প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণ

প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর  “ব্যক্তিক বিক্রয় এবং প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন” ইউনিট ১১ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণ

 

প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন কাকে বলে?

What is Direct and Digital Marketing?

প্রথম দিকে বাজার চাহিদা বৃদ্ধি, বিক্রয় এবং প্রসারমূলক কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য গণবিজ্ঞাপনকেই একমাত্র মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। নতুন নতুন প্রযুক্তির সাথে সাথে প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা উৎপাদক ও ক্রেতার মাঝে পারস্পরিক ক্রিয়াশীল এবং সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে অধিক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণনের মাধ্যমে ক্রেতারা ঘরে বসেই প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবা সম্পর্কে সব ধরনের তথ্য অবহিত হতে পারে এবং সহজে ক্রয় করতে পারে।

 

Philip Kotler 4 Gary Aramstrong-4, “Direct marketing is the use of consumer direct channels to reach and deliver goods and services to customers without using marketing middleman.” অর্থাৎ বিপণন মধ্যস্থ ব্যবসায়ীদের সহায়তা ছাড়া ভোক্তাদের নিকট পণ্য ও সেবা পৌঁছানোর প্রত্যক্ষ প্রণালিকে প্রত্যক্ষ বিপণন বলা হয়।

 

প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন ব্যবহার করে একটি প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদের মাঝে পণ্য বা সেবা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি, ব্র্যান্ড ইমেজ প্রতিষ্ঠা, ব্র্যান্ড ইমেজ বৃদ্ধি, নির্দিষ্ট প্রসারমূলক কার্যাবলির প্রতি প্রতিক্রিয়া ও সাড়া প্রদান বৃদ্ধি এবং ক্রেতা সুসম্পর্ক সৃষ্টি সহজভাবে করতে পারে। বর্তমানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ভোক্তাদের সাথে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে অনেক দ্রুত এবং সহজ করে তুলছে। একটি প্রতিষ্ঠান খুব কম ব্যয়ে এবং অল্প সময়ে সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয় প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে।

কোনো প্রকার মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ব্যতীত কোনো পণ্য বা সেবা সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিকট বিক্রয় এবং প্রসারমূলক কার্যক্রম পরিচালনাকে প্রত্যক্ষ বিপণন বলে। অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিকট পৌছানোর জন্য ইন্টারনেট, মুঠোফোন, সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, সার্চ ইঞ্জিনসহ অন্যান্য যেকোনো ধরনের ইলেকট্রনিক মাধ্যমসমূহ ব্যবহারের পদ্ধতিকে ডিজিটাল বিপণন বলা হয়। যেমন: রকমারি ডটকম (Rokomari.com), ফুড পাণ্ডা (Food Panda), আমাজন (Amazon), ডেল (Dell) ইত্যাদি।

 

ডিজিটাল বিপণ

 

প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণনের প্রবৃদ্ধি ও সুবিধাসমূহ

Growth and Benefits of Direct and Digital Marketing

বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সাথে সাথে প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। অধিকতর ভোক্তা ভ্যালু চাহিদা, সময়স্বল্পতা, উন্নত অর্থ স্থানান্তর সুবিধা, ব্যয় সংকোচন, নতুন নতুন আকর্ষণীয় যোগাযোগ মাধ্যমের উদ্ভব ইত্যাদি বিপণনকারীদের নতুন নতুন বিপণন মাধ্যম ব্যবহারে উৎসাহিত করে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন একক ভোক্তা অভিরুচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভ্যালু মিশ্রণ সৃষ্টি এবং স্বল্প ব্যয়ে দীর্ঘমেয়াদি ভোক্তা সুসম্পর্ক অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ব্যবহার করে ক্রেতা এবং বিপণনকারী উভয় পক্ষই লাভবান হচ্ছে।

ক) ক্রেতার সুবিধাসমূহ (Benefits to Buyers) : প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ক্রেতাদের জন্য সহজে এবং স্বল্প ব্যয়ে পণ্যদ্রব্য ক্রয়ের নতুন সমাহার সৃষ্টি করে। নিচে ক্রেতাদের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিপণন সুবিধাসমূহ বর্ণনা করা হলো:

→  প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ক্রেতাদের যেকোনো স্থান থেকে সহজে এবং সুবিধাজনক পণ্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করে থাকে। প্রতিটি পণ্য সম্পর্কিত তথ্যভাণ্ডার এবং সব ধরনের বিস্তারিত বিবরণ এবং প্রতিযোগী পণ্য যাচাইয়ের সুযোগ ও ভোক্তার ক্রয়ের সিদ্ধান্তকে সহজ ও তরান্বিত করে। যেমন: অনলাইন বইয়ের দোকান থেকে ক্রেতা হাজার হাজার বই অন্যান্য ভোক্তার মন্তব্যসহ যাচাই করে সহজে ক্রয় করতে পারে।

→  ক্রেতার পণ্য বা সেবা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঘরে বসেই ক্রয় করতে সক্ষম হয়। বিক্রয়কর্মীর প্ররোচনা বা প্রভাব ক্রেতার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে না। ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতারা বিক্রয়কর্মী বা প্রদর্শনীর অপেক্ষা ছাড়াই সহজে পছন্দনীয় উৎস হতে তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

→  প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থার ক্রেতা তার সুবিধাজনক সময়ে বিক্রেতার সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের মাধ্যমে ভ্যালু চাহিদা উপস্থাপন, পণ্য নির্বাচন এবং তাৎক্ষণিক সরবরাহ সেবা নিশ্চিত করতে পারে। যেমন: ফুড পাণ্ডায় পছন্দমতো রেস্টুরেন্ট থেকে ভোক্তা প্রয়োজনীয় খাবার অর্ডার করা, খাবার প্রস্তুতি থেকে ক্রেতার অবস্থানে পৌছানো পর্যন্ত প্রক্রিয়া অ্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় এবং নির্ধারিত সময়ে ভোক্তার পছন্দনীয় স্থনে পণ্য সরবরাহ করা হয়।

→  প্রত্যক্ষ বিপণন ব্যবস্থায় ক্রেতা ও বিপণনকারীর মাঝে দ্বিমুখী যোগাযোগ গঠিত হয়। পণ্য বা সেবা সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ ক্রেতা সহজেই বিপণনকারীর নিকট উপস্থাপন করে বিপণনকারীকে উন্নত ভ্যালু মিশ্রণ সৃষ্টিতে সহায়তা করে ।

→  ক্রেডিট কার্ড, অনলাইন অর্থ স্থানান্তর, মোবাইল ব্যাকিং ইত্যাদি ব্যবস্থাপনার কারণে দেনা-পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে অর্থ বহন এবং অর্থ প্রদান সংক্রান্ত জটিলতা হ্রাস পেয়েছে।

→  যোগাযোগ এবং তথ্য সংগ্রহের সুবিধার সাথে সাথে ক্রেতা সারা বিশ্বের পণ্য ও সেবার তথ্য সংগ্রহ, যাচাই, অর্ডার প্রদান এবং নিজ ভৌগোলিক সীমানায় পণ্য প্রাপ্তির সুবিধা পাচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ক্রেতাকে সঠিক পণ্য বিপণনকারীর সাথে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্ত থেকে প্রাপ্তির পথ সুগম করে দিয়েছে।

 

Marketing, Marketing Gurukul, GOLN, মার্কেটিং, মার্কেটিং গুরুকুল, বিপণন, مارکیٹنگ , تسويق , विपणन

 

খ) বিক্রেতার সুবিধা (Benefits to Sellers ) : 

→ বিপণনকারীর জন্য প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা লক্ষ্যায়িত বা টার্গেট বাজারকে কম খরচে, সহজে এবং দ্রুতগতিতে পণ্য ও সেবা সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি করে থাকে।

→ প্রযুক্তিগত উন্নয়ন বিপণনকারীকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বা একক ভোক্তা বাজারকে নির্বাচন করে তাদের প্রয়োজনীয় ভ্যালু মিশ্রণ সহজেই পূরণ করতে পারে। তাৎক্ষণিক যোগাযোগ ভোক্তা অভিরুচি পরিবর্তন ও সমস্যা সংক্রান্ত তথ্য দ্রুত সংগ্রহের মাধ্যমে অধিক ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে প্রয়োজন অনুযায়ী ভ্যালু মিশ্রণে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।

