বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপঃ প্রচলিত পদ্ধতি সমূহ এবং সীমাবদ্ধতা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “বিজ্ঞাপন গবেষণা” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপঃ প্রচলিত পদ্ধতি সমূহ এবং সীমাবদ্ধতা
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের পদ্ধতিগুলোকে মূলত প্রি-টেস্ট এবং পোস্ট-টেস্ট- এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রি- টেস্ট পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোক্তাজুরি পরীক্ষা, থিয়েটার বা নাট্যশালা পরীক্ষা, রীডাবিলিটি বা পঠনযোগ্যতা পরীক্ষা, পোর্টফোলিও পরীক্ষা, খসড়া পরীক্ষা, শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষা, ধারণা পরীক্ষা, বোধগম্যতা এবং প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা ইত্যাদি এবং পোস্ট-টেস্ট পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে স্মরণ পরীক্ষা, স্বীকৃতি পরীক্ষা, একক উৎস পদ্ধতি পরীক্ষা, অনুসন্ধান পরীক্ষা, ট্র্যাকিং পরীক্ষা এবং বিক্রয় পরীক্ষা ইত্যাদি। প্রতিটি পদ্ধতির সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনা করে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের উপযুক্ত পদ্ধতি ব্যবহারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরীক্ষার পূর্বশর্ত হলো পরিমাপের ক্ষেত্রে PACT (Positioning Advertising Copy Testing)-এর প্রতিষ্ঠিত নয়টি নীতি পরিপূর্ণ ভাবে মেনে চলা। তবে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ প্রতিটি কোম্পানির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হলেও খরচ, গবেষণা সমস্যা, কি পরীক্ষা করতে হবে তা নিয়ে মতানৈক্য, সৃজনশীল বিভাগের আপত্তি এবং সময়ের অভাবের কারণে বিপণনকারী বা বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপকরা অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করতে চান না ।
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের পদ্ধতিসমূহ ( Methods of Testing/ Measuring Advertising Effectiveness):
বিজ্ঞাপন বাবদ কোম্পানির ব্যয়িত অর্থ কাঙ্ক্ষিত ফল এনে দিতে পেরেছে কিনা, তা জানার জন্য বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়। বিজ্ঞাপন প্রচারের পূর্বে এবং বিজ্ঞাপন প্রকাশের পরে দুই সময়েই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা যেতে পারে। বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি প্রচলিত আছে। প্রখ্যাত বিজ্ঞাপন বিশারদ Belch and Belch বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের এই পদ্ধতিগুলোকে প্রিটেস্ট এবং পোস্টটেস্ট এই দুই ভাগে ভাগ করেছেন। প্রিটেস্ট বা বিজ্ঞাপন প্রচারের পূর্বের কার্যকারিতা পরিমাপ আবার পরীক্ষাগার এবং মাঠ পরীক্ষা উভয়ভাবেই সম্পাদন করা যেতে পারে।
আর পোস্টটেস্ট বা বিজ্ঞাপন প্রকাশোত্তর কার্যকারিতা পরিমাপ প্রধানত মাঠ পরীক্ষার মাধ্যমেই সম্পাদিত হয়। নিম্নে Belch and Belch প্রদত্ত বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের পদ্ধতি সমূহকে চিত্রের মাধ্যমে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:

বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য যেসব পদ্ধতি প্রচলিত আছে, তারমধ্যে বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি সমূহ নিম্নে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
১. ভোক্তাজুরি পরীক্ষা (Consumer jury Test):
ভোক্তাজুরি পদ্ধতিতে সম্ভাব্য গ্রাহকদের মধ্যে থেকে ৬ থেকে ১০ জন গ্রাহককে নিয়ে একটি জুরি বোর্ড গঠন করা হয়। জুরির সদস্যরা প্রকাশিতব্য বিজ্ঞাপনের শিরোনাম, স্লোগান, প্রতিলিপি, চিত্রণ, বিন্যাস ইত্যাদি সম্পর্কে নিজেদের মতামত প্রদান করেন। এভাবে জুরি বোর্ডের সদস্যদের পছন্দ-অপছন্দ বা মতামতের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়।
ভোক্তাজুরি পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো:
