মূল্য অভিযোজন আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “মূল্য নির্ধারণের কৌশলসমূহ” ইউনিট ১০ এর অন্তর্ভুক্ত।
মূল্য অভিযোজন
মূল্য সমন্বয় কৌশলসমূহ (Price Adjustment Strategies):
ভৌগোলিক চাহিদা ও ব্যয়, বাজার বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা, ক্রয়ের সময়, অর্ডারের সংখ্যা, সরবরাহের ব্যাপ্তি ও নিশ্চয়তা, সেবার চুক্তি এবং অন্যান্য উপাদানের ভিত্তিতে মূল্য কাঠামোয় পরিবর্তন করতে হয়। নিম্নে মূল্য সমন্বয়ের কৌশলগুলো আলোচনা করা হলো:
১. ভৌগোলিক মূল্যনির্ধারণ-নগদ, কাউন্টার ট্রেড, পণ্যবিনিময় (Geographical Pricing-cash, Countertrade, Barter):
এ কৌশলে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন অবস্থান বা দেশের ভোক্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের মূল্য ধার্য করে। যেমন পরিবহন ব্যয় বেশি হবার কারণে দূরের দেশের ক্ষেত্রে মূল্য বেশি হয়। ভৌগোলিক মূল্য নির্ধারণে ভিন্ন অবস্থান ও দেশের ভিন্ন ক্রেতার ক্ষেত্রে কীভাবে প্রতিষ্ঠান পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। কীভাবে মূল্য আদায় হবে তাও এখানে জড়িত থাকে। নিম্নে বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো-
(ক) পণ্য বিনিময় (Barter):
এ পদ্ধতিতে সরাসরি পণ্যবিনিময় করা হয়। এতে কোনো অর্থ বা তৃতীয় পক্ষ জড়িত থাকে না ।
(খ) ক্ষতিপূরণ চুক্তি (Compensation Deal):
এক্ষেত্রে, বিক্রেতা বিক্রীত পণ্যের মোট মূল্যের কিছু অংশ নগদে পায়, বাকি অংশ পণ্য পায় ।
(গ) ফিরতি ক্রয় ব্যবস্থা (Buy Back Arrangement):
এখানে বিক্রেতা প্লান্ট, যন্ত্রপতি বা প্রযুক্তি অন্য দেশে বিক্রয় করে এবং সরবরাহকৃত প্লান্ট বা যন্ত্রপাতির মাধ্যমে উৎপন্ন পণ্যের মাধ্যমে আংশিক মূল্য গ্রহণে রাজি হয় ।
(ঘ) সমতাবিধান (Offset):
এ কৌশলে বিক্রীত পণ্যের পুরো মূল্য বিক্রেতা নগদে পায়, কিন্তু তাকে নির্দিষ্ট সময়ে এই দেশে মূল্যের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়।

৩. মূল্য বাট্টা ও ছাড় (Price Discounts and Allowances):
ক্রেতাদের কোনো কোনো আচরণকে উৎসাহিত করার জন্য নিল্য সমন্বয় করে। যেমন- বেশি পরিমাণে ক্রয়, বার বার ক্রয় ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরনের বাট্টা ও ছাড় প্রদানের নয় ক্রেতাদের প্রত্যাশিত আচরণকে পুরস্কৃত করা যায়। যথা-
(ক) নগদ বাট্টা ( Cash Discount) :
ক্রেতাকে দ্রুত অর্থ পরিশোধে উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের বাট্টা প্রদান করা হয়। এতে নির্ধারত সময়ের মধ্যে মূল প্রদান করলে বাট্টা দেওয়া হয় ।
(খ) পরিমাণগত বাট্টা (Quantity Discount):
ক্রেতাদের একত্রে বেশি পরিমাণ পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করার জন্য। এ বার্তা প্রদান করা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ বাট্টা নগদে না দিয়ে পণ্যের মাধ্যমেও দেওয়া হয় ।
(গ) কার্যভিত্তিক বাট্টা (Functional Discount):