→ ক্রেতাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক স্থাপন এবং ধরে রাখার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থা সর্বোচ্চ কার্যকর মাধ্যম। বিশাল তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং ক্রেতা সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্ত সহজে ব্যবহারের মাধম্যে বিপণনকারী ক্রেতাদের সাথে জোরালো এবং শক্তিশালী সম্পর্ক গঠন করে ক্রেতা আনুগত্য সৃষ্টি করে থাকে। সারা পৃথিবীর ক্রেতাদের সাথে মুহূর্তেই যোগাযোগ আনুগত্য সৃষ্টিতে সহায়তা করে। যেমন: ভোক্তা প্রোফাইল অনুযায়ী ক্রেতাদের বিশেষ দিনে (জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী ইত্যাদি) শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো, নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয় সংক্রান্ত স্মরণী বার্তা, বিশেষ ছাড় ঘোষণা সহজেই ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়তা করে।

→ বিপণনকারী অধিকতর নমনীয়ভাবে পণ্য ও সেবা সংক্রান্ত যেকোনো পরিবর্তন সচল করতে পারে প্রত্যক্ষ বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে যা অন্যান্য মাধ্যমে সম্ভব নয়। প্রায় প্রতিদিনই পণ্যের মূল্য, অফার, প্রসার, পণ্যের মান, সহায়ক সেবা ইত্যাদির পরিবর্তন সাধন সম্ভব হয়।

→ ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থা, ইন্টারনেট, অনলাইন বিক্রয়, ইলেকট্রনিকস যোগাযোগ ব্যবহার বিপণন ব্যয় ব্যাপকভাবে হ্রাস করে দেয়। পণ্য সংক্রান্ত, দোকান ভাড়া, অগ্রিম ভাড়া প্রদান, উপযোগ সৃষ্টিজনিত ব্যয়, বিক্রয়কর্মীর সংখ্যা হ্রাস এবং অন্যান্য ব্যয় খুবই সীমিত আকার ধারণ করে প্রত্যক্ষ বিপণনের মাধ্যমে। একই সাথে দক্ষতা বৃদ্ধি ও দ্রুতগতি নিশ্চিত করে।

→ বর্তমান যুগে সামগ্রিক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে প্রত্যক্ষ এবং ডিজিটাল বিপণন ক্রেতা-বিক্রেতার জন্য একমাত্র মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে থেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ সারা বিশ্বে জীবনযাত্রা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে ব্যাপক পরিবর্তন সৃষ্টি করছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং সংক্রমণ রোধে ক্রেতা- বিক্রেতা উভয়ই প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণনকে একমাত্র মাধ্যম হিসেবে প্রাধান্য দিচ্ছে। অনলাইন ক্রয়- বিক্রয়, যোগাযোগে ডিজিটাল মাধ্যম, হোম ডেলিভারি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার ইত্যাদির ব্যাপক ব্যবহার ও চাহিদা পুরো পৃথিবীব্যাপী প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন ব্যবস্থাকে আরো জোরদার করে তুলেছে।

 

Marketing, Marketing Gurukul, GOLN, মার্কেটিং, মার্কেটিং গুরুকুল, বিপণন, مارکیٹنگ , تسويق , विपणन

 

সারসংক্ষেপ

কোনো প্রকার মধ্যস্থ ব্যবসায়ী ব্যতীত পণ্য বা সেবা ভোক্তার নিকট সরাসরি বিক্রয়কে প্রত্যক্ষ বিপণন বলে। অন্যদিকে সম্ভাব্য ক্রেতাদের নিকট বিপণনের উদ্দেশ্যে ডিজিটাল প্রযুক্তি বা ইলেকট্রনিকস মাধ্যমসমূহের ব্যবহারকে ডিজিটাল বিপণন বলা হয়। প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে ক্রেতা ও বিপণনকারী উভয় পক্ষ‍ই উপকৃত হন। ক্রেতারা সাধারণত সহজ ক্রয়, নিজস্ব সিদ্ধান্ত, তাৎক্ষণিক যোগাযোগ অভিযোগ জানানো, ক্রয়ের ঝুঁকি হ্রাস, বিশ্বব্যাপী যোগাযোগ ইত্যাদি সুবিধা পেয়ে থাকে। বিপণনকারীর অধিক ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জন, ক্রেতাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সুসম্পর্ক স্থাপন, ভ্যালু পরিবর্তন, স্বল্প ব্যয় ইত্যাদি সুবিধা ভোগ করে থাকে।

প্রত্যক্ষ ও ডিজিটাল বিপণন

Leave a Comment