বণ্টন প্রণালি একীভূতকরণ ও দ্বন্দ্বসমূহ

বণ্টন প্রণালি একীভূতকরণ ও দ্বন্দ্বসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “বিপণন প্রণালি ব্যবস্থাপনা” ইউনিট ১১ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

বণ্টন প্রণালি একীভূতকরণ ও দ্বন্দ্বসমূহ

ব্যবসায়ীক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে বণ্টন প্রণালির কাঠামোর পরিবর্তন হতে পারে। কখনো বিভিন্ন সদস্যের আবির্ভাব হতে পারে আবার বিদ্যমান প্রণালির সদস্যের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে ।

 

বিপণন প্রণালি একীভূতকরণ (Marketing Channel Integration):

প্রণালি সদস্যরা পণ্য বিতরণ ছাড়াও বিপণনের কার্যক্রমে তাদের ব্যাপক ভূমিকার কারণে প্রচলিত বিপণন প্রণালি পরিবর্তিত হয়ে নতুন বিপণন প্রণালির প্রবর্তন হচ্ছে। সেখানে বিপণন প্রণালির সদস্যরা একসাথে কাজ করতে বেশি আগ্রহী থাকে। সেইসব নতুন প্রণালি নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

 

১. উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Vertical Marketing System):

এই বিপণন পদ্ধতিতে বণ্টন প্রণালিতে উৎপাদনকারি, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর কার্যক্রম ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালিত হয়। চিত্র নং ১১.৫ এ প্রচলিত ও উলম্ব বিপণন প্রণালির মধ্যে পার্থক্য দেখানো হয়েছে। প্রচলিত প্রণালির উলম্ব বিপণন প্রণালির সদস্যরা চুক্তিদ্ধ সম্পর্ক স্থাপন করে সহযোগিতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রণালির কাজ সম্পাদন করে। উলম্ব বিপণন পদ্ধতি তিন ধরণের হয়ে থাকে, সেগুলো হলো-

 

 

ক) কর্পোরেট উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Corporate Vertical Marketing System):

পণ্যের উৎপাদন এবং বণ্টনের সমাগ্রিক কার্যক্রম একই মালিকানায় সম্পাদিত হলে তাকে কর্পোরেট উলম্ব বিপণন পদ্ধতি বলে। এক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠান নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক প্রণালি ব্যবহার করে থাকে।

খ) চুক্তিবদ্ধ উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Contactual Vertical Marketing System):

পারস্পরিক চুক্তির ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদন ও বণ্টনে নিয়োজিত বিভিন্ন স্তরের স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো পণ্য বণ্টনের কাজ সম্পাদন করলে তাকে চুক্তিবদ্ধ উলম্ব বাজারজাতকরণ পদ্ধতি বলে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বণ্টন কর্মীদের সাথে চুক্তির মাধ্যমে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংঘাত নিয়ন্ত্রণ করা হয়। আবার, উৎপাদন ও বণ্টন দক্ষতা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিপুল পরিমাণে খরচ হ্রাস করা সম্ভব হয়।

গ) নিয়ন্ত্রণাধীন উলম্ব বিপণন পদ্ধতি (Administered Vertical Marketing System):

যখন কোনো প্রতিষ্ঠান তার আয়তন এবং ক্ষমতাকে ব্যবহার করে উৎপাদন এবং বণ্টনের স্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধণের চেষ্টা করে তখন তাকে নিয়ন্ত্রণাধীন উলম্ব বাজারজাতকরণ পদ্ধতি বলে। এক্ষেত্রে প্রভাবশালী এক বা একাধিক বণ্টনকর্মীরা নেতৃত্ব দিয়ে থাকে ।

 

২. সমান্তরাল বিপণন পদ্ধতি (Horizontal Marketing System):

এধরণের বিপণন পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হ্রাস করার জন্য অথবা নতুন কোনো বিপণন সুযোগ গ্রহণের জন্যএকই স্তর বা পর্যায়ের দুই বা ততোধিক বিপণন প্রণালির সদস্যরা একত্রিক হয়ে কাজ করে ।

 

৩. বহুপ্রণালি বিপণন পদ্ধতি (Multi Channel / Hybrid Marketing System):

এধরনের বিপণন পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান পণ্য বিতরণ করার জন্য একইসাথে দুই বা ততোধিক বিপণন প্রণালি ব্যবহার করে। ক্রেতার বিস্তৃতি ও প্রণালি সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাবার ফলে বহু প্রণালি বিপণন পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এ পদ্ধতির ফলে ভোক্তার নিকট পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়, সামগ্রিকভাবে মুনাফা বৃদ্ধি পায় এবং বৃহৎ ও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে সুফল পাওয়া যায়।

 

বণ্টন প্রণালি একীভূতকরণ

 

বিপণন প্রণালি দ্বন্দ্ব (Marketing Channel Conflict):

প্রতিষ্ঠানের প্রণালির সদস্যদের মাঝে বিভিন্ন কারণে অনেক সময়ই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে। প্রণালি সদস্যদের মধ্যে যখন উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে মত পার্থক্য হয় এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয় তখন তাকে প্রণালি দ্বন্দ্ব বলে। প্রণালির মধ্যে অবস্থানকারী প্রতিটি সদস্য একে অপরের ওপর নির্ভরশীল এবং প্রতিটি সদস্যের সফলভাবে কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে প্রণালির সার্বিক সফলতা নির্ভর করে। কিন্তু অনেক সময়ই স্বল্পমেয়াদি স্বার্থের জন্য বা অস্পষ্ট ভূমিকা, লক্ষ্যে অসামঞ্জস্যতা অথবা ভোক্তার অভিযোগের কারণে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে পারে। প্রণালিতে দ্বন্দ্বের কারণে কখনও প্রণালির কার্যকারিতা বাধাপ্রাপ্ত হলেও অনেক সময় সুস্থ প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হতে পারে।

সমগ্র প্রণালিতে খারাপ প্রভাব পূর্বেই বিভিন্ন প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়। সাধারণত পারস্পরিক চুক্তি, অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রণালির দ্বন্দ্ব হ্রাস করা সম্ভব হয়। প্রণালি দ্বন্দ্বকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়; যথা-

 

১. উলম্ব প্রণালি দ্বন্দ্ব (Vertical Channel Conflict):

একই প্রণালির বিভিন্ন স্তরের সদস্যদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হলে তাকে উলম্ব প্রণালি দ্বন্দ্ব বলে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় যে, কলম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান মেটাডর যদি পাইকারি ব্যবসায়ীর পরিবর্তে সরাসরি খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে পণ্য বিক্রয় করলে উৎপাদক ও পাইকার ব্যবসায়ীর মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় আবার, কলমের পাইকারি ব্যবসায়ী যদি খুচরা ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রয় করার পরিবর্তে সরাসরি ভোক্তার কাছে পাইকারি মূল্যে পণ্য বিক্রয় করলে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর মাঝে মতপার্থক্যের তৈরি হয়।

 

২. সমান্তরাল প্রণালি দ্বন্দ্ব (Horizontal Channel Conflict):

এই স্তরের বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়। তাকে সমান্তরাল দ্বন্দ্ব বলে। যেমন- মেটাডর কলমের ক্ষেত্রে নীলক্ষেতের খুচরা ব্যবসায়ী যদি শান্তিনগরের খুচরা ব্যবসায়ীর তুলনায় কম মূল্যে কলম বিক্রয় করলে ঢাকার দুই এলাকার খুচরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমান্তরাল প্রণালি দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।

 

৩. বহু প্রণালি দ্বন্দ্ব (Multi Channel Conflict):

যখন উৎপাদনকারী একই বাজার বিভাগে দুই বা ততোধিক বণ্টন প্রণালি ব্যবাহার করে এবং এদের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয় তাকে বহু প্রণালি দ্বন্দ্ব বলে ।

বণ্টন প্রণালি একীভূতকরণ ও দ্বন্দ্বসমূহ

 

বণ্টন প্রণালি একীভূতকরণ ও দ্বন্দ্বসমূহ পাঠের সারসংক্ষেপ:

প্রণালি সদস্যরা পণ্য বিতরণ ছাড়াও বিপণনের কার্যক্রমে তাদের ব্যাপক ভূমিকার কারণে প্রচলিত বিপণন প্রণালি পরিবর্তিত হয়ে নতুন বিপণন প্রণালির প্রবর্তন হচ্ছে। উলম্ব পদ্ধতিতে বণ্টন প্রণালিতে উৎপাদনকারি, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর কার্যক্রম ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালিত হয়। উলম্ব বিপণন পদ্ধতি তিন ধরণের হয়ে থাকে, সেগুলো হলো- ক) কর্পোরেট উলম্ব বিপণন পদ্ধতি, খ) চুক্তিবদ্ধ উলম্ব বিপণন পদ্ধতি ও গ) নিয়ন্ত্রণাধীন উলম্ব বিপণন পদ্ধতি। সমান্তরাল বিপণন পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা হ্রাস করার জন্য অথবা নতুন কোনো বিপণন সুযোগ গ্রহণের জন্যএকই স্তর বা পর্যায়ের দুই বা ততোধিক বিপণন প্রণালির সদস্যরা একত্রিক হয়ে কাজ করে।

বহুপ্রণালি বিপণন পদ্ধতিতে একটি প্রতিষ্ঠান পণ্য বিতরণ করার জন্য একইসাথে দুই বা ততোধিক বিপণন প্রণালি ব্যবহার করে। প্রতিষ্ঠানের প্রণালির সদস্যদের মাঝে বিভিন্ন কারণে অনেক সময়ই দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হতে পারে। প্রণালি সদস্যদের মধ্যে | যখন উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে মত পার্থক্য হয় এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয় তখন তাকে প্রণালি দ্বন্দ্ব বলে। প্রণালি দ্বন্দ্বকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়; যথা- উলম্ব প্রণালি দ্বন্দ্ব, সমান্তরাল প্রণালি দ্বন্দ্ব ও বহু প্রণালি দ্বন্দ্ব ।

Leave a Comment