বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “বিপণন প্রসারের সূচনা” ইউনিট ১ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহ
যেকোন পণ্য বা সেবার কার্যকর প্রসারের জন্য বেশ কয়েকটি বিপণন প্রসারমূলক সরঞ্জাম বা হাতিয়ার রয়েছে যেমন- বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণন। এইসব হাতিয়ারের মাধ্যমে কোম্পানি, পণ্য বা সেবার বৈশিষ্ট্য এবং সুবিধাগুলোকে সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে জানিয়ে দেওয়া হয় এবং ক্রেতাদেরকে পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্ররোচিত করা হয়। এইসব প্রসার হাতিয়ারের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা একটি হাতিয়ারকে অন্য হাতিয়ারগুলো থেকে আলাদা করেছে। কোম্পানিগুলো বিভিন্ন পণ্য বা পরিস্থিতি অনুযায়ী তাই একেক সময় একেকটি হাতিয়ার ব্যবহার করে থাকে।
বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহ [ Tools of Marketing Promotion ]
কোম্পানি পণ্য উৎপাদন করে ভোক্তার প্রয়োজন বা অভাব মেটানোর জন্য। কিন্তু উৎপাদিত পণ্য সম্পর্কে ভোক্তারা জানতে না পারলে তারা ঐ পণ্য ক্রয় করতে পারবে না। ফলে খুব ভাল মানের পণ্য উৎপাদন করেও শুধুমাত্র উপযুক্ত প্রসারের অভাবে একটি কোম্পানি বাজারে ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। যেকোন পণ্য বা সেবার কার্যকর প্রসারের জন্য, বেশ কয়েকটি বিপণন প্রসারমূলক হাতিয়ার রয়েছে যা একটি কোম্পানির প্রসার কার্যক্রমে ব্যবহার করা যেতে পারে। এগুলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতি অনুসারে প্রয়োগ করা উচিত কেননা প্রতিটি প্রচারমূলক হাতিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতেই উপযুক্ত। যেমন- বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে যে বার্তা দেওয়া যায়, প্রচার ও জনসংযোগের মাধ্যমে সেই বার্তা দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
তাই কোম্পানির গ্রাহকদের পণ্য বা সেবা কেনার আগে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রয়োজন। সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে কোম্পানি, পণ্য বা তার সেবার বৈশিষ্ট্য এবং সুবিধাগুলো যেভাবে যোগাযোগ করে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং ক্রেতাদেরকে পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্ররোচিত করা হয়, তাকে বিপণন প্রসার বলা হয়। বিপণন প্রসারের হাতিয়ারগুলোকে মোটামুটিভাবে পাঁচভাগে ভাগ করা যায় যা নিম্নের চিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

১ . বিজ্ঞাপন (Advertising):
বিপণন প্রসারের হাতিয়ারগুলোর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত ও সর্বাধিক জনপ্রিয় হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার যা একটি কোম্পানিকে গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে, তাদের পণ্য সম্পর্কে অবহিত করতে এবং গ্রাহকের আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। বেশিরভাগ কোম্পানি তাদের পণ্য বা সেবার প্রসারে সাহায্য করার জন্য কোন না কোন ধরণের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করে থাকে।
বিজ্ঞাপন হলো একটি পণ্য, সেবা বা ধারণার অর্থপ্রদত্ত কিন্তু অব্যক্তিক প্রসার যা এক বা একাধিক ভোক্তাকে প্রভাবিত করার জন্য প্রদান করা হয়। এটি প্রিন্ট, রেডিও, টেলিভিশন এবং ডিজিটাল মিডিয়ার মতো বিভিন্ন মাধ্যমে প্রদান করা যেতে পারে। বিজ্ঞাপনের মূল লক্ষ্য হলো গ্রাহকদের কোম্পানির পণ্য সম্পর্কে অবহিত করা এবং একটি পণ্য কিনতে বা সুনির্দিষ্ট কোন কাজ সম্পাদন করতে তাদের রাজি করানো।
Kotler and Armstrong-4, “Advertising is any paid form of nonpersonal presentation and promotion of ideas, goods or services by an identified sponsor.” অর্থাৎ, নির্দিষ্ট উদ্যোক্তা কর্তৃক অর্থ প্রদত্ত উপায়ে পণ্য, সেবা বা ধারণার নৈর্ব্যক্তিক বা অব্যক্তিক উপস্থাপনাকে বিজ্ঞাপন বলে ।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়-
