বিক্ৰয়িকতা; অর্থ ও প্রকারভেদ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “প্রকল্প নির্বাচন” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিক্ৰয়িকতা; অর্থ ও প্রকারভেদ
বিপণন প্রক্রিয়ায় বিক্ৰয়িকতা একটি পুরাতন কৌশল। বিক্রয়িকতা হলো ব্যক্তিক বিক্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিক্রয়িকতা এমন একটি কৌশল যার মাধ্যমে বিক্রয়কর্মী তার পণ্য বা সেবা ক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করতে সমর্থ হয়। এটা আসলে বিক্রয় প্রচেষ্টা নয় বরং এটা হলো ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা। বিক্রয়ের সাথে যারা জড়িত থাকে তাদের ক্রেতাদের পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্ররোচিত করার ক্ষমতা থাকে। প্ররোচিত করার ক্ষমতা হলো আধুনিক বিক্রয়িকতার প্রাণ। চাহিদা সৃস্টিতে এবং বিক্রয় বৃদ্ধিতে বিক্রয়িকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিক্রয়িকতার মাধ্যমে বিপণনকারীরা স্থানীয়, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার হতে প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়ে থাকে যা তাদেরকে বিপণন নীতি, কৌশল ও প্রোগ্রাম উন্নয়ন ও বাস্তবায়নে সহায়তা করে। বিক্রয়িকতার মাধ্যমে ক্রেতাসাধারণকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পণ্য ও সেবা সামগ্রী প্রদান করা হয়। আর এ সকল পণ্য ও সেবা সামগ্রী ভোগ ও ব্যবহার করে ক্রেতাসাধারণ জীবন-যাত্রার মান উন্নত করতে পারে। এছাড়া অন্যান্য পেশা অপেক্ষা বিক্রয়িকতার মাধ্যমে একজন বিক্রয়কর্মী অধিক উপার্জন করতে পারে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে বিক্রয়িকতার মাধ্যমে ভোক্তাসাধারণ, বিপণন প্রতিষ্ঠান এমনকি বিক্রয়কর্মী নিজেও বহুবিধভাবে উপকৃত হয়। আর এ কারণেই অন্যান্য প্রসারমূলক হাতিয়ারের তুলনায় বিক্রয়িকতার গুরুত্ব সর্বাধিক।
বিক্ৰয়িকতা
Salesmanship
বিপণন প্রক্রিয়ায় বিক্ৰয়িকতা বহুল ব্যবহৃত একটি পুরাতন কৌশল। বিক্রয়িকতা হলো ব্যক্তিক বিক্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিপণন যোগাযোগ হিসেবে বিক্রয়িকতা সর্বকালে সকলদেশে সর্বাধিক ফলপ্রসূ প্রসার পদ্ধতি। বিক্রয়কর্মী যে সকল কলা-কৌশল ব্যবহার করে ক্রেতা বা সম্ভাব্য ক্রেতাকে পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্ররোচিত করে, ঐ সকল কলা-কৌশলকে বিক্রয়িকতা বলে। সম্ভাব্য ক্রেতার সাথে বিক্রেতার প্রত্যক্ষ্য মুখোমুখি উপস্থাপনাই বিক্ৰয়িকতা। বিক্রেতা নিজে বা তার প্রতিনিধি ব্যক্তিগতভাবে সম্ভাব্য ক্রেতার সম্মুখে পণ্য বিক্রয়ের জন্য অবতীর্ণ হয় ।
Marold M. Mike 4, “Salesmanship is a technique by which a salesman can sell his goods and services to a person.” (বিক্রয়িকতা হলো এমন এক ধরণের কৌশল যার সাহায্যে একজন বিক্রয়কর্মী একজন ব্যক্তির নিকট তার পণ্য বা সেবা বিক্রয় করতে পারে। )
American Marketing Association 4, “Salesmanship is an oral presentation in a conversation with one on more prospective customers for the purpose of making sales.” (বিক্রয়িকতা হলো বিক্রয় করার উদ্দেশ্যে আরও সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে কথোপকথনের একটি মৌখিক উপস্থাপনা।)
Garfield Blake 4, “Salesmanship consists of winning the buyer’s confidence for the seller’s house and goods, hereby winning a regular and permanent customer.” (বিক্রয়িকতা হলো এমন এক ধরণের প্রচেষ্টা যার মাধ্যমে বিক্রেতা তার ব্যবসাস্থল ও পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করে তাদেরকে স্থায়ী ক্রেতায় পরিণত করে।)
