বাজার বিভক্তি করণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “বাজার বিভক্তিকরণ ও লক্ষ্য বাজার নির্ধারণ” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।
বাজার বিভক্তি করণ
বর্তমানে প্রতিযোগিতার যুগে বিপণনকারী বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে সঠিক বিপণন কর্মকৌশল নির্ধারণ করে। ক্রেতা ও ভোক্তাদের মধ্যেকার প্রয়োজন ও সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করে বাজারকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। বাজার বিভক্তিকরণের পর মুনাফাযোগ্যতার ভিত্তিতে আকর্ষণীয়তা নির্ণয় করা হয় এবং সর্বশেষে বাজার অবস্থান গ্রহণ করা হয়।
বাজার বিভক্তিকরণ
Market Segmentation
বাজার বিভক্তিকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাজারকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। অর্থাৎ বাজার বিভক্তিকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি বৃহৎ বাজারকে সমজাতীয় বৈশিষ্ট্য ও আচরণের ভিত্তিতে কয়েকটি উপ-বাজারে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া। এরফলে বিপণনকারী সর্বাধিক দক্ষতার সাথে ভোক্তার সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারে। Philip Kotler & Gary Armstrong বাজার বিভক্তিকরণেকে সংজ্ঞায়িত করেছেন, “বাজার বিভক্তিকরণ বলতে একটি বাজারকে স্বতন্ত্র প্রয়োজন, বৈশিষ্ট্য বা আচরণের ভিত্তিতে ছোট ছোট ক্রেতা দলে ভাগ করাকে বুঝায় যাদের পৃথক বিপণন কৌশল বা মিশ্রণের প্রয়োজন হতে পারে।”
বিপণনকারী বাজার বিভক্তিকরণের মাধ্যমে কোনো পণ্যের বাজার অথা বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতা বা ভোক্তাদের ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করে। যেকোনো পণ্যের অসংখ্য ক্রেতা থাকে এবং তারা দেশে-বিদেশে, এখানে-সেখানে বিক্ষিপ্তভাবে অবস্থান করে। সব ক্রেতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত থাকে না। এছাড়াও, তাদের প্রয়োজন, চাহিদা এবং ক্রয়-অভ্যাসও এক রকমের নয়। ফলে পণ্যের উৎপাদক বা ব্যবসায়ীরা সকল গ্রাহকের নিকট একই উপায়ে পণ্য বিপণন করতে পারে না। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিপণন ক্ষমতাও ভিন্ন ভিন্ন রকমের। বাজারের বিভিন্ন অংশে একসাথে কিংবা একই পন্থায় পণ্য বিপণন করা তাদের অনেকের জন্যই কঠিন।
তাই আজকাল অনেক প্রতিষ্ঠানই পুরো বাজারে একসাথে প্রবেশ করে না বরং বাজারের ভিন্ন ভিন্ন অংশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। বাজারের এসব ছোট ছোট অংশকে বলা হয় বাজার অংশ (Segment)। যে বাজার অংশে ভালভাবে পণ্য বিপণন করে মুনাফা অর্জন করা সম্ভব, প্রতিষ্ঠানগুলো সে অংশেই পণ্য বাজারজাত করার জন্য কর্মসূচি গ্রহণ করে।

ভোক্তা বাজার বিভক্তিরণের ভিত্তিসমূহ
Bases for Segmeting Consumer Markets
চূড়ান্ত পণ্য যারা ভোগ করে তাদেরকে নিয়ে ভোক্তা বাজার গঠিত। সাধারণত ভোক্তা বাজারকে চারটি ভিত্তির আলোকে বিভক্ত করা হয় তা চিত্র নং ৫.১ এ দেখানো হলো ।