- এই পদ্ধতিতে খুব অল্প সময়ে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা যায়।
- বিজ্ঞাপন প্রচারের আগেই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয় বলে খরচও অল্প হয় ।
- খসড়া অবস্থাতেই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা যায়।
- প্রায় সব ধরণের মাধ্যমের জন্যই এই পদ্ধতি উপযোগী।
- অল্প সংখ্যক নমুনা নিয়েই ভোক্তাজুরি পরীক্ষা সম্পাদন করা যায়।
ভোক্তাজুরি পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো:
- যাদের নিয়ে বোর্ড গঠন করা হবে, তারা সকল ভোক্তার প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারেন।
- মতামত প্রদানের ক্ষেত্রে জুরিরা নিরপেক্ষ মতামত প্রদান নাও করতে পারেন ।
- জুরিদের পক্ষপাতিত্বের কারণে বা বিজ্ঞাপনদাতাদের খুশি করার জন্য জুরিরা বাস্তবতার বাইরে গিয়ে বিজ্ঞাপনের পক্ষে রায় দিয়ে দিতে পারেন।
- ভোক্তা একজন স্ব-ব্যাখ্যায়িত বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে পারেন।
- মূল্যায়নের জন্য সীমিত সংখ্যক বিজ্ঞাপন বিবেচনা করা হয়।
২. রেটিং স্কেল পরীক্ষা (Rating Scale Test):
রেটিং স্কেল পরীক্ষায় বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের বিভিন্ন উপাদান যেমন- বিজ্ঞাপনের আকর্ষণ ক্ষমতা, বিজ্ঞাপন আবেদন, শিরোনাম, চিত্রণ, বিন্যাস ইত্যাদিকে আলাদা নম্বর বা রেট দেওয়া হয়। এরপর বিকল্প বিজ্ঞাপন গুলোর উপাদানগুলোকেও অনুরূপভাবে নম্বর বা রেট দেওয়া হয় এবং বিজ্ঞাপনগুলোর রেটিং এর মধ্যে তুলনা করা হয়। এভাবে সর্বোচ্চ নম্বর বা রেটিং প্রাপ্ত বিজ্ঞাপনটিকে সর্বোৎকৃষ্ট বিজ্ঞাপন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
রেটিং স্কেল পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো:
- এই পদ্ধতিতে সহজেই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা যায় ।
- স্বল্প খরচে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা যায়।
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপে খুব অল্প সময় লাগে।
- বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতাকে গাণিতিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়।
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন গুণাবলীকে বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে পদ্ধতিটি বেশ বাস্তবসম্মত।
রেটিং স্কেল পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো:
- বিবেচ্য উপাদানগুলোর রেটিং ক্রম যথার্থ ভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
- বিবেচ্য উপাদানগুলো সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয় না ।
- এই পদ্ধতিতে যে উপাদানগুলো বিবেচনা করা হয়, এর বাইরেও অনেক উপাদান থেকে যেতে পারে বলে প্রাপ্ত ফলাফল শতভাগ অন্তর্ভুক্তিমূলক হয় না।
৩. পোর্টফোলিও পরীক্ষা (Portfolio Test):
পোর্টফোলিও পরীক্ষা হলো বিজ্ঞাপন প্রি-টেস্টিং এর একটি পরীক্ষাগার পদ্ধতি যাতে উত্তরদাতাদের একটি গ্রুপকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষা বিজ্ঞাপন সম্বলিত একটি পোর্টফোলিওর মুখোমুখি করানো হয়। এরপর উত্তরদাতারা বিজ্ঞাপন থেকে কি তথ্য মনে করতে পারেন তা জিজ্ঞাসা করা হয়। উত্তরদাতারা যে বিজ্ঞাপন সবচেয়ে বেশি স্মরণ করতে পারেন, সেই বিজ্ঞাপনগুলোকে সবচেয়ে কার্যকর হিসেবে ধরে নেওয়া হয় ।
পোর্টফোলিও পরীক্ষা পদ্ধতির সুবিধাসমূহ হলো :
- এই পদ্ধতি সহজে পরিচালনা করা যায় ।
- দ্রুত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয়।
- নিয়ন্ত্রক বিজ্ঞাপনের উপস্থিতির কারণে এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা যথার্থভাবে পরিমাপ করা সম্ভব হয় ।
- বিকল্প বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে সরাসরি তুলনা করা যায়।
পোর্টফোলিও পরীক্ষা পদ্ধতির অসুবিধাসমূহ হলো:
- এই পদ্ধতি বেশ ব্যয়বহুল।
- যেসব গ্রাহকের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তারা সকল ভোক্তার প্রতিনিধিত্ব নাও করতে পারেন।
