প্রতিযোগিতামূলক কৌশল সমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “প্রতিযোগিতা মূলক সুবিধা অর্জন” ইউনিট ১২ এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রতিযোগিতামূলক কৌশল সমূহ
একই পণ্য বা শিল্প বাজারে এক বা একাধিক প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী কাজ করে। তাদের সকলের জন্য একই বা একটি প্রতিযোগিতামূলক কৌশল প্রযোজ্য নয়। প্রতিযোগী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিযোগিতামূলক কৌশল নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয়।
প্রতিযোগীতামূলক কৌশলসমূহ (Competitive Strategies):
প্রতিযোগী শনাক্তকরণ, বিশ্লেষণ এবং নির্বাচনের ফলাফলের সাহায্যে বিপণনকারী প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের জন্য বিভিন্ন বৃহৎ বিপণন কৌশল অবলম্বন করে। এক্ষেত্রে কোন্ কৌশল ভালো কাজ করবে অথবা কোন্ কৌশল প্রতিষ্ঠানের সব বা নির্দিষ্ট পণ্য সারির জন্য উত্তম হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোনো একক কৌশলই বিপণনকারীর জন্য সর্বোত্তম বলে বিবেচিত হয় না।
কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের উচিত বাজারে তার অবস্থান এবং প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য, সুযোগ- সুবিধা এবং সম্পদের ব্যবহার ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রতিযোগিতামূলক কৌশলসমূহ নির্দিষ্ট করা। অনেক ক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পণ্যের জন্য বিভিন্ন ধরনের কৌশল প্রয়োজন হয়। সেই সাথে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন পন্থায় তাদের কৌশল পরিকল্পনা পদ্ধতি গড়ে তোলে। প্রচলিত প্রতিযোগীতামূলক কৌশলসমূহের মাঝে Micheal Porter কর্তৃক প্রবর্তিত প্রতিযোগীতামূলক কৌশল বিশেষভাবে পরিচিত। এই মতবাদ অনুযায়ী তিনটি সফলতার কৌশল হলো-
১. সার্বিক ব্যয় নেতৃত্ব (Overall Cost Ledership):
এই কৌশল অনুযায়ী বিপণনকারী সর্বদা পণ্য সংক্রান্ত ব্যয় সংকোচনের প্রচেষ্টায় থাকে বা প্রতিযোগীদের সাথে সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ অনেক ক্ষেত্রে বৃহৎ ভোক্তা শেয়ার তৈরিতে সহায়তা করে। যেমন: বাংলাদেশের মোবাইল সেট বাজারে ওয়ালটন (Walton) তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন দিয়ে ভোক্তার কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে।
২. পৃথকীকরণ (Differntiation):
এই কৌশল অনুযায়ী বিপণনকারী তার ব্র্যান্ডকে ব্যবসার ইন্ডাস্ট্রির সবচেয়ে ব্যতিক্রম ও পৃথক পণ্য সারির এবং বিপণন কার্যাবলির সমন্বয়ে গড়ে তোলে। যেমন: Hatil, Walton, Arong, (হাতিল ফার্নিচার ব্র্যান্ড, আড়ং, ওয়ালটন)|
৩. মনোযোগ (Focus):
এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বাজারকে বিবেচনা না করে যেকোনো একটি ক্ষুদ্র অংশ অথবা কিছু অংশের ওপর ফোকাস করে তাদের জন্য পণ্য সেবা এবং বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে। যেমন: হোটেল ওয়েস্টিন বা শেরাটন শুধু একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোক্তার জন্য সেবা প্রদান করে।
Micheal Porter-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী যেকোনো একটি নির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত কৌশল নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হলে সহজেই সফলতা অর্জন করবে। কিন্তু একই সাথে বিশৃঙ্খল কৌশল নিয়ে ব্যবসায় পরিচালনা করলে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকা সম্ভব হয় না। সর্বোপরি প্রতিটি প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের কৌশলে প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয় হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।
বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের অবস্থান ( Competitors’ Position in the Market):
কোনো একটি নির্দিষ্ট বাজারে নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান পৃথক পৃথকভাবে তাদের সম্পদ এবং উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হয় এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই প্রতিযোগীতামূলক বাজারের বিভিন্ন অংশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এবং ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা এবং অবস্থান ধারণ করে । প্রতিষ্ঠানের অবস্থান এবং ভূমিকা অনুযায়ী প্রতিযোগীতামূলক কৌশলসমূহ নির্ধারিত এবং পরিবর্তিত হয়। নিচে চিত্রে ১২.২ এ প্রতিযোগীতামূলক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ভোক্তা শেয়ার অনুযায়ী অবস্থান এবং ভূমিকা দেখানো হলো। বাজার নেতা, বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী, বাজার অনুসারী এবং বাজার নিসার—এই চার ধরনের প্রতিযোগীর সমন্বয়েই একটি নির্দিষ্ট বাজারের প্রতিযোগীতামূলক পরিবেশ গড়ে ওঠে।

বাজার নেতার বিপণন কৌশলসমূহ ( Marketing Strategies of Market Leader ):
একটি নির্দিষ্ট বাজার কাঠামোতে যে প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ বাজার শেয়ার দখল করে থাকে তাকে বাজার নেতা বা Market leader বলা হয়। যেহেতু বাজার নেতা সর্বোচ্চ বাজার শেয়ারের অংশীদার সাধারণত পণ্যের মূল্য পরিবর্তন, নতুন পণ্য পরিচিতকরণ, সরবরাহ পরিসর, প্রসারমূলক কর্মসূচি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার নেতার কৌশল এবং কার্যক্রম অনুসরণ করে থাকে।
বাজার নেতা সবসময় কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয় এবং তার অবস্থান ধরে রাখার জন্য নিত্যনতুন পণ্য, সেবা এবং বিপণন কৌশল অবলম্বন করে। যেমন: Google (ইন্টারনেট তথ্য সংগ্রহের সেবা), RFL (প্লাস্টিক এবং ফিটিংস পণ্য) ইত্যাদির বাজার শেয়ার। বাজার শেয়ার ধরে রাখার জন্য এবং প্রতিযোগীতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য বাজার নেতা মূলত তিন ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে ।
১. সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ (Expanding the Total Market):
এক্ষেত্রে বাজার নেতা নতুন ভোক্তা পরিসর বা বাজারে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। বাজার নেতা মূলত নতুন ভোক্তা পরিসর বা বর্তমান পণ্যের নতুন ব্যবহার অথবা বর্তমান পণ্যের অধিক ব্যবহার কৌশল গ্রহণ করে। সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণে উদ্যোগী হয়। যেমন: মেরিল (Meril) বেবি লোশন প্রথম দিকে শুধু বাচ্চাদের জন্য উৎপাদন এবং বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করত। কিন্তু বর্তমানে অধিক বাজার শেয়ার দখলের উদ্দেশ্যে বাচ্চাদের সাথে লোশন মায়েরাও ব্যবহার করতে পারে স্লোগান সংবলিত প্রসার কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
২. বাজার শেয়ার রক্ষাকরণ (Defending Market Share ) :
বাজারের সার্বাধিক অংশের অধিকারী হিসেবে বাজার নেতাকে সবসময় প্রতিযোগীদের আক্রমণের শিকার হতে হয়। প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য এবং বাজার শেয়ার রক্ষাকরণের উদেশ্যে বাজার নেতাকে সর্বদা সচেষ্ট থাকতে হয় ও বিভিন্ন প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো কৌশল হলো লাগাতার নিরবচ্ছিন্নভাবে পণ্য উন্নয়ন এবং ভোক্তা ভ্যালু সার্বাধিকরণ।
এছাড়াও বাজার নেতার দুর্বলতাসমূহ শনাক্তকরণ, দুর্বলতাসমূহ দূরীকরণ, প্রস্তাবিত ভ্যালু সঠিকভাবে সরবরাহ, প্রস্তাবিত ভ্যালুর সাথে মূল্য নির্ধারণে সামঞ্জস্য বিধান এবং ভোক্তা সুসম্পর্ক গঠন ইত্যাদি কৌশলের মাধ্যমেও বাজার শেয়ার ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে পারে। এককথায়, বাজার নেতাকে প্রাতিষ্ঠানিক যেকোনো দুর্বলতা বা সমস্যা নিশ্চিতভাবে দূর করতে হবে, যাতে প্রতিযোগীরা দুর্বলতাগুলোকে প্রতিযোগীতামূলক সুবিধায় রূপান্তর না করতে পারে।
৩. বাজার শেয়ার সম্প্রসারণ (Expanding Market Share):
বাজার নেতা এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের শেয়ার সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে পণ্যের ব্র্যান্ড ইমেজ (ভাবমূর্তি) ও বিক্রয় বৃদ্ধির চেষ্টা চালায়। অনেকেই মনে করে বাজার শেয়ার সম্প্রসারণের মাধ্যমে অধিক মুনাফা অর্জন সম্ভব এবং কিছু গবেষণা এ ধরনের ধারণার সাথে সমর্থন প্রকাশ করে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বৃহৎ বাজার শেয়ারের অধিকারী প্রতিষ্ঠানের মুনাফার হার তত বেশি নয়।
যেমন: নাভানা (Navana) ফার্নিচারের বাজার শেয়ার তুলনামূলক বেশি হলেও ফার্নিচারের ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে হাতিল উচ্চমান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড ভ্যালু, অধিক পণ্য মূল্য এবং ভোক্তাদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে অধিক মুনাফা অর্জন করে। অধিক বাজার শেয়ারের সাথে সম্পর্কিত নির্দিষ্ট মুনাফার হার, যা দ্বারা গুণগত পণ্য প্রস্তাবের সমস্ত ব্যয় নির্বাহ করার পরও উচ্চ মুনাফার সম্ভাবনা বহাল রাখে তাকেই সফলতা অর্জনের চাবিকঠি হিসেবে গণ্য হয় ।
বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর কৌশলসমূহ (Strategies of Market Challeger):
বাজারের দ্বিতীয় শেয়ার অধিকারী বা বাজার নেতার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী বা (Market challeger) বলা হয়। বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী মূলত দুই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকে। প্রতিদ্বন্দ্বীকে আক্রমণের ক্ষেত্রে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রাতিষ্ঠানিক কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং প্রতিযোগীদের বিশ্লেষণ করে এবং তদনুযায়ী কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীকে অক্রমণ করবে বা কাদেরকে আক্রমণ করা হবে না তা নির্ধারিত হয়। বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার নেতা বা অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে আক্রমণ করে থাকে। বাজার নেতাকে অক্রমণের ক্ষেত্রে বাজার নেতার সবলতা বা দুর্বলতা দুটি দিকই ব্যবহৃত হয়।
অনেক ক্ষেত্রে বাজার নেতার পণ্য, কৌশল, সেবা ইত্যাদির সবল দিকগুলো অনুসরণ করে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী অধিক বাজার শেয়ার অর্জনে সচেষ্ট হয়। আবার প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য এবং বাজার নেতার সম্পদের সাথে পার্থক্যের কারণে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার নেতার দুর্বল দিকগুলো খুঁজে বের করে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। এছাড়াও বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার নেতাকে বাদ দিয়ে বাজারের অন্য প্রতিযোগীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্যান্য অক্রমণ করে বাজার শেয়ার সম্প্রসারণের ব্যবস্থায় নিয়োজিত থাকে ।
বাজার অনুসারীর কৌশলসমূহ ( Strategies of Market Follower):
বাজার নেতাকে আক্রমণ করে পরাজিত করা অনেক কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাজার নেতা খুবই অল্প সময়েই বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীদের কৌশলসমূহ পরাজিত করে দিতে পারে। যেসব প্রতিষ্ঠান বাজার নেতাকে অনুসরণ করে এবং নিজেকে স্বতন্ত্রভাবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টায় থাকে তাদেরকে বাজার অনুসারী বলে।
বাজার অনুসারীর বাজার নেতার নতুন পণ্য উন্নয়ন, সরবরাহ প্রণালির ব্যবস্থাপনা, বিভিন্ন প্রসারমূলক কর্মকাণ্ড, নতুন বাজারের সচেতনতা বৃদ্ধির কলাকৌশল ইত্যাদি অনুসরণ করে অল্প ব্যয়ে মুনাফা বৃদ্ধির পদ্ধতি অবলম্বন করে। কিন্তু বাজার শেয়ার ধরে রাখার জন্য এবং ভোক্তা আকর্ষণ বৃদ্ধির করার জন্য পৃথকীকরণ, ভোক্তা সুসম্পর্ক গঠন এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে পণ্যের গুণগত মানের উন্নয়ন সংক্রান্ত কৌশল গ্রহণ করতে হবে।
নতুন নতুন বাজারে উচ্চ মানের পণ্য ও সেবা উপস্থাপন এবং পৃথকীকরণ ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসমূহ বাজার অনুসারীকে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে। যেমন: আগোরা (Agora) বাংলাদেশে প্রথম সুপারশপ চেইন প্রতিষ্ঠা করলেও অন্যান সুপারশপ চেইন আগোরাকে অনুসরণ করে সুপারশপ চেইন প্রতিষ্ঠা করে। ভোক্তাদের হোম ডেলিভারি সুবিধা এবং বিভিন্ন এলাকায় অধিক শাখা স্থাপন এবং বিভিন্ন অতিরিক্ত ভোক্তা সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এই সুপারশপ চেইনগুলো আগোরার বাজার শেয়ার দখলের প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকে।
বাজার নিসার এর কৌশলসমূহ (Strategies of Market Nicher):
সমগ্র বাজারে জন্য পণ্য প্রস্তাবনা সৃষ্টি না করে বাজারের বিভিন্ন ক্ষুদ্র অংশ বা যেকোনো একটি অংশের জন্য পণ্য উৎপাদন এবং বিপণন সংক্রান্ত কার্যাবলি পালনকৃত প্রতিষ্ঠানকে বাজার নিসার বা Market Nicher বলা হয়। যেহেতু শুধু একটি নির্দিষ্ট বাজার অংশকে লক্ষ করে বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় তাই বাজার নিসার প্রত্যক্ষভাবে বাজার নেতা বা অন্যদের সাথে কোনো প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয় না। বাজার নিসার প্রথমত একটি আদর্শ বাজার অংশ বা ভোক্তাশ্রেণি শনাক্ত করে, যা অধিক মুনাফাযোগ্য এবং অধিক প্রবৃদ্ধির বৈশিষ্ট্য সংবলিত হয়।
পরবর্তী ধাপে বাজার নিসার সৃজনশীলতা এবং পৃথকীকরণের সমন্বয়ের মাধ্যমে লক্ষ্যায়িত বা টার্গেট বাজারের জন্য বিশেষ পণ্য ও সেবা উৎপাদন এবং বিপণনের ব্যবস্থা করে। পণ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য বাজার নিসারের জন্য বাজারে টিকে থাকার প্রধান হাতিয়ার।
ভোক্তা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী কেন্দ্রিকতার মাঝে সামঞ্জস্য বিধান ( Balancing costomer and competitor orientations):
প্রতিদ্বন্দ্বী পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিযোগীতা মোকাবিলা একটি প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ডের মধ্যে অন্যতম। সর্বদা প্রতিযোগী পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে ভোক্তা কেন্দ্রবিন্দু থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ভোক্তা চাহিদা শনাক্তকরণ, প্রয়োজনীয় ভ্যালু উৎপাদন, ভ্যালু সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, এককথায় ভোক্তা কেন্দ্রিকতাই বিপণনকারীর মুনাফা অর্জনের একমাত্র উপায়। অতএব যেকোনো কৌশলের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ভোক্তার অবস্থান নিশ্চিত করাই প্রতিযোগীতা মোকাবিলা করার সর্বোত্তম উপায়।

সময়ের সাথে সাথে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো চার ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রিকতার বিবর্তনের সাথে পরিচিত হয়। উপরোক্ত চিত্র ১২.৩ অনুযায়ী একটি প্রতিষ্ঠান প্রথম পর্যায়ে শুধু পণ্য কেন্দ্রিকতা গ্রহণ করে। এক্ষেত্রে বিপণন কার্যাবলিতে ভোক্তা ও প্রতিযোগীকে মূল্যায়ন করা হয় না। দ্বিতীয় পর্যায়ে, বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ভোক্তা গুরুত্ব অনুধাবন করে ভোক্তা কেন্দ্রিক হয় এবং ভোক্তাদের চাহিদা, প্রয়োজন এবং সন্তুষ্টি অর্জনে সচেষ্ট হয়। তৃতীয় পর্যায়ে, বিপণনকারী প্রতিযোগী সম্পর্কে সচেতন হয় এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বিবেচনা করে।
প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য এবং প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করে। কিন্তু বর্তমান যুগে সফল বিপণন এবং সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে বাজার (বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতার সমষ্টি) এবং প্রতিযোগী উভয়কেই সমান গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হয়।
তাই চতুর্থ পর্যায়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে বাজার কেন্দ্রিক বা (Market contered company) হিসেবে ভোক্তা এবং প্রতিযোগী কেন্দ্রিকতার মাঝে সামঞ্জস্য বিধান করে নীতিনির্ধারণ করতে হয়। প্রতিযোগী কৌশলসমূহ পর্যবেক্ষণ এবং বিশ্লেষণের সাথে সাথে ভোক্তা চাহিদা নির্ধারণ, উন্নত প্রস্তাব গঠন, ভোক্তা সুসম্পর্ক স্থাপন এবং প্রতিযোগীদের তুলনায় অধিক ভ্যালু সরবরাহ নিশ্চিতকরণ অধিক কার্যকর। উত্তম বিপণনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ভোক্তা এবং ব্যবসায় পরিবেশের সমগ্রিক বৈশিষ্ট্যসমূহ অনুধাবন এবং প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণ ।

সারসংক্ষেপ:
এবং প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে থাকে। প্রতিযোগীতামূলক বাজারে ভোক্তা শেয়ার অনুযায়ী প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান গ্রহণ ও ভূমিকা পালন করে থাকে। যথা: বাজার নেতা, বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী, বাজার অনুসারী ও বাজার নিসার। যে প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ বাজার দখল করে থাকে তাকে বাজার নেতা বলা হয়। বাজার নেতা মূলত প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার জন্য তিন ধরনের কৌশল গ্রহণ করে থাকে। যথা: সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ, বাজার শেয়ার রক্ষাকরণ ও বাজার শেয়ার সম্প্রসারণ। বাজার নেতার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বা দ্বিতীয় শেয়ারের অধিকারীকে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী বলা হয়।
বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী মূলত দুই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে। প্রতিযোগীদের বিশ্লেষণ করে আক্রমণের পদ্ধতি নির্ধারণ করে অথবা বাজার নেতার দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে আক্রমণের কৌশল নির্ধারণ করে। যেসব প্রতিষ্ঠান বাজার নেতাকে অনুসরণ করে প্রতিযোগীতায় টিকে থাকার প্রয়াস চালায় তাকে বাজার অনুসারী বলে। বাজার অনুসারী বাজার নেতার বিভিন্ন কলাকৌশল অনুসরণ করা ব্যতীত বাজার শেয়ার ধরে রাখার উদ্দেশ্যে পৃথকীকরণ ব্যবস্থাপনা ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্য উপস্থাপন করে থাকে। বাজারের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশের জন্য বিপণন কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে বাজার নিসার বলা হয়।
বাজার নিসার পৃথকীকরণ ও সৃজনশীলতার | মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভোক্তাদের জন্য বিশেষ পণ্য উৎপাদন ও বিপণন করে থাকে। এছাড়াও ভোক্তা কেন্দ্রিকতার প্রতি দৃষ্টি রাখার প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানগুলো সময়ের সাথে সাথে চার ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রিকতার সাথে পরিচিত হয়। যথা: পণ্য কেন্দ্রিকতা, ভোক্তা কেন্দ্রিকতা, প্রতিযোগী কেন্দ্রিকতা এবং বাজার কেন্দ্রিকতা।
