পণ্য জীবন চক্র ও বিপণন কৌশলসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “পণ্য ও সেবা কৌশল” ইউনিট ৯ এর অন্তর্ভুক্ত।

পণ্য জীবন চক্র ও বিপণন কৌশলসমূহ
পণ্য জীবন চক্র কী?
What is Product Life Cycle?
একটি নতুন পণ্য বাজারে ছাড়ার পরে প্রতিষ্ঠান স্বভাবতই আশা করে যে, পণ্যটির বিক্রয়ের পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে এবং বহুদিন যাবত এটি বাজারে টিকে থাকবে। কোন পণ্যই চিরকাল একইভাবে বাজার দখল করে রাখতে পারে না- বিভিন্ন কারণে পণ্যের জীবনে উত্থানপতন ঘটে থাকে। বিপণনকারী এ ব্যাপারে সজাগ থাকেন যে, প্রত্যেক পণ্যেরই একটি জীবন-চক্র রয়েছে।একটি পণ্যের জীবদ্দশায় তাকে যেসব পর্যায় বা ধাপ অতিক্রম করতে হয় সেই পর্যায়গুলোকে পণ্যের জীবন-চক্র বলে। অর্থাৎ একটি পণ্যকে উৎপাদনের পর থেকে আরম্ভ করে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত যেসব পর্যায়ের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে যেতে হয় তাকে বলা হয় পণ্যের জীবন-চক্র। এখানে পণ্যের জীবনচক্রের কয়েকটি সংজ্ঞা দেওয়া হলো :
পণ্য জীবন চক্রের স্তরসমূহ ( Stages of Product Life Cycle):
নিম্নে একটি পণ্যের জীবনচক্র চিত্র ৯.৫ এ দেখানো হলো ও বিস্তারিত আলোচনা নিম্নরূপ-
১. পণ্য প্রবর্তন (Introduction):
প্রথম পর্যায়ে নতুনপণ্য বাজারে ছাড়া হয় এবং একে সম্ভাব্য গ্রাহকদের নিকট পরিচিত করানোর জন্য প্রচারমূলক কার্য চালানো হয়। এ পর্যায়ে বিক্রয়ের পরিমাণ তেমন বেশি হয় না এবং প্রায় ক্ষেত্রে মুনাফাও অর্জিত হয় অতি সামান্য। আবার অনেক ক্ষেত্রে মুনাফা একেবারেই হয় না। পণ্য প্রবর্তনজনিত বহুল খরচ এবং গ্রাহকের সংখ্যার অপ্রতুলতা মুনাফা না হওয়ার প্রধান কারণ। ভবিষ্যতে মুনাফার আশায় এ পর্যায়ে পণ্যের পেছনে প্রচুর বিনিয়োগ করা হয়।
প্রবৃদ্ধি (Growth):
পণ্যের জীবনচক্রের দ্বিতীয় পর্যায়ে পণ্যের বিক্রয় বাড়ে, ক্রেতাদের মধ্যে পণ্যের কদর বৃদ্ধি পায়; ফলে মুনাফার পরিমাণও বাড়তে থাকে। ৯.৫ নং চিত্রের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে বিক্রয়ের পরিমাণ দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেই গতিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। পণ্যের চলমান জীবনের এ পর্যায়ে প্রতিযোগীরা উন্নতমানের কিংবা কম ব্যয়ের পণ্য নিয়ে বাজারে প্রবেশ করতে থাকে। কোম্পানির জন্য সর্বোচ্চ মুনাফার এটাই সময়, তবে প্রতিযোগীতা বৃদ্ধির কারণে এটা মুনাফার অধোগতি শুরুরও সময়।

৩. পূর্ণতাপ্রাপ্তি (Maturity):
এ পর্যায়ে প্রতিযোগীতা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। ফলে বিক্রয়ের পরিমাণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেই আবার নিম্নমুখী হতে থাকে এবং তার সাথে মুনাফা রেখাও নিম্নগামী হয়। এ পর্যায়ে প্রতিযোগীর সংখ্যা শুধু বাড়তেই থাকে না, অনেক প্রতিযোগী বাজার দখল করার উদ্দেশ্যে মূল্য হ্রাসের প্রতিযোগীতায়ও নেমে পড়ে । ৪. অধোগতি (Decline): পণ্যের জীবন-চক্রের এটি শেষ ধাপ। বিক্রয়ের পরিমাণ আরও হ্রাস পেতে থাকে। ফলে শেষ পর্যন্ত মুনাফা অর্জন করা আর সম্ভব হয়ে ওঠে না। যদি পণ্যটিকে টিকিয়ে রাখার জন্য বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে পণ্যটির সমাপ্তি ঘটে।
পণ্য জীবন চক্রের বিভিন্ন স্তরে বিপণন কৌশলসমূহ ( Marketing Strategies in Different Stages of Product Life Cycle):
১. প্রবর্তন পর্যায়ে বিপণন কৌশল (Marketing Strategy in Introduction Stage):
যখন কোনো নতুন পণ্য সর্বপ্রথম বাজারে বিক্রয়ের জন্য ছাড়া হয় তখনই শুরু হয় প্রবর্তন। এ পর্যায়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ প্রত্যেকটি বিপণন চলককে (যেমন- পণ্যমূল্য, পণ্যের প্রসার, বণ্টন ও পণ্যগুণ ইত্যাদি) উচ্চ অথবা নিম্ন স্তরে নির্ধারণ করতে পারে। শুধু মূল্য ও বিক্রয় প্রসারকে বিবেচনা করে, বিপণনকারী নিম্নে আলোচিত চারটি কৌশলের যে কোনোটি ব্যবহার করতে পারে-

দ্রুত স্কিমিং কৌশল (Rapid Skimming Strategy):
এ ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যে পণ্য বাজারে ছাড়া হয় এবং পণ্যটিকে জনসাধারণের গোচরে আনয়ন করে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভের জন্য বহুল প্রচারের ব্যবস্থা করা । বিপণন প্রসারের পেছনে প্রচুর টাকা ব্যয় করে বাজারে পণ্যের সুনাম সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালানো হয়। সব ক্ষেত্রে এ কৌশল সুফল দেয় না ।
মন্থর/ধীর স্কিমিং কৌশল (Slow Skimming Strategy):
এ ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যে পণ্য বাজারে ছাড়া হয়; কিন্তু প্রচার কার্য ধীরে ধীরে চালানো হয়। বিপণন খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে প্রচারকার্যের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয় না। যথাসম্ভব বেশি মুনাফা লাভের উদ্দেশ্যে এ কৌশল গ্রহণ করা হয়।
দ্রুত প্রবেশ কৌশল (Rapid Penetration Strategy):
এই বিপণন কৌশলে পণ্যের মূল্য থাকে কম কিন্তু প্রচারের জন্য ব্যয় করা হয় প্রচুর টাকা। এ কৌশলটি এ প্রত্যাশায় অনুসরণ করা হয় যে, প্রচুর প্রচার ও স্বল্প মূল্যের দরুন বাজারের বৃহত্তর অংশ দখল করা সম্ভব হবে এবং অধিক বিক্রির ফলেতে মোট মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যাবে ।
মন্থর/ধীর প্রবেশ কৌশল (Slow Penetration Strategy):
এ ক্ষেত্রে পণ্যের মূল্য কম ধার্য করা হয় এবং বিক্রয় প্রসারের জন্যও খরচ করা হয় কম। এর উদ্দেশ্য কম মূল্য দ্বারা গ্রাহকদেরকে প্রভাবিত করে বেশি পরিমাণে বিক্রি করা এবং প্রচারকার্যে কম খরচ করে মুনাফার পরিমাণ স্ফীত করা ।

২. প্রবৃদ্ধি পর্যায়ে বিপণন কৌশল (Marketing Strategy in Growth Stage):
প্রবৃদ্ধি পর্যায়ে পণ্যের বিক্রয় দ্রুতহারে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ সময় থেকে প্রতিযোগীরাও বাজারে প্রবেশ করতে থাকে। তবুও বৃহদাকার উৎপাদনের ফলে ইউনিট প্রতি ব্যয় হ্রাস পায়। ফলে মুনাফার পরিমাণ বেড়ে যায়। এ পর্যায়ে বাজারের প্রবৃদ্ধি যথাসম্ভব কাম্য স্তরে রাখার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, যেমন-
- প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মান উন্নত করে এবং পণ্যের বৈশিষ্ট্য বৈচিত্র্য আনয়নের প্রয়াস পায়।
- প্রতিষ্ঠান নতুন নতুন বিভাজিত বাজারে প্রবেশ করে।
- নতুন নতুন বণ্টন প্রণালি ব্যবহারের জন্য প্রতিষ্ঠান প্রচেষ্টা চালায়।
- বিজ্ঞাপনের প্রকৃতি ও মাধ্যম পরিবর্তন করে । সঠিক সময়ে কোম্পানি পণ্যের মূল্য হ্রাস করে যাতে মূল্যের ব্যাপারে স্পর্শকাতর গ্রাহকদেরকে পণ্য ক্রয়ে অনুপ্রাণিত করা যায়।
এসব বাজার-সম্প্রসারণশীল কৌশল ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠান তার প্রতিযোগীতামূলক অবস্থানকে সুদৃঢ় করে তুলতে পারে। তবে এসব উন্নয়নের জন্য অতিরিক্ত খরচের প্রয়োজন হয়। কোম্পানি পরবর্তী পর্যায়ে মুনাফা বৃদ্ধির প্রত্যাশায় এ পর্যায়ে চলতি মুনাফার প্রতি কম গুরুত্ব প্রদান করে। তাই পণ্য-উন্নয়ন, প্রচার ও বণ্টনে প্রচুর অর্থ খরচ করে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করার প্রচেষ্টা চালায়।
৩. পূর্ণতাপ্রাপ্তির পর্যায়ে বিপণন কৌশল (Marketing Strategy in Matured Stage):
এ পর্যায়ে অনেক প্রতিষ্ঠান বেশি পুরনো পণ্য অর্থাৎ পূর্ণতাপ্রাপ্ত পণ্য ছেড়ে দিয়ে নতুন আরেকটি পণ্যের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। তারা মনে করে যে, পুরনো পণ্যের ব্যাপারে বেশি চেষ্টা না করে বরং নতুন পণ্য বাজারে ছাড়লে ভাল ফল পাওয়া যাবে। তবে এরূপও দেখা গেছে যে, পূর্ণতাপ্রাপ্ত পণ্যও বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে আবার বাজার দখল করতে সক্ষম হয়েছে। এ পর্যায়ে বিপণনকারী তিন প্রকার কৌশল অবলম্বন করতে পারে-
বাজার পরিমার্জন (Market Modification) :
প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব ব্র্যান্ডের পণ্য ব্যবহারকারীদের (সংক্ষেপে ব্র্যান্ড ব্যবহারকারী বলা যায়) সংখ্যায় বাড়িয়ে এবং ব্যবহারকারীদের দ্বারা বার্ষিক ব্যবহারের পরিমাণ বাড়িয়ে বাজারের পরিধি সম্প্রসারিত করতে পারে। প্রচার ও প্ররোচনার মাধ্যমে অব্যবহারকারীকে ব্যবহারকারীতে পরিণত করে নতুন বাজার বিভাগে প্রবেশ করে এবং প্রতিযোগীদের গ্রাহকের মন জয়ের মাধ্যমে তাদেরকে নিজের ক্রেতায় পরিণত করে ব্র্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা সম্ভব।
পণ্য পরিমার্জন (Product Modification):
বিপণনকারী অনেক সময় পূর্ণতাপ্রাপ্তির পর্যায়ে পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য এমনভাবে পণ্যের বৈশিষ্ট্যসমূহ পরিমার্জন বা পরিবর্তন করে যাতে নতুন ক্রেতা আকৃষ্ট হয় এবং বর্তমান ব্যবহারকারীদের পণ্যের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। প্রধানত তিনটি উপায়ে পণ্যের পরিমার্জন করা হয়, যথা- ক) গুণাগুণ উন্নয়ন, খ) বৈশিষ্ট্য উন্নয়ন, গ) স্টাইলের উন্নয়ন।
বিপণন-মিশ্রণ পরিমার্জন (Marketing Mix Modification):
বিপণন-মিশ্রণের বিভিন্ন উপাদানগুলোর মধ্যে দুই একটির পরিবর্তন সাধন করেও বিক্রয় বৃদ্ধির চেষ্টা করা যায়।
৪. অধোগতি পর্যায়ে বিপণন কৌশল (Marketing Strategy in Decline Stage) :
অধিকাংশ পণ্যের বিক্রির পরিমাণে ক্রমান্বয়ে অধোগতি দেখা দেয়। কোনো কোন পণ্যের বিক্রয়-হ্রাসের গতি মন্থর, আবার কোনটার দ্রুত। বিক্রয় শূন্যতেও নেমে আসতে পারে কিংবা একটা নির্দিষ্ট নিম্নস্তরে কয়েক বছর যাবৎ স্থির থাকতে পারে। অধোগতির পর্যায়ে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা যেতে পারে –
দুর্বল পণ্য চিহ্নিতকরণ (Identifying Weak Product):
বিপণনকারী প্রথম কর্তব্য হলো দুর্বল পণ্যগুলো চিহ্নিত করা। এতদূদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠান একটি রিভিউ কমিটি গঠন করতে পারে। কমিটি বিভিন্ন প্রাঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে দুর্বল পণ্যগুলো খুঁজে বের করবে এবং তাদের সুপারিশ প্রদান করবে।
বিপণন কৌশল নির্ধারণ (Determining Marketing Strategies):
এ পর্যায়ে বিপণনকারী বিপণন কৌশল সম্পর্কিত কীভাবে সমস্যা কাটিয়ে উঠা যায় সে কৌশল নির্ধারণ করবে।
পণ্য পরিত্যাগ সিদ্ধান্ত ( The Drop Decision):
বাজারের সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে যদি প্রতিষ্ঠান মনে করে যে, পণ্যটি বাজার থেকে তুলে নেয়াই ভাল হবে তাহলে তারা সেভাবেই অগ্রসর হবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পণ্যটি অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রয় করে দিতে পারে। সারসংক্ষেপঃ
সারসংক্ষেপঃ
একটি পণ্যকে উৎপাদনের পর থেকে আরম্ভ করে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত যেসব পর্যায়ের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে | অগ্রসর হয়ে যেতে হয় তাকে বলা হয় পণ্যের জীবন-চক্র। একটি পণ্যের জীবনচক্রে ৪টি ধাপ থাকে যথা- পণ্য প্রবর্তন, | প্রবৃদ্ধি, পূর্ণতাপ্রাপ্তি ও অধোগতি। প্রবর্তন পর্যায়ে পরিস্থিতি অনুযায়ী ১. দ্রুত স্কিমিং কৌশল, ২.মন্থর স্কিমিং কৌশল, ৩. দ্রুত প্রবেশ কৌশল, ৪. মন্থর প্রবেশ কৌশল অবলম্বন করা হয়। আবার, প্রবৃদ্ধি পর্যায়েও ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়। পূর্ণতাপ্রাপ্তির পর্যায়কালীন সময়ে ১. বাজার পরিমার্জন, ২. পণ্য পরিমার্জন, ৩. বিপণন-মিশ্রণ পরিমার্জন কৌশল নেওয়া হয়। সর্বশেষে, অধোগতি পর্যায়ের সময়ে দূর্বল পণ্য চিহ্নিতকরণের পর ফোকাস স্ট্র্যাটেজি, পণ্য বৈচিত্রকরণ কৌশল ইত্যাদি গ্রহণ করা যেতে পারে।

১ thought on “পণ্য জীবন চক্র ও বিপণন কৌশলসমূহ”