এতে কিছু বিপণন কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য তালিকা মূল্য থেকে মূল্য হ্রাস করা হয়। বিক্রেতা, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাকে এ বাট্টা প্রদান করে। বণ্টন প্রণালির সব সদস্যকে এ বাট্টা প্রদান করতে হয়।
(ঘ) মৌসুমি বাট্টা (Seasonal Discount):
ব্যবসায়ের মন্দা মৌসুমে বা অফ-সিজনে পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করার জন্য এ বাট্টা দেওয়া হয়। হোটেল, মোটেল, এয়ার লাইন তাদের মন্দা মৌসুমে এ ধরনের বাট্টা প্রদান করে ।
(ঙ) ছাড় (Allowances):
এক্ষেত্রে, তালিকা মূল্য থেকে মূল্য হ্রাস করা হয়। পুরনো পণ্যের স্টক ক্লিয়ার করার জন্য। এ ধরনের ছাঙ দেওয়া হয়, যাকে ট্রেড-ইন ছাড় বলে। পোশাক বিক্রেতা প্রায়ই এ ধরনের মূল্য হ্রাস দেয়। তবে,

৪. প্রসারমূলক মূল্যনির্ধারণ (Promotional Pricing):
এক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদে বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এ মূল্য তালিকা মূল্যের তুলনায় কম হয়, আবার কখনো ব্যয়ের তুলনায়ও কম হয়। এটা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। যেমন-
(ক) লোকসান নেতা (Loss Leaders):
এ কৌশলে বিক্রেতা কোনো জনপ্রিয় বা বেশি বিক্রীত পণ্যের মূল্য কমিয়ে দেয়। এতে বেশি সংখ্যক ক্রেতা দোকানে আসে এবং অন্যান্য পণ্যও তারা কিনে। ফলে বিক্রেতার বিক্রয় ও মুনাফা বাড়ে। যেমন- বিক্রেতা সেমাইয়ের দাম কমিয়ে দিল। এতে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতা দোকানে এসে সেমাইয়ের সাথে অন্যান্য পণ্যও কিনল।
(খ) বিশেষ ঘটনাভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ (Special Event Pricing):
বিশেষ কোনো ঘটনা উপলক্ষ্যে প্রতিষ্ঠান মূলহ্রাস করে বিক্রয় বাঙানোর চেষ্টা করে। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট মৌসুমে অধিকসংখ্যক ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার জন্য বিক্রেতা বিশেষ মূল্য ধার্য করে।
(গ) নগদ ছাড় (Cash Rebates):
এক্ষেত্রে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য কিনলে নগদ ছাড় দেওয়া হয়। বর্তমানে গাড়ড়, গৃহস্থালি পণ্যে এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয় ।
(ঘ) কম সুদে অর্থসংস্থান (Low Interest Financing):
এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান মূল্য হ্রাস করার বদলে ক্রেতাকে কম সুদে অর্থসংস্থানের প্রস্তাব দেয়। যেমন- গাড়ি বিক্রেতা নাম মাত্র সুদে বা বিনাসুদে ক্রেতাকে অর্থসংস্থান করে।
(ঙ) দীর্ঘ পরিেেশাধ মেয়াদ (Longer Payment Terms):
এখানে ক্রেতাকে মূল্য পরিশোধের জন্য দীর্ঘসময় দেওয়া। হয়। গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান এ ধরনের সুযোগ দিয়ে থাকে। এখানে মাসিক কিস্তির পরিমাণও কমানো হয় ।
(চ) ওয়ারেন্টি ও সেবা চুক্তি (Warranties and Service Contracts):
প্রতিষ্ঠান ক্রেতাকে বিনামূল্যে বা কম মূল্যে ওয়ারেন্টি বা সেবা প্রদান করে বিক্রয় বাড়াতে পারে। টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এসি প্রভৃতি পণ্যের ক্ষেত্রে এ কৌশল দেখা যায়।
(ছ) মনস্তাত্ত্বিক বাট্টা প্রদান (Psychological Discounting):
