বিপণন প্রসার এর ধারণা ও উদ্দেশ্য

বিপণন প্রসার এর ধারণা ও উদ্দেশ্য আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর  “বিপণন প্রসারের সূচনা” ইউনিট ১ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

Table of Contents

বিপণন প্রসার এর ধারণা ও উদ্দেশ্য

 

প্রমোশন বা প্রসার বিপণন মিশ্রণের অন্যতম প্রধান একটি হাতিয়ার। এটিকে বিপণন মিশ্রণের সর্বাধিক দৃশ্যমান উপাদান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়ে থাকে। পণ্য বা সেবার চাহিদা তৈরি, বৃদ্ধি বা ধরে রাখতে কিংবা বিক্রয় বৃদ্ধি করতে প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কোম্পানিগুলোকে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে সাফল্য অর্জনের জন্য শুধুমাত্র ভাল মানের পণ্য উৎপাদন, সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং কার্যকর বণ্টন নিশ্চিত করলেই চলেনা, বরং পণ্য বা সেবা বিক্রয়ের পূর্বে, বিক্রয়কালে, ভোগের সময় এবং ভোগ পরবর্তীকালে ক্রেতা বা ভোক্তাদের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে প্রসার কার্যক্রম চালাতে হয়।

বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহের- যেমন বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণনের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান সহজেই তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারে। বিপণন প্রসারের এই পাঁচটি হাতিয়ারের পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য ও শক্তিমত্তা রয়েছে। এই হাতিয়ারগুলোর যথার্থ ব্যবহার কোম্পানির বিপণন মিশ্রণের অন্যান্য উপাদানের সফলতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

 

বিপণন প্রসার এর ধারণা (Concept of Marketing Promotion):

মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসার বলতে সেসব কার্যক্রমকে বোঝায় যার মাধ্যমে কোম্পানি তার পণ্য বা সেবার চাহিদা সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও বিক্রয়ের ধারাকে অব্যাহত রাখে। এটি বিপণন মিশ্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। মূলতঃ বর্তমান কিংবা সম্ভাব্য ক্রেতাদেরকে বিদ্যমান বা নতুন কোন পণ্য বা সেবা সম্পর্কে অবহিত করা, ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা, প্ররোচিত করা বা পুনঃস্মরণ করিয়ে দেওয়াকেই মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসার বলা হয় । বাজারে পণ্য সরবরাহ করার পরে পণ্যটি যাতে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বাজার দখল করতে পারে, সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহন করাই হলো মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসারের মূলকথা।

অর্থাৎ, পণ্য বা সেবার বাজার তৈরি ও উন্নয়ন করা এবং কোম্পানির ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কোম্পানি কর্তৃক গৃহীত ক্রেতাদেরকে অবহিত ও উদ্বুদ্ধ করার জন্য ক্রেতামূখী সমন্বিত যোগাযোগ কার্যক্রমকেই মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসার বলা হয় । নিম্নে বিভিন্ন বিপণন বিশারদ কর্তৃক প্রদত্ত বিপণন প্রসারের সংজ্ঞা উল্লেখ করা হলো: McCarthy, “Promotion is communicating information between seller and potential buyer to influence attitudes and behaviors.”

(অর্থাৎ, বিক্রেতা ও সম্ভাব্য ক্রেতার মধ্যে তথ্যের আদান প্রদান করার মাধ্যমে দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে প্রভাবিত বা পরিবর্তন করাকেই প্রসার বলে।) Kotler and Armstrong, “Promotion includes all the activities the company undertakes to communicate and promote its products to the target market.” (অর্থাৎ, প্রসার হলো সেসব কার্যক্রমের সমষ্টি যার মাধ্যমে কোম্পানি তার অভীষ্ট বাজারে তার পণ্য সম্পর্কে জানায় ও প্রচারণা চালায়।)

Skinner and Ivancevich- 4, “Promotion is the communication of favorable persuasive information about a firm or product in order to influence potential buyers.” (অর্থাৎ, প্রসার হচ্ছে সম্ভাব্য ক্রেতাদেরকে প্রভাবিত করার জন্য প্রতিষ্ঠান বা পণ্য সম্পর্কে অনুকূল প্ররোচনামূলক তথ্যের যোগাযোগ।) Evans and Berman-, “Promotion is any form of communication used to inform, persuade and/or remind people about an organization’s or individual’s goods, services, image, ideas, community involvement or impact on society.” (অর্থাৎ, প্রসার হচ্ছে এক ধরণের যোগাযোগ প্রক্রিয়া যা কোন প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির পণ্য, সেবা, ভাবমূর্তি, ধারণা, সমাজ সংশ্লিষ্টতা বা সমাজের উপর তার প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা, প্ররোচিত করা অথবা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।)

উপরিল্লিখিত সংজ্ঞাসমূহ থেকে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসার হলো পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনমনে অনুকূল ধারণা তৈরি ও ধরে রাখার জন্য গৃহীত ভোক্তামূখী সমন্বিত কিছু যোগাযোগ কার্যক্রম। আধুনিক বিপণন বিশারদদের মতে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণন ইত্যাদি হলো মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসারের মূল হাতিয়ার। উপর্যুক্ত সংজ্ঞাগুলো বিশ্লেষন করলে বিপণন প্রসারের নিম্নোক্ত দিকসমূহ পাওয়া যায়:

 

বিপণন প্রসার হলো-

১. ক্রেতা বা ভোক্তামূখী একটি সমন্বিত যোগাযোগ কার্যক্রম;

২. ক্রেতা অবহিতকরণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কার্যক্রম;

৩. ক্রেতার মনোভাব ও আচরণ পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত কার্যক্রম;

৪. পণ্য, সেবা, ধারণা বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্রেতা বা ভোক্তাদের মনোযোগ সৃষ্টিকারী কার্যক্রম; এবং

৫. পণ্য বা সেবার চাহিদা সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও তা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কার্যক্রম।

বিপণন প্রসারের ধারণাটিকে নিম্নোক্ত চিত্রের সাহায্যে সহজভাবে উপস্থাপন করা যায়:

 

 

 

 

পরিশেষে সার্বিক আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতা বা ভোক্তাদেরকে পণ্য, সেবা, ধারণা বা প্রতিষ্ঠানের নানাবিধ বিষয় সম্পর্কে বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণনের মাধ্যমে অবহিত, প্ররোচিত এবং পুনঃপুনঃ স্মরণ করিয়ে দিয়ে পণ্য বা সেবার চাহিদা সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও অব্যাহত রাখা কিংবা পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করা ও তা ধরে রাখার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সম্পাদিত সমন্বিত যোগাযোগ ও প্ররোচনামূলক কার্যক্রমকেই মার্কেটিং প্রমোশন বা বিপণন প্রসার বলা হয়। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়িক জগতে বিপণন প্রসারের গুরুত্ব অপরিসীম।

 

বিপণন প্রসারের বৈশিষ্ট্য (Nature/ Characteristics of Marketing Promotion):

Boone and Kurtz, “Promotion is the function of informing, persuading and influencing the company’s purchase decision. ” অর্থাৎ, প্রসার হলো অবহিত করা, প্ররোচিত করা এবং কোম্পানির পণ্য ক্রয়ের জন্য ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার কার্যক্রম। ক্রেতা ও ভোক্তাদের অবশ্যই জানতে হবে যে সঠিক পণ্যটি সঠিক দামে সঠিক স্থানে তাদের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রস্তুত আছে। আর বিপণন মিশ্রণের মূল কাজই হলো সেটি নিশ্চিত করা। বিপণন প্রসার ছাড়া ক্রেতাদের পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানানো, তাদের পণ্য বা সেবা ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা এবং সর্বোপরি সফল বিক্রয় কার্যক্রম সম্পাদন করা সম্ভবপর নয় ।

 

উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে বিপণন প্রসারের কিছু বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। সেগুলো হলো:

১. তথ্যমূলক প্রক্রিয়া (Informative process):

বিপণন প্রসার হলো কোম্পানির পণ্য বা সেবা সম্পর্কে অভীষ্ট বাজারে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রদানের মাধ্যমে যোগাযোগ সৃষ্টির একটি প্রক্রিয়া।

২. প্ররোচনামূলক প্রক্রিয়া (Persuasive process):

বিপণন প্রসার কোম্পানির পণ্য বা সেবা সম্পর্কে ক্রেতাদের অবহিত করার মাধ্যমে ক্রয়ে প্ররোচিত করার একটি প্রক্রিয়া।

৩. প্রেরনামূলক প্রক্রিয়া (Motivating process):

বিপণন প্রসার শুধুমাত্র ক্রেতাদেরই প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবা ক্রয়ের উদ্দীপনা দেয় না, বরং বণ্টন প্রণালীর নানারকম পরিবেশককে পণ্যের সুষ্ঠু বন্টনের অনুপ্রেরণা যোগায়।

৪. প্রসার একটি বিনিয়োগ (Promotion is an investment):

বিপণন প্রসারকে স্বল্পমেয়দী বিক্রয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টা হিসেবে না দেখে বরং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে যার মাধ্যমে পণ্য বা কোম্পানির প্রতি ভোক্তাদের ভালো মনোভাব তৈরি করা যায়।

৫. বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া (Intellectual process) :

বিপণন প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য নানাবিধ সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যেমন— লক্ষ্যস্থিত বাজার ও ক্রেতাদেরকে খুঁজে বের করা, প্রসারের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা, প্রসারের হাতিয়ার ও তার বাজেট নির্ধারণ ইত্যাদি, যার প্রত্যেকটির জন্য বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন হয়।

৬. সুনির্দিষ্ট হাতিয়ার (Specific tools):

বিপণন প্রসারের সুনির্দিষ্ট পাঁচটি হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণন ।

 

বিপণন প্রসারের উদ্দেশ্য (Objectives of Marketing Promotion):

আধুনিক বাজারজাতকরন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিপণন প্রসার। বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতা ও ভোক্তাদের কাছে পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে চাহিদা সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও তার স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই হলো বিপণন প্রসারের মূল উদ্দেশ্য। এ প্রসঙ্গে Evans and Berman বলেন, “Promotion is any form of communication used to inform, persuade and/or remind people about an organization’s or individual’s goods, services, image, ideas, community involvment or impact on socity.” উপরোক্ত সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে বিপণন প্রসারের বহুমূখী উদ্দেশ্যগুলো সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। নিম্নে এসব উদ্দেশ্য সমূহ বর্ননা করা হলো:

১. অবহিত করা (To inform):

পণ্য উৎপাদিত হলেই তা বিক্রয় হয় না। এ জন্য প্রতিষ্ঠানকে তাদের উৎপাদিত পণ্য এবং এর গুণাগুণ সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করতে হয়।

২. প্ররোচিত করা (To persuade):

বাজারে বিদ্যমান অসংখ্য পণ্য বা সেবার মধ্য থেকে প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পণ্য বা সেবা ক্রয়ে ক্রেতা বা ভোক্তাদেরকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ ও প্ররোচিত করা বিপণন প্রসারের অন্যতম প্রধান একটি উদ্দেশ্য। বিপণন প্রসারের মাধ্যমে পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত লোভনীয় ও ইতিবাচক তথ্যাবলি অত্যন্ত আকর্ষনীয়ভাবে জনসাধারণের সামনে উপস্থাপন করা যায়।

৩. স্মরণ করিয়ে দেওয়া (To remind):

বাজারে বিরাজমান অসংখ্য পণ্যের ভীড়ে ক্রেতাসাধারণ নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যটির কথা ভুলে যেতে পারে। তাই ভোক্তারা বা ক্রেতারা যেন তাদের পছন্দের নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যটিই বারবার ক্রয় করে তার জন্য তাদেরকে পুনঃপুনঃ স্মরণ করিয়ে দেওয়া বিপণন প্রসারের উল্লেখযোগ্য একটি উদ্দেশ্য।

৪. পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করা (To create and increase demand):

পণ্য, সেবা এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত নানাবিধ ইতিবাচক এবং আশাব্যঞ্জক দিক ভোক্তাসাধারণকে অবহিত করার মাধ্যমে পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি করা বিপণন প্রসারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

৫. চাহিদার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা (Maintaining demand):

বিপণন প্রসারের হাতিয়ারগুলোর সময়োপযোগী এবং সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাজারে নির্দিষ্ট পণ্যের চাহিদার হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। যেমন- পণ্যের চাহিদা খুব বেড়ে গেলে প্রমোশনের মাত্রা কমিয়ে দিয়ে বা চাহিদা কমে গেলে প্রমোশনের (প্রসারের) মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বাজারে পণ্যের চাহিদার ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যায় ।

৬. ভোক্তার মনোভাব ও আচরণ পরিবর্তন করা (To change consumer attitude and behavior):

পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত তথ্যাবলী যৌক্তিক ও গঠনমূলকভাবে ক্রেতা ও ভোক্তাদের কাছে উপস্থাপনের মাধ্যমে ক্রেতাদের মনোভাব ও আচরণকে প্রভাবিত ও পরিবর্তন করা যায়। ফলে বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ে প্রলুব্ধ হয় ও প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় বৃদ্ধি পায় ।

৭. নেতিবাচক ভাবমূর্তি দূরীকরণ (To remove negative image ):

বিপণন প্রসারের কৌশল হিসেবে প্রচার ও জনসংযোগের সঠিক ও সময়োপযোগী ব্যবহারের মাধ্যমে পণ্য এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি সাধারণ জনগণের মনে সৃষ্টি হওয়া প্রতিকূল ধারণা, নেতিবাচক মনোভাব, শঙ্কা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ইত্যাদি দূর করা যায়।

৮. সুনাম সৃষ্টি করা (To create / establish goodwill):

প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ও গঠনমূলক দিকসমূহ বিপণন প্রসারের মাধ্যমে ভোক্তাসাধারণের কাছে উপস্থাপন করা যায়। এতে প্রতিষ্ঠানের প্রতি ভোক্তাদের আস্থা বাড়ে, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় ও সুনাম বৃদ্ধি পায়।

৯. প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করা (To face competition):

তীব্র প্রতিযোগিতার এই যুগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একই মূল্যে একই রকম পণ্য বাজারে ছাড়ছে। যা প্রতিযোগিতার মাত্রাকে তীব্রতর করছে। এমতাবস্থায়, বিপণন প্রসারের মাধ্যমে প্রতিযোগী অপেক্ষা অধিকতর পার্থক্যমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রচার করে পণ্যের চাহিদা ও বিক্রয় বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিযোগিদের মোকাবেলা করা যায়।

১০. মুনাফা বৃদ্ধি করা (To increase profit) :

বিপণন প্রসারের হাতিয়ারগুলোর সঠিক ব্যবহার বাজার সম্প্রসারণ ও পণ্যের বিক্রয় ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে মুনাফা বৃদ্ধির সুযোগ করে দেয়। তাই বিপণন প্রসারের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হলো মুনাফা বৃদ্ধি করা ।

পরিশেষে বলা যায়, উপরে উল্লিখিত উদ্দেশ্যসমূহকে সামনে রেখেই প্রতিষ্ঠানের বিপণন প্রসার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

 

বিপণন প্রসারের গুরুত্ব ( Importance of Marketing Promotion):

তীব্র প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় বিপণন প্রসারের গুরুত্ব অপরিসীম। ক্রেতাদের তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহজে পাওয়ার জন্য এবং বাজারজাতকারীকে তার উৎপাদিত পণ্য ক্রেতাদেরকে ভালো মুনাফাসহ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিপণন প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে Pride and Ferrel বলেন, “ The role of promotion is to communicate with individuals, groups or organizations to directly or indirectly facilitate exchanges by informing and persuading one or more of the audiences to accept an organization’s products.” অর্থাৎ, বিপণন প্রসার বাজারজাতকারী ও ক্রেতাসাধারণের মধ্যে পণ্যের বিনিময় ও গ্রহণযোগ্যতাকে সহজতর করে। বিপণন প্রসারের গুরুত্বকে দুইটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়, যা চিত্রের মাধ্যমে সহজে উপস্থাপন করা হলো:

 

বিপণন প্রসার এর ধারণা

 

ক) বিপণন প্রসারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic importance of marketing promotion):

একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিপণন প্রসার গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে। বিপণন প্রসারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নিম্নরূপ:

 

১. পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি (Creating and increasing demand):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে ক্রেতা ও ভোক্তাসাধারণকে পণ্য সম্পর্কে বারবার প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রদান করা হয়। ফলে ক্রেতা ও ভোক্তারা পণ্যের প্রতি আগ্রহী হয় এবং পণ্যের চাহিদা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বৃদ্ধিও পায় ।

২. চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতারক্ষা (Balancing demand and supply):

বিপণন প্রসার শুধুমাত্র পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি ও বৃদ্ধিই করেনা বরং পণ্যের যোগানের তুলনায় চাহিদা বেশি হয়ে গেলে প্রসার কার্যক্রম কমিয়ে দিয়ে পণ্যের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে সমতাবিধান করতে সহয়তা করে।

৩. বাজার সম্প্রসারণ (Market expansion) :

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে ক্রেতারা প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা সম্পর্কে জানতে পারে এবং পণ্য ক্রয়ে প্ররোচিত হয়। ফলে পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয় এবং ভোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে পণ্যের বাজারের সম্প্রসারণ ঘটে।

৪. বৃহদায়তন উৎপাদন (Large sale production):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে অধিক পরিমাণে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়। ফলে সম্প্রসারিত বাজারের চাহিদা মেটাতে উৎপাদনও বাড়াতে হয়। এভাবে বিপণন প্রসার বৃহদায়তন উৎপাদনে সাহায্য করে।

৫. উৎপাদন ব্যয় হ্রাস (Reducing production costs):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে পণ্যের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হয় ও ভোক্তাদের ভোগ বৃদ্ধি পায়। ফলে বাজারজাতকারীকে পণ্যের উৎপাদন বাড়াতে হয়, যা একক প্রতি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে সহায়তা করে।

৬. বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধি (Increasing sales and profit):

বিপণন প্রসার ক্রেতাদেরকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে বিক্রয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বিক্রয়লব্ধ মুনাফাও বৃদ্ধি পায়।

৭. প্রতিযোগিতা মোকাবেলা (Facing competition):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে কোম্পানি তার নিজ পণ্যের বৈশিষ্ট্য, গুনাগুণ, কার্যকারিতা ইত্যাদি প্রতিযোগীদের চেয়ে ভালোভাবে ও ভিন্ন আঙ্গিকে ক্রেতাদের সামনে উপস্থাপন করে। ফলে ক্রেতারা বাজারের অন্যান্য প্রতিযোগীর পণ্য না কিনে ঐ কোম্পানির পণ্যই কিনে। এভাবে বিপণন প্রসারের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করা যায় ।

৮. সুনাম সৃষ্টি (Creating goodwill):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে পণ্যের ভালো দিকসমূহ জনসাধারণের কাছে প্রচারিত হয়। ফলে পণ্যের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানেরও সুনাম সৃষ্টি হয়।

৯. নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও প্রচলন (Invention and Introduction of new products):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে নতুন পণ্যের আগমন, গুণাগুণ ও উৎকর্ষতা সম্পর্কে ইতিবাচক তথ্য ভোক্তাদেরকে প্রদান করার মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে নতুন পণ্যের প্রতি আগ্রহী করে তোলা যায়। ফলে ক্রেতারা খুব সহজেই নতুন পণ্যটিকে নিয়মিত অন্যসব পণ্যের মতো গ্রহণ করতে পারে ।

১০. ব্যক্তিগত ও জাতীয় আয় বৃদ্ধি (Increasing individual and national income):

বিপণন প্রসার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিশেষায়িত অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। সেসব প্রতিষ্ঠানে অনেক মানুষের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি দেশীয় বাজার ও আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে এই সেক্টর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের জাতীয় আয়ও বৃদ্ধি পায়।

 

খ) বিপণন প্রসারের সামাজিক গুরুত্ব (Social importance of marketing promotion):

বিপণন প্রসার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিপণন প্রসারের সামাজিক গুরুত্ব নিম্নে আলোচনা করা হলো:

 

১. অবহিতকরণ (To inform):

বিপণন প্রসারের নানাবিধ হাতিয়ার ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা সম্পর্কে বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতাদেরকে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি অবহিত করা হয়। ফলে ক্রেতারা তাদের প্রয়োজন ও অভাব মেটানোর জন্য প্রত্যাশিত পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানতে পারে।

২. সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি (Creating social awareness):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে সামাজিক বিভিন্ন ইস্যুতে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যায়। যেমন বিপণন প্রসারের সঠিক ব্যবহারের ফলেই “দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়”-এর মতো শ্রুতিমধুর স্লোগান এদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধিরোধের সচেতনতা তৈরি করতে সাহায্য করেছে।

৩. সামাজিক সম্পর্ক সৃষ্টি (Creating social relationship):

বিপণন প্রসারের মাধ্যমে দ্বি-পাক্ষিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তারা একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি, চাহিদা ও প্রয়োজন সম্পর্কে জানতে পারে, যার মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্কের সূচনা হয়।

৪. রুচির উৎকর্ষ সাধন ( Enrichment of taste):

বিপণন প্রসার সমাজে সামাজিক চাহিদাসম্পন্ন, সুন্দর ও রুচিবোধসম্পন্ন পণ্যের প্রবর্তন করে ভোক্তাসাধারণের রুচির উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে ।

৫. জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি (Creating nationalism):

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রচারিত নানা স্লোগান যেমন- “দেশি পণ্য, কিনে হও ধন্য” বা “আজকের সঞ্চয়, আগামীর নিরাপত্তা” ইত্যাদি ভোক্তাদের মাঝে জাতীয়তাবোধ সৃষ্টি করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে ।

৬. ক্ষতিকর পণ্য থেকে রক্ষা করা (Protecting from harmful products):

বিপণন প্রসার কার্যক্রম শুধু কোম্পানির পণ্যের প্রচারণাই চালায় না, বরং সামাজিক ও জনস্বার্থে বিভিন্ন পণ্যের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে ভোক্তাদের সতর্ক করে ও এরূপ পণ্য ক্রয়ে নিরুৎসাহিত করে। যার মাধ্যমে ভোক্তাসাধারণকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।

৭. মধ্যস্বত্বভোগীদের অযাচিত প্রভাব হ্রাস (Reducing middleman influence):

বিপণন প্রসারে মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান ও ভোক্তাদের মধ্যে সহজ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। ফলে ভোক্তারা কোম্পানির পণ্য বা সেবা সম্পর্কে সহজেই জানতে পারে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সাহায্য ছাড়াই নিজেরাই পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে পারে।

৮. শিক্ষামূলক (Educative ) :

পণ্য, সেবা, ধারণা বা শিক্ষামূলক অন্য যে কোন তথ্য বিপণন প্রসারের মাধ্যমে জাতীয় প্রচার মাধ্যম গুলোতে গুরুত্বসহকারে উপস্থাপন করা যায়। ফলে জনসাধারণ খুব সহজেই নতুন নতুন বিভিন্ন বিষয়ে জানতে ও শিখতে পারে।

৯. কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি (Creating employment opportunities):

বিপণন প্রসারের নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রচুর লোকবল দরকার হয়। এতে করে বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

১০. জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন (Improving standard of living):

বিপণন প্রসার কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্রেতারা নিত্যনতুন নানারকম পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানতে পারে। ফলে ক্রেতারা সতর্কভাবে মানহীন পণ্য পরিহার করার সুযোগ পায় এবং তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মানসম্পন্ন পণ্য ক্রয় ও ভোগ করতে পারে। এতে করে ভোক্তাদের জীবন যাত্রার মানোন্নয়ন ঘটে।

এভাবেই বিপণন প্রসার প্রতিষ্ঠান, ক্রেতা বা ভোক্তা, সমাজ ও দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

 

বিপণন প্রসার এর ধারণা ও উদ্দেশ্য পাঠের সারসংক্ষেপ:

বিপণন প্রসার একটি কোম্পানির বিপণন মিশ্রণের অন্যতম প্রধান একটি উপাদান। এটিকে বিপণন মিশ্রণের সর্বাধিক দৃশ্যমান ক্রেতা বা ভোক্তামূখী যোগাযোগ কার্যক্রম হিসেবেও বিবেচনা করা হয়ে থাকে। পণ্য বা সেবার চাহিদা তৈরী, বৃদ্ধি বা ধরে রাখতে কিংবা বিক্রয় বৃদ্ধি করতে প্রসার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিপণন প্রসারের হাতিয়ার সমূহের, যেমন বিজ্ঞাপন, ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ ও প্রচার, এবং প্রত্যক্ষ বিপণনের সফল ব্যবহারের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠান সহজেই তার প্রতিযোগিদের ছাড়িয়ে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছাতে পারে।

বিপণন প্রসার হলো এমন একটি তথ্যমূলক, প্ররোচনামূলক, এবং প্রেরণামূলক প্রক্রিয়া যা ছাড়া ক্রেতাদের পণ্য বা সেবা সম্পর্কে জানানো, তাদের পণ্য বা সেবা ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করা এবং সর্বোপরি সফল বিক্রয় কার্যক্রম সম্পাদন করা অসম্ভব। বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতা ও ভোক্তাদের কাছে পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে এদের চাহিদা সৃষ্টি, বৃদ্ধি ও তার স্থিতিশীলতা ধরে রাখাই হলো বিপণন প্রসারের মূল উদ্দেশ্য। বিপণন প্রসারের গুরুত্বকে দুইটি প্রধান দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা | যায়- অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও সামাজিক গুরুত্ব।

বিপণন প্রসার পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করে, বাজার সম্প্রসারণ করে, প্রতিযোগিদের মোকাবেলা করতে সহায়তা করে, বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে, এবং ব্যক্তিগত ও জাতীয় আয় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও সম্পর্ক তৈরি, রুচিবোধের উৎকর্ষ সাধন, শিক্ষামূলক বার্তা | প্রদান, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, এবং জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতেও বিপণন প্রসার গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে ।

বিপণন প্রসার ধারণা ও উদ্দেশ্য

১ thought on “বিপণন প্রসার এর ধারণা ও উদ্দেশ্য”

Leave a Comment