সময় অনেক বেশি হয় তবে ক্রেতারা ক্রয় সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করবে বা বিক্রয়কার্যকে বিঘ্নিত করতে পারে। অন্যদিকে সময় মেয়াদ না থাকলে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম নিয়ে ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে বিবাদ বা দ্বন্দ্ব দেখা দিতে পারে।

 

ঙ) বাজেট নির্ধারণ (Determining the budget):

বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তার বাজেট নির্ধারণ করতে হবে। বিক্রয় প্রসার বাজেট দুই ভাবে করা যেতে পারে। প্রথমত, নির্দিষ্ট একটি দ্রব্যের জন্য বাজেট প্রণয়ন করা। বিক্রয় প্রসার খরচ এবং প্রশাসনিক খরচ বিবেচনা করে বাজেট প্রণয়ন করা যায়। দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন দ্রব্যের জন্য আলাদা আলাদা বাজেট প্রণয়ন করা যায়। যেমন- টুথপেস্টের জন্য ২০%, শ্যাম্পুর জন্য ১৫% এবং সাবানের জন্য ১০% ইত্যাদি।

 

৪. বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির পূর্ব যাচাইকরণ (Pretesting of sales promotion program):

বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে উন্নয়নের পর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির পূর্ব যাচাইকরণ। সাধারণত বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমসমূহ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। তবে বর্তমানে প্রতিযোগিতার কারণে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার পূর্বেই কতগুলো বিষয় পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত। যেমন- বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমটি ফলপ্রসূ হবে কিনা, অতিরিক্ত সুবিধার পরিমাণ কাম্য পর্যায়ে থাকবে কিনা, বিক্রয় প্রসার কৌশলটি সঠিক হবে কি না, প্রচার মাধ্যমসমূহ যথার্থ কিনা ইত্যাদি।

ফলে বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি চূড়ান্তভাবে গৃহীত হওয়ার বা বাস্তবায়নের পূর্বেই এর সঠিকতা, সম্ভাব্যতা, কৃতকার্যতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। বিক্রয় প্রসারে পূর্ব যাচাইকরণ উদ্যোক্তাদের অনুভূত ঝুঁকিসমূহ দূর করতে সহায়তা প্রদান করে। বিপণন নির্বাহীর অনেক ধরণের সংশয় পূর্ব-পরীক্ষার দ্বারা দূর করা সম্ভব। যেমন- ক্রেতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিপণন নির্বাহীর বড় ধরণের সংশয় থাকে। যদি বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের পূর্ব পরীক্ষা করা হয় তবে এ সকল সংশয় থেকে একজন নির্বাহী মুক্তি পেতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠান ৪৫% মূল্য হ্রাস ঘোষণা করবে বলে মনে করলো এবং এর প্রেক্ষিতে পূর্ব-পরীক্ষা চালিয়ে দেখানো যে, অধিকাংশ ক্রেতা বা দর্শক এটাকে অযৌক্তিক মনে করছে।

কারণ এই পণ্যের গুণগত মান নিয়ে তাদের যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। ফলে ৪৫% মূল্য হ্রাস এই কর্মসূচিটিকে বাদ দিয়ে নতুন কোন কর্মসূচি প্রদান করতে হবে। ভোক্তা আচরণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিশেষ করে ট্রায়াল অফারের মাধ্যমে এ সকল পরীক্ষা করা যেতে পারে।

 

৫. বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রন (Coordination, implementation and control of sales promotion programs):

বিক্রয় কর্মসূচির পূর্ব পরীক্ষণ করার পর যদি ইতিবাচক ফলাফল পাওয়া যায় তখন একজন বিপণন নির্বাহী যে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তাহলো বিক্রয় কর্মসূচির সমন্বয়, বাস্তবায় ও নিয়ন্ত্রণ। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য বিক্রয় প্রসারের সাথে বিপণন প্রসারের অন্যান্য উপাদানের সুষ্ঠু সমন্বয় প্রয়োজন। যেমন- বিজ্ঞাপনে প্রচার করা হলো ৩০% মূল্য ছাড় কিন্তু বিক্রয়কর্মীর কাছে নির্দেশনা এলো ২০% মূল্য ছাড়। এই ক্ষেত্র বিষয়টি নিয়ে বিক্রয়কর্মী এবং ক্রেতার মধ্যে অহেতুক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হবে।