বিজ্ঞাপন অর্থ প্রদত্ত উপায়ে হয়;
সুনির্দিষ্ট উদ্যোক্তা কর্তৃক প্রদত্ত হয়;
পণ্য, সেবা বা ধারণার অব্যক্তিক উপস্থাপনার মাধ্যমে হয়।
২. ব্যক্তিক বিক্রয় (Personal Selling):
বিপণন প্রসারের আরেকটি উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হচ্ছে ব্যক্তিক বিক্রয় বা বিক্রয়িকতা। ব্যক্তিক বিক্রয় হল সামনাসামনি বিক্রির একটি কৌশল যার মাধ্যমে একজন বিক্রয়কর্মী তার আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট পণ্য কেনার জন্য একজন গ্রাহককে রাজি করান। ব্যক্তিক বিক্ৰয়ে বিক্রয়কর্মী পণ্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন যাতে গ্রাহককে বোঝানো যায় যে পণ্যটি গ্রাহকের জন্য একটি উত্তম ক্রয় হবে বা গ্রাহকের জন্য ভ্যালু যোগ করবে। ক্রয় প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট কিছু পর্যায়ে গ্রাহকদের পছন্দ, প্রত্যয় এবং ক্রিয়া তৈরিতে ব্যক্তিক বিক্রয় হলো সবচেয়ে কার্যকর প্রসার হাতিয়ার।
যাহোক, শুধুমাত্র একটি পণ্য কেনার জন্য একজন গ্রাহককে প্ররোচিত করাই ব্যক্তিক বিক্রয়ের পিছনে উদ্দেশ্য নয়। বরং প্রায়শই কোম্পানিগুলো একটি নতুন পণ্য সম্পর্কে গ্রাহকদের সচেতন করার জন্য গ্রাহকদের সাথে বিক্রয়িকতার বা ব্যক্তিক বিক্রয়ের মাধ্যমে বিপণন প্রসার চালানোর চেষ্টা করে।
Kotler and Armstrong -, “Personal selling is personal presentation by the firm’s sales force for the perpose of making sales and building customer relationships.” অর্থাৎ, ব্যক্তিক বিক্রয় হল বিক্রয় এবং গ্রাহক সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে কোম্পানির বিক্রয়বাহিনীর দ্বারা গ্রাহকের নিকট পণ্য বা সেবার ব্যক্তিগত উপস্থাপনা। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়-
~ ব্যক্তিক বিক্রয় হলো পণ্য বা সেবার সরাসরি উপস্থাপনা;
এটি দ্বি-পাক্ষিক যোগাযোগের মাধ্যমে হয়;
এতে পণ্য বা সেবার মৌখিক উপস্থাপনা সংঘটিত হয়।
৩. বিক্রয় প্রসার (Sales Promotion ) :
বিক্রয় প্রসার হলো স্বল্পমেয়াদে পণ্য বা সেবার বিক্রয় বাড়ানোর জন্য কোম্পানি কর্তৃক গৃহীত বিপণন কার্যক্রমের সমষ্টি। বিক্রয় প্রসার হলো এমন একটি স্বল্পমেয়াদী কার্যকলাপ অথবা উপাদান যা পুনঃবিক্রেতা, বিক্রয় কর্মী বা ভোক্তাদের কাছে পণ্য ক্রয়ের জন্য সরাসরি প্ররোচনা, অফার, উদ্দীপনা বা ভ্যালু সংযোজন হিসাবে কাজ করে।
তার মানে, বিক্রয় প্রসার একটি উদ্দীপক সরঞ্জাম যা স্বল্পমেয়াদী বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়। গ্রাহকদের ক্রয়ের কারন তৈরি করা যদি বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে বিক্রয় প্রসারের লক্ষ্য হলো পণ্য কেনার জন্য গ্রাহকদের মধ্যে একটি উদ্দীপনা তৈরি করা। বিক্রয় প্রসার প্রধানত ভোক্তা বা বাণিজ্যিক বিক্রয় প্রসার হিসাবে চালু করা যেতে পারে। বিক্রয় প্রসারের ভোক্তা প্রণোদনা হতে পারে নমুনা, কুপন, বিনামূল্যে ট্রায়াল এবং প্রদর্শন ইত্যাদি; বানিজ্যিক বা ব্যবসায়িক প্রণোদনা হতে পারে মূল্য হ্রাস, বিনামূল্যের পণ্য এবং ভাতা ইত্যাদি; এবং বিক্রয়কর্মীর বা দলের প্রণোদনা হতে পারে সম্মেলন, ট্রেড শো, বিক্রয় কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।
Kotler and Armstrong-4, “Sales promotion is short-term incentives to encourage the purchase or sale of a product or service.” অর্থাৎ, বিক্রয় প্রসার হলো একটি পণ্য বা সেবার ক্রয় বা বিক্রয়কে উৎসাহিত করার জন্য কোম্পানি প্রদত্ত স্বল্পমেয়াদী প্রণোদনা। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়
বিক্রয় প্রসার হলো পণ্য বা সেবার বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য গৃহীত কার্যক্রম;
এটি অনিয়মিত ও স্বল্পমেয়াদী একটি কার্যক্রম;
এটি গ্রাহকদের তাৎক্ষনিক পণ্য বা সেবা ক্রয়ের উদ্দীপনা দেয়।

৪. জনসংযোগ ও প্রচার (Public Relations and Publicity):