সার্বিকভাবে বলা যায় যে, বিক্রয়িকতা বলতে বিক্রয়কর্মীর বিক্রয় কৌশলকে বোঝানো হয়। এই সকল কৌশলের মাধ্যমে বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের স্থায়ী ক্রেতায় পরিণত করে। যোগাযোগের ফলাফল সম্পর্কে সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রতিক্রিয়া তৎক্ষণাৎ পাওয়া যায় বলে বিক্রয়কর্মী তাদের কৌশলকে ক্রেতার অনুকূলে প্রবাহিত করে তাৎক্ষণিক সঠিক উপায়ে ক্রেতাদের প্ররোচিত করতে পারে। তবে সকল ক্রেতাদের আচরণ ও প্রকৃতি একরকম হয় না। তাই প্রত্যেক ক্রেতার আচরণের উপর গভীর মনোযোগ দিয়ে তাদের উপযোগী করে বিক্রয় কৌশল প্রয়োগ করা প্রয়োজন ।
পরিশেষে বলা যায়, বিক্ৰয়িকতা একটা কৌশল এই কৌশল অবলম্বন করে বিক্রয়কর্মী তার পণ্য বা সেবা ক্রেতাদের কাছে বিক্রয় করতে সমর্থ হয়। বিক্রয়িকতা এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে বিক্রয়ের সাথে নিয়োজিত ব্যক্তি ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে।

বিক্রয়িকতার বৈশিষ্ট্য (Feature of Salesmanship)
এটা হলো ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ের প্রতি আকৃষ্ট করা। উপরের সার্বিক আলোচনা থেকে বিক্রয়িকতার নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যসমূহ লক্ষ্য করা যায়।
ক) বিক্রয়িকতা হলো প্ররোচিত করার ক্ষমতা (Salesmanship is the ability to persuade ) : বিক্রয়িতার সাথে যারা জড়িত থাকে তাদের ক্রেতাদের প্ররোচিত করার ক্ষমতা থাকে অধিক। প্রাথমিকভাবে তারা ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে প্রভাবিত করে থাকে। বলা হয়ে থাকে persuasion is the soul of modern salesmanship (প্ররোচিত করা ক্ষমতা হলো আধুনিক বিক্রয়িকতার প্রাণ)।
খ) ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ই বিক্ৰয়িকতায় উপকৃত হয় (Salesmanship benefits both the buyers and sellers): বিক্রয়িকতার হলো পারস্পারিক সুবিধার একটি সেতু বন্ধন। এটা ক্রেতা এবং বিক্রতার মধ্যে যথাযথ সংযোগ স্থাপন করে। এখানে বিক্রয় থেকে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ই উপকৃত হয় এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক একটি আস্থার সৃষ্টি হয়।
গ) বিক্ৰয়িকতা মানে বাণিজ্যিক সততা (Salesmanship stands for commercial honesty ): বিক্রয়িকতার ভিত্তি হলো সততায় উৎকৃষ্ট পন্থা। সনাতন পদ্ধতিতে চাটুকারীতার মাধ্যমে যেকোন উপায়ে পণ্য বিক্রয় করা হতো। বর্তমানে আধুনিক বিক্রয়িকতায় “বাণিজ্যিক সততা” বিষয়টি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক সততা না থাকলে ক্রেতা হারানোর ভয় থাকে এবং কোন সময় ক্রেতাদের স্থায়ী ক্রেতায় পরিণত করা যায় না।
ঘ) বিক্রয়িকতার লক্ষ্য ক্রেতার আস্থা জয় করা (Salesmanship aims at winning the buyer’s confidence) : বর্তমান আধুনিক বিক্রয়িকতার কোন ভাবে সন্দেহজনক বিক্রয় পদ্ধতির মাধ্যমে ক্রেতাদের উপর প্রভাব বিস্তার করে না। অন্যদিকে আধুনিক বিক্ৰয়িকতা শিক্ষামূলক, সচেতনতামূলক এবং উপদেশমূলক পদ্ধতির মাধ্যমে ক্রেতাদের বিক্রয় কাজে প্রভাবিত করে থাকে যা ক্রেতাদের মনে আস্থার সৃষ্টি করে। প্রতিযোগী পরিবেশে আধুনিক বিক্ৰয়িকতা ক্রেতাদের আস্থার জন্য সর্বদা প্রতিশ্রুতির চাইতে বেশি কিছু প্রদান করে থাকে ।
ঙ) আদর্শ বিক্রয়িকতার লক্ষ্য হলো উৎপাদক, বণ্টনকারী এবং ক্রেতাদের সেবা প্রদান করা (Ideal salesmanship aims at serving producer, distributor and consumer): বিক্রয়কর্মীরা উৎপাদকের উৎপাদিত পণ্য যথা সময়ে বিক্রয় করে এবং উৎপাদক তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে। বিক্রয়িকতা উৎপাদক এবং বণ্টনকারীর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে ও বণ্টনকারীদের প্রয়োজনীয় বাজার তথ্য প্রদান করে। বিক্রয়কর্মীরা ক্রেতাদের সাথে পরিবারের সদস্যদের মত জড়িত থাকে এবং বিক্রয়ে তাদের আস্থা অর্জন করে।