- ফলে ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা থাকে না ।
- বিজ্ঞাপনের সৃজনশীলতা ব্যতীত বিভিন্ন উপাদান ভোক্তাদের স্মরণশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।
- ফলে সঠিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না ।
- স্মরণযোগ্যতা নির্ভর পদ্ধতি হওয়ায় তা স্বীকৃতি পদ্ধতির মতো ভালো ফল এনে দিতে পারেনা।

৪. অনুসন্ধান পরীক্ষা (Inquiry Test):
অনুসন্ধান পরীক্ষায় একটি বিজ্ঞাপনকে খণ্ড খণ্ড করে বা পরিবর্তন করে কয়েকদিন ধরে সংবাদপত্রে প্রচার করা হয় এবং সাথে ভোক্তাদের জন্য ফিরতি কুপন দেওয়া হয়। ভোক্তারা পূরণকৃত কুপন সরাসরি, ফোনের মাধ্যমে বা মেইলের মাধ্যমে ফেরত পাঠাতে পারেন। যেদিন বেশি কুপন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়, সেদিনের বিজ্ঞাপনকে বেশি কার্যকর হিসেবে ধরে নেওয়া হয়।
অনুসন্ধান পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো:
- এই পরীক্ষা পদ্ধতি সহজে পরিচালনা করা যায়।
- পাঠক বা গ্রাহকদের প্রকৃত প্রতিক্রিয়া জানা যায়।
- গ্রাহকগণ তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ মতামত প্রদানের পরিবেশ পান।
- বিজ্ঞাপন কার্যকারিতার বস্তুনিষ্ঠ প্রতিফলন পাওয়া যায়।
অনুসন্ধান পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো:
- পাঠক বা গ্রাহকরা পরীক্ষাধীন বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট নাও হতে পারেন ।
- এই পদ্ধতি বেশ সময়সাপেক্ষ।
- বিজ্ঞাপনের সৃজনশীল উপাদানগুলোর তুলনা করা যায় না।
- বিজ্ঞাপন একাধিকবার বা একাধিক মাধ্যমে প্রচারের ফলে এই পদ্ধতি বেশ ব্যয়বহুল।
৫. মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা (Psychological Test):
বিজ্ঞাপনটি ভোক্তার মনমানসিকতার উপর কিরকম প্রভাব ফেলতে পারে অর্থাৎ, ভোক্তার মনস্তাত্ত্বিক প্রতিক্রিয়া কিরকম হয় তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়। বিজ্ঞাপন দেখার পর ভোক্তার মনে নিরাপত্তা, নিরুদ্বিগ্নতা, উদ্বিগ্নতা বা ভীতসন্ত্রস্ততা ইত্যাদির মধ্যে কিরকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়, তা মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিমাপ করে বিকল্প বিজ্ঞাপনগুলোর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হয়। মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তি দ্বারা ১০ থেকে ১৫ জন গ্রাহকের কাছে শব্দ সংশ্লেষণ, বাক্য সমাপ্তকরণ, গভীর সাক্ষাৎকার, গল্প বলাসহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বিজ্ঞাপন প্রচারের পূর্বে বা পরে, যেকোন অবস্থায় এই পরীক্ষা পরিচালনা করা যায়।
- এই পদ্ধতিতে ভোক্তার অবচেতন মনের ভাব বা প্রকৃত মনোভাব বের করে আনা যায়।
- বিজ্ঞাপন ভোক্তাদের মনমানসিকতার উপর কিরকম প্রভাব ফেলে, তা সহজেই বুঝতে পারা যায়।
- এই পদ্ধতি ভোক্তাদের বিজ্ঞাপন সম্পর্কে আত্ব-বিশ্লেষণের সুযোগ দেয়।
মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষার অসুবিধাগুলোর হলো:
- এটি একটি জটিল পদ্ধতি ।
- একজন গ্রাহকের মতামতের সাথে আরেকজন গ্রাহকের মতামতের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় বলে এর নির্ভরযোগ্যতা কম।
- বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
৬. শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষা (Physiological Test):
শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষা মূলতঃ বিজ্ঞাপনের প্রি-টেস্ট করার একটি পরীক্ষাগার পদ্ধতি যেখানে বিজ্ঞাপনের প্রতি ভোক্তাদের শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া পরিমাপ করা হয়। এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে ভোক্তাদের অনিচ্ছাকৃত প্রতিক্রিয়া বের হয়ে আসে বলে তাত্ত্বিকভাবে এই পদ্ধতিতে ভোক্তাদের পক্ষপাত মূলক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার সুযোগ থাকেনা।
