বিপণন চর্চার পরিবর্তন সমূহ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “বিপণন ব্যবস্থাপনা পরিচিতি” ইউনিট ১ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিপণন চর্চার পরিবর্তন সমূহ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
বিপণন চর্চার পরিবর্তনসমূহ
Changes in Marketing Practice
বিপণন মিশ্রণের ফোর পি আধুনিক বিপণন ব্যবস্থায় ব্যক্তি, পণ্য ( Product) বণ্টন (Place) প্রসার (Promotion) বর্তমানে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশ্বায়নের প্রভাব, ক্রেতার সচেতনতা, আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক, আইন, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে বিপণন ব্যবস্থাপনায় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। কিছুদিন আগেও প্রযুক্তির প্রতি ক্রেতা ও ভোক্তাদের মাঝে অনুকূল আচরণ ছিল না।
কিন্তু প্রযুক্তির সহজলভ্যতা ও ব্যবহার- বান্ধব হবার কারণে বিপণনকারীদের মধ্যে বিপণনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে এর ব্যবহার বাড়ছে। চিত্ৰ নং ১.৫ দেখানো হয়েছে বিপণন মিশ্রণের ফোর পি বর্তমানে আধুনিক বিপণন ব্যবস্থাপনায় নতুনরূপে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে বুঝানো হয়েছে যে প্রক্রিয়া, কার্যক্রম ও সম্পাদিত কাজ মূল্য (Price) গুরুত্বপূর্ণ যা হলিষ্টিক বিপণন ব্যবস্থার মূলকথা। বিপণনকারী পণ্য ও সেবা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও জানানোর জন্য, পণ্য উন্নয়ন, প্রস্তুত, প্রসার, সঠিক মূল্য চিত্র ১.৫: বিপণন ব্যবস্থাপনার ক্রমবিকাশ নির্ধারণ, পণ্য সরবরাহ বা গুদামজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার করছে।
যেমন- ইন্টারনেট, ফেসবুক, ও টুইটার ব্যবহার করে বিপণনকারী খুব সহজে এখন ভোক্তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। আবার, বিশ্বায়ন ও অবাধ বাণিজ্যের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলো একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। এতে ব্যবসায় পরিচালনা সহজতর ও পণ্যের সহজলভ্যতা হলেও প্রতিযোগিতা বেড়েছে। উদাহরণস্বরূপ বর্তমানে বাংলাদেশে বিভিন্ন বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের কারণে আর্ন্তজাতিক মানের বহু পণ্য সহজেই ক্রয় করা সম্ভব হচ্ছে। বিপণন ব্যবস্থাপনার কার্যক্রমে বর্তমান সময়ে পরিবেশ ও সমাজের কল্যাণের জন্য গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
যার ফলে বিপণনকারী পরিবেশবান্ধব পণ্য প্রস্তুত, সামাজিক কল্যাণের জন্য বিভিন্ন বিপণন কার্যক্রম গ্রহণ করছে। যেমন- প্লাস্টিক ব্যাগের পরিবর্তে অনেক বিপণনকারি এখন কাগজ বা পাটের মোড়ক ব্যবহার করছে। বিপণনকারী ক্রেতার সন্তুষ্টির জন্য এখন প্রত্যেক ক্রেতাকে পৃথকভাবে গুরুত্ব দিয়ে পণ্য প্রস্তুত করার প্রতি আগ্রহী হচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের ফলে এখন ক্রেতাকেন্দ্রিক পণ্য প্রস্তুত ও সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।

যেমন- বিপণনকারী অনলাইনে নিজস্ব ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ক্রেতাকে এখন নিজের পছন্দমতো রং, কাপড়, উপকরণ বা নকশা নির্ধারণ করে পোশাক বা জুতা তৈরির অর্ডার করার সুযোগ দিচ্ছে। সর্বশেষে, বিপণনকারী এখন দেশি ও বিদেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ড- এর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করে বাজারে টিকে থাকে। বিপণন প্রসারের বহুমুখি কৌশলের কারণে প্রতিযোগিতার তীব্রতাও বাড়ছে। এইসব প্রভাবকসমূহ ব্যবসায়িক পরিবেশে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। যার কারণে বিপণনকারী ক্রমাগত পরিবর্তনশীল ব্যবসায়িক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তার বিপণন কার্যক্রম ও বিপণন ব্যবস্থাপনার কর্মকাণ্ড পরিবর্তন করছে।
বাংলাদেশে বিপণন চৰ্চা
Marketing Practice in Bangladesh
বাংলাদেশে এখনো বিপণন কার্যক্রমের ব্যবহার ব্যাপক না হলেও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোক্তার পছন্দ বা চাহিদার পরিবর্তে বিক্রেতার প্রধান্য বেশি এবং ভোক্তার সন্তুষ্টির পরিবর্তে মুনাফা অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করে থাকে। এর কারণ বিপণন মতবাদ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানের অভাবে এদেশের ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিত উপায়ে এবং যথাযথভাবে বিপণন মতবাদ অনুসরণ করতে পারছে না। ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ এবং পণ্য উন্নয়নের জন্য বাজার গবেষণা প্রয়োজন।
কিন্তু বিপণনকারিরা পণ্যের মানোন্নয়নের জন্য গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা না করে, পণ্যের বিক্রয় বাড়ানোর জন্য কেবল বিজ্ঞাপন নির্ভর হয়ে পড়েন। এদেশে খুব কমসংখ্যক বিপণনকারীরা রয়েছেন যারা বাজার গবেষণা করে বিপণন কার্যক্রম শুরু করেন। বিপণনকারীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্রেতা অনুসন্ধান ও ক্রেতা নির্বাচন করার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন না, যার ফলে বিপণন কার্যক্রমে নানা ধরনের জটিলতা দেখা দেয়।
এ কারণে বাজার গবেষণা, পূর্বানুমান, পণ্য পরিকল্পনা, মূল্য নির্ধারণ, বণ্টন প্রণালি, প্রসার কার্যক্রম ইত্যাদি বিষয়সমূহ গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন ও সমন্বয় সাধন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বাজার গবেষণা করার জন্য একটি বড় অন্তরায় হলো প্রকৃত তথ্য ও তথ্যের উৎসের অভাব। অন্যদিকে, এদেশের বিপণনকারিরা পণ্যের প্রকৃত গুণাগুণ অনেক সময়ই গোপন করে ভুল এবং অতিরঞ্জিত বর্ণনা দিয়ে থাকেন। বিপণনে নৈতিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ।।
সুতরাং, পণ্যের মান, গুণ, উৎপাদনের উপকরণ, পরিমাণ মেয়াদ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ যথাযথ ভাবে ভোক্তাকে জানানো প্রয়োজন যা ভোক্তার সন্তুষ্টি ও আস্থা অর্জনে সহায়তা করে। উন্নত দেশসমূহের ন্যায় এখনও ভোক্তাদের অধিকার ও স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আইনকানুন পুরোপুরি অনুসরণ না করার ফলে ভোক্তারা অনেক সময়ই বিপণনকারীদের দ্বারা প্রতারিত হয়। ভোক্তা স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করলে বাংলাদেশে বিপণন কার্যক্রম আরও শক্তিশালী হবে। বিপণন মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন।
বিপণন কার্যক্রম সফলভাবে প্রয়োগ করার জন্য বাংলাদেশের যোগাযোগ, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, অর্থায়ন ইত্যাদি কাঠামো আরো আধুনিক হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই সনাতন চিন্তাভাবনা ছেড়ে সৃষ্টিশীল মনোভাব নিয়ে আধুনিক বিপণন কার্যক্রমের দিকে এগিয়ে আসছে। বিশেষ করে ইলেক্ট্রনিক্স, পোশাক, প্রসাধনী, ভোগ্য পণ্য ও সেবা পণ্য বিপণন কার্যক্রমে বিপণন মতবাদ সফলতার সাথে ব্যবহৃত হচ্ছে। এদেশে আর্ন্তজাতিক ও বহুজাতিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যারফলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যবসায় পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, পণ্যের বৈচিত্রতা, বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্রেতা সচেতনতা ইত্যাদি কারণে বিপণন মতবাদ ব্যবহারের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে। যেমন- এদেশের বৃহদায়তন বিপণি ও বিক্রয় কেন্দ্রগুলো ভোক্তা সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে বিপণন মতবাদ অনুসরণ করে থাকে। এছাড়াও বর্তমানে পর্যটন ক্ষেত্র, বেসরকারি হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংক ও বিমা কোম্পানিগুলো বিপণন কার্যক্রম সার্থকভাবে সম্পাদন করছে। এসব প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তার সন্তুষ্টির সাথে সাথে সমাজের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে পণ্য প্রস্তুত ও বিপণন করছে।
সর্বশেষে এটা বলা যায় যে, বাংলাদেশে বিপণন মতবাদের ব্যাপক পরিসরে ব্যবহার না হলেও অনেক প্রতিষ্ঠানই সফলভাবে বিপণন কার্যক্রমকে অনুসরণ করছে এবং ক্রমান্বয়ে বিপণন মতবাদের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে।

সারসংক্ষেপ:
বর্তমানে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশ্বায়নের প্রভাব, ক্রেতার সচেতনতা, আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক, আইন, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তন ইত্যাদি কারণে বিপণন ব্যবস্থাপনায় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক প্রভাব পড়ছে। বিপণনকারী পণ্য ও সেবা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও জানানোর জন্য, পণ্য উন্নয়ন, প্রস্তুত, প্রসার, সঠিক মূল্য নির্ধারণ, পণ্য | সরবরাহ বা গুদামজাতকরণসহ বিভিন্ন কাজে প্রযুক্তির ব্যবহার করছে। যেমন- ইন্টারনেট, ফেসবুক, ও টুইটার ব্যবহার করে বিপণনকারী খুব সহজে এখন ভোক্তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।
বাংলাদেশে এখনো বিপণন কার্যক্রমের ব্যবহার ব্যাপক না হলেও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভোক্তার পছন্দ বা চাহিদার পরিবর্তে বিক্রেতার প্রাধান্য বেশি এবং ভোক্তার সন্তুষ্টির পরিবর্তে মুনাফা অর্জনকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করে থাকে। এর কারণ বিপণন মতবাদ সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞানের অভাবে এদেশের ব্যবসায়ীরা পরিকল্পিত উপায়ে এবং যথাযথভাবে বিপণন মতবাদ অনুসরণ করতে পারছে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, পণ্যের বৈচিত্রতা, বিকল্প পণ্যের সহজলভ্যতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, ক্রেতা সচেতনতা ইত্যাদি কারণে বিপণন মতবাদ ব্যবহারের প্রতি ব্যবসায়ীদের আগ্রহ ধীরে ধীরে বাড়ছে ।


১ thought on “বিপণন চর্চার পরিবর্তন সমূহ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত”