বিপণন কৌশল (Marketing Strategy)

বিপণন কৌশল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “বিপণন: ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি” ইউনিট ১ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিপণন কৌশল (Marketing Strategy)

বিপণন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় ধাপটি হচ্ছে ক্রেতা ভ্যালুচালিত বিপণন কৌশল নকশা করা (চিত্র নং ১.১) যা এই পাঠে আলোচনা করা হয়েছে। এরজন্য বিপণনকারীকে প্রথমত, ক্রেতা নির্বাচন; দ্বিতীয়ত, ভ্যালু প্রস্তাব মনোনয়ন এবং সর্বশেষে বিপণন ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট মতবাদ নির্ধারণ করতে হয়।

 

ক্রেতা ভ্যালুচালিত বিপণন কৌশল নকশাকরণ (Designing Customer Value-Driven Marketing Strategy):

যেকোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য সফলভাবে অর্জন করার জন্য অর্থায়ন, পণ্য উৎপাদন, হিসাববিজ্ঞান ও অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সাথে সাথে বিপণনের কার্যক্রমও সম্পন্ন করতে হয়। কারণ বিপণন কার্যক্রম বাজারে পণ্য ও সেবার চাহিদা অনুসন্ধান করে এবং সে অনুযায়ী পণ্য তৈরি ও সরবরাহ করে। আর বিপণনের এই কার্যাবলি সঠিকভাবে সম্পন্ন করার ওপর নির্ভর করছে ব্যবসায়ের অর্থনৈতিক সফলতা। বিপণন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিপণনের কার্যাবলি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

Philip Kotler and Gary Armstrong বিপণন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে বলেছেন- “Marketing management is the art and science of choosing target markets and building profitable relationships with them.” অর্থাৎ বিপণন ব্যবস্থাপনা হচ্ছে লক্ষ্য বাজার পছন্দ করা এবং তাদের সাথে লাভজনক সম্পর্ক গড়ে তোলার কলা ও বিজ্ঞান। সুতরাং বলা যায় যে, বিপণন সংক্রান্ত সকল কার্যাবলি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পন্ন করাই হলো বিপণন ব্যবস্থাপনা। বিপণন ব্যবস্থাপনা হলো ব্যবসায় সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সেই কার্যগত ক্ষেত্র যার মাধ্যমে উৎপাদকের কাছ থেকে দ্রব্য ও সেবা দক্ষতার সাথে সঠিক সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে ও মসৃণ প্রক্রিয়ায় লক্ষ্য ক্রেতা (Target cutomers) বা ভোক্তার কাছে পৌঁছায়।

 

ক. ক্রেতা নির্বাচন (Selecting Customers):

একজন বিপণনকারীর পক্ষে সকল বা সব ধরণের ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করা সম্ভব নয় তাই বিপণনকারী লাভজনক ক্রেতা নির্বাচন করে। বিপণনকারী বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে লক্ষ্য ক্রেতাদের নির্বাচন করে, বিপণন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। বিপণন ব্যবস্থাপনার সাফল্য নির্ভর করে ক্রেতাদের চাহিদা সঠিকভাবে বিশ্লেষণের ওপর। ক্রেতারা কোন পণ্য, কখন, কোথা হতে, কী মূল্যে, কীভাবে পেতে চায় তা চাহিদা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায়।

সর্বোচ্চ ক্রেতা সন্তুষ্টি ও ভ্যালু প্রদানের মাধ্যমে লক্ষ্য ক্রেতাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব । এ জন্য বিপণন ব্যবস্থাপনা অপেক্ষাকৃত সম্ভাবনাময় লক্ষ্য বাজার অংশ নির্বাচন করে এবং তাদের সাথে শক্তিশালী ভ্যালু নির্ভর সম্পর্ক গড়ে তোলে। সুতরাং বিপণন ব্যবস্থাপনা হলো মূলত ক্রেতা ব্যবস্থাপনা ও ক্রেতার চাহিদা ব্যবস্থাপনা ।

 

খ. ভ্যালু প্রস্তাব মনোনয়ন (Choosing a Value Proposition):

বিপণনকারী লক্ষ্য ক্রেতাকে কীভাবে প্রতিযোগীদের থেকে আলাদাভাবে সন্তুষ্ট করবে এবং বাজারে দৃঢ়ভাবে অবস্থান গ্রহণ করবে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এ জন্য বিপণনকারী প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য লাভজনকভাবে লক্ষ্য ক্রেতাকে ভ্যালু সরবরাহ করে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের ভ্যালু প্রস্তাব বলতে সকল সুবিধা বা ভ্যালুসমূহকে বোঝায় যা ব্র্যান্ডটি ভোক্তাকে সরবরাহ করার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকে।

যেমন: ফেসবুক (Facebook) ভোক্তাকে ‘পরিবার, বন্ধু ও কাছের মানুষদের সাথে যোগাযোগ ধরে রাখা’র জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ফেসবুক তাই ভোক্তাকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে টেক্সট বা ফোন করাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়ে ভ্যালু সরবরাহ করছে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ক্রেতার সামনে বিভিন্ন পণ্য থেকে নিজের পছন্দমতো পণ্য ক্রয় করার স্বাধীনতা রয়েছে। তাই বিপণনকারী সঠিক ভ্যালু সৃষ্টি ও সরবরাহ প্রক্রিয়া গ্রহণ করে, যেন ক্রেতা তার পণ্যই পছন্দ করে এবং ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করতে পারে। বিপণনকারী ভ্যালু সৃষ্টি ও সরবরাহ করার সময় প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সামর্থ্য (Core competency) নির্ধারণ করতে হয় এবং এরপর সঠিক বিপণন কৌশলের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়।

বিপণন কৌশল

গ. বিপণন ব্যবস্থাপনার মতবাদসমূহ/পরিস্থিতিসমূহ ( Marketing Management Philosophies/Orientations):

বিপণন ব্যবস্থাপনার কাজ হলো এমন একটি কৌশলের পরিকল্পনা করা যার মাধ্যমে লক্ষ্য ক্রেতার প্রয়োজন পূরণ করা যায় এবং দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক সম্পর্ক তৈরি করা যায়। এর জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট কোনো মতবাদ বা দর্শন অনুসরণ করার প্রয়োজন হয়। নিম্নোক্ত পাঁচটি মতবাদের যেকোনো মতবাদের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠান তার বিপণন কৌশলের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে। চিত্র ১.৪-এ দেখানো হয়েছে ধারাবাহিকভাবে কীভাবে বিপণন ধারণার বিকাশ ঘটেছে।

 

১. উৎপাদন মতবাদ (Production Concept):

ব্যবসায় ধারণা শুরু হবার পর উৎপাদন মতবাদই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত ছিল। বিক্রেতা এই মতবাদে উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যয় হ্রাস ও বাজার সম্প্রসারণ করার জন্য সবসময়ই চেষ্টা করতে থাকে। এই উৎপাদন মতবাদের মূল কথা হচ্ছে ক্রেতারা এমন সব পণ্য পছন্দ করবে বা পণ্য ক্রয় করবে যার জোগান পর্যাপ্ত এবং ক্রেতার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- বাংলাদেশে WASA, Bangladesh railway- কার্যক্রম। এই ক্ষেত্রে ক্রেতা বা ভোক্তার মতামত বা সন্তুষ্টি, প্রতিযোগীদের কার্যক্রমেরর ব্যাপারে গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

 

 

২. পণ্য মতবাদ ( Product Concept) :

পণ্য মতবাদে মনে করা হয় যে ক্রেতারা সেসব পণ্য পছন্দ করবে যেসব পণ্য গুণগত মানে উন্নত, কার্যকর ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। পণ্য মতবাদে অনুমান করা হয় যে ভোক্তা সবচেয়ে বেশি গুণসম্পন্ন, কার্যকর ও উদ্ভাবনী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্য পছন্দ করে আর সেই উৎকৃষ্টমানের পণ্য তৈরি করতে পারলেই পণ্য বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়বে।

যেমন: ঔষধ, দামি মোবাইল ফোন ইত্যাদি। কিন্তু অনেক সময়, বিপণনকারী ভোক্তার প্রয়োজনের উপর গুরুত্ব না দিয়ে পণ্যের বৈশিষ্ট্য উন্নয়নের উপর বেশি জোড় দিয়ে থাকে, এই পরিস্থিতিকে অদূরদর্শী বিপণন (Marketing myopia) বলা হয়। এর ফলে বিপণনকারী ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে।