অনিচ্ছামূলক প্রতিক্রিয়া হলো সেসব প্রতিক্রিয়া যেসবের উপর ব্যক্তির কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না যেমন- হৃদস্পন্দন এবং প্রতিবর্তী ক্রিয়া ইত্যাদি। মূদ্রণ এবং সম্প্রচার বিজ্ঞাপন- উভয়ের কার্যকারিতা পরীক্ষা করার জন্য পিউপিল প্রসারণ, গ্যালভানিক ত্বকের প্রতিক্রিয়া, চোখের ট্র্যাকিং এবং মস্তিষ্কের তরঙ্গ বিশ্লেষণ ইত্যাদি শারীরবৃত্তীয় পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে ।
শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষার সুবিধাগুলো হলো:
- প্রাপ্ত ফলাফলের নির্ভরযোগ্যতা অনেক বেশি থাকে।
- গ্রাহকদের গোপন প্রতিক্রিয়া সহজেই বের করে আনা যায়।
- ‘যন্ত্র ব্যবহার করে সহজেই এই পরীক্ষা পরিচালনা করা যায়।
শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষার অসুবিধাগুলো হলো:
- পরীক্ষা পরিচালনা ব্যয় অনেক বেশি।
- এই পদ্ধতি ব্যবহারে উন্নত প্রযুক্তি ও তার প্রায়োগিক দক্ষতা সম্পন্ন লোকবল দরকার যা সহজে পাওয়া যায় না ।
- প্রাপ্ত ফলাফল ব্যাখ্যা করা জটিল কাজ।
- বিজ্ঞাপন কার্যকারিতা পরিমাপের এই পদ্ধতিটি বেশ সময়সাপেক্ষ ।
৭. স্মরণ পরীক্ষা (Recall Test):
মুদ্রণ বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য সাধারণত এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। স্মরণ পরীক্ষায় একটি সংবাদপত্র বা সাময়িকী দেখিয়ে গ্রাহকদের জিজ্ঞাসা করা হয় তিনি এই সংস্করণটি দেখেছেন কিনা। দেখে থাকলে কতটি বিজ্ঞাপনের কথা গ্রাহকরা স্মরণ করতে পারেন, তা জেনে সেসব ব্র্যান্ডের নামসহ উত্তর দেওয়ার জন্য কার্ড গ্রাহকদের দিয়ে দেওয়া হয়। এরপর গ্রাহকরা সেসব বিজ্ঞাপনের প্রতিলিপি, শিরোনাম, স্লোগান বা বিন্যাসের ব্যাপারে তাদের মনে যা আছে, তা লিখে দেখান। সেসব বিশ্লেষণ করে দেখা হয়, কোন বিজ্ঞাপনটি বা বিজ্ঞাপনের কোন অংশটি গ্রাহকদের মনে অনুকূল প্রভাব ফেলেছে। এভাবেই স্মরণ পরীক্ষার সাহায্যে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা হয়।
স্মরণ পরীক্ষার সুবিধাগুলো হলো:
- গ্রাহকদের স্মৃতির উপরে বিজ্ঞাপনের প্রভাব পরিমাপ করা যায়।
- এই পরীক্ষা পদ্ধতির পরিচালনা ব্যয় কম।
- তাৎক্ষণিকভাবে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের ফলাফল হাতে পাওয়া যায়।
স্মরণ পরীক্ষার অসুবিধাগুলো হলো:
- গ্রাহকরা প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় প্রশ্নকর্তার দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন ।
- সংবাদপত্র বা সাময়িকীর গ্রাহক বিজ্ঞাপিত পণ্যের ক্রেতা না হলে ভুল বা এলোমেলো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।
- গ্রাহক আবেগতাড়িত হয়ে খেয়াল খুশিমতো উত্তর দিতে পারেন।

৮. স্বীকৃতি পরীক্ষা (Recognition Test):
মুদ্রণ বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের সর্বাধিক ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো স্বীকৃতি পরীক্ষা। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন প্রচারের পর বিজ্ঞাপন সম্পর্কে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে বিজ্ঞাপনটি গ্রাহকরা দেখেছেন কিনা তা জানার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনটি গ্রাহকরা চিনতে পারছেন কিনা তা যাচাই করা হয়। গ্রাহকরা বিজ্ঞাপন চিনতে পারলে বিজ্ঞাপনটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম ও কার্যকর হয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয় এবং বিজ্ঞাপনটি চিনতে না পারলে বিজ্ঞাপনটি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় নি এবং কার্যকরও হয় নি বলে ধরে নেওয়া হয়।
স্বীকৃতি পরীক্ষা পদ্ধতির সুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- বিজ্ঞাপনের গ্রাহক আকর্ষণের ক্ষমতা মূল্যায়ন করা যায়।
- এই পদ্ধতি পরিচালনা করা খুবই সহজসাধ্য ।
- প্রতিযোগিদের বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতাও একইসাথে তুলনা করা যায়।
- বিকল্প বিজ্ঞাপন বাস্তবায়নযোগ্যতাও একইসাথে তুলনা করা যায়।