একজন বিপণন ব্যবস্থাপকের উচিত কোম্পানির বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার যেমন বিনিয়োগকারী, ভোক্তা, সরবরাহকারী, পরিবেশক, প্রেস, সরকারি সংস্থা, স্থানীয় মানুষ এবং সাধারণ জনগণ ইত্যাদির দিকে মনোযোগ দেওয়া। এই সকল স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করার কাজটিকেই জনসংযোগ বলা হয়। জনসংযোগ এর মাধ্যমে একটি কোম্পানি এর পণ্য এবং নীতির প্রতি মানুষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে এটি বিপণন প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং বিশ্বাসযোগ্য অংশ হয়ে উঠেছে।
Kotler and Armstrong -এর মতে, “Public relations (PR) is building good relations with the company’s various publics by obtaining favorable publicity, building up a good corporate image and handling or heading off unfavorable rumors, stories and events.” অর্থাৎ, জনসংযোগ (PR) হলো কোম্পানির বিভিন্ন জনসাধারণের সাথে ভাল সম্পর্ক তৈরি করে অনুকূল প্রচার লাভ করা, একটি ভাল কর্পোরেট ইমেজ তৈরি করা এবং প্রতিকূল গুজব, গল্প এবং ঘটনাগুলোকে দূর করা। অতএব, জনসংযোগ (PR) বলতে বোঝায় অন্যরা কিভাবে একজন ব্যক্তি, ব্রান্ড বা কোম্পানিকে দেখে এবং অনুভব করে তারই সফল ব্যবস্থাপনা ।
অন্যদিকে, প্রচার বলতে গণমাধ্যম ব্যবহার করে সাধারণ জনগণের কাছে উপস্থাপিত যে কোনও তথ্যকে বোঝায় যা একটি ব্র্যান্ড, কোম্পানি, ব্যক্তি বা পণ্য সম্পর্কে জনমত পরিবর্তন করার সম্ভাবনা রাখে। প্রচার মূলতঃ সংবাদ, প্রেস রিলিজ, ইভেন্ট এবং যোগাযোগের অন্যান্য ধরণ ব্যবহারের মাধ্যমে একটি কোম্পানি, পণ্য, সেবা বা সত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বা বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে কাজ করে। যেহেতু প্রচারের মূল লক্ষ্য হলো যেকোন পরিমাণ মিডিয়া কভারেজ লাভ করা, তাই প্রায়শই এটির একটি সংকীর্ণ ফোকাস বা পরিধি থাকে।
Belch and Belch-এর মতে, “Publicity refers to nonpersonal communications regarding an organization, product, service or idea that is not directly paid for or run under identified sponsorship.” অর্থাৎ, প্রচার বলতে একটি সংস্থা, পণ্য, সেবা বা ধারণা সম্পর্কিত এমন একটি অব্যক্তিগত যোগাযোগকে বোঝায় যেটির জন্য সরাসরি অর্থ প্রদান করা হয় না বা নির্দিষ্ট উদ্যোক্তার অধীনে পরিচালিত হয় না। সুতরাং, প্রচার হলো সরাসরি সময় এবং স্থানের জন্য অর্থ প্রদান না করে মিডিয়াতে বাণিজ্যিকভাবে উল্লেখযোগ্য সংবাদ স্থাপন করে একটি ব্র্যান্ড, অফার বা ব্যবসা সম্পর্কে যোগাযোগ।
প্রচার কোন প্রক্রিয়া নয় বরং একটি ভাল জনসংযোগ কৌশলের ফলাফল, যেখানে বাজারজাতকারীরা নানাবিধ মিডিয়া এবং তৃতীয় পক্ষের আউটলেট যেমন- ব্লগার, ভুগার, পডকাস্টার ইত্যাদির মত অন্যান্য তৃতীয় পক্ষের আউটলেটে কোম্পানি এবং তার পণ্য সম্পর্কে অনুকূল তথ্য প্রদান করতে সফল হয়। উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়-
জনসংযোগ হলো কোম্পানি, পণ্য বা সেবার প্রতি জনসাধারণের অনুকূল ধারণা তৈরি ও প্রতিকূল গুজব বা প্রচারণা মোকাবিলার জন্য গৃহীত কার্যক্রম;
বিপণন প্রসারের অন্যান্য হাতিয়ারের তুলনায় জনসংযোগ ও প্রচার কম ব্যয়বহুল ;
জনসাধারণের কাছে জনসংযোগ ও প্রচারের বিশ্বাসযোগ্যতা তুলনামূলক ভাবে বেশি;
প্রচারকে জনসংযোগেরই একটি অংশ বিশেষ হিসেবে দেখা যায়।
৫. প্রত্যক্ষ বিপণন (Direct Marketing):
কোন মধ্যস্থতাকারী ব্যবহার না করে সরাসরি যখন কোম্পানির গ্রাহকদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করা হয় তখন তাকে প্রত্যক্ষ বিপণন বলা হয়। প্রত্যক্ষ বিপণন, বিপণন প্রসারের এমন একটি প্রচারমূলক পদ্ধতি যা কোন মধ্যস্থতাকারীর ব্যবহার ছাড়াই লক্ষ্যস্থিত গ্রাহকের কাছে একটি কোম্পানি, পণ্য বা সেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করে। প্রত্যক্ষ বিপণন বিক্রেতাকে প্রতিটি গ্রাহকের সাথে একটি অবিচ্ছিন্ন সম্পর্ক তৈরি করতে সহায়তা করে। প্রত্যক্ষ বিপণন কোম্পানি ও ভোক্তাকে প্রয়োজনীয় গোপনীয়তা প্রদান করে কেননা প্রত্যক্ষ বিপণনকারীদের অফার এবং কৌশল প্রতিযোগীদের কাছে দৃশ্যমান হয় না।
শুধুমাত্র বিপণন যোগাযোগের অন্তর্ভূক্ত তথ্যই নয়, বরং কোম্পানির পণ্য বা সেবা সরাসরি প্রদানের জন্যও প্রত্যক্ষ বিপণন ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রত্যক্ষ বিপণনের ব্যবহার সাম্প্রতিক বছরগুলিতে দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যক্ষ বিপণনের এই বৃদ্ধির পিছনে ইন্টারনেট প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। প্রত্যক্ষ বিপণন সময় বাঁচায়, কোম্পানির জন্য খরচ কমায়, গ্রাহকের ক্রয় অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তিগত এবং আনন্দদায়ক করে তোলে। ফেস টু ফেস সেলিং বা মুখোমুখি বিক্রি, সরাসরি মেইল, ক্যাটালগ মার্কেটিং, টেলিমার্কেটিং, টিভি, কিয়স্ক ইত্যাদি হলো প্রত্যক্ষ বিপণনের মাধ্যম।
Kotler and Armstrong-4, “Direct marketing is direct connections with carefully targeted individual consumers to both obtain an immediate and cultivate lasting customer relationships”. অর্থাৎ, প্রত্যক্ষ বিপণন হলো সতর্কতার সাথে লক্ষ্যস্থিত পৃথক ভোক্তাদের সাথে কোম্পানির সরাসরি সংযোগ যাতে উভয়ই তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া পেতে পারে এবং দীর্ঘস্থায়ী গ্রাহক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে । উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়-
প্রত্যক্ষ বিপণন হলো ভোক্তাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের একটি মাধ্যম;
প্রত্যক্ষ বিপণন মধ্যস্থতাকারী থাকে না;
প্রত্যক্ষ বিপণনে কাঙ্খিত তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়।

বিপণন প্রসারের হাতিয়ারসমূহর বৈশিষ্ট্য [ Characteristics of the Tools of Marketing Promotion ]
বিপণন প্রসারের হাতিয়ার গুলোকে মোটামুটিভাবে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায়। যথা- বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার এবং প্রত্যক্ষ বিপণন। এসব হাতিয়ারের প্রতিটিরই আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
১ . বিজ্ঞাপন (Advertising):
বিজ্ঞাপন হলো পণ্য বা সেবার প্রচারের জন্য অর্থ প্রদানের মাধ্যমে নৈর্ব্যক্তিক যোগাযোগের একটি মাধ্যম। এটি বিপণন প্রসারের সর্বাধিক ব্যবহৃত উপাদানগুলির মধ্যে একটি। বিজ্ঞাপনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গুলো হচ্ছে-
১.১ অর্থ প্রদত্ত মাধ্যম (Paid form):
বিজ্ঞাপনী সংস্থার দ্বারা পরিচালিত যোগাযোগের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ খরচ হয় যা উদ্যোক্তা প্রদান করে থাকেন। বাজারে নানা রকমের বিজ্ঞাপনী সংস্থা রয়েছে যারা ব্যবসায় প্রচারমূলক বিভিন্ন সেবা প্রদান করে এবং তাদের সেবার জন্য বিভিন্ন রকমের ফি চার্জ করে। যাহোক, কোম্পানিগুলো কেবল কার্যকর ফলাফল পাওয়ার জন্য যে অর্থ প্রদান করে তার চেয়ে অনেক বেশি সুবিধা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি করে।
১.২ নৈর্ব্যক্তিকতা (Impersonality):
বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে লক্ষ্যস্থিত গ্রাহক এবং বিজ্ঞাপনদাতার মধ্যে কোন মুখোমুখি যোগাযোগ হয় না, যা বিজ্ঞাপনের নৈর্ব্যক্তিক প্রকৃতির দিকে ইঙ্গিত করে। যেহেতু এটি একটি একতরফা যোগাযোগ, বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তাই একটি মনোযোগ তৈরি হয়, সংলাপ নয়। অন্যভাবে বলা যায়, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনদাতা এবং ভোক্তার মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ হয় না ।
১.৩ নির্দিষ্ট উদ্যোক্তা (Identified sponsor):
বিজ্ঞাপনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো এর উদ্যোক্তাকে বা বিজ্ঞাপনদাতাকে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। যখনই আমরা একটি বিজ্ঞাপনের মুখোমুখি হই, সাধারণত তখনই আমরা এর বিজ্ঞাপনদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে চিনতে পারি। তাই যদি কোন কারণে স্পন্সর বা উদ্যোক্তাকে শনাক্ত করা কঠিন হয়, তাহলে সেই তথ্যকে বিজ্ঞাপন বলা যাবে না ।