১. ভৌগোলিক বিভক্তিকরণ (Geographic Segmentation): এ ধরনের বিভক্তিকরণে বাজারকে বিভিন্ন অঞ্চল, (যেমন- উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণ অঞ্চল), জেলা (যেমন- ঢাকা, কুমিল্লা, সিলেট), শহর, গ্রাম ইত্যাদির ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়। ভৌগোলিক বিভক্তিকরণের পর বিপণনকারী একটি, কিংবা কয়েকটি কিংবা সবগুলো এলাকায় পণ্য বিক্রয়ের চেষ্টা করে। তবে বিপণনকারী সে সব অঞ্চলেই পণ্য বিপণন করে যে অঞ্চলে অবস্থানজনিত কারণে সর্বাধিক মুনাফা করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করে। আবার প্রতিটি অঞ্চলের জন্য বিপণনকারীকে স্বতন্ত্র বিপণন কার্যক্রম নিতে হয়। কারণ প্রত্যেক অঞ্চলের ক্রেতাদের মধ্যে সমজাতীয় বৈশিষ্ট্য নাও থাকতে পারে। যেমন- শহরাঞ্চলে ফাস্টফুড বেশি জনপ্রিয় গ্রামাঞ্চলের তুলনায়; বাংলাদেশে টাঙ্গাইল অঞ্চলের চমচম বিখ্যাত; শীতপ্রধান দেশে শীতের পোশাক সারাবছর বিক্রয় হয় ।
২. জনসংখ্যাবিষয়ক বিভক্তিকরণ (Demographic Segmentation) : এ পদ্ধতিতে কতগুলো জনমিতিক উপাদান; যেমন- বয়স, লিঙ্গ, আয় পারিবারিক জীবনচক্র, পেশা, জাতীয়তা, শিক্ষা ইত্যাদির ভিত্তিতে সমগ্র বাজারকে বিভক্ত করা হয়। যেমন- হরলিকস বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের জন্য এনার্জি ড্রিংক বাজারে এনেছে। আবার, এ্যাপেক্স সুজ বয়স ও লিঙ্গের উপর ভিত্তি করে নানা ডিজাইন ও ধরনের জুতা বিপনন করছে।
৩. মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ (Psychographic Segmentation) : ভোক্তাদের জীবনমানের ধরণ, ব্যক্তিত্ব, সামাজিক অবস্থান, চাল-চলন, পণ্য থেকে প্রাপ্য উপযোগের প্রত্যাশা ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে বাজার বিভক্তিকরণ করা হলে তাকে মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ বলা হয়। এ পদ্ধতিতে বাজার বিভক্তিকরণের ফলে ক্রেতারা একদিকে তাদের ব্যক্তিত্ব, রুচি ও জীবন-মানের সাথে তাল মিলিয়ে পণ্য ক্রয় করতে পারে অন্যদিকে বিপণনকারীও দক্ষতার সাথে অধিক পরিমাণে পণ্য বিক্রয় সক্ষম হয়। যেমন- বাংলাদেশে ক্যাটস আই ব্র্যান্ড ভোক্তার রুচি ও ব্যক্তিত্ত্বের সাথে মিল রেখে প্রাত্যহিক ও আনুষ্ঠানিক আয়োজনের জন্য আলাদা আলাদা পোশাক ও আনুষাঙ্গিক উপকরণ ডিজাইন করে বিপণন করছে।
৪. আচরণমূলক বিভক্তিকরণ (Behavioral Segmentation) : পণ্যের প্রতি ভোক্তাদের আচরণের ভিত্তিতেও পণ্যের বাজার বিভক্তিকরণ করা যায়। এক্ষেত্রে আচরণের ভিত্তি বলতে পণ্যটি ভোগ করে কি ধরনের সুবিধা পাওয়া যাবে, পণ্যের প্রতি ভোক্তার মনোভাব, পণ্যের ব্যবহার ও পণ্য বিষয়ক জ্ঞান ইত্যাদি উপাদানকে বোঝায়। যেমন- ভোক্তা শ্যাম্পু ক্রয় করে বিভিন্ন কারণে; কখনো খুশকি দূর করার জন্য, বা ঝলমলে রেশমি চুলের জন্য বা চুলকে সুস্থ রাখার জন্য। শ্যাম্পু ব্যবহারের কারণের ওপর নির্ভর করে ভোক্তার এ বিভক্তিকে আচরণমূলক বিভক্তিকরণ বলা হয় ।


ব্যবসায় বাজার বিভক্তিরণের ভিত্তিসমূহ
Bases for Segmeting Business Markets