এক্ষেত্রে, বিক্রেতা একটি কৃত্রিম উচ্চমূল্য নির্ধারণ করে এবং এরপর মূল্য হ্রাস করে ক্রেতার সাশ্রয় দেখায়।

৫. পৃথকীকৃত মূল্যনির্ধারণ (Differentiated Pricing):
প্রতিষ্ঠান প্রায়ই ক্রেতা, পণ্য, অবস্থান, সময় প্রভৃতি ভেদে বিভিন্নরকম মূল্য আদায় করে অর্থাৎ বৈষম্য তখনই ঘটে যখন একটি প্রতিষ্ঠান একটি পণ্য বা সেবা দুই বা ততোধিক মূল্যে বিক্রয় করে যা, নুপাতিক ব্যয় পার্থক্যের কারণে ঘটে না। পৃথকীকৃত মূল্যনির্ধারণ বিভিন্নভাবে হতে পারে। যথা-
ক) ক্রেতা বিভাগভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ (Customer Segment Pricing):
এ কৌশলে একই পণ্য বিভিন্ন মূল্যে বিভিন্ন ক্রেতার নিকট বিক্রয় করা হয়। অর্থাৎ, একই পণ্য বা সেবার জন্য বিভিন্ন ক্রেতা বিভাগ থেকে বিভিন্ন মূল্য আদায় করা হয়। যেমন- অনেক বাসে ছাত্রদের হাফ ভাড়ায়, স্টাফদের বিনা ভাড়ায় পরিবহন করা হয়।
(খ) পণ্যের ধরনভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ ( Product Form Pricing):
এতে পণ্যের বিভিন্ন সংস্করণ বিভিন্ন দামে বিক্রয় করা হয়। এখানে দাম খরচেরভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় না । অর্থাৎ, বিভিন্ন সংস্করণের পণ্যের মূল্য বিভিন্ন রকম হয়, কিন্তু ব্যয় অনুপাতে নয় ।
(গ) ভাবমূর্তি ভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ (Image Pricing):
ভাবমূর্তি পৃথক করে অনেক সময় প্রতিষ্ঠান একই পণ্য ভিন্ন মূল্যে বিক্রয় করে। অর্থাৎ, কিছু কোম্পানি ভিন্ন ভাবমূর্তির ভিত্তিতে একই পণ্যের দুটি ভিন্ন স্তরে মূল্য নির্ধারণ করে।
ঘ) প্রণালিভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ (Channel Pricing):
এক্ষেত্রে, বিভিন্ন বণ্টন প্রণালির মাধ্যমে পণ্যটি বিভিন্ন মূল্যে বিক্রয় করা হয়।
(ঙ) অবস্থানভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ (Location Pricing):
এতে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মূল্যনির্ধারণ করে। যদিও বিভিন্ন স্থানে পণ্য সরবরাহের খরচের খুব একটা পার্থক্য হয় না। অর্থাৎ, বিভিন্ন স্থানে অর্পণের ব্যয় সমান হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন স্থানে একই পণ্যের ভিন্ন মূল্যনির্ধারণ করা হয়। সিনেমা হলে সামনে, মাঝে, পেছনে, দোতলায়, তিনতলায় প্রভৃতি স্থান ভেদে টিকেটের দাম ভিন্ন হয়।
(চ) সময়ভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ (Time Pricing):
বিভিন্ন সময়ে এ কৌশলে পণ্যের বিভিন্ন মূল্য ধার্য করা হয়। মৌসুম, দিন, এমনকি ঘণ্টাভেদেও মূল্যের তারতম্য হয়। অর্থাৎ, মৌসুম, দিন বা ঘণ্টায় মূল্য ভিন্ন হয়।
মূল্য অভিযোজন পাঠের সারসংক্ষেপ:
ভৌগোলিক চাহিদা ও ব্যয়, বাজার বিভাজনের প্রয়োজনীয়তা, ক্রয়ের সময়, অর্ডারের সংখ্যা, সরবরাহের ব্যাপ্তি ও নিশ্চয়তা, সেবার চুক্তি এবং অন্যান্য উপাদানের ভিত্তিতে মূল্য কাঠামোয় পরিবর্তন করতে হয়। সেই কৌশলগুলো হলো ভৌগোলিক মূল্যনির্ধারণ-নগদ, কাউন্টার ট্রেড, পণ্যবিনিময়; মূল্য বাট্টা ও ছাড়; প্রসারমূলক মূল্যনির্ধারণ ও পৃথকীকৃত মূল্যনির্ধারণ ।

১ thought on “মূল্য অভিযোজন”