- এই পরীক্ষায় গ্রাহকের প্রদত্ত প্রতিক্রিয়া বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার সাথে ভোক্তাদের সম্পৃক্ততার গভীরতার একটি নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।
স্বীকৃতি পরীক্ষা পদ্ধতির অসুবিধাগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- গ্রাহকরা বিজ্ঞাপন শনাক্ত করার ব্যাপারে মিথ্যা দাবী করতে পারেন।
- প্রশ্নকর্তার উপস্থিতির কারণে গ্রাহকরা পক্ষপাতমূলক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারেন।
- গ্রাহকরা আবেগতাড়িত হয়ে খেয়াল খুশিমতো অবাস্তব উত্তর দিতে পারেন ।
- গ্রাহক বিজ্ঞাপিত পণ্যের ক্রেতা না হলে ভুল বা এলোমেলো প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা যথাযথভাবে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাঁধার সৃষ্টি করতে পারেন ।
৯. মনোভাব বা অভিমত পরীক্ষা (Attitude or Opinion Test) :
এই পরীক্ষা পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনদাতা তার পণ্য, সেবা, ব্র্যান্ড বা কোম্পানি সম্পর্কে বর্তমান ও সম্ভাব্য গ্রাহকদের কাছে তাদের মনোভাব যাচাইয়ের জন্য জরিপ চালিয়ে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করে থাকেন। গ্রাহকরা সাধারণত নিচের স্কেলে পছন্দের ঘরে টিক (√) চিহ্ন দিয়ে তাদের মনোভাব ব্যক্ত করে থাকেন ৷

মনোভাব বা মতামত পরীক্ষা পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো:
- এই পদ্ধতিতে পণ্য, সেবা, ব্র্যান্ড বা কোম্পানির প্রতি ক্রেতাদের মনোভাব জানা যায় ।
- সহজে পরিচালনা করা যায় ।
- বিজ্ঞাপনটি গ্রাহকদের মনে কিরকম প্রভাব ফেলেছে তা নির্ণয় করা যায়।
মনোভাব বা মতামত পরীক্ষা পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো:
- অনেক সময় এই পদ্ধতিতে গ্রাহকের প্রকৃত মতামত জানা যায় না ।
- এই পদ্ধতির পরিচালনা ব্যয় বেশি।
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে সময় বেশি লাগে।
- সাক্ষাৎকারদানকারী পণ্য বা কোম্পানির প্রকৃত ক্রেতা না হলে এই পদ্ধতিতে প্রাপ্ত ফলাফলের কার্যকারিতা অনেকাংশেই কমে যায়।
১০. বিক্রয় পরীক্ষা (Sales Test):
এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন প্রচারের পর বিভিন্ন এলাকায় বিজ্ঞাপিত পণ্যের বিক্রয় পরিমাপ করে দেখা হয়। যেসব এলাকায় বিক্রয়ের পরিমাণ বেশি, সেসব এলাকায় বিজ্ঞাপনটি অধিক কার্যকর বলে ধরে নেওয়া হয় ।
বিক্রয় পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো:
- এটি বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের একটি বাস্তবসম্মত পদ্ধতি ।
- এই পদ্ধতিতে সহজেই বিজ্ঞাপন যাচাই করা যায়।
- এই পদ্ধতিটি বিজ্ঞাপন কার্যকারিতা পরিমাপের একটি পক্ষপাতমুক্ত পদ্ধতি।
- বিক্রয়ের উপর বিজ্ঞাপনের সরাসরি প্রভাব নির্ণয় করা যায়।
বিক্রয় পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো:
- সব বাজারে একসাথে বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয় বলে ব্যয় বেশি হয়।
- বিজ্ঞাপন প্রচারের নির্দিষ্ট সময় পরে বিক্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় বলে এই পদ্ধতিতে সময় বেশি লাগে।
- বিজ্ঞাপন প্রচার ও কার্যকারিতা যাচাইয়ের জন্য বাজার এলাকা নির্দিষ্ট করাটা বেশ কষ্টসাধ্য ।
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের পূর্বশর্ত/মৌলিক বিসয়সমূহ (Essentials of Effective Advertising Testing):
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরীক্ষার পূর্বশর্ত হলো পরিমাপের ক্ষেত্রে PACT এর প্রতিষ্ঠিত নয়টি নীতি পরিপূর্ণভাবে মেনে চলা। এটি নিশ্চিত করার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে প্রচারমূলক পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত ক্রম মডেল অনুসরণ করা। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত নির্দেশনাসমূহের প্রতি খেয়াল রাখা আবশ্যক ।
১. যোগাযোগের উদ্দেশ্য নির্ধারণ (Establish communications objectives) :
