বিপণন যোগাযোগ পদ্ধতি আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “সমন্বিত বিপণন যোগাযোগ” ইউনিট ১২ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিপণন যোগাযোগ পদ্ধতি
যোগাযোগ পদ্ধতি মডেল (Communication Process Models):
বিপণন যোগাযোগের মাধ্যমে বিপণনকারী ক্রেতা ও ভোক্তার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। এ কারণে বিপণনকারীকে কার্যকর যোগাযোগের জন্য যোগাযোগের মৌলিক উপাদানগুলো সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। যোগাযোগ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সংবাদ বা তথ্য প্রেরণ থেকে শুরু করে সেই তথ্য বা সংবাদ গ্রহণ পর্যন্ত গতিধারাকে বোঝায়। এ ক্ষেত্রে (১) ম্যাক্রো মডেল ও (২) মাইক্রো মডেল গুরুত্বপূর্ণ। নিম্ন তা আলোচনা করা হলো:
১. ম্যাক্রো মডেল (Macro Model of the Communication Process ):
যোগাযোগ পদ্ধতির ম্যাক্রোমডেল এ নয়টি উপাদান রয়েছে। যা চিত্র ১২.৩ এ দেখানো হয়েছে। যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় সর্বপ্রথম বার্তা প্রেরক বা যোগাযোগকারী কী বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করবে, সে বিষয়টি ঠিক করতে হয়। অর্থাৎ, প্রেরক কী বিষয়ে, কখন, কোথায়, কীভাবে যোগাযোগ করতে চায় তার একটি রূপরেখা নির্ধারণ করবে। তাই, যোগাযোগ প্রক্রিয়ার এ স্তরকে পরিকল্পনা স্তরও বলা হয়ে থাকে। প্রাপক যেন সহজেই মূল বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারে এজন্য প্রেরককে বিভিন্ন শব্দ, সংকেত, প্রতীক বা কোডের সাহায্যে সুশৃঙ্খলভাবে ও সহজে বোধগম্য ভাষায় প্রেরণ করতে হয় যেন প্রাপক সহজে বুঝতে পারে।
প্রাপকের নিকট বার্তাটি প্রেরণের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাধ্যমের সাহায্য নিতে হয়। সাধারণত মৌখিক কথাবার্তা, লিখিত প্রতিবেদন, মোবাইল, টেলিফোন, টেলিভিশন, রেডিও, ফ্যাক্স, ইন্টারনেট, ই-মেইল, পত্র-পত্রিকা প্রভৃতি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এ ছাড়া শব্দ, ধ্বনি, সংকেত, প্রতীক, চিহ্ন, প্রেরকের মনোভাব, ব্যক্তিত্ব, পদমর্যাদা, নিরবতা প্রভৃতিও যোগাযোগের মাধ্যমে হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। যোগাযোগকারীকে বার্তা প্ররণের জন্য সুবিধাজনক এক বা একাধিক মাধ্যম বাছাই করে নিতে হয়। মাধ্যম নির্বাচন করার পর বার্তা প্রেরণকারী সেই মাধ্যম ব্যবহার করে বার্তা গ্রহীতা বা প্রাপকের নিকট প্রেরণ করে থাকে।
আর বার্তা প্রেরণের পর প্রাপকের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া না আসা পর্যন্ত যোগাযোগ কার্যক্রম বন্ধ থাকে। তবে, মৌখিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত তাৎক্ষনিকভাবে প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। যোগাযোগকারী যে বার্তা প্রেরণ করেন তা প্রাপক গ্রহণ করে থাকেন। অনেক সময় প্রেরিত বার্তা বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা দ্বারা বাধাগ্রস্ত, বিকৃত বা নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বার্তা প্রাপ্তির পর প্রাপক তার নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে বার্তাকে বিন্যাস, উপলব্ধি ও ব্যাখ্যা করে থাকে এবং প্রকৃত অর্থোদ্ধোর করার চেষ্টা করে থাকে। অনেক সময় একই বার্তার অর্থ প্রাপকদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে, ব্যক্তি বিশেষে এর তারতম্য হয়ে থাকে।
সফলভাবে ডিকোডিং বা অর্থোদ্ধার করার ওপর কার্যকর যোগাযোগ অনেকাংশে নির্ভর করে। প্রাপক বার্তা পাবার পর তা অনুধাবন করে বার্তাটি গ্রহণ বা বর্জন করার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। যদি বর্জন করে তাহলে যোগাযোগ প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়। আবার, প্রাপক বার্তাটি গ্রহণ করে যে কোনো সময় (তাৎক্ষণিকভাবে বা পরবর্তীতে) এ বার্তার বিপরীতে সাড়া (Response) দিতে পারে, যা ফলাবর্তন (Feedback) নামে পরিচিত। এভাবেই যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় বা প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে।

২. ভোক্তা সাড়ার মাইক্রোমডেল (Micromodel of Response):
এ মডেল ভোক্তা বিপণন যোগাযোগ সুনির্দিষ্টভাবে কিরূপ সাড়া দেয় তার প্রতি আলোকপাত করেছে। চিত্র ১২.৪ এ স্বীকৃত তিনটি প্রতিক্রিয়া ক্রমমডেল (Response Hierochy Model) সংক্ষেপে দেখানো হয়েছে-

উপরের ৩টি প্রতিক্রিয়া মডেল দেখানো হয়েছে। যার প্রতিটি মডেলেই ধরা হয়েছে যে, প্রতিটি ক্রেতাই পণ্য ক্রয় করার সময়, প্রথমে পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে জ্ঞাত হয় (Cognitive), এরপর পণ্য সম্পর্কে অনুভুতির (Affective) সৃষ্টি হয় এবং সেই অনুভুতির ওপর নির্ভর করে তার পণ্য ক্রয় করার ব্যাপারে আচরণ নির্ধারিত হয় (Behavior)। AIDA (model) মডেলটি পাঠ নং ১২.৩ এবং নতুন পণ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া (Innovation Adoption)- টি পাঠ নং ৪.৪ এ আলোচনা করা হয়েছে।
এখানে ফলাফলের-ক্রম মডেল (Hirarehy of Effects Model) টি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। এই মডেলে যেকোনো পর্যায়কে উদ্দেশ্য করে যোগাযোগ লক্ষ্য স্থির করা যেতে পারে। তখন লক্ষ্যস্থিত ক্রেতা ছয়টি স্তরের যে কোনো একটিতে অবস্থান করতে পারে। নিচে ছয়টি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হলো:
১. সচেতনতা (Awareness):
বিপণন যোগাযোগকারীকে অবশ্যই প্রথমে তার পণ্য বা সংগঠন সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। যদি লক্ষ্যস্থিত ক্রেতার (Audiance) বেশিরভাগই পণ্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ বা কেবলমাত্র নাম জানে বা সামান্য বিষয় জানে তবে সে ক্ষেত্রে যোগাযোগকারীকে প্রথমেই অবগতি সৃষ্টির চেষ্টা এবং নাম পরিচিতির মাধ্যমেই তা শুরু করতে হবে।
২. জ্ঞান (Knowledge):
লক্ষ্যস্থিত ক্রেতারা যদি পণ্যের নাম শুনে থাকে কিংবা দু’একটি বিষয় অবগতও থাকে কিন্তু বিস্তারিত তথ্য জানা না থাকে যা ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক। তাহলে যোগাযোগকারীকে অবগতির পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান বা তথ্য সরবরাহ করতে হবে।
৩. পছন্দ (Liking):
যদি ধরে নেয়া হয় যে লক্ষ্যস্থিত ক্রেতারা পণ্যটি সম্পর্কে জানে কিন্তু এটি সম্পর্কে তার অনুভূতি কি হতে পারে বিপণনকারী তা বোঝার চেষ্টা করে। হতে পারে ক্রেতারা পণ্যটি খুব পছন্দ করে অথবা অপছন্দ করে কিংবা কিছুই করে না। যদি পণ্যটি ক্রেতারা খুবই অপছন্দ করে তবে অপছন্দের কারণ নির্ণয় করে তা পরিহার বা উন্নয়নের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পুনরায় যোগাযোগের মাধ্যমে ফলপ্রসূতা অর্জন করা যায়।
৪. অগ্রাধিকার (Preference ):
যদি লক্ষ্যস্থিত ক্রেতারা পণ্যটি পছন্দ করে কিন্তু অন্যান্য পণ্যের তুলনায় অগ্রাধিকার না দেয় তবে সে ক্ষেত্রে যোগাযোগকারীকে বিবেচনা করতে হবে ক্রেতারা কোন বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। এবং সেটির বিষয়ে উৎসাহ দিতে হবে।
৫. প্রত্যয় (Conviction):
এ পর্যায়ে মনে করা হয় যে, লক্ষ্যস্থিত ক্রেতারা পণ্যটিকে অগ্রাধিকার দেয় কিন্তু ক্রয়ের জন্য দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে না। কাজেই বিপণন যোগাযোগকারীর কাজ হচ্ছে ক্রেতার মধ্যে প্রত্যয় সৃষ্টি করা যেন ক্রেতা পণ্যটি ক্রয় করে।
৬. ক্রয় (Purchase):
যদি এমন দেখা যায় যে, ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও প্রকৃতপক্ষে পণ্যটি ক্রয়ের জন্য ধাবিত হচ্ছে না; কিংবা ক্রয় সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা কিংবা আরো তথ্যের জন্য অপেক্ষা করছে। যোগাযোগকারীকে এ ক্রেতাদের চূড়ান্তভাবে পণ্য ক্রয়ের স্তরে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয় ।

বিপণন যোগাযোগ পদ্ধতি পাঠের সারসংক্ষেপঃ
যোগাযোগ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সংবাদ বা তথ্য প্রেরণ থেকে শুরু করে সেই তথ্য বা সংবাদ গ্রহণ পর্যন্ত | গতিধারাকে বোঝায়। এ ক্ষেত্রে (১) ম্যাক্রো মডেল ও (২) মাইক্রো মডেল গুরুত্বপূর্ণ। যোগাযোগ প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো- ধারণার উন্নয়ন, প্রেরণযোগ্য করে সাজানো, মাধ্যম নির্বাচন, বার্তা প্রেরণ, বার্তা গ্রহণ, অর্থোদ্ধার, এবং সাড়া । উপরের প্রতিটি মডেলেই ধরা হয়েছে যে, প্রতিটি ক্রেতাই পণ্য ক্রয় করার সময়, প্রথমে পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে | জ্ঞাত হয় এরপর পণ্য সম্পর্কে অনুভুতির সৃষ্টি হয় এবং সেই অনুভুতির ওপর নির্ভর করে তার পণ্য ক্রয় করার ব্যাপারে আচরণ নির্ধারিত হয়। ফলাফলের-ক্রম মডেলে যেকোনো পর্যায়ে যোগাযোগ উদ্দেশ্য স্থির করা যেতে পারে। এই মডেলের ধাপসমূহ হলো- সচেতনতা, জ্ঞান, পছন্দ, অগ্রাধিকার, প্রত্যয় ও ক্রয়।