১.৪ বিস্তৃত অভিব্যক্তি (Amplified expressiveness):
বিজ্ঞাপন যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে কারণ এটি সর্বশেষ প্রযুক্তি, গ্রাফিক্স এবং মিডিয়া ব্যবহার করে। আধুনিক বিজ্ঞাপন পণ্যগুলোকে আরও আকর্ষণীয়, আকাঙ্খীত এবং অভিব্যক্তিপূর্ণ করে তোলে ।
১.৫ গণ বিস্তৃতি (Mass reach):
বিজ্ঞাপনের ব্যাপক বিস্তৃতি বা নাগাল রয়েছে কারণ এটি একসাথে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌছাতে পারে। উদাহরণস্বরুপ বলা যায়, কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে টিকা নেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়ে সরকারের দেওয়া বিজ্ঞাপন সংবাদপত্র, টেলিভিশন বা রেডিওতে প্রদত্ত বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে।
২. ব্যক্তিক বিক্রয় (Personal Selling):
ব্যক্তিক বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানির বিক্রয়কর্মী বিক্রয়ের জন্য মৌখিক উপস্থাপনা আকারে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন। এই পদ্ধতি দ্বারা বিক্রয়কর্মীরা কোম্পানির পণ্য বা সেবা সচেতনতা বৃদ্ধি করে থাকেন। ব্যক্তিক বিক্রয় বা বিক্রয়িকতা যোগাযোগের একটি অর্থ প্রদত্ত মাধ্যম। ব্যক্তিক বিক্রয়ের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গুলো নিম্নরূপ:
২.১ ব্যক্তিগত প্রকৃতি (Personal nature):
বিক্ৰয়িকতার ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ই নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার বিষয়ে সরাসরি কথোপকথনে জড়িত হন। ফলে, ব্যক্তিক বিক্রয়ের অধীনে ক্রেতা এবং বিক্রয়কর্মীর মধ্যে একটি ব্যক্তিগত যোগাযোগ স্থাপিত হয়। অন্য কথায় বলা যায়, ব্যক্তিক বিক্রয়ে উভয় পক্ষ একে অপরের মুখোমুখি হয়।
২.২ মৌখিক কথোপকথন (Oral conversation):
ব্যক্তিক বিক্রয়ে বিক্রয়কর্মী এবং ক্রেতার মধ্যে পণ্যের বৈশিষ্ট্য যেমন- মূল্য, রঙ, আকৃতি, নকশা, ব্যবহারের পদ্ধতি ইত্যাদি সম্পর্কে মৌখিকভাবে কথোপকথনের সুযোগ তৈরি হয়। ব্যক্তিক বিক্রয়ে মৌখিক বার্তাগুলি পণ্য সম্পর্কে গ্রাহকদের জানানোর জন্য এবং পণ্য ক্রয়ে রাজি করানোর জন্য ব্যবহার করা হয় ।
২.৩ সম্পর্কের বিকাশ (Development of relationship):
ব্যক্তিক বিক্রয়ের সাহায্যে বিক্রয়কর্মী এবং গ্রাহকদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই ধরণের সম্পর্ক বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সাহায্য করে।
২.৪ তথ্যের দ্বিমুখী প্রবাহ (Two way flow of information) :
গণ বিপণনের বিপরীতে, ব্যক্তিক বিক্রয়ে তথ্যের দ্বিমুখী প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়। ফলে সম্ভাব্য ক্রেতারা পণ্য বা সেবা সংশ্লিষ্ট তাদের প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার এবং কেনার আগে বিক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি তাদের সন্দেহ দূর করার সুযোগ পান ।
২.৫ প্ররোচনা (Persuasion) :
ব্যক্তিক বিক্রয় শুধুমাত্র কোম্পানির অফার সম্পর্কে সম্ভাব্য গ্রাহকদের জানানোর জন্য নয়। বরং এটি গ্রাহকদের বিক্রেতার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে বা গ্রাহককে একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে রাজি করাতে বিক্রেতার প্ররোচিত করানোর ক্ষমতাকে নির্দেশ করে।
৩. বিক্রয় প্রসার (Sales Promotion ) :
বিক্রয় প্রসার বলতে সে সকল প্রচারমূলক কার্যক্রমকে বোঝায় যার মধ্যে মধ্যস্বত্বভোগী, বিক্রয়কর্মী এবং/অথবা ভোক্তাদের দেওয়া স্বল্পমেয়াদী প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিপণন জগতে বিক্রয় প্রসারের ভূমিকা ব্যাপকভাগে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিক্রয় প্রসারের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গুলো হলো নিম্নে আলোচনা করা হলো ।
৩.১ অনিয়মিত এবং অ-পুনরাবৃত্ত কার্যকলাপ (Irregular and non-recurring activity):