আমরা জানি, সরাসরি প্রতিক্রিয়া বিজ্ঞাপন ছাড়া অধিকাংশ বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেই বিক্রয়ের উপর বিজ্ঞাপনের সরাসরি প্রভাব নির্ণয় প্রায় অসম্ভব। সেকারণেই প্রচারমূলক কর্মসূচীর প্রতিষ্ঠিত বিপণন উদ্দেশ্যগুলো সাধারণত যোগাযোগ কার্যকারিতা বা বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা নির্ধারণের ভালো মানদণ্ড হয় না। যেমন- ব্র্যান্ড-শেয়ার বা বিক্রয়ের উপর বিজ্ঞাপনের প্রভাব নির্ধারণ করা খুবই কঠিন কিংবা খুবই ব্যয়বহুল। তাই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য যোগাযোগের (বিজ্ঞাপনের) উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে তার উপরেই বেশি গুরুত্ব দিতে হবে কেননা যোগাযোগের উদ্দেশ্য কতটুকু অর্জিত হয়েছে তা পরিমাপ করা যেতে পারে এবং চূড়ান্ত ভাবে এর মাধ্যমেই বিপণনের উদ্দেশ্যগুলোর অর্জন পরিমাপ করা যায়।
২. ভোক্তা প্রতিক্রিয়া মডেলের ব্যবহার (Use a consumer response model):
যেহেতু প্রভাবক্রম মডেল বা কগনিটিভ প্রতিক্রিয়া মডেলের ন্যয় মডেলগুলো যোগাযোগের প্রভাবকে বুঝতে এবং যোগাযোগের উদ্দেশ্য অর্জনে সাহায্য করে সেহেতু বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ভোক্তা প্রতিক্রিয়া মডেল ব্যবহার করা উচিৎ।
৩. প্রি-টেস্ট এবং পোস্ট-টেস্ট উভয়ের ব্যবহার (Use both pretests and posttests):
খরচের দৃষ্টিকোণ থেকে প্রি-টেস্টিং পদ্ধতিসমূহের ব্যবহার খুবই যৌক্তিক। এসব পদ্ধতি স্বল্প খরচেই বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান বা পণ্যের সাফল্য বা ব্যর্থতার তুলনা করতে পারে। তবে কার্যকর মূল্যায়নের জন্য প্রি-টেস্টকে পোস্ট-টেস্ট এর সাথে একত্রে ব্যবহার করা উচিৎ। উভয় পদ্ধতির যুগপৎ ব্যবহার প্রি-টেস্টের সীমাবদ্ধতাগুলোকে এড়াতে, অনেক বড় নমুনার ব্যবহার করতে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে কার্যকারিতার পরিমাপ করতে সহায়তা করে। তাই বিজ্ঞাপনের প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য প্রি-টেস্টিং এর পাশাপাশি পোস্ট-টেস্টিং পদ্ধতিসমূহের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
৪. একাধিক মাপকাঠি ব্যবহার (Use multiple measures ) :
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করার অনেক কার্যক্রমই বিভিন্ন মাপকাঠি যেমন- বিক্রয়, স্মরণশক্তি বা স্বীকৃতি ইত্যাদি ব্যবহার করে। যেহেতু ভোক্তার উপর বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন ধরণের প্রভাব থাকতে পারে, যা শুধুমাত্র প্রথাগত পদ্ধতির মাধ্যমে পরিমাপ করা যায় না এবং এর জন্য হালনাগাদ চিন্তাভাবনা বা পদ্ধতির ব্যবহার করতে হয়। তাই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতার একটি সত্যিকারের মূল্যায়নের জন্য একাধিক মাপকাঠি ব্যবহার করা উচিৎ।
৫. সঠিক গবেষণা বোধগম্যতা এবং বাস্তবায়ন (Understand and implement proper research):
বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপন কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয় বলে সঠিক পরিমাপের জন্য বিভিন্ন গবেষণা পদ্ধতি ভালোভাবে বুঝতে পারাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণা সংশ্লিষ্ট নানা বিষয় যেমন- ভালো নকশা গঠন, এর বৈধতা এবং নির্ভরযোগ্যতা, যা পরিমাপ করতে চাই তা পরিমাপ করে কিনা ইত্যাদি ভালোভাবে বুঝতে এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। এই মানদণ্ডের কোন শর্টকাট নেই এবং সঠিকভাবে বিজ্ঞাপনের প্রভাব পরিমাপের জন্য বিজ্ঞাপন গবেষণার সঠিক বোধগম্যতা এবং বাস্তবায়নের কোন বিকল্প নেই ।
উপরের সাধারণ নির্দেশনাগুলো অনুসরণ করে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করতে পারলে একটি কার্যকর ও সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব হবে বলে আশা করা যায় ।

বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের সীমাবদ্ধতা সমূহ ( Limitations of Testing/Measuring Advertising Effectiveness):
বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় বিজ্ঞাপনের কোন বিকল্প নেই। প্রতিটি কোম্পানিই যেমন বিজ্ঞাপনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে, তেমনি প্রতিটি কোম্পানিই এটা বিশ্বাসও কওে যে এই বিজ্ঞাপন কতটুকু কার্যকর হয়েছে তা পরিমাপ করা উচিত। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি এটাই যে অনেক ক্ষেত্রে এই পরিমাপ করা হয় না। বিজ্ঞাপনদাতারা বা কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ না করার পিছনে যে যুক্তিগুলো দেখিয়ে থাকেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

১. খরচ (Cost) :
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ না করার জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বেশি যে কারণটির কথা বলা হয় তা হলো খরচ। একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে অনেক কোম্পানি তাদের আয়ের ২৫ শতাংশ ব্যয় করে বিপণন বা বিজ্ঞাপন বাবদ; কিন্তু তাদের ৭০ শতাংশই কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য মাত্র ২ শতাংশেরও কম অর্থ ব্যয় করে। ভালো বিজ্ঞাপন গবেষণা সময় এবং অর্থ উভয় দিক থেকেই ব্যয়বহুল হতে পারে।
তাই অনেক ব্যবস্থাপক মনে করেন, যে সময় তারা পাচ্ছেন সেটি অত্যন্ত মূল্যবান এবং তারা এই সময়ের মধ্যেই প্রচারাভিযান কার্যক্রমটি শুধু ভালোভাবে বাস্তবায়ন করতে চান। আবার অনেকে বিশ্বাস করেন যে, গবেষণায় অর্থ ব্যয় না করে সে অর্থ দিয়ে বরং উন্নত বিজ্ঞাপন, অতিরিক্ত মাধ্যম কেনা বা অতিরিক্ত স্পেস/ জায়গা কেনার মতো আরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করা যেতে পারে।
২. গবেষণা সমস্যা (Research problems ) :
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ না করার পিছনে দ্বিতীয় কারণ হলো গবেষণার মাধ্যমে প্রচারমূলক উপাদানগুলোর অর্জিত প্রভাবগুলোকে আলাদা করা কঠিন। বিপণন মিশ্রণের প্রতিটি উপাদানই কোন না কোনভাবে পণ্য বা সেবার সাফল্যকে প্রভাবিত করে। যেহেতু সঠিক গবেষণা ছাড়া প্রতিটি বিপণন উপাদানের অবদান সরাসরি পরিমাপ করা খুবই কঠিন, তাই অনেক বিজ্ঞাপনদাতা হতাশ হয়ে পড়েন এবং কার্যকারিতা পরীক্ষা না করার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের খুব সাধারণ একটি মনোভাব হলো এমন যে, “যদি আমি নির্দিষ্ট প্রভাব নির্ধারণ করতে না-ই পারি, তাহলে কেন এর পিছনে অর্থ ব্যয় করবো?”
৩. কী পরীক্ষা করতে হবে তা নিয়ে মতানৈক্য (Disagreement on what to test):
প্রচারমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে কোন উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের চেষ্টা করা হবে তা শিল্পের ভিত্তিতে, পণ্যের জীবনচক্রের পর্যায় অনুসারে, এমনকি কোম্পানির মধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির জন্য আলাদা হতে পারে। আবার এই উদ্দেশ্যগুলো পরিমাপ করার অনেক উপায় রয়েছে এবং এরমধ্যে কোন মানদণ্ড ব্যবহার করা উচিৎ তা নিয়ে বিজ্ঞাপনদাতা বা ব্যবস্থাপকদের মধ্যে মতানৈক্য থাকে।
যেমন- বিক্রয় ব্যবস্থাপক বিক্রয়ের উপর বিজ্ঞাপনের প্রভাব দেখতে চাইতে পারেন, শীর্ষ ব্যবস্থাপনা কর্পোরেট ভাবমূর্তির উপর প্রভাব জানতে চাইতে পারেন এবং যারা সৃজনশীল প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত তারা বিজ্ঞাপনটির স্মরণযোগ্যতা বা স্বীকৃতি মূল্যায়ন করতে চাইতে পারেন। কী পরীক্ষা করতে হবে সে বিষয়ে সমঝোতার অভাবে অনেকসময় কার্যকারিতা পরিমাপের কোন পরীক্ষাই করা হয় না।
৪. সৃজনশীল বিভাগের আপত্তি (The objections of creative):
অনেক ক্ষেত্রেই সৃজনশীল বিভাগ তার কাজটি পরীক্ষা করতে চায়না এবং অনেক সংস্থা তাদের কাজ পরীক্ষার জন্য জমা দিতে ইচ্ছুক হন না। বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোর সৃজনশীল বিভাগ যুক্তি দেয় যে, বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিগুলো বিজ্ঞাপনের সৃজনশীলতা এবং কার্যকারিতার সঠিক পরিমাপক নয় এবং বিভিন্ন মানদণ্ডের প্রয়োগ তাদের সৃজনশীলতাকে রোধ করে। তাদের মতে বিজ্ঞাপনটি যত বেশি সৃজনশীল হবে, বিজ্ঞাপনটির সফল হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি। তাই তারা বিপণন বিভাগ কর্তৃক আরোপিত বিভিন্ন নির্দেশিকা মানা ছাড়াই সৃজনশীল হওয়ার সুযোগ চেয়ে থাকে।