এ জাতীয় অনেক অবাঞ্ছিত বিষয়ের সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বিক্রয় প্রসারের সাথে প্রসার মিশ্রণের উপাদানসমূহের সুষ্ঠু সমন্বয় সাধন করতে হবে। এছাড়া এ ধরণের কর্মসূচি বাস্তবায়নের কি পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ হতে পারে, কত সময় লাগতে পারে, বিক্রয় কর্মীদের দক্ষতা কেমন হওয়া প্রয়োজন, মাধ্যমের কার্যকারীতা নির্বাচন ইত্যাদি বিবেচনা করে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের প্রত্যেকটি স্তরে নির্বাহীর নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রন থাকবে হবে। বিশেষকরে বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি বাস্তবায়নে মধ্যস্থাকারীগণ বিভিন্ন ধরণের সমস্যার সৃষ্ট করে থাকে। অন্যদিকে খুচরা ব্যবসায়ীদের বিশ্বস্ততা নিয়ে অনেক ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সকল ক্ষেত্রে বিপণন নির্বাহীর যথাযথ নিয়ন্ত্রন থাকতে হবে।

 

৬. বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির ফলাফল মূল্যায়ন (Evaluation of sales promotion program):

বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের শেষ ধাপ হলো বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির ফলাফল মূল্যায়ন। বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির বাস্তবায়নের পর এর ফলাফল মূল্যায়ন আবশ্যক। যে কোন বিপণন ব্যবস্থাপকই জানতে চান তার প্রদত্ত বিজ্ঞাপন ও বিক্রয় প্রসারের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ কতটুকু কার্যকরী হয়েছে এবং বিপণন কার্যক্রমে কি পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করেছে।

কারণ এর দ্বারা যদি কোন ইতিবাচক ফল না পাওয়া যায় তাহলে এতে কোন লাভ নেই। অথচ বিক্রয় প্রসার একটি ব্যয়বহুল ব্যাপার। বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির ফলাফল মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রয়োজনবোধে বিক্রয় প্রসারের যে সকল হাতিয়ারসমূহ রয়েছে তার কোন একটি পরিবর্তন করতে হয়, এমতাবস্থায় বিক্রয় প্রসার মূল্যায়ন ব্যতীত তা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। বিক্রয় প্রসার ফলাফল মূল্যায়ন সাধারণত নিম্নোক্ত পদ্ধতিগুলো অনুস্মরণ করা হয়:

 

ক) বিক্রয়ের পরিমাণ (Quantity of sales):

সর্বাধিক প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে বিক্রয় প্রসারকার্য চালানোর পূর্বের সময়ে এবং পরে সময়ে বিক্রয়ের তুলনা করা। ধরা যাক বিক্রয় প্রসার কার্য চালানোর পূর্বে কোম্পানির বাজার শেয়ার ছিল ৬%। বিক্রয় কার্য পরিচালনার পর কোম্পানির বর্তমান বাজার শেয়ার হলো ১০%। ফলে দেখা যাচ্ছে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের ফলে বাজার শেয়ার বৃদ্ধি পেয়েছে ৪%। এ তথ্য দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের ফলে নতুন ক্রেতার পরিমাণ বেড়েছে এবং বর্তমান ক্রেতারাও পণ্য ক্রয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

খ) ভোক্তা জরিপ (Consumer survey):

বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি সম্পর্কে ভোক্তাদের উপর জরিপ পরিচালনা করে ফলাফল মূল্যায়ন করা যায় । একটা বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক দিয়ে ক্রেতাদের প্রশ্ন করে তা থেকে ব্যবহারকারীর সংখ্যা, ভোক্তাদের ক্রয় আচরণ, ব্রান্ডের প্রতি ভোক্তাদের মনোভাব ইত্যাদি বিষয় বিশ্লেষণ করে ফলাফল মূল্যায়ন করা যায়। এখানে উন্মুক্ত উত্তর সম্বলিত প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে ক্রেতাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয় এবং তাদের মতামতের ভিত্তিতে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের কিছু দুর্বল বিষয় বাদ দেওয়া হয় অথবা নতুন কোন ধারণা অন্তর্ভূক্ত করা হয়।

 

Marketing, Marketing Gurukul, GOLN, মার্কেটিং, মার্কেটিং গুরুকুল, বিপণন, مارکیٹنگ , تسويق , विपणन

 

সারসংক্ষেপ :

বিপণন প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো বিক্রয় প্রসার। প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য গৃহীত স্বল্পকালীন উদ্দীপনামূলক কার্যক্রমকে বিক্রয় প্রসার বলে। যেমন ক্রেতাদের মনে পণ্য সংক্রান্ত বিষয়ে অনুকূল প্রভাব সৃষ্টির জন্য ক্রেতাদের বিভিন্ন জিনিসপত্র উপহার হিসেবে প্রদান করা যায়। এরূপ উপহারের গায়ে প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, লোগো ইত্যাদি লিখা থাকে। বিক্রয় প্রসারের প্রধান লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য হলো প্রতিষ্ঠানের পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি। বিক্রয় প্রসার কৌশলের মাধ্যমে নতুন ক্রেতারা পণ্য ক্রয় করতে বেশি আগ্রহী হয়। বাজারে নতুন পণ্য প্রবর্তন করা হলে তার বাজার চাহিদা কম থাকে। নতুন পণ্যের পরিচিতি এবং বাজার চাহিদা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

এছাড়া বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যসমূহ হলো পরীক্ষামূলক ক্রয়ে ক্রেতাদের উদ্বুদ্ধ করা, ক্রেতাদের বার বার ক্রয়ে আকৃষ্ট করা, পণ্যের পতন স্তরে দ্রুত চাহিদা সৃষ্টি করা, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, ক্রেতাদের ব্যাপক ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা, ব্র্যান্ডের বিশ্বস্ততা অর্জন করা, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি করা, বিক্রয়কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করা, হারানো ক্রেতাদের উজ্জীবিত করা, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ করা ইত্যাদি। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম থেকে বিভিন্ন সুবিধা এবং বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্যসমূহ সফলভাবে অর্জন করতে হলে একটা সুন্দর পরিকল্পনার মাধ্যমে অগ্রসর হতে হবে। এই পরিকল্পনার প্রথম পদক্ষেপ হলো বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্য নির্ধারণ।

বিক্রয় প্রসারের একটি মাত্র কৌশল দিয়ে বিক্রয় প্রসারের সকল উদ্দেশ্য অর্জন করা সম্ভবপর নয়। তাই উদ্দেশ্য স্থির করে সেই অনুযায়ী বিক্রয় প্রসার কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। উদ্দেশ্যের নির্ধারণের পর বিক্রয় কৌশল নির্বাচন করতে হবে। এই ক্ষেত্রে ভোক্তা, ডিলার এবং বিক্রয়কর্মীদের জন্য আলাদা আলাদা বিক্রয় কৌশল নির্বাচন করতে হবে। বিক্রয় কৌশল নির্বাচনের পর বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির উন্নয়ন এবং কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। এখানে বাড়তি সুবিধা, বিক্রয়ের শর্তাবলী, বণ্টনের মাধ্যম | নির্বাচন, বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের সময়, স্থায়িত্ব ও বাজেটের বিষয়সমূহ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে। এর পরের পদক্ষেপ হলো বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির পূর্ব যাচাইকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এরপর বিক্রয় কর্মসূচির সুষ্ঠু | সমন্বয়, বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সব শেষে বিক্রয় প্রসার কর্মসূচির ফলাফল মূল্যায়ন করতে হবে ।

Leave a Comment