বিক্রয় প্রসার হলো বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য কোম্পানি কর্তৃক গৃহীত একটি অনিয়মিত এবং অ-পুনরাবৃত্ত প্রচেষ্টা। অন্যভাবে বলা যায়, বিপণন প্রচেষ্টার রুটিন কার্যক্রম এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। বিপণন প্রসারের হাতিয়ার হিসেবে বিক্রয় প্রসার কৌশলটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা হয়, যেমন- চাহিদা হ্রাস, লাভের পতন, বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা বা যখন একটি নতুন পণ্য বাজারে প্রবর্তন করা হয় ।
৩.২ স্বল্পমেয়াদী প্রচেষ্টা (Short-term effort ):
বিক্রয় প্রসারের কৌশলগুলি ভোক্তাদের উপর একটি স্বল্পমেয়াদী প্রভাব বিস্তার করে। কেননা এটি স্বল্প সময়ের মধ্যে সর্বাধিক বিক্রয় পাওয়ার জন্য একটি উদ্দেশ্য ভিত্তিক বিপণন হাতিয়ার।
৩.৩ ব্যক্তিগত এবং নৈর্ব্যক্তিক প্রকৃতি (Personal and impersonal nature):
বিক্রয় প্রসার ব্যক্তিক এবং একইসাথে নৈর্ব্যক্তিক, উভয় ধরণের কার্যকলাপ হতে পারে। বিক্রয় প্রসারমূলক কিছু সরঞ্জাম যেমন প্রিমিয়াম, নমুনা, প্ৰদৰ্শন, প্রশিক্ষণ, মেরামত ইত্যাদি ব্যক্তিক প্রকৃতির এবং অন্যান্য কিছু সরঞ্জাম যেমন প্রতিযোগিতা, সজ্জা, বাণিজ্য মেলা ইত্যাদি নৈর্ব্যক্তিক প্রকৃতির ।
৩.৪ ভোক্তাদের তাৎক্ষণিক কিনতে অনুপ্রাণিত করে (Motivates consumers to buy immediately):
সফল বিক্রয় প্রসার প্রচেষ্টা গুলি ক্রেতাদেরকে তাৎক্ষণিক ভাবে কেনার তাগিদ অনুভব করায় এবং ক্রয় স্থগিত করার অভ্যাস এড়াতে সহায়তা করে। ফলে ভোক্তা পণ্য বা সেবা ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে অবিলম্বে ক্রয়ের ব্যবস্থা নিতে এবং লেনদেনের সাথে জড়িত হতে অনুপ্রাণিত হয়।
৩.৫ একাধিক উদ্দেশ্য (Multiple objectives) :
বিক্রয় প্রসার একাধিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য পরিচালিত হয় যেমন- মন্দা সময়ে বিক্রয় বজায় রাখা, বিক্রয় বৃদ্ধি করা, প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করা, স্টক বা মজুত পরিষ্কার করা, ইমেজ বা ভাবমুর্তি উন্নত করা, নতুন পণ্যের প্রচার করা ইত্যাদি ।

৪. জনসংযোগ ও প্রচার (Public Relations or Publicity):
জনসংযোগ (Public relations) হল কোম্পানি এবং এর ব্র্যান্ডগুলোর একটি অনুকূল ধারণা বা সুখ্যাতি ধরে রাখার জন্য জনসাধারণের কাছে কোম্পানি সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করা এবং ছড়িয়ে দেওয়ার একটি কৌশলগত প্রক্রিয়া। জনসংযোগের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গুলো হলো-
৪.১ একাধিক দল (Multiple parties):
জনসংযোগ আনুষ্ঠানিক এবং অনানুষ্ঠানিক গ্রুপ বা দল- উভয় ধরণের জনসাধারণকে কভার করে। এই জনসাধারণ গ্রাহক, স্টকহোল্ডার, কর্মচারী, ইউনিয়ন, পরিবেশবাদী দল, সরকার, স্থানীয় সম্প্রদায়ের মানুষ বা সমাজের অন্যান্য গোষ্ঠী হতে পারে। জনসংযোগের উদ্দেশ্য হল একটি কোম্পানি সম্পর্কে এই দলগুলির মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলা।
৪.২ ক্রমাগত প্ৰক্ৰিয়া ( Continuous process):
জনসংযোগ একটি ধারাবাহিক ও চলমান প্রক্রিয়া। এটি ব্যবসায়িক ইউনিটের কার্যক্রমের সূচনার সাথে সাথেই শুরু হয় এবং যতক্ষণ ব্যবসাটি টিকে থাকে, জনসংযোগ ততক্ষন স্থায়ী হয়। বাজারে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিকে ধারাবাহিকভাবে জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
৪.৩ প্রাত্যহিক কাজ (Routine activity ):
জনসংযোগ হল কোম্পানির রুটিন কার্যক্রমের একটি অংশ। এটা আনুষঙ্গিক বা অনিয়মিত কোন কার্যক্রম নয়। পাশাপাশি, এটিকে স্বতন্ত্র কার্যকলাপ হিসাবে নেওয়া হয় না বরং প্রতিদিনের কার্যকলাপের একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি কোম্পানির দৈনন্দিন নানাবিধ কার্যক্রমের যেমন-ক্রয়, প্রশাসন, উৎপাদন, বিপণন, আর্থিক সংস্থান ইত্যাদির অংশ হিসাবে বিবেচিত হয়।
৪.৪ জনসাধারণের সহযোগিতা নিশ্চিত করা (Securing cooperation of publics):