৫. সময় (Time):
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ না করার একটি চূড়ান্ত কারণ সময়ের অভাব। ব্যবস্থাপকরা মনে করেন যে, কার্যকারিতা পরিমাপ করা একটি সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তাদের হাতে যে সময় রয়েছে, সে সময়ের মধ্যেই তাদের অনেক কিছু করার আছে এবং শুধু বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য তারা তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারেন না। তারা শুধু যে কোন ভাবে বিজ্ঞাপনের বার্তাটি হাতে পেয়ে প্রচারাভিযান কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে চান। তাদের মতে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের পিছনে সময় ব্যয় করলে সেসময়ের মধ্যে তারা হয়তো প্রচারের ভালো কোন সুযোগ হাতছাড়া করে ফেলতে পারেন।
উপরোল্লিখিত করণে বিপণনকারী বা বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপকরা অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করতে চান না। তবে একটি বিষয় এক্ষেত্রে মনে রাখতেই হবে যে, বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ করা বাঞ্ছনীয় এবং তা বিজ্ঞাপনের ত্রুটিসমূহ খুঁজে পেতে এবং বিজ্ঞাপনকে উন্নততর করতে সাহায্য করে থাকে।
সারসংক্ষেপ:
বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের পদ্ধতিগুলোকে প্রি-টেস্ট এবং পোস্ট-টেস্ট এই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। বিজ্ঞাপন | প্রচারাভিযান বাস্তবায়নের আগে বিজ্ঞাপন কর্মসূচীর বিভিন্ন দিক পরিমাপ করাকে প্রি-টেস্ট বা বিজ্ঞাপন-পূর্ব পরীক্ষা এবং বিজ্ঞাপন প্রচারিত হওয়ার পর এর কার্যকারিতা পরিমাপ করাকে পোস্ট-টেস্ট বা বিজ্ঞাপন-প্রকাশোত্তর পরীক্ষা বলে। | বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের প্রচলিত পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভোক্তাজুরি পরীক্ষা, রীডাবিলিটি বা | পঠনযোগ্যতা পরীক্ষা, পোর্টফোলিও পরীক্ষা, শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষা, বোধগম্যতা এবং প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা, স্মরণ পরীক্ষা, স্বীকৃতি পরীক্ষা, অনুসন্ধান পরীক্ষা, ট্র্যাকিং পরীক্ষা, মনস্তাত্বিক পরীক্ষা, মনোভাব বা অভিমত পরীক্ষা এবং বিক্রয় | পরীক্ষা ইত্যাদি।
প্রতিটি পদ্ধতিরই নিজস্ব কিছু সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। তাই বিপণন ব্যবস্থাপককে প্রতিটি পদ্ধতির | সুবিধা-অসুবিধার কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য উত্তম পদ্ধতি বেছে নিতে এবং প্রতিটি পদ্ধতির সুবিধা-অসুবিধার মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরীক্ষার পূর্বশর্ত হলো পরিমাপের ক্ষেত্রে PACT (Positioning Advertising Copy Testing) এর নীতিমালাসমূহ পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করা। পাশাপাশি বিজ্ঞাপনের কার্যকারিকতা পরিমাপের ক্ষেত্রে যোগাযোগের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, ভোক্তা প্রতিক্রিয়া মডেলের ব্যবহার, প্রি- | টেস্ট এবং পোস্ট-টেস্ট উভয় পদ্ধতির ব্যবহার, একাধিক মাপকাঠি ব্যবহার এবং সঠিক গবেষণা বোধগম্যতা ও বাস্তবায়নের দিকে খেয়াল রাখা আবশ্যক।
যদিও বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপ প্রতিটি কোম্পানির জন্যই গুরুত্বপূর্ণ; তবুও খরচ, গবেষণা সমস্যা, কী পরীক্ষা করতে হবে তা নিয়ে মতানৈক্য, কোম্পানির সৃজনশীল বিভাগের আপত্তি এবং সময়ের অভাব ইত্যাদি বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা পরিমাপের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হিসেবে কাজ করে থাকে।
