ক্রয় উদ্দেশ্য : কারণ ও প্রকারভেদ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “প্রকল্প নির্বাচন” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।
ক্রয় উদ্দেশ্য : কারণ ও প্রকারভেদ
মানুষের কোন কিছু ক্রয়ের পিছনে কিছু প্রেষণামূলক উপাদান কাজ করে থাকে। মানুষ প্রাথমিকভাবে তার মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের জন্য পণ্য ক্রয় করে তাকে। মানুষের একটি চাহিদা পূরণের পর অন্য একটি চাহিদার সৃষ্টি হয়। মানুষ সামাজিক জীব তাই সমাজের বসবাস করার জন্য মানুষকে নানাবিধ পণ্য ক্রয় করতে হয়। আবার শখের বসবর্তী হয়ে মানুষ পণ্য বা সেবা ক্রয় করে থাকে। ক্রেতাদের ক্রয় উদ্দেশ্য নির্ণয় করা বিপণনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। একজন বিক্রয়কর্মী যদি ক্রেতাদের ক্রয় উদ্দেশ্য বুঝতে না পারে তবে সে যথাযথভাবে ক্রেতাকে প্ররোচিত করতে পারবে না।
একজন ক্রেতার যদি পণ্য ক্রয়ের আসলেই কোন উদ্দেশ্য না থাকে তবে তার পিছনে অহেতকু বিভিন্ন ধরণের বিক্রয় কৌশল প্রয়োগের কোন যুক্তি থাকেনা। এতে বিক্রয়কর্মীর শ্রম ও সময় দুটোই নষ্ট হয়। আর যদি বিক্রয়কর্মী ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারে তবে সে সেই অনুযায়ী পণ্য বিক্রয় কৌশল প্রয়োগ করতে পারবে। যদিও ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য নিরূপণ করা অত্যন্ত দুরূহ কাজ। তথাপি কিছু বিপণন কৌশলের মাধ্যমে ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। বিক্রয়কর্মীকে ক্রেতার ক্রয় আচরণ ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে জানতে হয় যাতে ক্রেতার দুর্বলতম অংশে আঘাত করে বিক্রয়কর্মী তার বিক্রয়ের কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করতে পারে।
মানুষ কেনো ক্রয় করে
Why People Buy
ক্রেতারা কেন একটা কোম্পানির পণ্য ক্রয় করতে চায় না? হতে পারে তার অর্থের অভাব। যখন সে পণ্যটি অর্থ দিয়ে কিনে তখন সে পণ্যের মালিকানা স্বত্ব লাভ করে। এটাই কি পণ্য ক্রয়ের একমাত্র কারণ? আসলে এটা পণ্য ক্রয়ের কারণ নয়। একজন সেলিব্রেটিকে কেন কোম্পানির ব্যবহার করছে তার পণ্যের বিজ্ঞাপনে? কারণ হলো ক্রেতাদের ক্রয়ে আগ্রহী করে তোলা। আবার অনেকে কোন কারণ ছাড়াই অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার পিছনে। আসলে মানুষের কোন কিছু ক্রয়ের পিছনে কিছু প্রেষণামূলক উপাদান কাজ করে থাকে। ক্রয় উদ্দেশ্যে অধ্যায়ের মানুষের পণ্য ক্রয়ের বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তথাপি মানুষ কেন পণ্য বা সেবা ক্রয় করে প্রাথমিক ভাবে নিম্নে আলোচনা করা হলো ।
১. মৌলিক প্রয়োজন (Basic needs): মানুষ তার মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণ করার জন্য পণ্য ক্রয় করে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষার প্রয়োজনে পণ্য ক্রয় করে থাকে। তবে সবগুলি চাহিদা একসাথে পুরণ করা সম্ভবপর নয়। প্রথমে একটি চাহিদা পূরণের পর মানুষের অন্য একটি চাহিদার সৃষ্টি হয়।
২. প্রতিস্থাপন (Replacement): মানুষ পণ্য ক্রয় করে ব্যবহার করার পর পণ্যটির উপযোগ ক্রমেই কমতে থাকে । তখন ঐ পণ্যটি পরিবর্তন করে আবার একটি নতুন পণ্য ক্রয় করতে চায়। বিশেষ করে ফ্যাশন বা সৌখিন পণ্যের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপন বিষয়টি খুবই প্রচলিত। তাই পুরাতন পণ্য বাদ দিয়ে মানুষ নতুন মডেল বা নতুন ব্যান্ডের পণ্য ক্রয় করতে পছন্দ করে ।
৩। অভাব (Scarcity): পণ্য বা সেবা ব্যবহার করার পর যদি মনে হয় অদূর ভবিষ্যতে পণ্যের যোগান বা সরবরাহ নিয়ে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে তখন মানুষের মধ্যে ক্রয় প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপনে “আমাদের স্টক সীমিত” স্লোগানটি ব্যবহার করা হয়। এটি পণ্যের অভাববোধ সৃষ্টি করে মানুষকে পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে।
৪. প্রতিপত্তি (Prestige): মানুষ নিজের প্রতিপত্তি ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। একজন মানুষের অনেক দিনের ইচ্ছা একটা দামি গাড়ি ক্রয় করার। অর্থের অভাবে হয়তো সে পণ্যটি ক্রয় করতে ব্যর্থ হয়। তবে সময় ও সুযোগের পরিবর্তনে সে যখন অনেক অর্থ বিত্তের মালিক হয় তখন সে একটি দামি গাড়ি ক্রয় করে।
৫. আবেগ প্রবণ (Emotional): মানুষ আবেগ প্রবণে তাড়িত হয়ে পণ্য ক্রয় করে থাকে। আমরা প্রিয়জনদের জন্মদিন বা বিবাহ বার্ষিকীতে বিভিন্ন ধরণের উপহার সামগ্রী ক্রয় করে থাকি। অনেক সময় আমাদের ক্রয়ের কোন ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন পরিবেশে আবেগের বশবর্তী হয়ে পণ্য ক্রয় করে থাকি ।
৬. মূল্য হ্রাস (Price reduction): অনেক সময় পণ্যের উচ্চমূল্য ক্রেতাদের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। তবে কোম্পানি যদি হঠাৎ করে পণ্যের লক্ষণীয় মূল্যহ্রাস করে তবে অনেক ক্রেতা পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হবে। কোন পণ্যের ৩০% বা ৪০% মূল্যহ্রাসের সময় ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ের হিড়িক পড়ে যায় ।
৭. অতি মূল্যবান (Great value): যখন পণ্যের অনুভূত মান পণ্য মূল্য অপেক্ষা বেশি হয় তখন মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকে। অনেক সময় পণ্যের প্রয়োজনীয়তা সৃষ্টি ছাড়াই মানুষ পণ্য ক্রয় করে কেবল মাত্র পণ্যের অনুভূত মান বৃদ্ধির কারণে । সৌখিন বা অনন্য পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বেশি পরিলক্ষিত হয়।
৮. কেনাকাটার সুবিধা (Convenience buying): কেনাকাটা সুবিধার জন্য পণ্য ক্রয় করা হয়ে থাকে। এই সুবিধার জন্য অনেক সময় পণ্যের ব্রান্ড বা অন্যান্য বিষয়ও বিবেচনা করা হয় না। অনেক সময় গাড়িতে বসেই ক্রেতা বিভিন্ন ধরণের পণ্য ক্রয় করে থাকে। পিপাসার সময় হাতের কাছে যে পানি পাওয়া যায় ক্রেতা সেটাই ক্রয় করে।
৯. বিবর্ণ বা নতুনত্ব (Fad or innovation) : পুরাতন পণ্যের চেয়ে নতুন মডেলের পণ্য ক্রয় করতে মানুষ পছন্দ করে। অনেক সময় দেখা যায় মানুষ পুরাতন পণ্য বিক্রি করে নতুন মডেলের পণ্য ক্রয় করছে। নতুন মডেলের পণ্য নিজেই বিজ্ঞাপনের কাজ করে। অন্যদিকে পণ্য বিবর্ণতার সাথে সাথে মানুষের অন্য একটি নতুন পণ্য ক্রয় করার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
১০. বাধ্যতামূলক ক্রয় (Compulsory Purchase): অনেক সময় মানুষকে বাধ্য হয়েই পণ্য ক্রয় করতে হয়। সন্তানদের জন্য স্কুল ব্যাগ বা বই ক্রয় বাধ্যতামূলক ক্রয়ের উদাহরণ। অসুখের সময় ঔষধ ক্রয়ের কোন বিকল্প থাকে না। বিশেষ পরিস্থিতিতে স্ত্রী-কন্যার চাপে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাধ্য হয়ে পণ্য ক্রয় করতে হয়।
১১. অহমবোধ (Egoism): চূড়ান্ত আহমবোধ থেকে মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকে। কিছু মানুষের নিজেকে দেখানোর প্রবণতা থাকে। একজন মানুষ খুব উচ্চমূল্যের গাড়ি ক্রয় করে বলতে পারে আমার গাড়ি এই শহরের সবচেয়ে দামি গাড়ি। কোরাবানির বাজারে সবচেয়ে দাম দিয়ে গরু ক্রয় করে মানুষ তার আহমবোধ প্রকাশ করে।
১২. সামাজিক পরিচয় (Niche identity): নিজের সামাজিক পরিচয়ের জন্য মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকে । ঈদের সময় মুসলিম ছেলেদের পাঞ্জাবি কেনার ধুম পড়ে যায়। বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ও বিভিন্ন ধরণের আয়োজনে নানা ধরণের পোশাক, খাবার ও আয়োজনের সামগ্রী ক্রয় করা হয়। সেভাবে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের জন্য নানাবিধ পণ্য ক্রয় করা হয়। ১৩. সহকর্মীদের চাপ (Peer pressure): নিজেদের কাছের মানুষ, বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের চাপে মানুষ পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য হয়। খুব কাছের একজন বন্ধু যদি জীবনবীমার কর্মী হয় তবে তার চাপে বাধ্য হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও জীবনবীমা পলিসি ক্রয় করতে হয়। অনেকে সহকর্মীদের সাথে পহেলা বৈশাখে একজাতীয় পোশাক ক্রয়ে অংশগ্রহণ করে।
১৪. আত্মতৃপ্তি (Self satisfaction): অন্যকে দেয়ার মধ্যে যে আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায় সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকে। যেমন- বিভিন্ন দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের সময় অনেক মানুষ বিভিন্ন ধরণের পণ্যসামগ্রী ক্রয় করে এবং বিপর্যস্ত এলাকার মানুষের মধ্যে বিতরণ করে। ফলে অন্যের প্রয়োজনে পণ্য ক্রয় ও বিতরণ করে মানুষ তৃপ্তি পায় ৷
১৫. পারস্পারিক অপরাধবোধ (Reciprocity guilt): অনেক সময় পারস্পারিক বাধ্যবাধকতা থেকে মানুষ ক্রয় করে থাকে। একজন মানুষ অন্যজনকে কিছু উপহার বা উপলক্ষ ছাড়াই যদি কিছু প্রদান করে তবে অন্যজনের একটা অপরাধবোধ কাজ করে। তখন সে মনে করে তাকেও কিছু প্রদান করা উচিৎ। ফলে এই ধরণের বাধ্যবাধকতা থেকে অন্যজনকেও পণ্য ক্রয় করতে হয় ।
১৬. সহানুভূতি (Empathy): অনেক মানুষ সমাজের গরীব-দুখী দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। অনেক দানশীল মানুষ আছে যারা নিজের নাম প্রকাশ না করে সমাজের গরীব ও অসহায় মানুষের জন্য অকাতরে পণ্য ও সেবা বিতরণ করে। এছাড়াও এই শ্রেণির মানুষ এতিমখানা বা বৃদ্ধাশ্রমে সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে।
১৭. আসক্তি (Addiction): কিছু মানুষ বিভিন্ন পণ্যে আসক্তি হয়ে পণ্য ক্রয় করে থাকে। বিশেষ করে মানুষ নেশায় ১৭. আসক্তি হয়ে নানা ধরণের নেশাজাতীয় পণ্য ক্রয় করে থাকে। এক সময় এই জাতীয় পণ্য ক্রয় বাধ্যতামূলক ক্রয়ের পর্যায়ে চলে আসে। অন্ন বা বস্ত্রে চাইতেও এই সকল পণ্যের ক্রয় আবশ্যিক হয়ে পড়ে। মানুষ নিজের শেষ সম্বল বিক্রি করেও এই সকল পণ্য ক্রয় করে থাকে।
১৮. ভয় ও নিরাপত্তা (Fear & Safely): ভয় ও নিরাপত্তার তাগিদে মানুষ বিভিন্ন ধরণের পণ্য ক্রয় করে থাকে । নিজের জীবনকে ঝুঁকি মুক্ত করার জন্য মানুষ বন্দুক ক্রয় করে থাকে। আবার শেষ জীবনের নিরাপত্তার জন্য মানুষ জীবন বীমার পলিসি ক্রয় করে থাকে। পরিবারে সদস্যদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য শিক্ষা বীমা, স্বাস্থ্য বীমা বা সঞ্চয়পত্র ক্রয় করা হয়।
১৯. শখ (Hobbies): সমাজে মানুষের বিভিন্ন ধরণের শখ দেখতে পাওয়া যায়। শখের বশবর্তী হয়ে মানুষ নানা রকম পণ্য ক্রয় করে থাকে। শখের বসে মানুষ বিভিন্ন ধরণের জীবজন্তু ক্রয় করে থাকে। যেমন- বিড়াল, কুকুর, পাখি ইত্যাদি। আবার শখের বসে মানুষ গাছপালা, স্ট্যাম্প ও অনেক পুরাতন দিনের মৌলিক বিষয়সমূহ ক্রয় করে থাকে।
২০. ব্যাপক ভোগ প্রবৃত্তি (Habit of mass consumption) : সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বর্তমানে মানুষের ব্যাপক ভোগ প্রবৃত্তি ক্রমাগতভাবেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। একজন মানুষ প্রয়োজন ছাড়াই ৪টি মোবাইল সেট ব্যবহার করছে। অতিথী আপ্যায়নে অহেতুক মানুষ খাদ্য তালিকায় ২০টি পদের খাদ্য দ্রব্য অন্তর্ভূক্ত করছে। অহেতুক কোন প্রয়োজন ছাড়াই নানা ধরণের পণ্য ক্রয় করা হচ্ছে। কিছু সংখ্যক মহিলা আছে তারা তাদের শাড়ি ও গয়নার সংখ্যা নিজেরাই বলতে পারে না।
পরিশেষে বলা যায় মানুষ নানাবিধ কারণে পণ্য ক্রয় করে থাকে। বিভিন্ন প্রয়োজনে যেমন মানুষের মৌলিক চাহিদা পুরণের জন্য মানুষকে পণ্য ক্রয় করতে হয়। মানুষ সামাজিক জীব তাই সমাজের বসবাস করার জন্য মানুষকে নানাধরণের পণ্য ক্রয় করতে হয়। কিছু পণ্য রয়েছে যা মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবেই ক্রয় করতে হয়। অনেক সময় মানুষ নেশাগ্রস্ত হয়ে পণ্য ক্রয় করে থাকে। আবার শখের বসবর্তী হয়েও মানুষ নানা ধরণের পণ্য ক্রয় করে থাকে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কিছু মানুষের পণ্য ক্রয়ের বার্ত্তিক থাকে তারা বিনা কারণেই পণ্য সামগ্রী ক্রয় করে থাকে।

ক্রয় উদ্দেশ্য (Buying Motives)
ক্রয় উদ্দেশ্যের অর্থ
Meaning of buying motive
বিক্রয় কার্যক্রমের কেন্দ্রিয় ভূমিকায় থাকে ক্রেতা। পণ্য ক্রয় করা বা না করার পুরোটাই নির্ভর করে ক্রেতার উপর। ভোক্তার কেবল মাত্র ভোগের জন্যই পণ্য ক্রয় করে এমন নয় বরং ভোক্তাদের পণ্য ক্রয়ের পিছনে নানাবিধ উদ্দেশ্য থাকে। কেউ নিজের ভোগের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে, কেউ পরিবারে জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে, কেউ উপহার দেওয়ার জন্য পণ্য ক্রয় করে আবার কেউ পুনঃবিক্রয়ের জন্য বা পণ্য উৎপাদনের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। ক্রেতারা যে কারণেই পণ্য ক্রয় করে থাকুক না কেন ক্রেতাদের সকল ক্রয়ের পিছনে আসলে একটা কারণ বা যুক্তি থাকে। বিক্রয়কর্মীকে প্রথমত জানতে হবে পণ্য ক্রয়ের আসল উদ্দেশ্য কি? ক্রয় উদ্দেশ্য হলো একটি ইচ্ছা বা প্রয়োজন মেটানোর তাগিদ যা মানুষকে পণ্য বা সেবা কিনতে বাধ্য করে ।
K.C Raut, “Buying motives are the set of thought, feeling, emotion and instincts which motivate the buyer to buy an article.” (ক্রয় উদ্দেশ্য হলো চিন্তা, আবেগ, অনুভূতি এবং প্রবৃত্তির একটি সেট যা ক্রেতাদের একটি পণ্য ক্রয়ে অনুপ্রাণিত করে।)
Prof. D.J. Duncan, “Buying motives are those influences or considerations which provide the impulse to buy, induce action or determine choice in the purchase of goods and service.” (ক্রয় উদ্দেশ্য হলো সেই সকল প্রভাব বা বিবেচনা যা পণ্য ও সেবা ক্রয়ে অথবা পছন্দের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।)
পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেতা যে সকল বিষয় বিবেচনা করে পণ্য ক্রয় করে থাকে সেগুলোকে ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য বলা হয়। প্রত্যেকটি ঘটনার পিছনে একটা কারণ থাকে। ক্রয়কে যদি একটা ঘটনা বলা হয় তবে ক্রয় ঘটনার পিছনে যে কারণগুলো থাকে তাকেই ক্রয় উদ্দেশ্য বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায়, Behind every purchase, there remains a set of buying motives.
বিক্রয়কর্মীকে জানতে হবে পণ্য ক্রয়ের পিছনে ক্রেতার আসল কারণ কি? যদি কেউ নিজের ভোগের জন্য পণ্য ক্রয় করে তবে তার জন্য বিক্রয় পন্থা (approach) হবে একরকম। আবার যদি কেউ উপহারের জন্য পণ্য ক্রয় করে তবে তার জন্য বিক্রয় পন্থা হবে অন্য রকম। বিপণনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্লোগান হলো “ভোক্তাই রাজা” তাই ভোক্তা সন্তুষ্টির উপর সবচেয়ে গুরুত্ব প্রদান করতে হবে। আর ভোক্তাদের সন্তুষ্টি বিধানের জন্য প্রথমেই জানা প্রয়োজন ভোক্তাদের ক্রয় উদ্দেশ্য। পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও প্রচার সংক্রান্ত বিপণের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণের পূর্বে প্রতিষ্ঠানকে ক্রেতাদের ক্রয় উদ্দেশ্যসমূহ যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন ।
ক্রয় উদ্দেশ্যের শ্রেণি বিভাগ: (Classification of Buying Motives)
এতক্ষণ আমরা ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য আলোচনা করেছি। এ পর্যায়ে আমরা ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্যের শ্রেণিবিভাগ সম্বন্ধে আলোচনা করব। ক্রেতাদের অনেক ধরণের ক্রয় উদ্দেশ্য দেখা যায়। আর এই উদ্দেশ্যের উপর ভিত্তি করে ক্রয় উদ্দেশ্যকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভাগ করা যায়। M.S. Hattwick ক্রয় উদ্দেশ্যকে প্রধানত দুইটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। যথা- প্রাথমিক ক্রয় উদ্দেশ্য এবং মাধ্যমিক ক্রয় উদ্দেশ্য। নিম্নের ছকে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক ক্রয় উদ্দেশ্যের একটি তালিকা দেখানো হলো ।

অনেক বিপণনবীদ ক্রয় উদ্দেশ্যকে পণ্য ও পৃষ্ঠপোষকতার উপর ভিত্তি করে দুইটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছে। কোন বিশেষ পণ্য কিংবা তার বৈশিষ্ট্য এবং পরিচিত ক্রেতার নিকট উক্ত পণ্য অর্জনের উদ্দেশ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। যেমন- বাটার জুতার স্থায়ীত্বের কারণে ক্রেতা উক্ত জুতা ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এখানে পণ্যের বৈশিষ্ট্যই প্রভাব বিস্তারকারী উপাদান হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অন্যদিকে পৃষ্ঠপোষকতামূলক ক্রয় সিদ্ধান্তে পণ্যের বৈশিষ্ট্য নয় বরং অন্যান্য বিষয়গুলো যেমন- বিক্রয়কর্মী, মূল্য, ঋণ সুবিধা, বিশেষ দোকান বা ডিলারের প্রতি আগ্রহ ইত্যাদি প্রভাব বিস্তার করে থাকে। প্রত্যহিক জীবনে আমাদের নৈমিত্তিক পণ্যসমূহ ক্রয়ের জন্য স্থানীয় নির্দিষ্ট দোকানে গমন করাই পৃষ্ঠপোষকতামূলক ক্রয় উদ্দেশ্যের উদাহরণ।
পণ্য এবং পৃষ্ঠপোষকতামূলক ক্রয় উদ্দেশ্যকে আবার দুটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়, যেমন আবেগপ্রবণ ও যুক্তিসঙ্গত ক্রয় উদ্দেশ্য, আবেগপ্রবণ ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা তার আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়। এখানে ক্রেতাদের মর্যাদা, সম্মানবোধ, ভালবাসা, আনন্দ ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো কাজ করে। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা তার স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ দ্বারা ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যুক্তিসঙ্গত ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্যের তুলনামূলক গুণ, মান, মূল্য, পণ্য সুবিধা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা করে থাকে। নিম্নে চিত্রে ক্রেতাদের ক্রয় উদ্দেশ্যের শ্রেণিবিভাগ দেখানো ও বর্ণনা করা হলো –

১. পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য (Product buying motives )
ক্রেতা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের পণ্য ক্রয় করতে পছন্দ করে। যখন পণ্যের গুণাগুন, বৈশিষ্ট্য, উপাদান ইত্যাদির কারণে প্রভাবিত হয়ে ক্রেতা পণ্য ক্রয় করে তখন তাকে পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য বলা হয়। জাপানী পণ্যের স্থায়িত্বের কারণে মানুষ জাপানী পণ্য ক্রয়ে আগ্রহ প্রকাশ করে।
i) আবেগপ্রবণ পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য (Emotional product buying motives) : ক্রেতারা এখানে বিভিন্নভাবে আবেগ তাড়িত হয়ে পণ্য ক্রয় করে থাকে। এই রূপ পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের ক্রয় সিদ্ধান্ত যে সবসময় সঠিক হয়ে থাকে সেটা বলা যায় না। আবেগ তাড়িত ক্রয় সিদ্ধান্ত অযৌক্তিক হতে পারে। নিম্নে আবেগপ্রবণ ক্রয় উদ্দেশ্যের উপর প্রভাববিস্তারকারী উপাদানসমূহ বর্ণনা করা হলো।
ক) গর্ব (Pride): মানুষ সমাজে নিজেকে বিভিন্ন ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় এবং সমাজের কাছ থেকে বিশেষ স্বীকৃতি আশা করে। সেই কারণে সে নিজের অবস্থান নিয়ে খুব সচেতন থাকে। মানুষ তার গর্ববোধ প্রকাশের জন্য খুব ব্যয়বহুল ও বিলাশহুল দ্রব্যসমূহ ক্রয় করে থাকে।
খ) অনুকরণ (Imitation): মানুষ প্রায় ক্ষেত্রেই অন্যকে অনুকরণ করতে পছন্দ করে। বিশেষ করে নায়ক-নায়িকা, প্রসিদ্ধ খোয়ায়াড়, রাজনীতিবিদ অথবা সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন বিষয় নকল করে থাকে। নায়িকাদের অনুকরণে মেয়েরা গয়নাসামগ্রী কিংবা প্রসাধনীসামগ্রী ক্রয় করে থাকে।
গ) যৌনতা ও রোমান্স (Sex and romance): ছেলে ও মেয়ে উভয়ে একে অপরকে আকৃষ্ট করতে চায়। সে কারণে বিজ্ঞাপনে যৌনতা ও রোমান্স সংশ্লিষ্ট আবেদন ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে পোশাক ও প্রসাধনীসামগ্রীর জন্য এই ধরণের আবেদনময় বিজ্ঞাপন খুবই কার্যকর।
ঘ) আরাম (Comfort): সকল মানুষ আরাম-আয়েশে জীবন কাটাতে চায়। মানুষ জীবনে দুঃখ কষ্ট পরিহার করতে চায়। আরাম আয়েশের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতা বিভিন্ন আরামদায়ক পণ্য ক্রয় করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় সোফা, ফোমের তৈরি গদি, রেফ্রিজারেটর, ওয়াশিং মেশিন ইত্যাদি।
ঙ) ভালবাসা ও স্নেহ (Love and affection): ভালবাসা ও স্নেহ সকল মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। ভালবাসা ও স্নেহের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ক্রেতা কিছু বিশেষ পণ্য ক্রয় করে থাকে। ছেলে মেয়ে বা নিকট আত্মীয় স্বজনদের জন্মদিনে বিভিন্ন ধরণের উপহারসামগ্রী ক্রয় করা হয়। ভালোবাসা দিবসে ভালোবাসার মানুষের জন্য নানা ধরণের পণ্যসামগ্রী ক্রয় করা হয়।
চ) অভ্যাস (Habits): প্রতিটি মানুষই অভ্যাসের দাস। অভ্যাস করা সহজ কিন্তু অভ্যাস ভাঙ্গা কঠিন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মানুষের অভ্যাস গড়ে ওঠে। যেমন- সিগারেট, ব্র্যান্ডের পোশাক, চুল কাটা, খাবার দাবার ইত্যাদি। অভ্যাসের বশবর্তী হয়ে মানুষ বিভিন্ন শ্রেণির পণ্য ও সেবা ক্রয় করে থাকে।
ছ) স্বাতন্ত্র (Distinctiveness): কিছু কিছু ক্রেতা পণ্যের সাদৃশ্য রক্ষার সাথে সাথে তার স্বাতন্ত্র রক্ষারও প্রয়াস চালায়। মানুষ বিভিন্ন ভাবে নিজেকে অন্যের সাথে আলাদা ভাবে দেখতে পছন্দ করে। নানা ধরণের পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে মানুষ তার স্বাতন্ত্রবোধ প্রকাশের চেষ্টা করে। অনেকে সকল ক্ষেত্রেই বিদেশি পণ্য ব্যবহার করে নিজের স্বাতন্ত্রতা প্রকাশ করে। এই বোধ থেকে ক্রেতা দেশি পারফিউমের পরিবর্তে বিদেশি পারফিউম ক্রয় করে।
জ) উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও স্বীকৃতি (Ambition and approval): উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও পরিশ্রম মানুষকে সফলতা এনে দেয়। আবার সকল মানুষের আত্মসম্মান বোধ থাকে এবং প্রত্যেক ব্যক্তিই অপরাপর ব্যক্তির নিকট থেকে সম্মান, শ্রদ্ধা, ভালবাসা আশা করে। ক্রেতা হিসেবে একজন ব্যক্তিও পণ্য ক্রয়ের মাধ্যমে তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং স্বীকৃতি আশা করে। এই কারণে ক্রেতা বিশেষ বই-পুস্তক, সাময়িকী, সৌখিন পোশাক পরিচ্ছদ ও বিলাসসামগ্রী ক্রয় করে ।
ii) যুক্তিসঙ্গত পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য (Rational product buying motives) :
কিছু পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ করে থাকে। এ যুক্তিসঙ্গত ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্যের তুলনামূলক গুণ, মান, মূল্য, সুবিধা, পণ্য পরীক্ষা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা করে থাকে। যুক্তিসঙ্গত পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নিম্নে আলোচনা করা হলো:
ক) স্থায়িত্ব (Durability): বর্তমানে ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের সময় পণ্যের স্থায়িত্বের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে। দীর্ঘস্থায়ী পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের সবসময় ইতিবাচক মনোভাব থাকে। পণ্যের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্বের কথা বিবেচনা করে ক্রেতা গাড়ি, টেলিভিশন, মোবাইল সেট, আসবাবপত্র ইত্যাদি পণ্যসামগ্রী ক্রয় করে থাকে।
খ) উপযুক্ততা (Suitability): উপযুক্ত বলতে বুঝায় যা ক্রেতার চাহিদার সাথে মানানসই। একটি ছোট খাবার ঘরে যেমন ২০ আসন বিশিষ্ট খাবার টেবিল মানানসই নয় তেমন একটি বড় খাবার ঘরে ছোট টেবিলও মানানসই নয়। তাই উপযুক্ততা বিষয়টি পরিবেশ অনুযায়ী বিভিন্ন ক্রেতার নিকট বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। পণ্য ক্রয়ে ক্রেতা এই বিষয়টি বিশেষ যত্নসহকারে বিবেচনা করে।
গ) একাধিক ব্যবহার (Multiple use ) : পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেতা পণ্যের একাধিক ব্যবহারের বিষয়টি সবসময় চিন্তার মধ্যে রাখে। পণ্য ক্রয়ে ক্রেতা একাধিক সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় করে থাকে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য গাড়ি ক্রয় করলে প্রতিষ্ঠান এই গাড়ি থেকে একাধিক সুবিধা পেয়ে থাকে। একাধিক ব্যবহারের কারণে স্লিপিং সোফা এখন বেশ জনপ্রিয় আসবাবপত্র।
ঘ) মিতব্যয় (Economy): যদিও কিছু মানুষ পণ্যের মূল্য, খরচ ইত্যাদি সম্পর্কে উদাসীন থাকে তথাপি সাধারণভাবেই সকল শ্রেণির ক্রেতাই কম খরচে উৎকৃষ্ট পণ্য লাভে আগ্রহী হয়। এই কারণে ক্রেতা বিভিন্ন দোকান ঘুরে ঘুরে তুলনামূলক পণ্য সুবিধা ও মূল্য যাচাই করে পণ্য ক্রয় করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের সময় মিতব্যয়ীতার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে ।
ঙ) নিশ্চয়তা (Guarantee): আধুনিক বিপণনে পণ্য নিশ্চয়তা প্রদান বিক্রয়কর্মীর অন্যতম প্রধান প্রমোশন কৌশল। পণ্যের নিশ্চয়তা ক্রেতার মনে আস্থার সৃষ্টি করে। কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে পণ্য নিশ্চয়তা না থাকলে ক্রেতা পণ্যটি ক্রয় করতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। বিশেষকরে ইলেকট্রনিক পণ্য সমাগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাসাধারণ যথাযথ পণ্য নিশ্চয়তা চেয়ে থাকে।
চ) নির্ভরযোগ্যতা (Dependability): ক্রেতাদের চাহিদা পুরণের জন্য পণ্য বা সেবার নির্ভরযোগ্যতা থাকতে হবে। ক্রেতারা নির্ভরযোগ্য উৎপাদনকারী এবং নির্ভরযোগ্য বিক্রয়কর্মীর নিকট থেকে পণ্য ক্রয় করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
নির্ভরযোগ্যতা ক্রেতার অনুভূত ঝুঁকিসমূহ (perceived risks) দূর করতে সাহায্য করে। বর্তমানে ক্রেতারা হোটেল বা রেস্টুরেন্টের খাবারে চাইতে বাড়িতে তৈরি খাবার বেশি পছন্দ করে।
ছ) নিরাপত্তা (Safety): যুক্তিসঙ্গত ক্রয়ের একটা বড় উপাদান হলো নিরাপত্তা। জীবনের ঝুঁকি জড়িত পণ্য ক্রয় থেকে ক্রেতারা সবসময় দূরে থাকতে চায়। বিশেষ কিছু পণ্য ও সেবা যেমন- ঔষধ, গ্যাসের চুলা, জীবন বীমার পলিসি, ব্যাংক লকার ইত্যাদি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা নিরাপত্তার বিষয়টিকে গভীরভাবে পর্যালোচনা করে। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে ক্রেতাগণ স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পণ্যসমূহ ক্রয় করতে আগ্রহী হয় ।
জ) সুবিধা (Converience ) : যে সকল পণ্য বাড়তি সুবিধা প্রদান করে ক্রেতারা সেগুলো ক্রয়ের ক্ষেত্রে বেশি আগ্রহী হয়। বর্তমানে ক্রেতারা অ্যান্ড্রয়েড ফোন ক্রয়ে বেশি আগ্রহী কারণ এই ফোন ক্রেতাদের বাড়তি অনেক ধরণের সুবিধা প্রদান করে। কর্মক্ষেত্রে অথবা পেশার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সাধারণ ক্রেতা কিছু পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী হয়। একটা প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য গাড়ি ক্রয় করতে পারে ।
২) পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্য (Patronage buying motives)
পৃষ্ঠপোষকতামূলক ক্রয় সিদ্ধান্তে বিশেষ পণ্য কিংবা পণ্যের বৈশিষ্ট্য নয় বরং সুপরিচিত নির্দিষ্ট দোকান কিংবা বিক্রয়কর্মীর প্রতি ক্রেতার দুর্বলতা প্রকাশ পায়। প্রাত্যহিক জীবনে আমাদের নৈমিত্তিক পণ্যসমূহ ক্রয়ের জন্য স্থায়ী নির্দিষ্ট দোকানে গমন করাই পৃষ্ঠপোষকতামূলক ক্রয় উদ্দেশ্যের উদাহরণ। এখানে কিছু উপাদান রয়েছে যা পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্যকে প্রভাবিত করে।
i) আবেগপ্রবণ পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্য (Emotional patronage buying motives): আবেগপ্রবণ পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্য নির্ভর করে ক্রেতাদের মানসিকতার উপর। সাধারণত একজন ক্রেতা নির্দিষ্ট কোন দোকান বা ডিলারের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করে থাকে। ফলে একসময় ক্রেতা ঐ দোকান বা ডিলার প্রতি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে। যদিও আবেগপ্রবণ হওয়ার হয়তো আরো অনেক কারণ থাকতে পারে। তথাপি এই ধরণের ক্রয়ের ক্ষেত্রে তারা যুক্তিপ্রবণতার বিষয়টি অনেকটাই এড়িয়ে যায়। নিম্নে আবেগপ্রবণ পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্যের প্রধান বিষয়সমূহ ব্যাখ্যা করা হলো ।
ক) দোকান বিন্যাস ও চেহারা (Store layout and appearance): দোকানের বৈশিষ্ট্য দেখে অনেক ক্রেতা সেখানে থেকে পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী হয়। গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড গরমে সবাই চাইবে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত দোকান থেকে পণ্য ক্রয় করার জন্য। একটা সাজানো গোছানো সুন্দর দোকান যেকোন ক্রেতাকে আকৃষ্ট করবে। এটি আসলে প্রথম দর্শনেই ক্রেতা দোকানের প্রতি ভালবাসায় আবদ্ধ হয়ে যায়।
খ) সুপারিশ (Recommendations): অনেক সময় বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজন অথবা অফিস সহকর্মীদের সুপারিশ অনুযায়ী ক্রেতা কোন পণ্য ক্রয় করতে পারে। যারা সুপারিশ করেছে তারা হয়তো এই পণ্য বা দোকান থেকে বাড়তি কিছু সুযোগ সুবিধা পেয়েছে। সেই কারণে ক্রেতা মনে করে এবং বিশ্বাস করে সেও পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে একই ধরণের সুযোগ সুবিধা পাবে। যদি ক্রেতা সঠিক সুযোগ সুবিধা পায় তবে সে আবার অন্য ক্রেতাদের সুপারিশ করবে।
গ) নকলপ্রবণতা (Imitation) : পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের নকলপ্রবণতা একটা প্রচলিত সাধারণ বিষয়। পণ্য ক্রয় করার পূর্বে একজন ক্রেতা প্রাথমিকভাবে চিন্তা করে কোন শ্রেণির মানুষ এই পণ্যটা ব্যবহার করছে। পণ্য পছন্দের ক্ষেত্রে নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষ মধ্যবিত্তদের অনুকরণ করে। আবার মধ্যবিত্তরা উচ্চবিত্তদের অনুকরণ করে। বিশেষ করে প্রসাধনী পণ্য ও ফ্যাশন পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের নকলপ্রবণতা বেশি দেখা যায়।
ঘ) প্রতিপত্তি (Prestige): কিছু মানুষের অঢেল সম্পদ থাকে এবং তাদের ক্রয় ক্ষমতা থাকে অনেক বেশি। এরা অনেক মূল্যবান পণ্য ক্রয় করে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে চায়। অনেক সময় তারা তাদের প্রতিপত্তি প্রমান করার জন্য কিছু অপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করে থাকে। এই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্য এই শ্রেণির ক্রেতারা বাজারের সবচেয়ে নতুন মডেল ও অতি উচ্চ মূল্যের পণ্য সামগ্রী ক্রয় করে থাকে ।
ii) যুক্তিসঙ্গত পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্য (Rational patronage buying motives) বহু সংখ্যক ক্রেতা নির্দিষ্ট দোকান থেকে তাদের পণ্য ক্রয় করতে পছন্দ করে। ক্রয়ের পূর্বে এই শ্রেণির ক্রেতারা তাদের যুক্তি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে দোকানের পৃষ্ঠপোষকতা যাচাই করে। কোন পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে এই ক্রেতারা তাদের অনুগত্যতা প্রকাশের পূর্বেই পণ্য ও দোকানের সুবিধাসমূহ যাচাই করে। যুক্তিসঙ্গত পৃষ্ঠপোষকতা ক্রয় উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত উপাদানসমূহ অন্তর্ভূক্ত থাকে:
ক) ঋণ সুবিধা (Credit facilities): কিছু দোকান বা ডিলারগণ উদার বিক্রয়নীতি গ্রহণ করে থাকে। বিশেষ করে তারা ক্রেতাদের বিভিন্ন ধরণের ঋণ সুবিধা প্রদান করে। এই সকল সুবিধাসমূহ ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আকৃষ্ট করে, মাঝে মাঝে এরা কিছু মূল্যবান পণ্য ও স্থায়ী পণ্যসমূহ কিস্তিতে বিক্রয়ের প্রস্তাব দিয়ে থাকে। এই সকল সুবিধাসমূহ গ্রহণ করে ক্রেতারা নির্দিষ্ট দোকানের স্থায়ী ও নিয়মিত ক্রেতায় পরিণত হয় ।
খ) অবস্থান (Location): পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টি নির্ভর করে দোকানের অবস্থানের উপর। যদি প্রধান সড়কের পাশে দোকান হয় তবে ক্রেতারা সহজেই এর অবস্থান খুঁজে পায় এবং ক্রেতা নিজ পরিবহনে বসেই পণ্যটি ক্রয় করতে পারে। তাছাড়া দোকান যদি চলাচলের সহজ অবস্থানে হয়ে থাকে তবে ক্রেতার সময় ও পরিশ্রম দুটোই কম হয়। অনেক ক্রেতার রাস্তার ভিতরে দোকানগুলো এড়িয়ে চলে। অস্বাস্থ্যকর ও অপরিস্কার বাজার অপেক্ষা সুসংগঠিত ও স্বাস্থ্যকর বাজারে কিছু দাম বেশি দিয়ে হলেও ক্রেতার তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হয়।
গ) যত্নশীল (Caring): ক্রেতারা একটি নির্দিষ্ট ডিলারকে পৃষ্ঠপোষকতা করতে পছন্দ করে কারণ যদি তারা ডিলারের কাছ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা পায়। এখনকার ব্যবসা বাণিজ্য অনেকটাই নির্ভর করে ডিলারদের সৌজন্যতার উপর। যদি বলা হয় ভোক্তাই রাজা তবে তাদের সেইরকম আচরণ করতে হবে। ক্রেতাকে কতটুকু গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে তার উপরই নির্ভর করবে ক্রেতার সন্তুষ্টি। ক্রেতার সাথে আলাপ, আলোচনা, আপ্যায়ন ইত্যাদি যদি ক্রেতা আস্থা অর্জন করে তবে সেই দোকানের বিক্রয় বৃদ্ধি হবে।
ঘ) ব্যাপক পছন্দ (Wide choice): মানুষ সাধারণত তাদের প্রয়োজনীয় সামগ্রী এমন দোকান থেকে কিনতে চায় যেখানে পণ্যের বিভিন্ন ধরন, রং, স্বাদ, মূল্যের বিশাল বৈচিত্র্যের সমাহার ঘটে। ভালো পণ্য ক্রয়ের সাথে সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি জড়িয়ে থাকে। অনেক সমাহার থেকে ক্রেতাদের পণ্য পছন্দ করা সহজ হয় ও ক্রেতাদের তৃপ্তি বৃদ্ধি পাই। ফলে যে দোকানে পণ্যের বিশাল সমাহার থাকে সেকানে ক্রেতা পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায়।
ঙ) বাড়তি সুবিধা (Additional services): যে সকল স্টোরে ক্রেতারা বাড়তি সুযোগ সুবিধা বেশি পাবে সেখানে থেকে ক্রেতারা বেশি পরিমাণ পণ্য ক্রয় করবে। এখন দেখা যায় বিক্রেতারা টেলিফোনে পণ্যের অর্ডার গ্রহণ করছে এবং ক্রেতাদের বাড়িতে পণ্য সরবরাহ করছে। কোন কোন প্রতিষ্ঠান মধ্য রাতেও বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করছে। ফলে দোকানের বাড়তি সুযোগ সুবিধা বেশি হলে ক্রেতা পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধি পায়।
উপসংহারে বলা যায় যে, বিভিন্ন কারণে ক্রেতা পণ্য ক্রয় করে থাকে। ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য অনুধাবন করতে পারা যদিও বেশ কষ্টের ব্যাপার এবং যদিও এটি পরিমাপ করার কোন গাণিতিক পদ্ধতি বাহির হয়নি। তথাপি কিছু কৌশলের মাধ্যমে ক্রেতাদের ক্রয় উদ্দেশ্য অনুমান করা যায়। ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য নির্ণয় করতে পারলে বিক্রয়কর্মী ঠিক সেইভাবে তার কাছে পণ্য উপস্থাপন করবে এবং বিক্রয় কাজে সফলতা লাভ করবে ।
সারসংক্ষেপঃ
মানুষের পণ্য ক্রয়ের পিছনে নানাবিধ কারণ থাকে। মানুষ প্রথমে নিজের মৌলিক চাহিদাসমূহ পূরণের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। সমাজে বসবাস করার জন্য মানুষকে বিভিন্ন ধরণের পণ্য সামগ্রী ক্রয় করতে হয়। কিছু পণ্য রয়েছে যা মানুষকে বাধ্যতামূলকভাবেই ক্রয় করতে হয়। অনেক সময় বিনা প্রয়োজনেও মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকে। মানুষ যে উদ্দেশ্যেই পণ্য ক্রয় করুক তার পিছনে তাদের একটা যুক্তি থাকে। কেউ নিজের ব্যবহারের জন্য পণ্য ক্রয় করে, কেউ পরিবারের জন্য, কেউ উপহারের জন্য আবার কেউ পুনঃউৎপাদনের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। ফলে ক্রেতা যে উদ্দেশ্যেই পণ্য ক্রয় করুক বিক্রয়কর্মীকে অবশ্যই ক্রেতার ক্রয় উদ্দেশ্য জানতে বা বুঝতে হবে।
যদি কেউ নিজের ভোগের জন্য অথবা উপহারের জন্য পণ্য ক্রয় করে তবে দুই ক্ষেত্রে একই বিক্রয় কৌশল গ্রহণ করা যাবে না। ক্রয় উদ্দেশ্যকে প্রধানত দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- প্রাথমিক উদ্দেশ্য (আরাম, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সামাজিক স্বীকৃতি, | দীর্ঘজীবী হওয়া, ভয় ও বিপদ থেকে মুক্তি ইত্যাদি) ও মাধ্যমিক উদ্দেশ্য (তথ্য, পরিচ্ছন্নতা, দক্ষতা, সুবিধা, | মিতব্যয়ীতা, নির্ভরযোগ্যতা ইত্যাদি)। এছাড়া পণ্য ও পৃষ্ঠপোষকতার উপর ভিত্তি করে আরো দুই ধরণের ক্রয় উদ্দেশ্য দেখা যায় যেমন আবেগপ্রবণ ক্রয় উদ্দেশ্য ও যুক্তিসঙ্গত ক্রয় উদ্দেশ্য। ক্রেতা যখন পণ্যের গুণাগুন, বৈশিষ্ট্য, উপাদান ইত্যাদির কারণে প্রভাবিত হয়ে পণ্য ক্রয় করে তখন তাকে পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য বলা হয়।
আবার ক্রেতারা যখন বিভিন্ন ধরণের আবেগে তাড়িত হয়ে পণ্য ক্রয় করে তখন তাকে আবেগপ্রবণ পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য বলে। ক্রেতা যখন পণ্য ক্রয়ের সময় স্বাভাবিক বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করে থাকে তখন তাকে যুক্তিসঙ্গত পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য বলে। আবার ক্রেতা যখন তৃতীয় পক্ষ কারো দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পণ্য ক্রয় করে তখন তাকে পৃষ্ঠপোষক পণ্য ক্রয় উদ্দেশ্য বলে। ক্রেতা যে উদ্দেশ্যেই পণ্য ক্রয় করুক একজন বিক্রয়কর্মীকে ক্রেতার পণ্য ক্রয়ের আসল উদ্দেশ্য খুঁজে বের করতে হবে। ক্রেতার প্রকৃত ক্রয় উদ্দেশ্য বুঝতে পারলে বিক্রেতার পক্ষে যথাযথ বিক্রয় কৌশল প্রয়োগ করা সম্ভব হবে।