ব্যবসায় বাজারে ক্রেতা পুনরায় সেই পণ্য বিক্রয় বা পুনঃপ্রক্রিয়ার জন্য পণ্য ক্রয় করে। ব্যবসায় বাজারও ভোক্তা বাজার বিভক্তিকরণের ভিত্তি সমূহের ওপর ভিত্তি করে বিভক্তিকরণ করা যায়। তবে ব্যবসায় বাজার বিভক্তিকরণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে; তা নিম্নরূপ-
১. ক্রেতা প্রকৃতি (Type of Buyers): ব্যবসায় ক্ষেত্রে বিপণনকারীর পণ্যটি যেসব শিল্পে ব্যবহার হয় তার ভিত্তিতে বাজারকে ভাগ করা যায়।
২. প্রতিষ্ঠানের আয়তন (Company Size): এক্ষেত্রে বিক্রয় পরিমাণকে ভিত্তি করে বাজারকে বড় ও ছোট হিসেবে নির্ধারণ সম্ভব। বাজার বিভক্ত করে বৃহৎ ক্রেতাদের নিকট সরাসরি বিক্রয় ও অধিক সেবা প্রদান করা হয় । অপরদিকে, ক্ষুদ্র বা ছোট ক্রেতাদের ক্ষেত্রে মধ্যস্থকারবারী নিয়োগ করা হয়। এতে বাজারে শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত হয়।
৩. ক্রয়কার্য পদ্ধতি (Purchasing Fuction) : প্রতিষ্ঠান ক্রয়কার্য কীভাবে সংগঠিত হয় তার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় বাজারকে ভাগ করা যায়। প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীভূত ও বিকেন্দ্রীভূত পদ্ধতিতে ক্রয়কার্য সম্পাদন করতে পারে।
৪. ক্রয় অবস্থা (Buying Functions): যে কোনো ক্রয় অবস্থাকে তিনভাগে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে; যেমন- সম্পূর্ণ নতুন ক্রয়, সংশোনিক পুনঃক্রয় ও সরাসরি পুনঃ ক্রয়। এ তিন ধরনের ক্রয় অবস্থার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় বাজারকে বিভক্ত করা যায়।
৫. ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান (Buyers’ Location): ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ি ব্যবসায় বাজারকে ভাগ করা যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি অবস্থান করে আবার কিছু দূরে অবস্থান করতে পারে। বিপণনকারী পণ্য পৌছে দেওয়ার ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে ব্যবসায় বাজারকে বিভক্ত করতে পারে।

সারসংক্ষেপ:
বাজার বিভক্তিকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ বাজারকে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে ভাগ করা হয়। বাজারের এসব ছোট ছোট অংশকে বলা হয় বাজার অংশ। চূড়ান্ত পণ্য যারা ভোগ করে তাদেরকে নিয়ে ভোক্তা বাজার গঠিত। সাধারণত ভোক্তা বাজারকে চারটি ভিত্তির আলোকে বিভক্ত করা হয়। যথা- ভৌগোলিক বিভক্তিকরণ, জনমিতিক বিভক্তিকরণ, মনস্তাত্ত্বিক বিভক্তিকরণ ও আচরণমূলক বিভক্তিকরণ। অন্যদিকে ব্যবসায় বাজারে ক্রেতা পুনরায় সেই পণ্য বিক্রয় বা পুনঃপ্রক্রিয়ার জন্য পণ্য ক্রয় করে। ব্যবসায় বাজারও ভোক্তা বাজার বিভক্তিকরণের ভিত্তি সমূহের ওপর ভিত্তি করে বিভক্তিকরণ করা যায়। তবে ব্যবসায় বাজার বিভক্তিকরণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে; যেমন ক্রেতা প্রকৃতি, – প্রতিষ্ঠানের আয়তন, ক্রয়কার্য পদ্ধতি, ক্রয় অবস্থা ও ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অবস্থান ।
