প্রচার এর উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য

প্রচার এর উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর  “ব্যক্তিক বিক্রয়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

Table of Contents

প্রচার এর উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য

 

বিপণন প্রসারের একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলো প্রচার। প্রচার হচ্ছে বিক্রয়ের উদ্দেশ্য সফলের জন্য পত্র পত্রিকা, বেতার, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তথ্য উপস্থাপন এবং প্রচার করা। বিভিন্ন কারণে প্রচার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়। দেশের উন্নয়নের জন্য কর্তৃপক্ষ প্রচারের সহায়তা নিয়ে থাকে। তবে কোন কোম্পানি সাধারণত তার প্রতিষ্ঠান এবং পণ্য বা ব্র্যান্ডকে জনগণের সামনে উপস্থাপনের জন্য প্রচার কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। অন্যভাবে বলা যায় প্রচার বৃহত্তর জনসংযোগ ব্যবস্থার একটি অংশ। প্রচার গণসংযোগ বিভাগের অংশ হওয়াতে সাধারণত কোন কোম্পানির বিপণন বিভাগের দায়িত্ব ও কর্তব্যের আওতায় প্রচারকে অন্তর্ভূক্ত করা হয় না।

তবে সময়োপযোগী ও সুষ্ঠু প্রচারের জন্য বিপণন বিভাগ এবং জনসংযোগ বিভাগের মধ্যে সুনির্দিষ্ট যোগাযোগ ও সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। বিপণন প্রমোশনের সকল মাধ্যমগুলোর জন্য বিপণন নির্বাহীকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয় তবে কেবল মাত্র প্রচার কার্যক্রমের জন্য বিপণন নির্বাহীকে কোন অর্থ ব্যয় করতে হয় না। তথাপি একটি প্রচার বিভাগ প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার জন্য কোম্পানিকে কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয়।

বিজ্ঞাপনের ন্যায় প্রচার কার্যাবলী পরিচালিত হয় না বলে সাধারণ জনগণ প্রচলিত বিষয়বস্তুর সঙ্গে বিপণন প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে অবগত থাকে না। ফলে সাধারণ জনগণের নিকট প্রচারের কার্যক্রম অধিক বিশ্বাসযোগ্য হয়ে থাকে। যেমন সংবাদপত্রে বা ম্যাগাজিনে কোন ওষধ বা সেবা সম্পর্কে যদি কোন কলাম লেখা হয় তবে এর গ্রহণযোগ্যতা বিজ্ঞাপন অপেক্ষা অধিকতর হয়ে থাকে। দীর্ঘ মেয়াদী প্রচার কার্যক্রম অধিক ফলপ্রসূ হয়ে থাকে। পুনঃপুনঃ বিষয়বস্তু তুলে ধরা হলে প্রচার কার্যক্রম অত্যন্ত কার্যকর ও ফলপ্রসূ হয়।

 

প্রচার (Publicity):

বিপণন প্রসারের একটি প্রধান হাতিয়ার হলো প্রচার। প্রচার একটি যোগাযোগের পদ্ধতি যা প্রাচীন কাল থেকেই কোন কিছুর প্রতি মানুষের মনোভাবকে প্রভাবিত করে। প্রচার হলো এমন পদ্ধতি এবং কৌশল যা দ্বারা কোন বার্তা অনুগামীদের আকর্ষণ বা প্রভাবিত করার জন্য ব্যবহার করা হয়। যে সকল প্রচার মাধ্যম রয়েছে তাদেরকে অর্থ প্রদান না করে কোম্পানি যদি নিজ উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে পারে তবে তাকে প্রচার বলে। বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাধ্যমগুলোকে অর্থ প্রদান করতে হয় কিন্তু প্রচারে ক্ষেত্রে বিপণন সংস্থা এই মাধ্যমগুলোকে কোন অর্থ প্রদান করে না। তাই প্রচারে মাধ্যমে বিপণন প্রসারে খরচের পরিমাণ কম হয়ে থাকে।

কোম্পানি ও পণ্য সম্পর্কে ক্রেতাদের মনে কোন নেতিবাচক ধারণা থাকলে তা সহজেই প্রচারের মাধ্যমে দূর হয়ে যায়। যদি একজন সেলিব্রেটি টেলিভিশন আলোচনা অনুষ্ঠানে একটি হাসপাতালের সেবার মান নিয়ে ইতিবাচক কিছু তথ্য উপস্থাপন করে তবে অনেকেই ঐ হাসপাতালের সেবা গ্রহণে আগ্রহী হবে। তবে এই উপস্থাপনাটি স্বেচ্ছা প্রণোদিত ভাবে হতে হবে এবং বিনিময়ে অর্থের কোন লেনদেন থাকবে না। প্রচারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার কোন ভূমিকা থাকে না বলে বিজ্ঞাপনের চেয়ে প্রচারের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি।

