নতুন পণ্য ব্যবস্থাপনা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “পণ্য ও সেবা কৌশল” ইউনিট ৯ এর অন্তর্ভুক্ত।
নতুন পণ্য ব্যবস্থাপনা
সাধারণত নতুন পণ্য বলতে আমরা যে পণ্য বাজারে পূর্বে ছিল না বা ক্রেতারা পূর্বে কখনো দেখেনি সেই পণ্যকে বুঝি কিন্তু পণ্য উন্নয়ন বা উদ্ভাবনের বেলায় নতুন পণ্যকে সে দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। বিপণনের ভাষায় নতুন পণ্য বলতে নতুন উদ্ভাবিত পণ্যকে বোঝায়।
নতুন পণ্যের ধরন
Types of New Products
বাজারে প্রচলিত পণ্যের নবায়ন অথবা কোন কোম্পানির পণ্যসারিতে যে পণ্য ছিলনা তা সংযোজনকে বোঝায়। এ অর্থে পণ্যসারির গভীরতা বৃদ্ধিও নতুন পণ্য উন্নয়ন বলে বিবেচিত হয়। নতুন পণ্যকে তিনভাবে সহায়তা করতে পারি প্রথমত- যে পণ্যের পূর্বে কোন অস্তিত্ব ছিলনা, একেবারেই প্রথমবারের মতো বাজারে আবির্ভাব হয়েছে তাকে নতুন পণ্য বলা যেতে পারে।
সাধারণত এ ধরনের পণ্য একেবারেই নতুন হওয়ায় এ পণ্যের কোন বিকল্প পণ্য বাজারে থাকে না। দ্বিতীয়ত- বাজারে প্রচলিত কোন পণ্যের কোন ধরনের পরিবর্তন বা পরিমার্জনকে আমরা নতুন পণ্য বলতে পারি। তৃতীয়ত- একটি প্রতিষ্ঠান যদি তার জন্য সারিতে নতুন কোন পণ্য সংযোজন করে তাকেও নতুন পণ্য বলা যাবে। বাজারে থাকা সত্ত্বেও ঐ কোম্পানির জন্য পণ্যটি নতুন ।

নতুন পণ্য উন্নয়ন সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া
New Product Development Decision Process
ক্রেতার পছন্দ, রুচি ও চাহিদা প্রতিনিয়তই পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে ক্রেতার চাহিদা ও বাজারে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান সব সময় নতুন পণ্য বাজারে উপস্থাপন করতে হয়। নতুন পণ্য ঠিক মতো উদ্ভাবন করে বিপণন করতে পারলে কোম্পানি যেমন লাভবান হয় তেমনি ক্রেতার চাহিদা মতো পণ্য উদ্ভাবন করতে না পারলে ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখিন হতে হয়। নতুন পণ্য উদ্ভাবন প্রক্রিয়াকে আটটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। পর্যায়গুলো নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো-
১. নতুন পণ্য ধারণা সৃষ্টি (New Product Idea Generation): নতুন পণ্য ধারণা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে নতুন পণ্য উন্নয়নের শুরু। বিক্রয়ধর্মী, ক্রেতা, পাইকারী ও খুচনা প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা, সরকারি বা পেশাদারী গবেষণাগার, প্রতিযোগী পণ্য, আবিষ্কারক প্রভৃতি উৎস হতে পণ্য ধারণা পাওয়া যেতে পারে। পণ্য উদ্ভাবনের পূর্বে কোনো না কোনো ভাবে একটি ধারণার সৃষ্টি হতে হয়। ধারণা সৃষ্টি না করে পণ্য উদ্ভাবন করা অসম্ভব।
২. ধারণা বাছাই করা (Idea Screening) : বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া সব ধারণাই একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। এই স্তরে বিভিন্ন ধারণার মধ্যে থেকে একটি কোম্পানির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ ধারণাটিকে বেছে নিতে হয়। এর জন্য উক্ত প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি বাজারে পণ্যের চাহিদা, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সামর্থ, প্রযুক্তিগত সুবিধা ইত্যাদি। বিবেচনা করে সবচেয়ে গ্রহণ যোগ্য ধারণাটিকে নির্বাচন করে অন্য ধারণাগুলো বাদ দিতে হবে।
ধারণা উন্নয়ন এবং যাচাইকরণ (Concept Development and Testing): এই স্তরে নির্বাচিত ধারণাকে পণ্য ধারণায় উন্নয়ন করতে হবে। ধরা যাক একটি কোম্পানি কলম উৎপাদন করতে চায় সে ক্ষেত্রে উক্ত কোম্পানীকে এই স্তরে ঐ কলমের একটি ডিজাইন তৈরী করতে হবে এবং গবেষণাগারে ঐ পণ্য কিভাবে ক্রেতার কাছে আরও আকর্ষণীয় করা যায় তার জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।
৪. বিপণন কৌশল নির্ধারণ (Marketing Strategy Development): নতুন পণ্যের বিপণন কৌশল নির্ধারণের সময় তিনটি স্তর বিশিষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা হয়। প্রথম অংশটিতে লক্ষ্য নির্দিষ্ট বাজার, পরিকল্পিত পণ্য অবস্থান, বিক্রয়, বাজার অংশ এবং প্রথম কয়েক বছরের মুনাফা লক্ষ্যের বর্ণনা থাকে। বিপণন কৌশল বিবৃতির দ্বিতীয় অংশে পণ্যটির পরিকল্পিত মূল্য, বণ্টন এবং প্রথম বছরের জন্যে বিপণন বাজেট দেখানো হয় এবং তৃতীয় অংশে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি বিক্রয়, মুনাফা লক্ষ্য এবং বিপণন মিশ্রণ কৌশলের বর্ণনা থাকে।
৫. ব্যবসায় বিশ্লেষণ (Business Analysis): এখানে যৌক্তিক ভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা হয় যে এই নতুন পণ্যটি আদৌও লাভজনক হবে কিনা। এখানে মনে রাখা জরুরি যে ব্যবসায় বিশ্লেষণ করার সময় কোন প্রকার আবেগের বশবর্তী না হয়ে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে কোম্পানীর সামর্থ। পণ্যের বৈশিষ্ট্যাবলি, বাজারের সম্ভাবনা উন্নয়ন। মুনাফা করা যাবে কিনা এ বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে।
৬. পণ্য উন্নয়ন (Product Development): এ পর্যায়ে ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়। অর্থাৎ স্বল্প পরিসরে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য ও ডিজাইনের পণ্য এই পর্যায়ে উৎপাদন করা হয় এবং পরীক্ষামূলক ভাবে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়।
৭. পরীক্ষামূলক বিপণন (Test Marketing): এ স্তরে এসে পণ্যটি ক্রেতারা কিভাবে গ্রহণ করছে বা ক্রেতারা পণ্যের মধ্যে কি কি সুবিধ বা অসুবিধা বোধ করছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ পরীক্ষামূলক বিপণন হলো পণ্যটি ক্রেতার কাছে কতটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে তা খুজে দেওয়ার একটি বাস্তব কৌশল ।
৮. বাণিজ্যিকীকরণ (Commercialization) : এটা হচ্ছে নতুন পণ্য উন্নয়নের সর্বশেষ ধাপ। পরীক্ষামূলকভাবে একটি পণ্য বাজারে ছাড়ার পর বাজার যদি সে পণ্যকে গ্রহণ করে নেয় তাহলে তাকে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হয়। এখানে যে বিষয়গুলো বিবেচনা করা হয় তা হলো- কখন পণ্যটি ছাড়তে হবে । কোথায় ছাড়তে হবে, কাদের উদ্দেশ্য ছাড়তে হবে এবং কীভাবে ছাড়তে হবে।

নতুন পণ্য গ্রহণের ব্যাপারে ব্যক্তিগত পার্থক্য
Individual Differences in Innovativeness
নতুন কোনো পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সকল ক্রেতা সমানভাবে প্রস্তুত থাকে না বা সাড়া দেয় না। নতুন পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে এক এক ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। কিছু ক্রেতা খুব সহজেই পণ্যটি গ্রহণ করে আবার কিছু ক্রেতা অনেক সময় অতিবাহিত হবার পর পণ্য গ্রহণ করে। নতুন পণ্য গ্রহণকারীদের ভিন্নতার দিক বিবেচনা করে E.M. Rogers গবেষণা করে ক্রেতাদের বিভিন্ন দলে নির্দিষ্ট করেছেন; তা নিম্নে চিত্র ৯.৭ এ দেখানো হলো-
ক) প্রবর্তনকারী (Innovators) : যারা পণ্যটি সম্পর্কে প্রথমে অবগত হয় এবং পণ্যটি ব্যবহার করার জন্য এগিয়ে আসে। নতুন পণ্য বাজারে আসার সাথে সাথে সবাই এটাকে গ্রহণ করে না। যারা গ্রহণ করে তাদেরকে প্রবর্তনকারী বলা হয়। সমাজের প্রায় ২.৫% ভাগ জনগণ এ শ্রেণির অন্তর্ভূক্ত। স্বভাবতই এদের সংখ্যা খুব কম। এ শ্রেণির মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ এবং নতুন কিছু গ্রহণ করতে খুবই আগ্রহী হয়ে থাকে। এ শ্রেণীর ক্রেতারা অল্পবয়সী, শিক্ষিত এবং সমাজের উচ্চ শ্রেণির হয়ে থাকে। যেমন- বাজারের নতুন মডেলের মোবাইল আসার সাথে সাথে তারা তাদের পুরাতন মডেল বিক্রি করে নতুন পণ্যটি ক্রয় করে ।
খ) দ্রুত গ্রহণকারী (Early Adopters): প্রবর্তনকারীর পরেই এদের অবস্থান। পণ্যটা কিছুটা পরিচিত পাবার পর তারা পণ্যটি গ্রহণ করে। এদের সংখ্যা সমাজে প্রায় ১৩.৫% ভাগ। এরা নিজের মূল্যবোধ এবং বিচার বিবেচনায় পণ্যটি ক্রয় করে। এরা সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে চিহ্নিত এবং সমাজে ব্যাপকভাবে নতুন পণ্য প্রচলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিপণনকারী এ শ্রেণির ক্রেতাদের দিয়ে বিপণন কৌশল বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচন করে থাকে। কারণ এ শ্রেণীর ক্রেতারা পরামর্শ নেতা (Opinion leader) হিসেবে ব্যক্তিগত প্রভাবে অন্যরা পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হয়।

গ) দ্রুত অধিজন (Early Majority): দ্রুত অধিজনরা ধীরে ধীরে এবং বেশি সতর্কতার সাথে পণ্য ক্রয় করে থাকে। এরা দ্রুত গ্রহণকারীর প্রভাবে প্রভাবিত হয়। এদের ওপর বিজ্ঞাপনের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজে যখন কিছু লোক নতুন পণ্যটি ব্যবহার আরম্ভ করে তখন এরা পণ্য সম্পর্কে বিভিন্ন প্রকার তথ্য সংগ্রহ করে এবং পণ্যটি ক্রয়ে আগ্রহী হয়ে থাকে। এরা সাধারণত উচ্চ শিক্ষিত এবং চাকুরীজীবি শ্রেণির হয়ে তাকে। সমাজে এদের সংখ্যা প্রায় ৩৪% ভাগ। সমাজে ব্যাপক সাড়া পাবার পূর্বেই এরা পণ্যটি গ্রহণ করে।
ঘ) বিলম্বে অধিজন (Late Majority): পণ্যটি যখন ব্যাপক আকারে গৃহীত হয় যে ক্রেতারা পণ্যটি ক্রয় করে থাকে তাদের বিলম্বের অধিজন বলে। সমাজে এদের সংখ্যা ৩৪% ভাগ। এরা পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো সময় ঝুঁকি নিতে চায় না। এরা অতিমাত্রায় সন্দেহ প্রবন হয়ে তাকে। এরা অনেক পরীক্ষা এবং যাচায়ের পরই পণ্যটি গ্রহণ করে। এ ধরনের ক্রেতারা যখন দেখে সবাই পণ্যটি ব্যবহার করছে তখন পণ্যটি ব্যবহার করা যেতে পারে। এ শ্রেণির ক্রেতারা অনুসরণকারীর পর্যায়ে পড়ে।
ঙ) প্রান্তিক (Laggards) : এ শ্রেণির ক্রেতারা নতুন পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সবার শেষে অবস্থান করে। এরা সনাতনী অথবা চিরাচরিত প্রথা দ্বারা পরিচালিত। এরা কোনো অবস্থায় নতুন পণ্যকে গ্রহণ করতে চায় না বরং অভ্যস্ততা অনুযায়ি এরা পণ্য ব্যবহার করতে চায়। এদের বলা হয় প্রতিষ্ঠানের অন্ধ ভক্ত কারণ এরা নতুন পণ্যের ভাল মন্দ কিছুই বিবেচনা করে না । সমাজে এদের পরিমান ১৬% ভাগ। পণ্য যখন সবার কাছে স্বীকৃত ও পুরাতন হয়ে যায় তখনই এ শ্রেণির ক্রেতা গ্রহণ করে ।
নতুন পণ্যের গ্রহণ প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করতে হয। বাজারে কোনো শ্রেণির ক্রেতা কত এবং তাদের অবস্থান কোথায় তা চিহ্নিত করে বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।
সারসংক্ষেপঃ
বাজারে প্রচলিত পণ্যের নবায়ন অথবা কোন কোম্পানির পণ্যসারিতে যে পণ্য ছিলনা তা সংযোজনকে বোঝায়। এ অর্থে | পণ্যসারির গভীরতা বৃদ্ধিও নতুন পণ্য উন্নয়ন বলে বিবেচিত হয়। নতুন পণ্য উদ্ভাবন প্রক্রিয়াকে আটটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়; যথা- নতুন পণ্য ধারণা সৃষ্টি, ধারণা বাছাই করা, ধারণা উন্নয়ন এবং অভীক্ষণ, বিপণন কৌশল নির্ধারণ, | ব্যবসায় বিশ্লেষণ, পণ্য উন্নয়ন, পরীক্ষামূলক বিপণন ও বাণিজ্যিকীকরণ। নতুন কোনো পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সকল ক্রেতা সমানভাবে প্রস্তুত থাকে না বা সাড়া দেয় না। নতুন পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে এক এক ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। E.M. Rogers নতুন পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের বিভিন্ন দলে নির্দিষ্ট করেছেন তারা হলো- প্রবর্তনকারী, গ্রহণকারী, দ্রুত অধিজন, বিলম্বে অধিজন ও প্রান্তিক।

১ thought on “নতুন পণ্য ব্যবস্থাপনা”