ক্রমবিকাশ কৌশল ও প্রতিযোগী বিশ্লেষণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “প্রতিযোগিতা মোকাবেলা” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।
ক্রমবিকাশ কৌশল ও প্রতিযোগী বিশ্লেষণ
যেকোনো প্রতিষ্ঠান কখনো এক অবস্থানে সবসময় থাকে না কারণ গতিশীল ব্যবসায় পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকার জন্য প্রতিনিয়ত প্রতিযোগিতা করে যেতে হয়। এইকারণে প্রতিষ্ঠানকে কাঙ্খিত অবস্থান অর্জন করার জন্য ক্রমবিকাশ কৌশল এবং সেই অবস্থান ধরে রাখার জন্য প্রতিযোগীদের বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করতে হয়।
ক্রমবিকাশ কৌশল
Growth Strategies
ক্রমবিকাশ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে নতুন বাজার ও নতুন পণ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠান এক অবস্থান থেকে নতুর আরেক অবস্থানে পৌছে যেতে পারে। ইউনিট দুইয়ে এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এছাড়াও প্রতিষ্ঠান ক্রমবিকাশের জন্য আরোও কিছু কৌশল গ্রহণ করতে পারে; যেমন- বাজার অংশ বৃদ্ধি করা, দীর্ঘমেয়াদী অনুগত (Loyal) ক্রেতা ও স্টেকহোল্ডার (Stakeholder) তৈরি করা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রস্তুত, নতুন পণ্য বা সেবা উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ইত্যাদি।
প্রতিযোগী বিশ্লেষণ কী?
What is Analysing Competitors?
বর্তমানে বিপণনকারীকে সফলতার ও দক্ষতার সাথে ক্রেতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য বিভিন্ন ধরণের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিযোগী কারা, তাদের যোগ্যতা ও কার্যক্রম প্রভৃতি সম্পর্কে বিপণনকারীকে জানতে হয় এবং প্রতিযোগীদের সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে কৌশল গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে ক্রেতা প্রতিযোগীদের দ্বারা আকৃষ্ট হতে পারে। এজন্য বিপণনকারীকে প্রতিযোগী বিশ্লেষণ করতে হয়। প্রতিযোগী বিশ্লেষণে বিপণনকারী প্রতিযোগীদের কার্যক্রম, উদ্দেশ্য, কৌশল, শক্তিশালী ও দুর্বল দিক প্রভৃতি পর্যালোচনা করা হয়।
প্রতিযোগী বিশ্লেষণ হচ্ছে অনেকগুলো কাজের সমষ্টি; যথা- মূল প্রতিযোগীদের চিহ্নিত করা; তাদের উদ্দেশ্য, কৌশল, শক্তি ও দুর্বলতা এবং প্রতিক্রিয়ার ধরন পরিমাপ করা তাছাড়া কোনো প্রতিযোগীকে টার্গেট করা হবে, কোন প্রতিযোগীকে এড়িয়ে যাওয়া হবে, কোন প্রতিযোগীকে গুরুত্বহীন ভাবা হবে আবার কোন প্রতিযোগীকে আক্রমণ করতে হবে তা নির্ধারণ করা। সুতরাং বলা যায়, প্রতিযোগী বিশ্লেষণ হচ্ছে কতগুলো কাজের সমষ্টি, যেখানে প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগী চিহ্নিত করে প্রতিযোগীদের কার্যক্রম, উদ্দেশ্য, কৌশল, শক্তি, দুর্বলতা বিশ্লেষণ করা হয়, আক্রমণ ও এড়িয়ে যাবার জন্য কৌশল অবলম্বন করা হয়।
প্রতিযোগী বিশ্লেষণের ধাপসমূহ
Steps of Analysing Competitors
প্রতিযোগীতামূলক বিপণন কৌশল করার জন্য কতগুলো ধাপের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের বিশ্লেষণ করা হয় তা চিত্র ৬.২ এ দেখানো হলো-