চ) বিক্ৰয়িকতা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ সৃষ্টি করে (Salesman acts as a link between the seller and the customers): বিক্রয়কর্মী পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা এবং বিক্রেতার মধ্যে সংযোগ ও সমন্বয় সাধন করে থাকে।বিক্রয়িকতা ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী বাজারে পণ্য সরবরাহ করে। অন্যদিকে বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা, রুচি, আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে বিক্রেতাকে অবহিত করে।
ছ) বিক্রয়িকতা হলো একটি শিক্ষামূলক প্রক্রিয়া (Salesmanship is an educative process): বিক্ৰয়িকতা কেবল মাত্র উৎপাদকের পণ্য বিক্রয় করে না বরং ভোক্তাদের পণ্য সম্পর্কে নানাবিধ জ্ঞান প্রদান করে থাকে। ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য শিক্ষামূলক পণ্য উপস্থাপনা করে থাকে। অন্যদিকে বিক্রয়িকতা উৎপাদকে বাজার নিয়ন্ত্রণ, বাজার প্রতিযোগীতা, পণ্য-উন্নয়ন ও ধারণা ইত্যাদি বিষয়ে পরামর্শ প্রদান করে ।
জ) বিক্ৰয়িকতা সন্তুষ্ট ক্রেতা তৈরী করে (Salesmanship creates satisfied customers): আধুনিক বিক্ৰয়িকতায় মুনাফা অর্জনের চেয়ে ভোক্তা সন্তুষ্টিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ভোক্তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে ভোক্তাদের সাথে দীর্ঘ মেয়াদে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরী হয়। ফলে ভোক্তারা প্রতিষ্ঠানের সাথে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ থাকবে। ভোক্তা নিজে পণ্য ক্রয় করবে এবং অন্যদের পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করবে। সার্বিকভাবে প্রতিষ্ঠান তার অভিষ্ট লক্ষে পৌঁছাতে পারবে।
বিক্ৰয়িকতা: কলা, বিজ্ঞান না পেশা
Salesmanship: Arts, Science or Profession:
কিছু বিপণন চিন্তাবিদ বিক্ৰয়িকতাকে কলা বলে অবিহিত করেছেন। আসলে কলা কি? কলা হলো যা রীতিনীতি শিক্ষা দেয়। অর্থাৎ অর্জিত জ্ঞানের দক্ষতা বা প্রয়োগিক কুশলতাই হলো কলাবিদ্যা। যেমন, চারুকলা শিক্ষা দেয় কিভাবে চিত্র আঁকতে হবে। চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষা দেয় কিভাবে ঔষধ প্রয়োগ করে রোগ সারাতে হবে। ঠিক সেই ভাবে বিক্রয়িকতা শিক্ষা দেয় কিভাবে ক্রেতাদের উৎসাহিত করে পণ্য বা সেবা বিক্রয় করা হবে। একজন ডাক্তার থেকে অন্য ডাক্তারে পার্থক্য হলো কিভাবে তারা তাদের অর্জিত জ্ঞানকে প্রয়োগ করবে। একজন বিক্রয়কর্মী থেকে অন্য বিক্রয়কর্মীর পার্থক্য হলো কিভাবে এবং কত দক্ষতার সাথে তাদের বিক্রয়ের কলা-কৌশলসমূহ প্রয়োগ করবে।
তাই বিক্রয়কর্মীকে সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করতে হয় এবং দক্ষতা অর্জনের সাথে সাথে উন্নয়ন প্রচেষ্টাও গ্রহণ করতে হয়। এ প্রসঙ্গে Sherlekar বলেছেন, “Salesmanship is the art of persuasion, the art of handling people.” আবার কিছু বিপণন চিন্তাবিদ বিক্রয়িকতাকে বিজ্ঞান বলে অভিহিত করেছেন। আমরা জানি যে জ্ঞানশাখা সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় বিশেষ কোন সত্য ঘটনার অন্তর্নিহিত নিয়ম আবিষ্কার করে তাকে বিজ্ঞান বলে। যেমন পদার্থবিদ্যা বিভিন্ন পদার্থের বৈশিষ্ট্য ও ক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে এর পরীক্ষণ প্রক্রিয়ায় সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে কতগুলো সাধারণ নিয়মের আবিষ্কার করে। বিজ্ঞানের লক্ষ্য হলো বিষয় বা বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান দান করা। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিক্রয়িকতার বিজ্ঞান বলা যায়।