Willian J. Stanton, Publicity is any communication about an organization, its products or policies through the media that is not paid for by the organization. (প্রচার হলো প্রতিষ্ঠান, তার পণ্য বা নীতি নিয়ে যে কোন ধরণের যোগাযোগ যা কোন প্রচার মাধ্যমে প্রচারিত হয় এবং এর জন্য প্রতিষ্ঠানকে কোন অর্থ ব্যয় করতে হয় না।

অতএব, প্রচার হলো বিপণন প্রসারের একটা হাতিয়ার যার জন্য উদ্যোগতাকে কোন অর্থ প্রদান করতে হয় না। ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ ও নেতিবাচক ধারণাকে দূর করার জন্য প্রচারের কৌশল গ্রহণ করা হয়। প্রচার হচ্ছে পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য পত্র-পত্রিকা, বেতার, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদি প্রচার মাধ্যমে বিনা খরচে পণ্য বা সেবার ইতিবাচক উপস্থাপন। অন্যভাবে বলা যায় প্রচার গণসংযোগের একটি অংশ। পণ্য, সেবা বা প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধির জন্যই প্রচারের সাহায্য নেয়া হয়। সাধারণত দুই ধরণের প্রচার দেখা যায়:

 

i) ইতিবাচক প্রচার (Positive Publicity):

যে প্রচারে প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক বিষয়সমূহ তুলে ধরা হয় তাকে ইতিবাচক প্রচার বলে। যেমন- কোন সেমিনারে পণ্যের গুণ ও মান সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত প্রকাশ করা হলো।

 

ii) নেতিবাচক প্রচার (negative Publicity):

যে প্রচারে প্রতিষ্ঠানের নেতিবাচক বিষয়সমূহ তুলে ধরা হয় তাকে নেতিবাচক প্রচার বলে। যেমন- কোন সেমিনারে পণ্যের গুণ ও মান সম্পর্কে নেতিবাচক মতামত প্রকাশ করা হলো।

 

প্রচার এর উদ্দেশ্য

 

প্রচারের বৈশিষ্ট্য (Features of Publicity):

উপরের আলোচনা থেকে প্রচারে নিম্নোক্ত কিছু বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়া যায়।

 

ক) নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপনা (Impersonal presentation):

এটা সম্পূর্ণ একটা নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপন। প্রচার সরাসরি কোন বিক্রয়কর্মীর মাধ্যমে উপস্থাপিত হয় না।

 

খ) প্রচার প্রণালী (Media outlet):

প্রচার সুনির্দিষ্ট কোন প্রচার প্রণালীর মাধ্যমে প্রবাহিত হয়। উপস্থাপক বিভিন্ন মিডিয়া প্রণালীর মাধ্যমে তার বক্তব্য উপস্থাপন করে।

 

গ) প্রচার ব্যয় (Media cost):

এখানে উদ্যোগতাকে কোন ধরণের অর্থ ব্যয় করতে হয় না। মিডিয়া, সময়, স্পেস ও সেলিব্রিটিদের জন্য বিপণনকারীর কোন অর্থ ব্যয় হয় না।

 

ঘ) নিয়ন্ত্রণহীনতা (No control):

প্রচারের ক্ষেত্রে বিপণনকারীর কোন নিয়ন্ত্রন থাকে না। ফলে এর ফলাফল প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অথবা বিপক্ষে উভয় দিকেই যাওয়া সম্ভাবনা থাকে । ঙ) তৃতীয় পক্ষ (Third parties): প্রচার সর্বদায় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ও সহায়তায় সম্পাদিত হয়ে থাকে। এখানে উদ্যোক্তার কোন ধরণের ভূমিকা থাকে না ।

 

চ) বিস্তৃত দর্শক (Broad audience):

প্রচার সবসময় বিস্তৃত দর্শককে ফোকাস করে থাকে। তাই এটাকে শর্ট গান এ্যাপ্রোচ বলা হয় ।

 

ছ) বিশ্বাসযোগ্যতা (Credibility):

প্রচারের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি। উদ্যোক্তা নিজ খরচ এবং উদ্যোগে বিজ্ঞাপন পরিচালনা করে। অন্যদিকে এখানে উদ্যোক্তার কোন ভূমিকা না থাকায় এর বিশ্বাসযোগ্যতা খুব বেশি হয়।

 

জ) গণসংযোগের অংশ (Part of public relation):

ব্যাপক অর্থে প্রচার গণসংযোগের একটি অংশ। প্রকৃতপক্ষে গণসংযোগ একটি বৃহত্তর ধারণা যা প্রচার এবং এ জাতীয় অন্যান্য কর্মকর্তাকে অন্তর্ভুক্ত করে।

 

প্রচারের উদ্দেশ্য (Purposes of publicity):

বিপণন কার্যাবলীর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভোক্তা সন্তুষ্টির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন। প্রচার কৌশল হচ্ছে বিপণনের অন্যতম প্রধান বিষয় যার মাধ্যমে বিপণনের উদ্দেশ্য অনেকাংশে সফলতা লাভ করে। প্রচারণা করা হয় সাধারণত কোন ব্র্যান্ড, প্রতিষ্ঠান, মতবাদ, স্থান, ব্যক্তি এমনকি দেশের উন্নয়নের জন্যও। সাধারণত কোম্পানির বিপণন বিভাগের দায়িত্ব ও কর্তব্যের মধ্যে প্রচারকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় না কারণ এটা গণসংযোগ বিভাগের অংশ। তথাপি নানাবিধ কারণে একটা কোম্পানি প্রচারকে বিপণের প্রসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে । প্রচারের উদ্দেশ্যসমূহ সংক্ষেপে নিম্নে আলোচনা করা হলো:

 

ক) নতুন পণ্য ঘোষণা (Announce new product) :

নতুন পণ্যকে দ্রুত প্রচারের আওতায় নিয়ে আসতে হয়। প্রচার নতুন পণ্যের প্রসারের জন্য খুবই উপযোগ। প্রেস মিডিয়া নতুন পণ্যের জন্য বিশেষ কলামের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারে। কিছু কিছু পত্রিকা বা সংবাদপত্র নিয়মিত বাণিজ্যিক কলাম থাকে যেখানে নতুন পণ্যকে অন্তর্ভূক্ত করা যেতে পারে।

 

খ) নতুন নীতি ঘোষণা (Announce new policy):

মিডিয়ার মাধ্যমে নতুন নীতিমালা বা পরিবর্তীত নীতিমালাসমূহ প্রকাশ করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের বোনাস, ডিভিডেন্ট অথবা আকর্ষণীয় কোন ঘোষণা প্রচার করতে চাইলে প্রচলিত সংবাদপত্র বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসমূহ ব্যবহার করতে পারে।

 

গ) ফলাফল প্রকাশ (Report the performance):

প্রত্যেক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উচিত তাদের শেয়ার হোল্ডারদের জন্য বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ করা। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের ফলাফলের বিষয়বস্তুর সংক্ষেপিত রূপ প্রকাশ করে ।

 

ঘ) জনগণকে অবহিত করা (Informing the public):

প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন দিক জনগণকে অবহিত করার জন্য প্রচার কার্য চালানো হয়। প্রতিষ্ঠানের সুযোগ সুবিধাসমূহ, পণ্যের গুণাগুন, বাজার অবস্থান, প্রতিষ্ঠানের সামাজিক কার্যক্রম ইত্যাদি বিষয় জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য প্রচারের আশ্রয় নেয়া হয়।

 

ঙ) ভাবমূর্তি সৃষ্টি করা (To create an image):

প্রচার কৌশলের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তার ভাবমূর্তি বৃদ্ধির চেষ্টা করে। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান করোনাকালীন দুর্যোগ মোকাবেলায় যেভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে তা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যা সেই সকল প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে আরো উজ্জ্বল করে ।

 

চ) নেতিবাচক প্রচারকে বাধা (Counter negative publicity):

বিভিন্ন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান অথবা পরিস্থিতির কারণে জনগণের মধ্যে প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবা সম্পর্ক বিরূপ ধারণা হতে পারে। এটা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য বড় ধরণের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে ঐ সকল প্রতিকূলতা দূর করে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করা যায়।

 

ছ) বাণিজ্যিক বিরতি (Commercial break) :

বিভিন্ন মিডিয়া অনুষ্ঠানে বাণিজ্যিক বিরতি দর্শকদের কাছে একটা বিরক্তিকর বিষয়। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপনের পরিবর্তে প্রচারের সাহায্য নিয়ে থাকে। বর্তমানে অনেক বিপণন কর্মকর্তা পণ্য প্রদর্শন (product placement) কৌশলের মাধ্যমে প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে।

 

জ) পতনশীল পণ্য (Declining product) :

পণ্য যখন তার পণ্য জীবন চক্রের শেষ স্তরে পৌঁছে যায় তখন তার বাজার চাহিদা থাকে নিম্ন পর্যায়ে। পতনশীল চাহিদাসম্পন্ন পণ্যের চাহিদাকে পুনরুজ্জিবিত করার জন্য সেই প্রতিষ্ঠান প্রচার কার্য চালিয়ে থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠান এই কৌশল অবলম্বন করে সফলতা লাভ করেছে।

 

ঝ) ক্রেতা গ্রহণযোগ্যতা (Customer acceptance):

ক্রেতাদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রচার কাজ চালানো হয়। বিজ্ঞাপনে উদ্যোক্তারা অনেক সময় বিভিন্ন ধরণের ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে থাকে। তাই এখানে ক্রেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কম থাকে। কিন্তু তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে এখানে ক্রেতাদের বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি।

 

ঙ) পর্যটক আকর্ষণ (Tourist attraction):

যে সকল দেশে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে এবং যে সকল দেশ পর্যটন শিল্প থেকে প্রচুর আয় করে সেই সকল দেশের উদ্যোক্তারা এই শিল্পের প্রসারের জন্য প্রচার কৌশলের সহায়তা গ্রহণ করে থাকে । অনেক সময় পর্যটনকে আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবেও প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়।

 

চ) অতিরিক্ত তথ্য (Additional information):

প্রচার কার্যক্রমের অন্যান্য মাধ্যমে মূল তথ্যের বাইরে অতিরিক্ত তথ্য প্রদানের খুব বেশি সুযোগ থাকে না। বর্তমান প্রতিযোগিতায় ক্রেতারা পণ্য বা সেবা সম্পর্কে মূল তথ্যের বাইরেও অতিরিক্ত কিছু তথ্য আশা করে। প্রচার কার্যক্রমে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে ক্রেতাদের সামনে অতিরিক্ত তথ্য প্রদানের যথেষ্ট সুযোগ থাকে। ফলে প্রচার হচ্ছে বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে সফল করার জন্য পত্র-পত্রিকা, বেতার, টেলিভিশন ইত্যাদি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে বিনা খরচে কোম্পানির পণ্য বা সেবার ইতিবাচক উপস্থাপনা।

বণিক সমিতি তাদের অধীন বিভিন্ন পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সৃষ্টির জন্য প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে থাকে। সরকার বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য, বিদেশী পুঁজি আকৃষ্ট করার জন্য এবং বিদেশী সহযোগিতার জন্য প্রচার কার্যক্রম চালিয়ে থাকে ।

 

প্রচার উদ্দেশ্য ও বৈশিষ্ট্য

 

প্রচারের গুরুত্ব (Importance of Publicity)

মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কোম্পানির পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এটি জনগণের আস্থা অর্জন, অনুকূল ধারণা সৃষ্টি, চাহিদার উন্নয়ন, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি সৃষ্টি, ক্রেতার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করার একটি শক্তিশালী বিপণন হাতিয়ার। নিম্নে প্রচারের গুরুত্বসমূহ আলোচনা করা হলো:

 

ক) বিশ্বাসযোগ্যতা সৃষ্টি (Building credibility):

প্রচারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার ভূমিকা কম থাকে। বিজ্ঞাপনে যেমন সকল দায়-দায়িত্ব থাকে উদ্যোক্তার উপর। এখানে উদ্যোক্তা নিজের মত করে সংবাদ প্রচার করতে পারে। কিন্তু প্রচারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা নিজের মত করে সংবাদ প্রচার করতে পারে না। এখানে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রচার কাজ সম্পাদিত হয়। তাই এর গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বিজ্ঞাপনের চেয়ে অনেক বেশি।

 

খ) মিতব্যয়ীতা (Economy) :

বিজ্ঞাপনসহ বিপণন প্রসারের অন্যান্য উপাদানগুলো কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়। কিন্তু প্রচারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তাকে কোন খরচ বহন করতে হয় না। ফলে বিজ্ঞাপনে যে বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করা হয় যা প্রতি একক পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে থাকে। সেই হিসেবে প্রচার অনেক লাভজনক এবং মিতব্যয়ী।

 

গ) কম শ্রম (Less efforts):

প্রমোশনের অন্যান্য যেকোন মাধ্যমের চাইতে প্রচার কার্যক্রমে কম শ্রম, কম মেধা, কম সময় ব্যয় হয়ে থাকে । একটা বিজ্ঞাপন কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত সময় সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল বিষয়। কিন্তু প্রচার কার্যক্রমে এই ধরণের কোন জটিলতার সৃষ্টি হয় না। প্রচার কার্যক্রমে নূন্যতম সময় ও শ্রম ব্যয় হয়ে থাকে।

 

ঘ) তথ্যের ব্যপকতা (High volume of information):

অন্যান্য প্রচার কৌশলে তথ্যের ব্যপকতা থাকে না। বিক্রয় প্রসার, বা বিজ্ঞাপনে সাধারণত এককেন্দ্রিক সংবাদ ও তথ্য প্রদান করা হয়ে থাকে। কিন্তু প্রচারের ক্ষেত্রে বহুকেন্দ্রিক তথ্য প্রচার করা হয়ে থাকে। বিজ্ঞাপনে কেবল তথ্যসমূহ মুদ্রিত মাধ্যমে প্রচারিত হয়। কিন্তু প্রচারে মৌখিক বা লিখিত মাধ্যমে বিভিন্ন ধরণের তথ্য প্রচারিত হয়।

 

ঙ) ব্যাপক দৃষ্টিগোচরতা (Wide exposures) :

প্রচারের দর্শক দৃষ্টিগোচরের সংখ্যা অনেক বেশি এবং এর আওতা অনেক বিস্তৃত থাকে। বিজ্ঞাপনে দেখা যায় বিজ্ঞাপনটি প্রচারের সময় যদি দর্শকের দৃষ্টিগোচর না হয় তবে এখান থেকে ক্রেতাদের পণ্য সচেতনতা সৃষ্টি হয় না। অন্যদিকে সংবাদপত্র বা পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ বা তথ্যসমূহ দর্শক অনেক দিন পর্যন্ত দেখার বা পড়ার সুযোগ থাকে। আবার বর্তমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সংবাদ ও তথ্যসমূহ ভাইরাল হচ্ছে।

 

চ) দ্রুত প্রচার (Quick promotion ) :

পণ্য বা সেবার ধারণাসমূহ দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রচারের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমে কোন তথ্য যেভাবে সহজে ও দ্রুত জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তা আর অন্য কোন মাধ্যমে ছড়ায় না। কোন সেলিব্রেটির মাধ্যমে কোন পণ্য বা প্রতিষ্ঠানের প্রচারণা ইউটিউব বা ফেসবুকে ভাইরাল হলে তা সহসায় ব্যাপক প্রচার লাভ করে ।

 

ছ) বিপণনকারীর সুবিধা ( Benefits of Marlceters):

প্রচার কার্যক্রম দ্বারা বিপণনকারী, উৎপাদক ও অন্যান্য ব্যবসা মহল ভিষণভাবে উপকৃত হয়ে থাকে। শিশুদের খেলনা সামগ্রীর বিক্রয় লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পায় ইতিবাচক প্রচারণার মাধ্যমে। কিছু খাদ্য দ্রব্যের উপর গবেষণা থেকে দেখা যায় প্রচারণার মাধ্যমে তাদের বিক্রয় ৩৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। যখন বলা হলো লাল মদ সেবনে হৃদরোগের ঝুঁকি অনেকাংশে কম হয় তখন এটার বিক্রয় ৪৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এইভাবে ইতিবাচক প্রচারের মাধ্যমে বিপণনকারীগণ বিভিন্নভাবে সুবিধা অর্জন করে থাকে।

 

জ) মধ্যস্থকারীদের সুবিধা ( benefits of middlemen):

প্রচার সরাসরি মধ্যস্থকারী এবং বিক্রয়কর্মীদের সহযোগিতা করে থাকে। প্রচারের ফলে বিক্রয়কর্মীদের ও মধ্যস্থকারীদের বিক্রয় কার্যক্রম অনেক সহজ হয়। প্রচারের সময় এদের পক্ষ থেকে অনেক তথ্য ও সংবাদ ক্রেতাদের সরবরাহ করা হয়। ফলে বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অথবা ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য খুব বেশি শ্রম ও প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয় না।

 

ঝ) অলাভজনক প্রতিষ্ঠান (Non- profit organization):

বর্তমানে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানসমূহ প্রচারের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা, ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধিসহ প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ইত্যাদি সুবিধা সমূহ অর্জন করতে সমর্থ হচ্ছে। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বা হাসপাতালসমূহ তাদের মৌলিক আদর্শ ও গবেষণালব্ধ ফলাফলসমূহ জনগণের সামনে উপস্থাপন করছে। এছাড়াও কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, মিশনারী, প্রতিবন্ধী সংগঠনের কর্মকাণ্ড নিয়মিতভাবে বিভিন্ন মিডিয়া চ্যানেলে প্রচারিত হচ্ছে।

 

ঙ) প্রতিষ্ঠানের সুনাম (Goodwill of the organization):

প্রত্যেকটা প্রতিষ্ঠানের প্রধান লক্ষ্য হলো তাদের মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি করা। হিলারী ক্লিন্টন যখন তার বক্তব্যে গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম বর্ণনা করেন তখন বিশ্বব্যাপী গ্রামীণ ব্যাংকের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দুর্যোগে সাহায্য ও সহযোগিতার মাধ্যমে দুঃস্থ মানুষের কল্যাণ কামনা করছে।

কোডিভ-১৯ এর মহামারিতে কোয়ান্টাম ফাউণ্ডেশন এবং আল মারকাজুল ইসলাম এর ভূমিকা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় যা সংগঠন দুইটিকে একটি ভিন্ন মাত্রা দান করে । উপরের আলোচনা থেকে বলা যায় যে, ক্রেতাদের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। এর মধ্যে প্রচার একটি অন্যতম কৌশল। প্রায় সব ধরণের প্রতিষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধা অর্জন করতে চায়। যেমন- উৎপাদনকারী, বণ্টনকারী, বণিক সমিতি, অব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচারের মাধ্যমে নানা ধরণের সুযোগ ও সুবিধা অর্জন করছে।

 

প্রচারের সীমাবদ্ধতা (Limitation of Publicity):

প্রতিষ্ঠানের পণ্য বা সেবার ভাবমূর্তি, ক্রেতা আকর্ষণ ও কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক জনসাধারণের সামনে তুলে ধরার জন্য প্রচার কার্যক্রম চালানো হয়। তবে প্রচার কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন রকম সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। নিম্নে প্রচারের কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করা হলো :

 

ক) নিয়ন্ত্রণের অভাব (No control):

প্রচার কার্যক্রমের উপর বিপণন নির্বাহীর কোন ধরণের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। একটা প্রতিষ্ঠান সৃষ্টিশীল একটি ডকুমেন্টরি বা ফিচার তৈরি করে বিভিন্ন চ্যানেলে তা প্রচারের জন্য প্রেরণ করলে সেই ডকুমেন্টরি সম্প্রচার হবে কি না এই বিষয়ের উপর নির্বাহীর কোন হাত নেই। কোন চ্যানেল এটা প্রচার করতে পারে আবার নাও পারে। কোন ক্ষেত্রে যদি এটা প্রেরিত চ্যানেলসমূহ সম্প্রচার করা না হয় তবে এখানে প্রতিষ্ঠানের তেমন কিছু করণীয় থাকে না ।

 

খ) নেতিবাচক প্রচারের প্রভাব (Impact of negative publicity):

প্রচারের সময় যদি প্রচারক পণ্য বা সেবা সম্পর্কে কোন নেতিবাচক মন্তব্য প্রকাশ করে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরণের হুমকিতে পরিণত হয়। মনেকরি কোন সেলিব্রেটিকে নির্দিষ্ট কোন কোমল পানীয় অফার করা হলো এবং তিনি জনসম্মুখে প্রচার করলেন তিনি এই ব্র্যান্ডটি অপছন্দ করেন। এ ক্ষেত্রে ঐ ব্র্যান্ডের উপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যা তাদের পণ্য বিক্রয় ও মুনাফাকে প্রভাবিত করবে। নেতিবাচক প্রচারের সবচেয়ে খারাপ দিক হলো এটা মুখে মুখে জনগণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

 

গ) সীমিত দৃষ্টিগোচর (Limited exposure):

অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয় কিন্তু প্রশ্ন হলো কতজন দর্শকের এই প্রচারণা দৃষ্টিগোচর হয়েছে। পত্রিকা বা সংবাদপত্রের সংখ্যা হিসেবে দর্শকের সংখ্যা গণনা করা যায় না। ২ লক্ষ পত্রিকার মধ্যে এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পত্রিকা বিক্রয় হলে বলা যাবে না যে দৃষ্টিগোচর দর্শকের সংখ্যা এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার। কারণ এই সংখ্যার মধ্যে ৩০% ভাগ ক্রেতার কাছে প্রকাশিত সংবাদটি দৃষ্টিগোচর হয় নি। আবার টেলিভিশন চ্যানেলে প্রকাশের সময় যারা উপস্থিত থাকে কেবল তাদেরই দৃষ্টিগোচর হয়।

 

ঘ) প্রচার ও খরচ (Publicity and cost) :

যদিও প্রচারের সংজ্ঞা থেকে আমরা জানি যে, প্রচার কার্যক্রমের জন্য উদ্যোক্তাকে কোন ধরণের অর্থ ব্যয় করতে হয় না তথাপি পুরো কার্যক্রমে একজন উদ্যোক্তাকে নানা ধরণের খরচ বহন করতে হয়। যেমন একটি সংবাদ বার্তা তৈরি করে বিভিন্ন চ্যানেলে পাঠাতে অনেক ধরণের খরচ হয়ে থাকে। একটা সৃষ্টিশীল ডকুমেন্টরি তৈরি করতে প্রতিষ্ঠানকে অনেক খরচ বহন করতে হয়। আবার এগুলো প্রচারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার জন্য যেমন সম্পাদক মন্ডলীর সাথে যোগাযোগ বা কিছু লবিং কার্যক্রম পরিচালনা ইত্যাদিতে উদ্যোক্তাকে বেশ কিছু অর্থ ব্যয় করতে হয় ।

 

ঙ) ব্র্যান্ড ইকুইটির ক্ষতিগ্রস্ততা (Damage brank equity):

নেতিবাচক প্রচারণা ব্র্যান্ড ইকুইটির উপর দারুণ ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। মনেকরি প্রচারণার পূর্বে বিক্রয় এবং মুনাফা প্রবৃদ্ধি ছিল ৫%। কিন্তু কিছু প্রচারণা বা সেলিব্রেটির কারণে নেতিবাচক প্রচারণায় পরিণত হয়েছে এমন ক্ষেত্রে বিক্রয় এবং মুনাফা প্রবৃদ্ধি কমে ৩% দাড়িয়েছে। এখানে যে বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ তাহলো প্রচারণা মানুষের ইতিবাচক মনোভাবকে নেতিবাচক মনোভাবে রূপান্তরিত করে। একবার কোন পণ্য বা সেবার প্রতি জনগণের নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হলে সেটাকে ইতিবাচক মনোভাব রূপান্তরিত করা খুবই কঠিন কাজ।

 

চ) অনিশ্চিত ফলাফল (No guaranted result):

প্রচার থেকে নিশ্চিত কোন ফলাফল পাওয়া যাবে সেটা সঠিক করে বলা যায় না। যেমন বিক্রয় প্রসারে যদি ৫% মূল্য হ্রাস করা হয় তবে এর প্রভাব পরিমাপ ও মূল্যায়ন করা সম্ভব। কিন্তু প্রচারের ক্ষেত্রে প্রচারের প্রভাব ও মূল্যায়ন প্রায় ক্ষেত্রেই সঠিক হয় না। অন্যদিকে অনেক খরচ করে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার পর এখানে থেকে একটা নিশ্চিত ফলাফল পাওয়া যাবে সেটার নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভবপর নয়।

অতএব, প্রচারের বিভিন্ন ধরণের সুবিধা থাকলেও প্রচারের অনেক ধরণের সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। তাই পূর্ব থেকে সংবাদপত্র এবং প্রচার মাধ্যমের সাথে সুন্দর সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। পণ্য, সেবা অথবা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে কোন ধরণের প্রতিকূল সংবাদ যাতে প্রচারিত না হয় সেই দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

 

সেলেব্রিটির আবেদন (Image of celebrity):

প্রচারের ক্ষেত্রে যখন কোন সেলেব্রিটিকে ব্যবহার করা হয় তখন তার ব্যক্তিগত ইমেজ নেতিবাচক এবং ইতিবাচক দুইভাবেই কাজ করে থাকে। যেমন- যদি কোন সংসদ সদস্য কোন কোন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তার ইতিবাচক মতামত প্রদান করে তবে এটার একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে যারা তাকে ব্যক্তিগতভাবে বা তার আদর্শের পরিপন্থি তাদের উপর। অন্যভাবে বলা যায় শিয়া সম্প্রদায়ের কোন সেলেব্রিটির প্রচারণার প্রতি সুন্নী মুসলমানরা ইতিবাচক মনোভাব পোষণ নাও করতে পারে ।

 

Marketing, Marketing Gurukul, GOLN, মার্কেটিং, মার্কেটিং গুরুকুল, বিপণন, مارکیٹنگ , تسويق , विपणन

 

গণসংযোগ ও প্রচারের মধ্যে পার্থক্য (  Defference between Public Relation and Publicity ):

গণসংযোগ এবং প্রচারের মধ্যে অনেকেই কোন পার্থক্য নির্ণয় করতে চায় না। বলা হয় গণসংযোগ ও প্রচার আসলেই একই বিষয়। যদিও এদের কার্যক্রম প্রায় একই রকম তথাপি এদের মধ্যে মৌলিক ও ধারণাগত কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। গণসংযোগ ও প্রচার উভয়ই বিপণন প্রসারের দুইটি হাতিয়ার। ব্যাপক অর্থে গণসংযোগের একটি উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হলো প্রচার । প্রচার ও গণসংযোগের ধারণাগত পার্থক্য নির্ণয়ের পর এদের পার্থক্যসমূহ বর্ণনা করা হলো:

 

গণসংযোগ (Public relation):

সমগ্র জনসাধারণের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে অনুকূল প্রচারণা লাভ, আইনগত ভাবমূর্তি এবং প্রতিকূল প্রচারণা ও গুজব মোকাবেলা করার জন্য প্রতিষ্ঠান যে সকল কার্যক্রম গ্রহণ করে তার সামগ্রিক রূপকে গণসংযোগ বলে।

 

প্রচার (Publicity):

কোন চিহ্নিত পৃষ্ঠপোষক বা স্পন্সর কর্তৃক অর্থ প্রদান ব্যতীত গনমাধ্যমসমূহে পণ্য বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মতামত প্রকাশ অথবা অনুকূল উপস্থাপনার দ্বারা পরোক্ষভাবে চাহিদা বৃদ্ধি অথবা পরিচিতি তুলে ধরার কার্যক্রমকে প্রচার বলা যায়। মনেকরি শহরে একটি নতুন খাবারের হোটেল উদ্বোধন করা হলো। উক্ত অনুষ্ঠানে অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিল এবং সবার জন্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত খাদ্যে বিষ ক্রিয়ার ফলে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরের দিন এই বিষয়টি পত্রিকার হেড লাইনে পরিণত হয়।

এই প্রচারিত হেড লাইনকে প্রচার বলা হয়ে থাকে। আর প্রকৃত কি কারণে খাদ্যে বিষক্রিয়া হয়েছিল সেটা মোকাবেলা করার যে প্রক্রিয়া অর্থাৎ এই বিষয়টির প্রকৃত কারণ জনসাধরণের নিকট তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে প্রতিষ্ঠিত করা হলো গণসংযোগ। উল্লেখিত আলোচনার পর নিম্নে কিছু মৌলিক এবং ধারণাগত পার্থক্য নির্ণয় করতে পারি।

ক) একটা ঘটনা প্রবাহ উপস্থাপন হলো প্রচার। যেমন- প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয় কম হচ্ছে বিষয়টির উপস্থাপনা হলো প্রচার। কিন্তু ঘটনা প্রবাহের কারণ ব্যাখ্যা হলো গণসংযোগ যেমন- কেন পণ্য বিক্রয় কম হচ্ছে তার উপস্থাপন।

খ) পুরো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা এবং সঠিক দর্শকের কাছে সঠিক বার্তা প্রেরণ হলো গণসংযোগ। অন্য দিকে গণসংযোগের একটি অন্যতম হাতিয়ার হলো প্রচার ।

গ) ব্লগারগণ যখন একটি সংবাদ বিভিন্ন মাধ্যমে সম্প্রচার করে তখন সেটাকে প্রচার বলা হয়। আর যখন তার সুনির্দিষ্ট দর্শকের জন্য সম্প্রচার করে তখন সেটাকে গণসংযোগ বলা হয় ।

ঘ) গণসংযোগে জনগণের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে তাদের সাথে ব্যবসায়িক সুসম্পর্ক তৈরি হয়। কিন্তু প্রচারের ক্ষেত্রে কেবলমাত্র পণ্য বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করা হয়।

ঙ) প্রচারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার নিজের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে এটা পরিচালিত হয়। গণসংযোগের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকে উদ্যোক্তার হাতে এবং প্রতিষ্ঠানের আলাদা বিভাগের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

চ) প্রচারের প্রকৃতি ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক উভয় হতে পারে কিন্তু গণসংযোগের প্রকৃতি সর্বদাই ইতিবাচক হয়ে থাকে। ফলে প্রচারে সকল শ্রেণীর দর্শককে ফোকাস করা হয় অন্যদিকে গণসংযোগে নির্দিষ্ট দর্শককে ফোকাস করা হয়।

 

পরিশেষে বলা যায় প্রচারের তুলনায় গণসংযোগ একটি ব্যাপক ধারণা। গণসংযোগ প্রসার কর্মসূচির একটি বড় অংশ আর প্রচার গণসংযোগের একটি অংশ। তাই গণসংযোগের হাতিয়ারের সংখ্যা অনেক হলেও প্রচারের হাতিয়ারের সংখ্যা অনেক কম হয়ে থাকে।

 

সারসংক্ষেপ :

বিপণন প্রসারের একটি প্রধান হাতিয়ার হলো প্রচার। বিভিন্ন যে প্রচার মাধ্যমগুলো রয়েছে তাদেরকে অর্থ প্রদান না করে কোম্পানি যদি নিজ উদ্দেশ্যকে কাজে লাগাতে পারে তবে তাকে প্রচার বলে। প্রচারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো প্রচারের ক্ষেত্রে উদ্যোক্তার কোন ভূমিকা থাকে না বলে বিপণন প্রসারের অন্যান্য হাতিয়ারগুলোর চাইতে প্রচারের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। তবে প্রচারের ক্ষেত্রে বিপণনকারীর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এর ফলাফল প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বা বিপক্ষে উভয় দিকেই যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। ফলে প্রচারের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুইটি দিক দেখতে পাওয়া যায়। ব্যাপক অর্থে প্রচার গণসংযোগের একটি অংশ।

প্রচার কৌশল হচ্ছে প্রসার মিশ্রণের অন্যতম প্রধান বিষয় যার মাধ্যমে বিপণনের উদ্দেশ্য অনেকাংশে সফলতা লাভ করে। প্রচারণা করা হয় সাধারণত কোন ব্র্যান্ড, প্রতিষ্ঠান, মতবাদ, স্থান, ব্যক্তি এমনকি দেশের উন্নয়নের জন্যও। প্রচারের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ হলো নতুন পণ্য ঘোষণা, নতুন নীতিমালা ঘোষণা, জনগণকে অবহিত করা, প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি সৃষ্টি করা, নেতিবাচক প্রচারকে বাধা প্রদান করা, পতনশীল পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করা, ক্রেতার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা ইত্যাদি। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কোম্পানির পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি জনগণের আস্থা অর্জন করে এবং এই কার্যক্রমে নূন্যতম মেধা, সময় ও শ্রম ব্যয় হয়ে থাকে।

এখানে তথ্যের ব্যাপকতা থাকে এবং পণ্যের ধারণাসমূহ দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া যায় । | মধ্যস্থকারীগণ এখান থেকে বহুবিধ সুবিধা অর্জন করে থাকে এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম দ্রুত বৃদ্ধি করা যায়। এছাড়া প্রায় সব ধরণের প্রতিষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে তাদের ব্যবসায়িক এবং প্রতিষ্ঠানিক সুবিধা অর্জন করতে চায়। প্রচার এবং গণসংযোগের সাথে মৌলিক কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। প্রচারের তুলনায় গণসংযোগ একটি ব্যাপক ধারণা। গণসংযোগ বিপণন প্রসারের একটি বড় অংশ এবং প্রচারণা গণসংযোগের একটি অংশ। প্রচারের যেমন বহুমুখি সুবিধা রয়েছে তেমনি এটাকে সঠিকবাবে পরিচালনা করতে না পারলে প্রতিষ্ঠানকে বিভিন্ন রকম সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। প্রচারের সময় যদি প্রচারক পণ্য সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য প্রকাশ করে তা প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরণের হুমকিতে পরিণত হয় ।

Leave a Comment