জনসংযোগ হলো জনসাধারণের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার জন্য গৃহীত একটি কার্যকলাপ। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই সফলভাবে চলতে চায়। আর এই সফলতার জন্য জনসাধারণের (সমস্ত সম্পর্কিত সমর্থক বা চরিত্র যেমন- ভোক্তা, কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার এবং সমাজ) সমর্থন অপরিহার্য বা প্রয়োজন। জনসংযোগের মাধ্যমে জনসাধারণের সমর্থন অর্জন করা যেতে পারে ।
৪.৫ মতবিনিময়ে জড়িত (Engaging in dialogue):
প্রতিটি কোম্পানিই তার উপর প্রভাব বিস্তারকারী সমস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষের বিপরীতে সুন্দর ভাবমূর্তি ধরে রাখতে চায়। সুনাম প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিটি পক্ষের সাথে কথোপকথন বা ধারণা বিনিময় অপরিহার্য। সংলাপের সময় কোম্পানি প্রয়োজনীয় তথ্য সরবারহ করে এবং এটি কেবল জনসংযোগের মাধ্যমেই সম্ভব হয়। অপরপক্ষে, প্রচার (Publicity) হলো সরাসরি সময় এবং স্থানের জন্য অর্থ প্রদান না করে মিডিয়াতে বাণিজ্যিকভাবে উল্লেখযোগ্য সংবাদ প্রকাশ করে একটি ব্র্যান্ড, অফার বা ব্যবসা সম্পর্কে যোগাযোগ। প্রচারের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিম্নে সেগুলো আলোচনা করা হলো।
প্রচারের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য:
৪.১ অবৈতনিক মাধ্যম ( Non-paid form):
প্রচার হল প্রসারের একটি অন্যতম অবৈতনিক মাধ্যম। প্রচারের জন্য যে মিডিয়া কভারেজ পাওয়া যায় তার জন্য কোন অর্থ প্রদান করা হয় না ।
৪.২ বৃহত্তর শ্রোতার উপর ফোকাস (Focuses on a broader audience):
প্রচার টার্গেট মার্কেটিং বা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যস্থিত বিপণন নয়। বরং এটি “শটগান পদ্ধতি”র উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে, যেখানে প্রয়োজনীয় তথ্যটি বিস্তৃত দর্শকদের কাছে প্রচার করা হয়।
৪.৩ স্বল্প-মেয়াদী ফোকাস ( Short-term focus):
প্রচার হলো একটি প্রসারমূলক কৌশল যা একটি পণ্য চালু করা, ইভেন্টের প্রচার ইত্যাদির মতো স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য পূরণের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে।
৪.৪ বিশ্বাসযোগ্যতা (Credibility):
অভীষ্ট শ্রোতারা প্রচারকে যোগাযোগের অধিক বিশ্বাসযোগ্য হাতিয়ার হিসাবে বিবেচনা করে কারণ এটি গণমাধ্যম বা সংবাদ আউটলেটের মতো বিশ্বস্ত চ্যানেল ব্যবহার করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই প্রচারকে সামাজিক স্বার্থে সংবাদ হিসাবে দেওয়া হয়। ফলে বিপণন প্রসারের অন্যান্য উপায়ের তুলনায় প্রচারের সামাজিক তাৎপর্য বেশি।
৪.৫ জনসংযোগের অংশ (Part of public relations) :
প্রচার হলো ব্যাপক জনসংযোগ প্রচেষ্টা এবং কার্যক্রমের একটি অংশ। জনসংযোগের মধ্যে রয়েছে সকল জনসাধারণের সাথে সরাসরি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা, উন্নত করা এবং বজায় রাখা। প্রচার জনসংযোগ উন্নত করতে সাহায্য করতে পারে।
৫. প্রত্যক্ষ বিপণন (Direct Marketing):
প্রত্যক্ষ বিপণন হলো বিপণনের একটি প্রচারমূলক পদ্ধতি যা গ্রাহকদের মধ্যস্থতাকারী ছাড়াই একটি পণ্য বা সেবা সম্পর্কে অবহিত করে। প্রত্যক্ষ বিপণনের বৈশিষ্ট্যগুলো এটিকে অন্যান্য বিপণন পদ্ধতির থেকে আলাদা করেছে। প্রত্যক্ষ বিপণনের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য গুলো হলো-
৫.১ কোন মধ্যস্থতাকারী নেই (No intermediary):
প্রত্যক্ষ বিপণনে কোন মধ্যস্থতাকারী নেই। এই পদ্ধতিতে কোম্পানি গুলো একাধিক চ্যানেলের মাধ্যমে গ্রাহকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। এটি ব্র্যান্ডগুলোকে গ্রাহকদের সাথে তারা যেভাবে চায় সেভাবে জড়িত হতে দেয়। যেহেতু এই ব্যবস্থায় কোন মধ্যস্থতাকারী নেই, তাই কোম্পানি গুলো প্রসারের খরচ বাঁচাতে পারে ।
৫.২ লক্ষ্যস্থিত বার্তাপ্রেরণ (Targeted messaging):
প্রত্যক্ষ বিপণন বিপণনকারীদের লক্ষ্যযুক্ত বার্তাপ্রেরণের মাধ্যমে নির্দিষ্ট গ্রাহকদের আকৃষ্ট করতে সাহায্য করে। ফলে তারা আগ্রহী গ্রাহকদের আলাদা করে প্রচারমূলক বার্তা প্রদানের দিকে মনোনিবেশ করে।