কারণ বিক্রয়িকতার কার্যক্রম কতিপয় নীতি এবং সাধারণ সূত্র দ্বারা পরিচালিত হয়। বর্তমান কালে বিক্রয়িকতার বিভিন্ন তত্ত্ব, ধারণা, মূলনীতি, পদ্ধতি ইত্যাদি সুসংবদ্ধ জ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। আর প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও সফলতা অর্জনের জন্য একজন বিক্রয়কর্মী বিক্ৰয়িকতার তত্ত্ব, ধারণা ও পদ্ধতিসমূহ গ্রহণ করে থাকেন। তবে যেহেতু বিক্রয়কর্মীগণ আসলে ক্রেতাদের আচার-আচরণ নিয়ে কাজ করে থাকেন সেই ক্ষেত্রে পদার্থ বিজ্ঞানের মত বিক্ৰয়িকতাকে পুরোপুরি বিজ্ঞান বলা যায় না। তাই বিক্ৰয়িকতাকে পুরোপুরি বিজ্ঞান না বলে সামাজিক বা মানবিক বিজ্ঞান হিসাবে বিবেচনা করাই বাঞ্ছনীয়।
এখন অনেকেই প্রশ্ন করে বিক্রয়িকতা কি একটি পেশা? কোন বিষয়ের উপর বৃত্তিমূলক জ্ঞান আহরণ ও দক্ষতা অর্জন করে তা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করে জীবিকা অর্জন করার প্রক্রিয়াকে পেশা বলে। পেশা হচ্ছে বিশেষ জ্ঞানের সমাবেশ যেখানে স্বীকৃত সনদপত্র থাকে। পেশাতে সনদধারী ব্যক্তিদের সংস্থা থাকে এবং পেশাগত বিভিন্ন আইন থাকে। পেশার এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্যে বিক্রয়িকতার সাথে মিল রয়েছে এবং কিছু বৈশিষ্ট্যের রয়েছে অমিল। সুষ্ঠ-বিক্রয়িকতার জন্য অবশ্যই বিশেষায়িত জ্ঞান দরকার। বর্তমানে বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন ডিগ্রী রয়েছে। তবে বিক্ৰয়িকতা এখনো ডাক্তারি কিংবা আইন পেশার মত পেশার মর্যাদা লাভ না করলেও দিন দিন পেশা হিসেবে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। আশা করা যায়, খুব শীঘ্রই বিক্ৰয়িকতা পেশার মর্যাদা লাভ করবে।
পরিশেষে বলা যায়, বিক্রয়িকতায় জ্ঞান ও প্রয়োগ দুটোই সমানভাবে প্রয়োজন। দুটো ছাড়া পরিপূর্ণ বিক্রয়িকতা আশা করা যায় না। অন্যদিকে বিক্ৰয়িকতাও পেশাগত মর্যাদাপূর্ণ কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তাই বিক্রয়িকতা হলো কলা, বিজ্ঞান ও পেশার সমন্বিত রূপ ।
বিক্রয়কর্মীর প্রকারভেদ (Types of Salesperson )
বর্তমানে বৃহদায়তন ও জটিল বণ্টন প্রক্রিয়ায় বিক্রয়কর্মী ও বিক্রয় কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিপণন উপাদান। সাধারণত: যারা বিক্রয় প্রক্রিয়ায় পণ্য বিক্রয়ের সাথে জড়িত থাকে তাদেরকে বিক্রয়কর্মী বলা হয়। দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন প্রকার বিক্রয়কর্মী পরিলক্ষিত হয়। যেমন কিছু বিক্রয়কর্মী ভোগ্য পণ্য বিক্রয় করে, কিছু বিক্রয়কর্মী শিল্পজাত পণ্য আবার কিছু বিক্রয়কর্মী সেবাজাত পণ্য বিক্রয় করে। বিক্রয়কর্মী একজন স্বাধীন ব্যবসায়ী হতে পারে বা সে কতিপয় উৎপাদনকারীর বিক্রয়শক্তির সদস্য হতে পারে। ফলে বিক্রয়ের ভিন্নতা অনুযায়ী বিক্রয়কর্মীর ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। যদিও বিক্রয়কাজে বিক্রয়কর্মীদের ভিন্নতা দেখা যায় তথাপি প্রত্যেক বিক্রয়কর্মীই ব্যক্তিগত যোগাযোগে নিয়োজিত থাকে।
বর্তমান প্রতিযোগী পরিবেশে বিক্রয় কার্যক্রমে একই ধরণের বিক্রয়কর্মী দেখা যায় না। তাই বিক্রয়কর্মীদের শ্রেণিবিভাগ একটি জরুরী বিষয়। বিভিন্ন পদ্ধতির মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীদের কার্যক্রমগুলিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। নিম্নলিখিত চিত্রের মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীদের প্রকারভেদ দেখানো ও বর্ণনা করা হলো।

১। উৎপাদকের বিক্রয়কর্মী ( Manufacturer’s salesperson): কিছু কিছু বিক্রয়কর্মী রয়েছে যারা উৎপাদকের পক্ষ থেকে পণ্য বিক্রয় করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। আবার উৎপাদক দ্বারা সরাসরি বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীকে বলা হয় উৎপাদকের বিক্রয়কর্মী। এরা সাধারণত পণ্যের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হয়ে থাকে এবং পণ্য সম্পর্কে সকল ধরণের তথ্য এদের কাছে থাকে। এদেরকে নিম্নলিখিত ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়।
ক) অগ্রগামী বিক্রয়কর্মী (Pioneer salesperson): এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীগণ বাজারে নতুন পণ্যের দায়দ্বায়িত্ব গ্রহণ করে। কিভাবে নতুন পণ্যকে বাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সেটা নিয়ে তারা কার্যক্রম পরিচালিত করে। নতুন পণ্যের যথাযথ প্রসারের ব্যবস্থা করে বলে এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীদের প্রমোশনাল বিক্রয়কর্মী বলা হয়। এদের পেশাগত শিক্ষা এবং কর্মদক্ষতা খুব উঁচু মানের হয়ে থাকে। অগ্রগামী বিক্রয়কর্মীদের পারিশ্রমিকও হয় অনেক বেশি।
খ) ডিলার সার্ভিসিং বিক্রয়কর্মী (Dealer servicing salesperson): সাধারণত উৎপাদকগণ এই ধরণের বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এরা ডিলারদের বিভিন্ন ধরণের সেবা প্রদান করে থাকে। এরা নিয়মিত ডিলারদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে এবং তাদের পণ্য ও সেবা সংক্রান্ত নানাবিধ তথ্য সরবরাহ করে থাকে। এছাড়াও এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীরা ডিলারদের সেলিং পয়েন্ট, পণ্য উন্নয়ন, পণ্য ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ধরণের কাজে সরাসরি সহযোগিতা করে থাকে।
এই সকল বিক্রয়কর্মীরা ডিলারদের কর্মচারী ও বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় পদ্ধতি সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকে। এরা খুবই বন্ধুসুলভ এবং সহযোগিতামূলক মনোভাব সম্পন্ন হয়ে থাকে। এছাড়াও এরা ডিলারদের ব্যবসায়িক মনোভাব, বাজার পরিস্থিতি, প্রতিযোগিদের অবস্থান ইত্যাদি পর্যবেক্ষণ করে। এদের পরিশ্রমিক অগ্রগামী বিক্রয়কর্মীদের চেয়ে কিছুটা কম হয়ে থাকে।
গ) পণ্যের বিক্রয়কর্মী (Merchandise salesperson): সাধারণত এই ধরণের বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দেয়া হয় ডিলারদের বিক্রয় কাজে সহযোগিতার জন্য। ডিলারদের বিক্রয় বৃদ্ধি করা হলো এদের প্রধান কাজ। এরা নিয়মিতভাবে ডিলারদের বিক্রয়কার্যক্রম পরিদর্শন করে এবং বিক্রয়বৃদ্ধি সংক্রান্ত সকল বিষয়ের সুপারিশ প্রদান করে। এছাড়া বিক্রয় প্রদর্শনী ব্যবস্থাপনা, বিজ্ঞাপন, পণ্য-বিন্যাস, অভ্যন্তরীন সাজসজ্জা, ঋণ নীতি ইত্যাদি বিষয়ে ডিলারদের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করে থাকে। সিগারেট, ঔষধ, ডিটারজেন্ট, হালকা পানীয় ইত্যাদি পণ্যের ক্ষেত্রে এই ধরণের বিক্রয়কর্মীর আধিক্য দেখা যায়।
এরা সাধারণত পণ্য বা সেবার বিস্তারিত তথ্য সরবরাহ করে এবং তাদের প্রধান কাজ হলো ডিলারদের বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করা ।
২। পাইকারী বিক্রেতার বিক্রয়কর্মী (Wholesaler’s salesperson): উৎপাদকের নিকট থেকে খুচরা কারবারীদের কাছে পণ্য পাঠানোর দায়িত্ব পালন করে পাইকারী কারবারীগণ। ফলে উৎপাদক থেকে খুচরা কারবারীর কাছে পণ্য পৌঁছানোর প্রধান মাধ্যম হলো পাইকারগণ। পাইকারগণ এক শ্রেণীর বিক্রয়কারী নিয়োগ দিয়ে থাকে যাদের প্রধান কাজ হলো খুচরা কারবারীদের পণ্য তথ্য ও সেবা প্রদান করা।
এই বিক্রয়কর্মীগণ খুচরাকারবারীদের বিক্রয় কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে। তার পাইকারী কারবারীর বিক্রয়কর্মীগণ খুচরাকারবারীদের পণ্য যোগান ও চাহিদার বিষয়টি গুরুত্বের সহকারে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে। এছাড়া তারা খুচরাকারবারীদের বিক্রয় আচরণ, বাজার অবস্থান, প্রতিযোগিতা ইত্যাদি বিষয় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে। এরা খুচরাকারবারীদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও প্রবাহের দিকটি বিবেচনা করে এবং খুচরাকারবারীদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করে।