১. প্রতিযোগী শনাক্তকরণ (Identifying Competitors): প্রতিযোগীদের শনাক্ত করার বিষয়টি শিল্প ও বাজার উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই ব্যাখ্যা করা যায়। একটি শিল্পের অন্তর্গত যেসব ফার্ম এমন কোনো পণ্য বা পণ্যশ্রেণি অৰ্পণ করে যা একটি অপরটির বিকল্প তাকে প্রতিযোগীতা বলে। আবার ভোক্তার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিযোগী বলতে সেসব প্রতিষ্ঠানকে বুঝায় যারা গ্রাহকদের একই ধরনের প্রয়োজন মেটায়।
প্রতিযোগী শনাক্ত করার জন্য প্রথমেই শ্রেণিগত সদস্য সংখ্যা (Category Membership) নির্ধারণ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্যের শ্রেণি সদস্য হবে সকল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পণ্য বা বিকল্প পণ্য যাদের সাথে সেই ব্র্যান্ডকে প্রতিযোগীতা করতে হচ্ছে। যেমন- কোমলপানীয় প্রাণকোলাকে প্রত্যক্ষভাবে প্রতিযোগীতা করতে হচ্ছে কোকাকোলা, আরসি কোলা, প্রাণকোলা, ফিজআপ, মোজো ইত্যাদি ব্র্যান্ডের সাথে। আবার পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ফ্রটজুস এবং এনার্জি ড্রিংক ও চা-কফির সঙ্গেও প্রাণকোলাকে প্রতিযোগীতা করতে হয়। তাই সব সময় প্রতিযোগীদের সহজে শনাক্ত করা যায় এমনটি নয় ।
২. প্রতিযোগী বিশ্লেষণ (Analyzing Competitors): প্রতিযোগীদের শনাক্ত করার পর বিশ্লেষণ করে বের করতে হয় কোন প্রতিযোগীদের উদ্দেশ্য, কৌশল, সবলতা, দুর্বলতা এবং প্রতিক্রিয়ার ধরন। নিম্নে আলোচনা করা হলো-
ক) উদ্দেশ্য পরিমাপ করা (Assessing Objectives): মুনাফাযোগ্যতা, নগদ টাকা আয়, বাজার অংশ বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব, সেবা নেতৃত্ব ইত্যাদি উদ্দেশ্যের সমন্বয়ে প্রত্যেক প্রতিযোগীর একটি উদ্দেশ্য মিশ্রণ থাকে। এসব উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রতিযোগী কোনোটিকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে তা প্রতিষ্ঠানকে জানতে হবে। এতে প্রতিযোগীর সন্তুষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অনুমান করা যায় ৷
খ) কৌশল চিহ্নিত করা (Identifying Strategies) : সমজাতীয় কৌশল গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগীতা বেশি হয়। যেমন- যেসব প্রতিষ্ঠান কমদামে প্রতিযোগীতা করে তাদেরকে একটি দল আবার বেশিদামে প্রতিযোগীতাকারী প্রতিষ্ঠানকে আরেকটি দল করে প্রতিযোগীর কৌশলগত দল নির্ধারণ করতে পারে।
গ) প্রতিযোগীর দুর্বল ও সবল দিক পরিমাপ (Assess Competitor’s Weaknesses and Strengths): প্রতিযোগীরা কি কাজ করতে পারে বা কী প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে এটা বোঝার জন্য প্রতিষ্ঠানকে সতর্কভাবে প্রাতিযোগিদের শক্তিশালী ও দুর্বল দিক পরিমাপ করতে হয়। প্রতিষ্ঠান বিপণন গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
ঘ) প্রতিক্রিয়ার ধরন পরিমাপ করা (Assessing Reaction Patterns): এ পর্যায়ে প্রতিষ্ঠান পূর্বানুমান করে বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে প্রতিযোগী কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারে। প্রতিযোগীদের কার্যক্রম, উদ্দেশ্য, কৌশল, সবল ও দুর্বল দিক সম্পর্কে জানা থাকলে প্রতিযোগীর প্রতিক্রিয়া অনুমান করা সহজ হয়।
৩. আক্রমণ এবং এড়িয়ে যাবার জন্য প্রতিযোগী নির্বাচন (Selecting Competitors to Attack and Avoid): প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগী সনাক্ত করার পরে সিদ্ধান্ত নেয় কাকে সে আক্রমণ করবে আর কাকে এড়িয়ে যাবে। এক এক প্রতিযোগীদের অবস্থানের উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে।
ক) দুর্বল বনাম শক্তিশালী প্রতিযোগী (Weak versus Strong Competitors): অনেক প্রতিষ্ঠানই দুর্বল প্রতিযোগীদের আক্রমণ করতে চায় কারণ এতে লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তবে দুর্বল প্রতিযোগীকে আক্রমণ করা সহজ হলেও লাভ খুব সামান্য হয়ে থাকে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী প্রতিযোগীদের আক্রমণ করা উচিত বলে মনে করে।
খ) নিকট বনাম দূরবর্তী প্রতিযোগী (Close versus Distant Competitors): প্রতিষ্ঠান তার কাছাকাছি বা নিকটতম প্রতিযোগীকে যেমন আক্রমণ করতে পারে তেমনি দূরবর্তী প্রতিযোগীকেও আক্রমণ করতে পারে ।
গ) ভদ্র বনাম সংহতিনাশক প্রতিযোগী (Well Behaved versus Distruptive Competitors): প্ৰতিযোগীতা থাকার ফলে প্রতিষ্ঠান কিছু কৌশলগত সুবিধা পায়। যেমন- মোট চাহিদা বৃদ্ধিতে সহায়তা, বাজার ও পণ্য উন্নয়ন, আইন প্রণেতাদের সাথে দরকষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি, পণ্য পৃথকীকরণ ইত্যাদি। ভদ্র প্রতিযোগী নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকে ফলে প্রতিষ্ঠান কৌশলগত সুবিধা ভোগ করতে পারে। কিন্তু সংহতিনাশক প্রতিযোগী নিয়ম ভঙ্গ করে তাই অনেক প্রতিষ্ঠান ভদ্র প্রতিযোগীর পরিবর্তে সংহতিনাশক প্রতিযোগীদের আক্রমণের পথ বেছে নেয় ।

সারসংক্ষেপ :
ক্রমবিকাশ কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে নতুন বাজার ও নতুন পণ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠান এক অবস্থান থেকে নতুর আরেক অবস্থানে পৌছে যেতে পারে। ইউনিট দুইয়ে এই বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। যেমন- বাজার অংশ বৃদ্ধি করা, দীর্ঘমেয়াদী অনুগত ক্রেতা ও স্টেকহোল্ডার তৈরি করা, শক্তিশালী ব্র্যান্ড প্রস্তুত, নতুন পণ্য বা সেবা উদ্ভাবন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ ইত্যাদি। প্রতিযোগী বিশ্লেষণে বিপণনকারী প্রতিযোগীদের কার্যক্রম, উদ্দেশ্য, কৌশল, শক্তিশালী ও দুর্বল দিক প্রভৃতি পর্যালোচনা করা হয়। প্রতিযোগী বিশ্লেষণ হচ্ছে অনেকগুলো কাজের সমষ্টি; যথা- মূল প্রতিযোগীদের চিহ্নিত করা; তাদের উদ্দেশ্য, কৌশল, শক্তি ও দুর্বলতা এবং প্রতিক্রিয়ার ধরন পরিমাপ করা তাছাড়া কোনো প্রতিযোগীকে টার্গেট করা হবে, কোন প্রতিযোগীকে এড়িয়ে যাওয়া হবে, কোন প্রতিযোগীকে গুরুত্বহীন ভাবা হবে আবার কোন প্রতিযোগীকে আক্রমণ করতে হবে তা নির্ধারণ করা।