 

 

৩. বিক্রয় মতবাদ (Selling Concept):

বিক্রয় মতবাদে পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধির কারা জন্য বিভিন্ন কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয়। এইসব কর্মপন্থা উদ্দীপনা সৃষ্টি করে যা ক্রেতাদের প্ররোচিত করে অধিক পরিমাণে পণ্য ক্রয় করার জন্য। এ মতবাদের মূল কথা হলো অধিক বিক্রয়ের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জন। এক্ষেত্রে বিপণনকারী পণ্য বিক্রয়ের জন্য যেসব প্রসারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করে, তা হলো- বিজ্ঞাপন, প্রচার, বিক্রয় প্রসার, বিক্রয়কর্মী নিয়োগ ইত্যাদি। বাংলাদেশে ব্যাংক ও আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এ মতবাদ অনুসরণ করে।

 

৪. বিপণন ধারণা (Marketing Concept):

বিপণন ধারণায় মনে করা হয় যে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করে লক্ষ্য বাজারের প্রয়োজন ও অভাব নির্ধারণ এবং প্রতিযোগীদের তুলনায় কার্যকর ও দক্ষভাবে কাঙ্ক্ষিত পণ্য প্রস্তুত ও সরবরাহ করার ওপর। এই মতবাদে সমন্বিত বিপণন কর্মসূচি (পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও প্রসার)-এর মাধ্যমে লক্ষ্য বাজারের সন্তুষ্টি বিধান করে মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করা হয়।

অনেক সময় বিক্রয় ও বিপণনের কার্যক্রমকে একই ভাবা হয়। চিত্র ১.৫ এ বিক্রয় ও বিপণন মতবাদের মধ্যে পার্থক্য উল্লেখ করা হলো। বিপণন মতবাদে ভোক্তার রুচি-অরুচি, চাহিদা, মন-মানসিকতা, সুবিধা-অসুবিধা প্রভৃতি সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে বিপণন কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং বিপণন মিশ্রণের রূপরেখা তৈরি করা হয়।

 

৫. সামাজিক বিপণন মতবাদ (Societal Marketing Concept):

এই মতবাদে প্রধানত তিনটি বিষয় বিবেচনা করা হয়, কোম্পানির মুনাফা, ভোক্তার সন্তুষ্টি এবং সমাজ ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ। ভোক্তা ও সমাজের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করে বিপণন কর্মকাণ্ড সম্পাদনের উদ্দেশ্যে বর্তমানে অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও অব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলো এ মতবাদ অনুসরণ করে চলেছে।

বিভিন্ন কোম্পানি নানা প্রকার সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করার উপর জোর দিচ্ছে কারণ তারা মানবিক মূল্যবোধকেও অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পরিবেশগত সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, সামাজিক সমস্যা ইত্যাদি দূর করার জন্য কোম্পানিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চিত্র ১.৬-এ দেখানো হয়েছে সামাজিক বিপণন মতবাদ অনুসরণকারী বিপণনকারী ভোক্তা, কোম্পানি ও সমাজের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করছে।

 

বিপণন কৌশল

 

সারসংক্ষেপ:

বিপণন ব্যবস্থাপনা হলো ব্যবসায় সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার সেই কার্যগত ক্ষেত্র, যার মাধ্যমে উৎপাদকের কাছ থেকে দ্রব্য ও সেবা দক্ষতার সাথে সঠিক সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে ও মসৃণ প্রক্রিয়ায় ক্রেতা বা ভোক্তার কাছে পৌঁছায়। বিপণন ব্যবস্থাপনার মতবাদসমূহ হলো—উৎপাদন মতবাদ, পণ্য মতবাদ, বিক্রয় মতবাদ, বিপণন ধারণা ও হলিস্টিক বিপণন মতবাদ । বিপণন ব্যবস্থাপনার প্রথম কাজ হচ্ছে বিপণন কর্মকাণ্ডের কৌশল ও পরিকল্পনা উন্নয়ন করা। এছাড়াও এর অন্যতম কাজ হচ্ছে বিপণনের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। বিপণন ব্যবস্থাপনা বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে লক্ষ্য ক্রেতাদের নির্বাচন করে বিপণন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে ।

১ thought on “বিপণন কৌশল (Marketing Strategy)”

Leave a Comment