৩। খুচরা বিক্রেতার বিক্রয়কর্মী ( Retailer’s salesperson) : খুচরা বিক্রেতা পাইকারী বিক্রেতার নিকট থেকে পণ্য সংগ্রহ করে এবং ভোক্তাদের কাছে পণ্য বিক্রয় করে। পণ্য বন্টন প্রণালীতে খুচরা বিক্রেতারা সরাসরি ভোক্তাদের সাথে জড়িত থাকে। ফলে বহু সংখ্যক ক্রেতাদের সাথে তাদের সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন হয়ে থাকে এবং পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এই সকল বিক্রয়-কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য খুচরা বিক্রেতাগণ কিছু বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীদের বলা হয় খুচরা বিক্রেতার বিক্রয়কর্মী। এই ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতাগণ দুই ধরণের বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে।
ক) অভ্যন্তরীন বিক্রয়কর্মী ( Indoor salesperson): এই সকল বিক্রয়কর্মী দোকানের মধ্যে থেকেই বিক্রয়কার্য সমাধান করে। এরা দোকানে বসেই ক্রেতাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। এরা ক্রেতা সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকে না। বরং ক্রেতাগণ সারসরি এদের কাছে ক্রয় প্রস্তাব দিয়ে থাকে। এখানে ক্রেতারা একজনের পর অন্যজন আসা যাওয়া করে এবং এই সকল বিক্রয়কর্মী তাদের বিক্রয় সেবা প্রদান করে থাকে।
এখানে বিক্রয়কর্মী সরাসরি অর্থের বিনিময়ে পণ্য ও ক্যাশ মেমো হস্তান্তর করে থাকে। এদের বিক্রয় কার্যক্রম অন্য বিক্রয়কর্মীদের চেয়ে অনেক সহজ প্রকৃতির। এই জাতীয় বিক্রয়কর্মীগণ পণ্য বিক্রয়ের সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রয়ের জন্য ক্রেতাদের কাছে আবেদন সৃষ্টি করে থাকে। যেমন কোন ক্রেতা জুতা ক্রয়ের পর বিক্রেতা তাকে মোজা ক্রয় করার জন্য অনুরোধ করতে পারে ।
খ) বহিরঙ্গন বিক্রয়কর্মী (Outdoor salesperson): ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মী যারা দেশের বা শহরের বিভিন্ন এলাকায় পণ্য বিক্রয় করে তাদেরকে বহিরঙ্গন বিক্রয়কর্মী বলা হয়। এরা প্রধানত যারা সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা তাদের কাছে পণ্য বিক্রয়ের প্রস্তাব করে থাকে। সাধারণত উচ্চ মূল্য এবং বিশেষায়িত পণ্য সমূহের জন্য এই ধরণের বিক্রয়কর্মীর নিয়োগ দেয়া হয়। এই সকল বিক্রয়কর্মী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ভ্রমণ করে এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিকট নতুন পণ্য বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপন করে। এরা অন্তরঙ্গ বিক্রয়কর্মীদের মত ঘরে মধ্যে আবদ্ধ থাকে না বরং প্রত্যন্ত অঞ্চলে পণ্য-বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এই সকল বিক্রয়কর্মীদের স্বাস্থ্য এবং সুস্থ্যতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তাছাড়া এদের ব্যক্তিত্ব হয় খুবই আকর্ষণীয়। পণ্য-বিক্রয়ের জন্য এদের অনেক ধৈর্য্যশীল হতে হয়। এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীদের পণ্য সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য সম্বন্ধে যথাযথ জ্ঞান অর্জন করতে হয় । ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মীদের আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়।
i) মুখ্য বিক্রয়কর্মী (Staple salesperson) : সাধারণত প্রচলিত যেসকল প্রতিযোগী পণ্য রয়েছে যেমন খাদ্য, বস্ত্র, স্টেশনারী, মুদিখানা ইত্যাদি পণ্যের বিক্রয়কর্মীদের মূখ্য বিক্রয়কর্ম বলা হয়। এই পণ্যগুলি প্রতিযোগি পণ্য এবং একটি এলাকার বিভিন্ন দোকানে এই পণ্যগুলি পাওয়া যায়। এই সকল পণ্যের উৎপাদকের সংখ্যাও থাকে অনেক। ক্রেতারা এই সকল পণ্যের গুনাগুণ, মূল্য, বন্টন ইত্যাদি যাচাই করে পণ্য ক্রয় করে থাকে। এই সকল পণ্যের চাহিদা মূলত অস্থিতিস্থাপক এবং চাহিদা বৃদ্ধির জন্য বিক্রয়কর্মীদের তেমন কোন কৌশল অবলম্বন করতে হয় না। এরা খুব সহজেই ভোক্তাদের চাহিদা পুরণ করতে পারে।
ii) বিশেষ পণ্য বিক্রয়কর্মী (Specialty goods salesperson): সাধারণত কিছু টেকসই ও অটেকসই পণ্য যাদের প্রতি একক মূল্য অনেক বেশি ইত্যাদি পণ্যের বিক্রয়কর্মীদের বিশেষ পণ্য বিক্রয়কর্মী বলা হয়। এই জাতীয় পণ্যের কিছু উদাহরণ দেয়া যেতে পারে যেমন, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, পানি পরিশোধক, উন্নত সেলাই মেশিন, ইত্যাদি। এই সকল বিক্রয়কর্মী নতুন পণ্য বাজারে উপস্থাপন করে এবং পণ্য সম্পর্কে তাদের বিশেষায়িত জ্ঞান থাকে। এই সকল পণ্য বাজারে বিক্রয়ের জন্য বিক্রয়কর্মীদের বিশেষ বিক্রয় প্রচেষ্টা ও বিশেষ দক্ষতা থাকে । অন্যদিকে সেবাদানের ভিত্তিতে বিক্রয়কর্মীদের নিম্নলিখিতভাবে ভাগ করা যেতে পারে :
ক) ভোক্তাদের গৃহে বিক্রয় (In consumer’s house): এরা সাধারণত ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মী। একটি অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরণের ভ্রাম্যমান বিক্রয়কর্মী দেখা যায়। এরা ক্রেতাদের ঘরে ঘরে গিয়ে বিভিন্ন ধরণের পণ্য-বিক্রয় করে থাকে। অনেক ক্রেতা রয়েছে যারা খুচরা দোকানে এসে পণ্য দ্রব্য ক্রয় করতে চায় না। আমাদের দেশের ফেরিওয়ালারা এর প্রকৃষ্টতম উদাহরণ। এই সকল ফেরিওয়ালা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বিভিন্ন বাসায় দেশীয় শাড়ী, কমদামী প্রসাধনী, হাড়ি-পাতিল, মাছ, মুরগী, তরিতরকারী ইত্যাদি বিক্রয় করে। এই ধরণের বিক্রয়কর্মীরা সম্পূর্ণরূপে নিজেদের জন্য বা উৎপাদক বা খুচরাকারবারীর পক্ষ হয়ে বিক্রয়কার্য সমাধা করে ।
খ) প্রচারক বিক্রয়কর্মী (Missionary salesperson): এরা উৎপাদক কর্তৃক নিয়োগকৃত বিশেষ ধরণের বিক্রয়কর্মী। এরা পণ্যের বিভিন্ন সুবিধাসমূহ এবং পণ্যের বিশেষ দিক ক্রেতাদের নিকট প্রচার করে। এই সকল বিক্রয়কর্মীরা কোন পণ্যের অর্ডার গ্রহণ করে না তবে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধির জন্য অথবা ক্রেতাদের পণ্য সচেতনতার জন্য এরা কাজ করে থাকে। এরা চাহিদা সৃষ্টি করে এবং বিক্রয় এলাকা বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এরা প্রধানত পাইকারী এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন ধরণের সেবা প্রদান করে থাকে। এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীরা উচ্চ শিক্ষিত ও উচ্চ পেশাগত দক্ষতা সম্পন্ন হয়ে থাকে ।
গ) সেবা পণ্য বিক্রয়কর্মী ( Service salesperson): এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীগণ দৃশ্যমান পণ্যের ক্রয় বিক্রয়ের সাথে জড়িত থাকে না বরং এরা অদৃশ্যমান পণ্য বা সেবা পণ্যের বিক্রয় কার্যক্রমের সাথে জড়িত থাকে। জীবনবীমা বিক্রয়কর্মী, ব্যাংক ডিপোজিট সংগ্রহকারী, স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকার, রিয়েল এস্টেট বিক্রয়কর্মী, ইত্যাদি সেবা পণ্য বিক্রয়কর্মীদের উদাহরণ। এই সকল বিক্রয়কর্মীদের কাজ হলো খুব সূক্ষ্ম এবং জটিল প্রকৃতির। সাধারণত এদের ক্রেতারা হয় উচ্চ শিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ। ফলে সেবা পণ্য বিক্রয়ে বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মীদের বিশেষ কৌশলী হতে হয়।
ঘ) রপ্তানিকারক বিক্রয়কর্মী (Exporter salesperson) : পণ্য রপ্তানি করার নিমিত্তে উৎপাদনকারী এই শ্রেণীর বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে। এদের প্রধান কাজ হলো তার প্রতিষ্ঠানের পণ্য দ্রব্য রপ্তানির প্রয়োজন ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এদের দায়- দায়িত্ব খুব জটিল প্রকৃতির। এরা মূলত বিদেশী ডিলারদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে থাকে এবং পণ্য সম্পর্কে যথাযথ তথ্য সরবরাহ করে। সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে বিদেশী ডিলারদের নিকট পণ্য পৌঁছানোর দায়িত্ব থাকে এই বিক্রয়কর্মীদের উপর। এই সকল বিক্রয়কর্মীদের পণ্যের আমদানি ও রপ্তানির উপর যথেষ্ট জ্ঞান থাকতে হয়, বিশেষ করে আমদানি রপ্তানির আইন কানুন সম্পর্কে। যে দেশে পণ্য রপ্তানি করা হবে সেই দেশের ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে এদের প্রাথমিক ধারণা থাকতে হয়। এই জটিল বিক্রয়কর্মীদের উচ্চ বেতনসহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় ।
ঙ) শিল্প পণ্য বিক্রয়কর্মী (Industrial salesperson): এই প্রকার বিক্রয়কর্মীরা কেবলমাত্র শিল্প পণ্য বিক্রয় করে থাকে। এরা সাধারণত উৎপাদক, পাইকারী ব্যবসায়ী ও ডিলারদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে থাকে। এদের উচ্চ কারিগরি জ্ঞান, পণ্য বিক্রয় দক্ষতা ও বিশেষ প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হয়। সে কারণে এই ক্ষেত্রে যারা পেশাগত দক্ষতা অর্জন করে তাদের বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান শিল্প বিক্রয়কর্মীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এরা উচ্চ বেতন ভুক্ত হয় এবং বিক্রয় কমিশন পেয়ে থাকে ।

সারসংক্ষেপ
বিক্রয়িকতা হলো এমন এক ধরণের প্রচেষ্টা যার মাধ্যমে বিক্রেতা তার ব্যবসা-স্থল ও পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা | অর্জন করে তাদেরকে স্থায়ী ক্রেতায় পরিণত করে। বিক্রয়িকতা হলো এক ধরণের দক্ষতা যা ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে। আদর্শ বিক্রয়িকতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো উৎপাদক, বণ্টনকারী এবং ক্রেতাদের সেবা প্রদান করা। পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিক্রয় বৃদ্ধি করে বিক্রয়িকতা অর্থনীতিতে থুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিক্রয়িকতায় জ্ঞান এবং প্রয়োগ দুটোই সমানভাবে প্রয়োজন। দুটো ছাড়া পরিপূর্ণ বিক্রয়িকতা আশা করা যায় না। বর্তমানে বিক্রয়িকতাও পেশাগত | মর্যাদাপূর্ণ কার্যক্রম হিসেবে গণ্য হচ্ছে। তাই বিক্রয়িকতা হলো কলা, বিজ্ঞান ও পেশার সমন্বিত রূপ।
যারা বিক্রয় প্রক্রিয়ায় পণ্য বিক্রয়ের সাথে সরাসরি জড়িত থাকে তাদেরকে বিক্রয়কর্মী বলা হয়। দেশের অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরণের বিক্রয়কর্মী পরিলক্ষিত হয়। কিছু বিক্রয়কর্মী রয়েছে যারা উৎপাদকের পক্ষ থেকে পণ্য বিক্রয় করার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এদের উৎপাদকের বিক্রয়কর্মী বলা হয়। উৎপাদকের তিন ধরণের বিক্রয়কর্মী থাকে যেমন অগ্রগামী বিক্রয়কর্মী, ডিলার সার্ভিসিং বিক্রয়কর্মী এবং পণ্যের বিক্রয়কর্মী। পাইকারী বিক্রেতাগণ এক শ্রেণীর বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে । তাদের পাইকারী বিক্রেতার বিক্রয়কর্মী বলা হয়। আবার বিভিন্ন কাজের জন্য খুচরা বিক্রেতাগণ কিছু বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে যাদের খুচরা বিক্রেতার বিক্রয়কর্মী বলা হয়। খুচরা কারবারীদের দুই ধরণের বিক্রয়কর্মী থাকে।
যেমন অভ্যন্তরীন ও বহিরঙ্গন বিক্রয়কর্মী। আবার সেবা প্রদানের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরণের বিক্রয়কর্মী দেখা যায়। যেমন: ভোক্তাদের গৃহে বিক্রয়, প্রচারক বিক্রয়কর্মী, সেবা পণ্য বিক্রয়কর্মী, রপ্তানিকারক বিক্রয়কর্মী ও শিল্প পণ্যের বিক্রয়কর্মী। বিক্ৰয়িকতা হলো পারস্পরিক সুবিধার একটি সেতুবন্ধন। এটা ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে যথাযথ সংযোগ স্থাপন করে। এখানে | বিক্রয় থেকে ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ই উপকৃত হয় এবং তাদের মধ্যে একটি আস্থার সৃষ্টি হয়।