৫.৩ গ্রাহক কেন্দ্রিকতা (Customer oriented):
প্রত্যক্ষ বিপণনে বিক্রেতা এবং গ্রাহকদের মধ্যে সম্পর্ক গভীর হওয়ার পাশাপাশি শক্তিশালীও হয়। বিক্রেতারা প্রতিটি গ্রাহকের ইচ্ছা এবং প্রয়োজনের উপর জোর দেয়। এটি আসলে ওয়ান-টু-ওয়ান বিপণন। যেহেতু এই পদ্ধতিতে কোম্পানি গুলো গ্রাহকদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখে, তাই তারা গ্রাহকদের কেন্দ্রে রেখে বিপণন মিশ্রণ তৈরি করে।
৫.৪ সরাসরি যোগাযোগ (Direct contact):
প্রত্যক্ষ বিপণনে সরাসরি চ্যানেল ব্যবহৃত হয়। যেহেতু এই পদ্ধতিতে কোনও মধ্যস্থতাকারী থাকে না, তাই বিক্রেতা এবং গ্রাহকদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করা হয়। ফলে বিক্রেতারা বা কোম্পানি গুলো গ্রাহকদের ক্রয় ক্ষমতা, গ্রাহকদের চাহিদা এবং আগ্রহ সম্পর্কে সহজে জানতে পারে ।
৫.৫ ব্যক্তিগতকরণ (Personalization) :
প্রত্যক্ষ বিপণনে বার্তাটি সুনির্দিষ্ট একজন ব্যক্তির দিকে পরিচালিত হয়। এটি একজন ব্যক্তির সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে, তাকে স্বনামে সম্বোধন করতে বিক্রেতাকে সহায়তা করে । ফলে গ্রাহকের চাহিদা পরিপূর্ণ ভাবে জেনে-বুঝে তা যথাযথভাবে পূরণ করতে সাহায্য করে ।

বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহ পাঠের সারসংক্ষেপ :
যেকোন পণ্য বা সেবার কার্যকর প্রসারের জন্য একটি কোম্পানি মোটামুটি ভাবে পাঁচ ধরণের বিপণন প্রচারমূলক সরঞ্জাম ব্যবহার করে। একটি কোম্পনির প্রসার কার্যক্রমে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণনের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে কোম্পানিটি তার সার্বিক বিপণন লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে। তবে বিপণন প্রসারের হাতিয়ারগুলোর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে এগুলো ব্যবহারের সময় একজন বিপণন ব্যবস্থাপককে যথেষ্ট বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে হয়। যেমন- বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে যে বার্তা দেওয়া যায়, জনসংযোগ ও প্রচারের মাধ্যমে অনুরূপ বার্তা দেওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
তাই বিপণন প্রসারের পাঁচটি হাতিয়ার সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা বিপণনকারীর জন্য আবশ্যক। বিজ্ঞাপন হলো নির্দিষ্ট উদ্যোক্তা কর্তৃক একটি পণ্য, সেবা বা ধারণার অর্থপ্রদত্ত কিন্তু অব্যক্তিক প্রসার যা এক বা একাধিক ক্রেতাকে পণ্য সম্পর্কে জানানো ও পণ্য ক্রয়ে প্রভাবিত করার জন্য প্রদান করা হয়। আবার ব্যক্তিক বিক্রয় হল সম্মুখ বিক্রির একটি কৌশল যার মাধ্যমে একজন বিক্রয়কর্মী তার আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত উপস্থাপনার মাধ্যমে কোন পণ্য কেনার জন্য একজন গ্রাহককে রাজি করিয়ে থাকেন। এছাড়া বিক্রয় প্রচার স্বল্পমেয়াদী বিক্রয় বৃদ্ধির অনিয়মিত একটি উদ্দীপক সরঞ্জাম যা গ্রাহকদের তাৎক্ষনিক পণ্য বা সেবা ক্রয়ের প্ররোচনা দেয়।
আবার জনসংযোগের মাধ্যমে একটি কোম্পানি মানুষের মধ্যেকার নেতিবাচক মনোভাব দূর করে এর পণ্য এবং নীতির প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তোলে। অপরপক্ষে প্রচার হলো সরাসরি সময় এবং স্থানের জন্য অর্থ ব্যয় না করেও একটি পণ্য, ব্র্যান্ড, অফার বা কোম্পানি সম্পর্কে বিভিন্ন গণমাধ্যমে বানিজ্যিকভাবে উল্লেখযোগ্য সংবাদ পরিবেশন করা। সর্বশেষ প্রত্যক্ষ বিপণন হলো বিপণন প্রসারের এমন একটি প্রচারমূলক পদ্ধতি যা কোন মধ্যস্থতাকারীর ব্যবহার ছাড়াই কাঙ্খিত গ্রাহকের কাছে সরাসরি একটি কোম্পানি, পণ্য বা সেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য উপস্থাপন করে পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্রভাবিত করে।
অর্থাৎ, এ থেকেই পরিষ্কার ভাবে বুঝা যায় যে বিপণন প্রসারের প্রতিটি হাতিয়ারেরই আলাদা আলাদা কার্যপদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে।


১ thought on “বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহ”