পাইকারি ব্যবসায় ও পাইকারি ব্যবসায়ের বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “বিপণন বা বণ্টন প্রণালি, খুচরা ব্যবসায়, পাইকারী ব্যবসায়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।
পাইকারি ব্যবসায় ও পাইকারি ব্যবসায়ের বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ
পাইকারি ব্যবসায় ও পাইকার
Wholeselling and Wholeseller
খুচরা ব্যবসায়ীদের মতো পাইকার বিপণন প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থ ব্যবসায়ী। খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্যদ্রব্য চূড়ান্ত ভোক্তাদের নিকট বিক্রয় করে, অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায় বলতে পণ্যদ্রব্য ও সেবা পুনঃ বিক্রয় বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রয় করাকে বোঝায়। যে ব্যক্তি পাইকারি ব্যবসায়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করে তাকে পাইকার বা Wholesaler বলে। পাইকার উৎপাদনকারী বা বিপণনকারী থেকে পণ্যদ্রব্য ক্রয় করে খুচরা ব্যবসায়ী বা শিল্পে ব্যবহারকারীদের নিকট বিক্রয় করে।
পাইকার সাধারণত উৎপাদনকারী থেকে অধিক পরিমাণে পণ্য ক্রয় করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগ করে খুচরা ব্যবসায়ী বা অন্যদের নিকট বিক্রয় করে। পাইকারি ব্যবসায়ের কার্যাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি, বিক্রয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও পর্যায়িতকরণ, মোড়কীকরণ, অর্থসংস্থান, ঝুঁকি গ্রহণ, তথ্য সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা সেবা ও পরামর্শ দান ইত্যাদি।

পাইকারি ব্যবসায়ের শ্রেণিবিভাগ
Types of Wholeseller
উৎপাদনকারীর উৎপাদিত পণ্য পাইকারি ব্যবসায়ীরা খুচরা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে চূড়ান্ত ভোক্তাদের নিকট উপস্থাপন করে থাকে। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পাইকারি ব্যবসায়কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে তা আলোচনা করা হলো-
১. মার্চেন্ট পাইকারি ব্যবসায়ী (Merchant Wholesalers ) : যে সকল স্বাধীন পাইকারি ব্যবসায়ী পণ্যের মালিকানা গ্রহণ করে এবং পণ্যের যাবতীয় ঝুঁকি গ্রহণ করার সাথে সাথে ওই পণ্যের খুচরা ব্যবসায়ী বা শিল্পীয় ব্যবহারকারীর নিকট বিক্রয় করে তাকে মার্চেন্ট পাইকারি ব্যবসায়ী বলে। মার্চেন্ট পাইকারি ব্যবসায়কে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
ক. পূর্ণ সেবাদানকারী পাইকারি ব্যবসায়ী (Full – service Wholesalers): যে সকল পাইকারি ব্যবসায়ীরা পাইকারি ব্যবসায়ের প্রায় সকল প্রকার সেবা প্রদান করে তাকে পূর্ণ সেবাদানকারী পাইকারি ব্যবসায়ী বলে। যেমন: পণ্য মজুদকরণ, বাকিতে বিক্রয়, পণ্য সরবরাহ করা।
খ. সীমিত সেবাদানকারী পাইকারি ব্যবসায়ী (Limited-service Wholesalers) : যে সকল পাইকারি ব্যবসায়ীরা পণ্যের মালিকানা লাভ করলেও পাইকারি ব্যবসায়ের অন্যান্য কার্যাবলি যেমন পণ্য সরবরাহ, ঋণ প্রদান, মজুদ পণ্য নিয়ন্ত্রণ, বাজার তথ্য সরবরাহ ইত্যাদি কার্য সম্পাদন করে না তাদেরকে সীমিত সেবাদানকারী পাইকারি ব্যবসায়ী বলে।
২. দালাল এবং প্রতিনিধি (Brokers and agents): যে মধ্যস্থ ব্যবসায়ী পণ্যের মালিকানা গ্রহণ না করে পণ্য ক্রয়- বিক্রয়ের কাজে সাহায্য করে এবং বিক্রয়ের ওপর নির্দিষ্টি হারে কমিশন লাভ করে তাদেরকে দালাল ও প্রতিনিধি বলে।
ক. দালাল (Brokers): যে মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ক্রেতা-বিক্রেতাকে একত্র করে একটি সমঝোতা চুক্তির ভিত্তিতে ক্রয়- বিক্রয়ে সহায়তা করে তাদেরকে দালাল বলে। দালালরা সাধারণত পণ্য মজুদ বা সংরক্ষণ করে না, পণ্যের মালিকানা লাভ করে না, অর্থসংস্থান করে না, ঝুঁকি গ্রহণ করে না ইত্যাদি।
খ. প্রতিনিধি (Agents): যে সকল পাইকারি ব্যবসায়ী পণ্যের মালিকানা গ্রহণ করে না কিন্তু প্রদত্ত সেবার জন্য কমিশন আদায় করে দালালের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি সেবা প্রদান করে তাদেরকে প্রতিনিধি বলে । প্রতিনিধিকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১. উৎপাদনকারীর প্রতিনিধি, ২. বিক্রয় প্রতিনিধি, ৩. ক্রয় প্রতিনিধি এবং ৪. কমিশন মার্চেন্ট ।
৩. উৎপাদনকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীর শাখা এবং অফিসসমূহ (Manufacturers and retailers branches): অনেক সময় স্বাধীন পাইকারি ব্যবসায়ীর পরিবর্তে পাইকারি ব্যবসায়ের কার্যাবলি সম্পাদন করার জন্য উৎপাদনকারী ও খুচরা ব্যবসায়ী শাখা অফিসের মাধ্যমে উৎপাদনকারী তার পণ্য বিক্রয় করে এবং খুচরা ব্যবসায়ী। পাইকারি হরে পণ্য ক্রয় করে থাকে।

পাইকারি ব্যবসায়ের বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ
Wholesalers Marketing Decisions
পাইকাররা দিন দিন অধিক প্রতিযোগিতা, অধিক চাহিদাসম্পন্ন ক্রেতা, নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং অনেক বেশি প্রত্যক্ষ বিক্রয় ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কারণে পূর্ব থেকে দক্ষ এবং উত্তম কৌশল গ্রহণ করতে বাধ্য হচ্ছে। বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার পূর্বে ব্যবসায়ীকে পরিবেশ সম্পর্কিত বৃত্তান্ত এবং ভোক্তার চাহিদা পর্যবেক্ষণ এবং সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ পাইকারের জন্য অধিক বিবেচ্য বিষয়। পাইকারি ব্যবসায়ের বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহগুলো হলো, বাজার বিভক্তিকরণ এবং লক্ষ্যায়ণ, পৃথকীকরণ এবং অবস্থান সৃষ্টি এবং বিপণন মিশ্রণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ।
১. বাজার বিভক্তিকরণ ও লক্ষ্যায়ণ (Market segmentation and targeting): খুচরা ব্যবসায়ীদের মতো পাইকারি ব্যবসায়ীকে সমগ্র বাজারের (বর্তমান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাসমষ্টিকে) আকর্ষণীয় অংশগুলোকে টার্গেট বা লক্ষ্যস্থির করতে হবে। যেসব বাজারে পাইকারের পক্ষে ব্যবসায় কাযক্রম পরিচালনা করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন সম্ভব শুধু সেসব বাজারকেই লক্ষ্যস্থির করতে হবে।
২. পৃথকীকরণ এবং অবস্থান সৃষ্টি (Market differentiation and positioning): পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে নির্দিষ্ট বাজারের ক্রেতাদের চাহিদা, প্রয়োজন এবং পাইকারের সক্ষমতা অনুযায়ী পৃথকীকরণ এবং অবস্থান সৃষ্টির ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথকীকরণ এবং অবস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের ভাবমূর্তি এবং সেবা প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে প্রতিযোগীদের তুলনায় পৃথক ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে।
৩. বিপণন মিশ্রণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ (Marketing mix related decisions): খুচরা ব্যবসায়ীর ন্যায় পাইকারি ব্যবসায়ীকে ও বিপণন মিশ্রণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ পণ্য ও সেবা সম্ভার, পণ্য মূল্য, প্রসার ও স্থান সম্পর্কিত সিদ্ধান্তসমূহ সাবধনাতার সাথে অবলম্বন করতে হয় ।
ক. পণ্য ও সেবা সম্ভার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ (Product and service mix related decisions): পাইকারি ব্যবসায়ী সাধারণত অধিক পরিমাণে পণ্য ক্রয় করে। এক্ষেত্রে একাধিক পণ্য সরাসরি বা একই পণ্যের সম্পূর্ণ সারি ক্রয় করার ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে। জরুরি সরবরাহের প্রয়োজনে একাধিক পণ্য সারি বা সম্পূর্ণ পণ্য সারির মজুদের সাথে সাথে গুদামজাতকরণ, পরিবহন এবং ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এছাড়া প্রয়োজনীয় পণ্য সংক্রান্ত সেবা প্রদানের নিশ্চয়তার জন্য বৃহৎ লোকবল নিয়োজিত করতে হয়। তাই পণ্য ও সেবা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে ক্রেতা চাহিদা, অবস্থান, ব্যয়, মুনাফা এবং ঝুঁকি হ্রাসের পদ্ধতিসমূহ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন ।
খ. মূল্য সিদ্ধান্ত (Price related decisions): পাইকাররা মূলত পণ্যের ব্যয়ের ওপর একটি নির্দিষ্ট হারে মুনাফার ভিত্তিতে মূল্য নির্ধারণ করে। এবং খুবই সীমিত মুনাফায় পণ্য বিক্রয় করে। মূল্য নিধারণের পূর্বে পণ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন ব্যয়, সময়ের পরিবর্তনের সাথে ব্যয়ের ওপর প্রভাব এবং ক্রেতা চাহিদাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করতে হবে।
গ. প্রসার সিদ্ধান্ত (Promotion related decisions): পাইকারি ব্যবসায়ের প্রসার মুনাফা অর্জনে খুবই সহায়ক। যদিও পাইকাররা প্রসার কার্যক্রমে আগ্রহী হয় না এবং অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদনকারীর প্রসারের ওপরই নির্ভর করে। কিছু কিছু পাইকার পরিকল্পনাবিহীন এবং অবিন্যস্তভাবে বিক্রয় প্রসার, ব্যবসায়িক বিজ্ঞাপন, গণসংযোগ এবং বিক্রয়কর্মী ব্যবহার করে। বর্তমান যুগের ক্রেতাগণের থেকে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে পাইকারদের অধিক সমন্বিত ও পরিকল্পিত প্রসার কার্যাবলি গ্রহণ করা একান্ত আবশ্যক।
ঘ. বণ্টন/অবস্থান নির্বাচন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ (Place related decisions): পাইকারি ব্যবসায়ের পণ্যের অবস্থান নির্বাচনের সাথেই অধিকাংশ ব্যয় সম্পর্কিত থাকে। বৃহৎ পরিমাণে পণ্য ক্রয়ের ফলে এবং পণ্যের ধরন অনুযায়ী গুদমজাতকরণ ব্যবস্থা, পরিবহন ব্যবস্থা ও ক্রেতা চাহিদা মোতাবেক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন পড়ে। পাইকারি ব্যবসায়ের অবস্থান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো স্থান নির্বাচন, পরিবহন ব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ব্যয় সংকোচন, পণ্য সহায়ক সেবাসমূহ এবং দ্রুততার সাথে সরবরাহের জন্য সঠিকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করতে হবে।

সারসংক্ষেপ
খুচরা ব্যবসায়ীদের মতো পাইকার বিপণন প্রণালির গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থ ব্যবসায়ী। খুচরা ব্যবসায়ীরা পণ্যদ্রব্য চূড়ান্ত ভোক্তাদের নিকট বিক্রয় করে, অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায় বলতে পণ্যদ্রব্য ও সেবা পুনঃ বিক্রয় বা ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রয় করাকে বোঝায়। যে ব্যক্তি পাইকারি ব্যবসায়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করে তাকে পাইকার বা Wholesaler বলে। পাইকারি ব্যবসায়ের কার্যাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি, বিক্রয়, পরিবহন, | সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ ও পর্যায়িতকরণ, মোড়কীকরণ, অর্থসংস্থান, ঝুঁকি গ্রহণ, তথ্য সরবরাহ, ব্যবস্থাপনা সেবা ও পরামর্শ দান ইত্যাদি।
বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পাইকারি ব্যবসায়কে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা: ১.মার্চেন্ট পাইকারি ব্যবসায়ী, ২.দালাল এবং প্রতিনিধি এবং ৩.উৎপাদনকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীর শাখা এবং অফিসসমূহ। পাইকারি | ব্যবসায়ের বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ হলো-বাজার বিভক্তিকরণ এবং লক্ষ্যায়ণ পৃথকীকরণ এবং অবস্থান সৃষ্টি এবং বিপণন মিশ্রণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ।

