বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “বিপণন পরিবেশ, তথ্য সংগ্রহ ও চাহিদার পূর্বপরিকল্পনা” ইউনিট ৩ এর অন্তর্ভুক্ত।
বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ
বিপণনকারী বাজার পরিবেশ ও বিপণন গবেষণার মাধ্যমে আকর্ষণীয় বাজার সুযোগকে খুঁজে বের করে। এরপর সেসব নতুন বাজার সুযোগের আকার, আয়তন, বৃদ্ধি ও মুনাফার সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। বিপণনকারী এইসব তথ্যের ভিত্তিতে বিক্রয়ের পরিমাণ পূর্বানুমান করে বাজার চাহিদা পরিমাপ করে। এরফলে ব্যবসায়ে কতটা বিনিয়োগ করা প্রয়োজন বিপণনকারী সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে । পণ্যের বাজার চাহিদা পরিমাপ ও পূর্বানুমান করার জন্য বর্তমান বাজার ও ভবিষ্যৎ বাজারের চাহিদা পরিমাপ করা হয় ।
বর্তমান চাহিদা নির্ধারণ
Estimating Current Demand
প্রতিষ্ঠান বর্তমান চাহিদা নির্ধারণ করার জন্য মোট বাজার সম্ভাব্যতা, এলাকা বাজার সম্ভাব্যতা, বাজার গঠন পদ্ধতি ও বহু উপাদানবিশিষ্ট সূচক পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। তা নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১. মোট বাজার সম্ভাব্যতা (Total Market Potential): মোট বাজার সম্ভাব্যতা বলতে কোনো একটি নির্দিষ্ট শিল্প অর্থাৎ একই পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত সকল ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সর্বাধিক কত পরিমাণ বিক্রয় করতে পারে তার মোট পরিমাণকে বোঝায়। মোট বাজার সম্ভাব্যতার পরিমাণ একটি নির্দিষ্ট সময়ে এবং বিরাজমান পরিবেশে সেই শিল্পের প্রয়োগকৃত সকল বিপণন প্রচেষ্টাকে বিবেচনা করে নিরূপণ করা হয়।
এটি পরিমাপ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সম্ভাব্য বা ভবিষ্যৎ ক্রেতাকে গড় ক্রয়ের পরিমাণ ও মূল্য দিয়ে গুণ করে বের করা হয়। ধরা যাক, বাংলাদেশে ৫,০০,০০০ লোক প্রতি বছর ৫টি করে কলম ক্রয় করে, যার ক্রয়মূল্য ১০ টাকা। তাহলে মোট বাজার সম্ভাব্যতা হবে- ৫,০০,০০০ x ৫ x ১০ = ২৫,০০০,০০০ টাকার। কিন্তু এই হিসাব করা সহজ নয়। কারণ একটি বাজারে কতজন ক্রেতা রয়েছে তা বের করা কঠিন। সাধারণত একটি বাজারের মোট জনসংখ্যা নিয়ে হিসাব শুরু করা হয়। বিপণনকারী এরপর মোট জনসংখ্যার কতজন পণ্য ক্রয় করবে তা বাদ দিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতার সংখ্যা বের করে। এইক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিশু ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠির সংখ্যা বাদ দিয়ে সম্ভাব্য ক্রেতা ধরা হয়।
২. আঞ্চলিক বাজার সম্ভাব্যতা (Area Market Potential): কোনো একটি নির্দিষ্ট পণ্যের বাজার এক এক অঞ্চলে এক এক রকম হয়ে থাকে। যেমন- বাংলাদেশের ঢাকা শহরের জনসংখ্যা, আয়, ভোগ ও সিলেটের থেকে ভিন্ন হবে। আবার, শহরাঞ্চলের মানুষের ক্রেতা আচরণ ও গ্রামীণ অঞ্চলের ক্রেতা আচরণ ভিন্ন হবে। সেকারণে প্রতিষ্ঠানের বিপণন খাতে সম্পদ বিনিয়োগ করার সময় অঞ্চল বা এলাকার ভিন্নতার কথা বিবেচনা করে মোট বাজার পরিমাণ নির্ণয় করা প্রয়োজন হয় নয়তো বিনিয়োগকৃত সম্পদ থেকে প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করতে পারে না ।
ক) বাজার গঠন পদ্ধতি (Market Buildup Method): বাজার গঠন পদ্ধতিতে প্রতিটি অঞ্চলের বাজারের সম্ভাব্য ক্রেতা ও ক্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণের মাধ্যমে আঞ্চলিক বাজারের সম্ভাব্য চাহিদা নির্ণয় করা হয়। এই পদ্ধতিতে শুধুমাত্র একটি উপাদান বিবেচনায় এনে বাজার সম্ভাব্যতা নিরূপন করা হয়।
খ) বহু উপাদান বিশিষ্ট সূচক পদ্ধতি (Multiple – Factor Index Method): এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট এলাকার সম্ভাব্য ক্রেতা ও ক্রয়ের পরিমাণের সাথে এর সঙ্গে প্রভাব বিস্তার করতে পারে এমন সব উপাদানকেও বিবেচনায় আনা হয়। যেমন- ক্রেতার ক্রয় আচরণ, মাথাপিছু আয় ইত্যাদি। এইসব উপাদানগুলোর আপেক্ষিক গুরুত্বের ভিত্তিতে সেই অঞ্চলের বাজার চাহিদা পরিমাপ করা হয় ।
৩. প্রতিযোগিদের বিক্রয় ও বাজার অংশ (Competitors’ Sales and Market Share ) : কোনো বাজারে একাধিক সমজাতীয় প্রতিষ্ঠান একই পণ্য নিয়ে ব্যবসায় কাজে নিয়োজিত থাকে ও প্রতিযোগিতা করে। বিপণনকারীকে সেই বাজারের মোট সম্ভাব্য বিক্রয়ের পরিমাণ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কতটুকু বাজার অংশ ধারণ করে আছে তা জানতে হয়। এই তথ্য জানার মাধ্যমে প্রতিযোগি প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। এর সাথে বিপণনকারী সেই বাজারে নিজের অবস্থান নির্ণয় করতে পারে।

ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ
Estimating Future Demand
বিপণনকারী সাধারণত সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে চাহিদার পূর্বানুমান করে থাকে। ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপন করার জন্য তিন ধরনের তথ্যের প্রতি খেয়াল করা হয়; সেগুলো হলো মানুষ কী বলে?, কী করে অথবা কী করছে। মানুষ কী বলে এই তথ্য জানার জন্য ক্রেতার অভিপ্রায় জরিপ, বিক্রয়কর্মীর সম্মিলিত মতামত এবং বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হয়। বাজার পরীক্ষা পদ্ধতি ও বাজার গবেষণার মাধ্যমে মানুষ কী করে বা তাদের সাড়া সম্পর্কে জানা যায়। সর্বশেষে, অতীত বিক্রয়ের লিখিত বিবরনী বা নথি থেকে ক্রেতার অতীত ক্রয় আচরণ বিশ্লেষণ বা কালীন সারি বিশ্লেষণ অথবা পরিসংখ্যানিক চাহিদা বিশ্লেষণের মাধ্যমে মানুষ কী করছে তা নির্ধারণ করা হয়।
১. ক্রেতার অভিপ্রায় জরিপ (Survey of Buyers’ Intensions): এই পদ্ধতিতে ক্রেতার ক্রয় সম্পর্কে বিভিন্ন প্রশ্ন করে ক্রেতার চাহিদা, পচ্ছন্দ কী জানা হয়। একটি নির্দিষ্ট অবস্থায় ক্রেতার মতামত নিয়ে ভবিষ্যত চাহিদা নির্ধারণ করা হয়। তবে এই কৌশলটি শিল্প পণ্য, দীর্ঘস্থায়ী ভোগ্য পণ্য এবং যেসকল পণ্য ক্রয়ের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও অগ্রিম পরিকল্পনার প্রয়োজন হয় সেক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আবার, নতুন পণ্যের কোনো অতীত তথ্য না থাকলে ক্রেতার অভিপ্রায় জরিপ পদ্ধতি কার্যকর।
২. বিক্রয় কর্মীদের সম্মিলিত মতামত (Composite of Sales Force Opinions): এই পদ্ধতিতে বিক্রয় কর্মীদের সাথে সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ বিক্রয় পূর্বানুমান করা হয়। প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতার নিকট কত পরিমাণ বিক্রয় করতে পারবে তা জেনে সকল পরিমাণকে যোগ করে সম্ভাব্য বিক্রয়ের পরিমাণ হিসাব করা হয়।
৩. বিশেষজ্ঞ মতামত (Expert Opinion) : প্রতিষ্ঠান বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়েও তার পণ্যের ভবিষ্যৎ বিক্রয় পূর্বানুমান করতে পারে। বিশেষজ্ঞ বলতে ডিলার, বণ্টনকারী, সরবরাহকারী, বিপণন উপদেষ্টা এবং ব্যবসায়ী সংস্থা যারা প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে পারস্পরিক মত বিনিময়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ করে থাকে। আবার অনেকসময় তারা আলাদাভাবেও পূর্বানুমান করতে পারে। পরে প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষক পুনরায় পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংশোধন করে প্রতিষ্ঠানের পণ্যের মোট ভবিষ্যৎ চাহিদার পরিমাণ ঠিক করে থাকে।
৪. অতীত বিক্রয় বিশ্লেষণ (Past-Sales Analysis): প্রতিষ্ঠান অতীতের বিক্রয়ের উপর ভিত্তি করে চাহিদার পূর্বানুমান করে। এক্ষেত্রে কালীন সারি বিশ্লেষণ পদ্ধতিতে বিক্রয়ের ধারা (Trend), কালচক্র (Cycle), মৌসুম (Seasonal), ও অনির্ধারিত ঘটনার (Erratic) সাথে বিক্রয়ের সম্পর্ক নির্ণয় করে চাহিদার পূর্বানুমান করা হয় ।
৫. বাজার পরীক্ষা পদ্ধতি (Market Test Method): সাধারণত এই পদ্ধতি নতুন কোনো পণ্য বা প্রতিষ্ঠিত কোনো পণ্যের নতুনভাবে বণ্টন বা প্রসার বা মূল্য বিপণন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ক্রেতারা যখন সচেতনতার সাথে ক্রয় পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে না অথবা বিশেষজ্ঞদের অনুপস্থিত থাকে তখন বাজার পরীক্ষার মাধ্যমে চাহিদা নিরূপনের কাজ পরিচালনা করা হয়।

সারসংক্ষেপ:
বিপণনকারী বাজার পরিবেশ ও বিপণন গবেষণার মাধ্যমে আকর্ষণীয় বাজার সুযোগকে খুঁজে বের করে। প্রতিষ্ঠান বর্তমান চাহিদা নির্ধারণ করার জন্য মোট বাজার সম্ভাব্যতা, এলাকা বাজার সম্ভাব্যতা, বাজার গঠন পদ্ধতি ও বহু উপাদানবিশিষ্ট সূচক পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। ভবিষ্যৎ চাহিদা নিরূপন করার জন্য তিন ধরনের তথ্যের প্রতি খেয়াল করেসেগুলো হলো মানুষ কী বলে?, কী করে অথবা কী করছে।


১ thought on “বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণ”