প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “প্রতিযোগিতা মূলক সুবিধা অর্জন” ইউনিট ১২ এর অন্তর্ভুক্ত।

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

একসময় বাংলাদেশের লবণের সবচেয়ে বিখ্যাত ব্র্যান্ড ছিল ‘মোল্লা সল্ট’। মোল্লা সল্ট তাদের বিজ্ঞাপনে প্রথম আয়োডিনযুক্ত লবণ বৈশিষ্ট্যটি তুলে ধরে বাজারের সবচেয়ে বহুল পরিচিত এবং বিক্রীত ব্র্যান্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো নিজেদের পণ্যের উন্নতমান এবং মিহি লবণে দানাযুক্ত সুবিধা নিয়ে প্রবেশ করে। পরবর্তী সময়ে মোল্লা সল্ট প্রতিযোগীদের সাথে সমাঞ্জস্যপূর্ণ গুণগতমান এবং ব্র্যান্ড নামের পরিবর্তন করে মোল্লা সুপার সল্ট হিসেবে পরিচিত হলেও পূর্বের ন্যায় বাজার শেয়ার বা ভোক্তা মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি।

মোল্লা সল্টের ন্যায় বর্তমান যুগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই তীব্র প্রতিযোগীতার সম্মুখীন হয়। বর্তমান বিশ্বয়ানের যুগে প্রতিযোগীতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য প্রতিষ্ঠানকে সঠিক পণ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি শক্তিশালী ভোক্তা সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়। তীব্র প্রতিযোগীতা এবং জটিল ব্যবসায়িক পরিবেশে প্রত্যেক বিপণনকারীরই উচিত প্রথাগত উৎপাদন ও বিক্রয় দর্শন থেকে বের হয়ে ভোক্তা এবং বিপণন দর্শন ব্যবহার করা। সফল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের বিপণন করার জন্য শুধু ভোক্তা চাহিদা এবং প্রয়োজন বুঝতে পারাই যথেষ্ট নয় বরং অধিক ভোক্তা সন্তুষ্টি এবং ভ্যালু সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী ভোক্তা সম্পর্ক ও প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জন করা একান্ত প্রয়োজন।

 

 

প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা কী?

What is Competitive Advantage?

প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা বলতে প্রতিযোগীদের তুলনায় কোনো বিশেষ সুবিধার কারণে সর্বোচ্চ ভোক্তা সন্তুষ্টি এবং ভ্যালু প্রদানের ক্ষমতা অর্জনকে বোঝায়। যে সুবিধা প্রতিযোগীরা সহজে নকল করতে পারে না এবং প্রতিষ্ঠানকে সর্বোচ্চ ভোক্তা ভ্যালু অর্জনে সহায়তা করবে। প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা এবং সর্বোচ্চ ভ্যালু প্রদানের মাধ্যমে ভোক্তার কাছে বিপণনকারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন (প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা ভোক্তা সুবিধায় পরিণত হওয়া) হয় এবং অন্যান্য প্রতিযোগীর তুলনায় সেই নির্দিষ্ট বিপণনকারীর প্রতিষ্ঠানকে অগ্রাধিকার প্রদান করে।

 

প্রতিযোগী বিশ্লেষণের ধাপসমূহ ( Steps in Competitor Analysis):

শক্তিশালী ভোক্তা সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি এবং সফল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য একজন বিপণনকারীর প্রথম কাজ হলো, বাজারে বর্তমান এবং সম্ভাব্য প্রতিযোগীদের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা এবং তা সঠিক বিশ্লেষণ করা। প্রতিযোগীতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য বিশ্লেষণই বিপণনকারীর জন্য প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা নির্ধারণের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। প্রতিযোগী এ পর্যন্ত যে সকল সুযোগ-সুবিধা ভোক্তাগণকে প্রদান করতে ব্যর্থ হয়েছে তার থেকে কোনো একটি বা সমগ্র অবস্থাকে বিবেচনা করে ভোক্তার জন্য ওই সকল সমস্যা থেকে প্রয়োজনীয় সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জিত হয়।

প্রতিযোগী বিশ্লেষণ বলতে ব্যবসায় বাজারে বিদ্যমান বর্তমান এবং সম্ভাব্য প্রতিযোগী শনাক্তকরণ, বিশ্লেষণ এবং প্রধান প্রতিযোগী নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যাবলির সমষ্টিকে বোঝায়। একে প্রতিযোগীতা বিশ্লেষণও বলে। চিত্র ১২.১ এ প্রতিযোগিতা বিশ্লেষণের ধাপসমূহ দেখানো হয়েছে।

 

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

 

 

১. প্রতিযোগী সনাক্তকরণ (Identifying Competitor):

প্রতিযোগী শনাক্তকরণ আপাত দৃষ্টিতে সহজ মনে হলেও একটি পণ্যের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রতিযোগীদের সংখ্যা নির্ধারণ জটিল এবং শ্রমসাধ্য বিষয়। সাধারণত একটি প্রতিষ্ঠান তার সমজাতীয় পণ্য ও সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান যারা একই বাজার বা ভোক্তা শ্রেণিকে ভ্যালু প্রদান করে তাদেরকে প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু বৃহৎ অর্থে প্রতিযোগী বলতে নির্দিষ্ট পণ্যের সমজাতীয় পণ্য বা পণ্য শ্রেণির উৎপাদনকারী এবং বিপণনকারী সকল প্রতিষ্ঠানই প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচিত হয়। এক্ষেত্রে একটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে প্রতিযোগী শনাক্ত করতে পারে। যেমন: ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্প ধারণা অনুসারে: এক্ষেত্রে একই শিল্পের আওতায় বা সংজ্ঞায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগী হিসেবে ধরা হয়।

যেমন: পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, ইস্পাত শিল্প ইত্যাদি। বাজার বা ভোক্তা ধারণা অনুসারে একই ভোক্তা গ্রুপকে সন্তুষ্টি এবং ভ্যালু প্রদানের সাথে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিযোগী হিসেবে গণ্য করা হয়। যেমন: ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ইত্যাদি।

 

২. প্রতিযোগী বিশ্লেষণ (Competitor Analysis):

প্রতিযোগীদের সংখ্যা এবং ধরন শনাক্তকরণের পরবর্তী কাজ হলো প্রতিটি প্রতিযোগীর উদ্দেশ্য, প্রতিযোগীদের কৌশল, সবলতা, দুর্বলতা এবং প্রতিক্রিয়ার ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা।

 

ক. উদ্দেশ্য (Objectives):

উদ্দেশ্য বলতে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান বিপণনের মাধ্যমে কী ধরনের ফলাফল অর্জনের চেষ্টা করে, এক্ষেত্রে বিপণনকারী প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মুনাফার হার, প্রবৃদ্ধির হার, মূলধন সরবরাহ, প্রযুক্তি ও সেবার ক্ষেত্রে নেতৃত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্দেশ্যাবলি থেকে সেই প্রতিযোগীর ভবিষ্যৎ বাজার পরিকল্পনা এবং বিপণন কার্যাবলির প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়।

 

খ. কৌশল (Strategy):

একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কৌশল যত বেশি অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে সমাঞ্জস্যপূর্ণ হবে তত বেশি প্রতিযোগীতা বাড়বে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় কয়েকজন প্রতিযোগীরা মিলে কৌশলগত দল (Strategic Group) তৈরি করে, যারা একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে পণ্য বিপণন করে। যেমন: গাড়ি প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান Toyata এবং Ford কৌশলগত দল তৈরি করে, একই কৌশল গ্রহণ করে অন্য গাড়ি প্রস্তুতকারি প্রতিযোগীদের সাথে প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করে।

এ জন্য প্রতিযোগীদের বিভিন্ন ব্যবসায়িক কৌশল; যেমন: পণ্যের গুণগত মান, বৈশিষ্ট্য এবং পণ্য মিশ্রণ, ভোক্তা সেবাসমূহ, মূল্য নির্ধারণ কৌশল, পণ্য বিপণন অবস্থানসমূহ, প্রসার কার্যক্রম, কাঁচামাল ক্রয়, গবেষণা এবং উন্নয়ন সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্যসমূহ নতুন প্রতিযোগীতামূলক কৌশল তৈরিতে ইনপুট বা প্রধান সহায়ক হিসেবে কাজ করে।

 

গ. সবলতা ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ (Analysing Strengths and Weaknesses):

বিপণনকারী বিভিন্ন উৎস হতে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের সবলতা ও দুর্বলতা সম্পর্কে তথ্য পেতে পারে। যেমন: পূর্ব ইতিহাস, সেকেন্ডারি তথ্য, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সুনাম এবং মুখের কথা (Word of mouth) ছাড়াও ভোক্তা, কাঁচামাল সরবরহকারী, মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের উপর বিপণন গবেষণার মাধ্যমে প্রতিযোগীদের তথ্য পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বিণনকারী প্রতিযোগীদের সবলতা ও দুর্বলতাকে মানদণ্ড (Benchmark) হিসেবে ধরে নিজের প্রতিষ্ঠানের কার্যাবলির বিশ্লেষণ করে এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি বের করে ।

 

ঘ. প্রতিযোগীর প্রতিক্রিয়া পূর্বানুমান (Forecasting Competitor’s Reactions) :

শেষ ধাপে বিপণনকারী প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পূর্বানুমান করে। প্রতিক্রিয়া বলতে বিপণনকারীর গৃহীত বিপণন কৌশলের বাস্তবায়ন এবং কার্যাবলির জন্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে বোঝায়। যেমন: বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ শিল্পে Grameenphone (GP) ও Banglalink (BL) দুইটি প্রতিষ্ঠান। GP কোনো কারণে কলরেট কমালে BL বা অন্যান্য প্রতিযোগীও একই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে কিনা তা GP তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে পূর্বানুমান করতে পারে ।

 

৩. প্রধান প্রতিযোগী নির্ধারণ (Selecting Key Competitor):

এ পর্যায়ে বিপণনকারী সিদ্ধান্ত নেয় যে পূর্বে বিশ্লেষণকৃত প্রতিযোগী তালিকা থেকে কোন্ কোন্ প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে এবং কোন্ কোন্ প্রতিষ্ঠানকে তালিকা থেকে বাদ দেবে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সবচেয়ে দুর্বল প্রতিযোগীদের টার্গেট করেও বিপণনকারী ব্যবসার কৌশল নির্ধারণ করে। প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান বা বিপণনকারী মূলত প্রতিষ্ঠানের ক্রেতা প্রস্তাবকে (Customer Offer) প্রতিযোগীদের প্রস্তাবের সাথে তুলনা করে এবং ভোক্তাদের সর্বোচ্চ ভ্যালু প্রদান ও মুনাফা অর্জনের জন্য ব্যবসায় পরিবেশে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান খুঁজে বের করে, যেখানে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীরা সফল হবে না ।

প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা

সারসংক্ষেপ

প্রতিযোগীদের তুলনায় সর্বোত্তমভাবে কোনো বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জন ও সর্বোচ্চ ভ্যালু সরবরাহ নিশ্চিতকরণের ক্ষমতাকে প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা বলা হয়। প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের জন্য | প্রতিযোগীতা বিশ্লেষণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। প্রতিযোগীতা বিশ্লেষণের বিভিন্ন ধাপ রয়েছে।

যথা: নির্দিষ্ট প্রতিযোগীদের শনাক্তকরণ, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণ এবং প্রধান প্রতিযোগী নির্বাচন। প্রতিযোগীতামূলক | সুবিধা অর্জনের জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ একান্ত প্রয়োজন। এক্ষেত্রে প্রতিযোগী | প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য, কৌশলসমূহ, সবলতা ও দুর্বলতা এবং প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করতে হয়। বিশ্লেষণকৃত তথ্য অনুযায়ী বিপণনকারী প্রধান প্রতিযোগী নির্বাচন করে।

Leave a Comment