বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতা সমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “প্রকল্প নির্বাচন” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতা সমূহ
বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় সংক্রান্ত নানাবিধ কাজ করতে হয়। তবে পণ্যভেদে বিক্রয়কর্মীদের কাজের পরিধি ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠান, ক্রেতা এবং নিজের প্রতি বিক্রয়কর্মীর নানাবিধ দায়-দায়িত্ব থাকে। এই দায়িত্ববোধ থেকেই বিক্রয়কর্মীর বিভিন্ন ধরণের বাধ্যবাধকতার সৃষ্টি হয়। বিক্রয়কর্মী এবং প্রতিষ্ঠান একে অপরের উপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। পণ্য বিক্রয় না হলে যেমন প্রতিষ্ঠানের মুনাফা হয় না তেমনি কম মুনাফার জন্য কোম্পানি বিক্রয়কর্মীকে তার পারিশ্রমিক প্রদান করতে পারে না।
তাই নিয়োগ প্রাপ্তির পর হতেই প্রতিষ্ঠানের উন্নতি, মুনাফা ও আন্তরিকতার সাথে কাজ করাই প্রত্যেক বিক্রয়কর্মীর কর্তব্য। ক্রেতাদের আস্থার স্থান হলো বিক্রয়কর্মীগণ। এদের প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়ানো হলো বিক্রয়কর্মীদের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। তাই প্রতিষ্ঠানের উন্নতি, ক্রেতাদের সর্বোচ্চ সন্তুষ্টি প্রদান এবং বিক্রয়কর্মীর নিজের উন্নয়নের জন্য তাকে বিভিন্ন দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন করতে হয় যা তার সফলতার জন্য অপরিহার্য্য।
বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতাসমূহ
Obligations of a Salespeople
যেকোন ধরণের ব্যবসার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের সামনে পণ্য উপস্থাপন থেকে শুরু করে পণ্য বিক্রয়ের কাজে যে ব্যক্তি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যুক্ত তাকে তাকে বিক্রয়কর্মী বলে। একজন ব্যবসাকর্মীকে যেকোন ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র বলা হয়ে থাকে। বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় সংক্রান্ত নানাবিধ কাজ করতে হয়। তবে পণ্যভেদে বিক্রয়কর্মীদের কাজের পরিধি ভিন্ন হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি একজন বিক্রয়কর্মীর নানাবিধ দায়-দায়িত্ব তাকে। বিক্রয়ের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করে বিক্রয়কর্মীদের কার্যক্রমের উপর।
এই জন্য বিক্রয়কর্মীর কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ কাজের জন্য বিক্রয়কর্মীর কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা সুষ্ঠুভাবে পালন করার উপর বিক্রয়ের সার্থকতা এবং প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে। একজন বিক্রয়কর্মী তার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, ক্রেতা ও নিজের প্রতি যে সকল দায়িত্ব পালন করে তাকে বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতা বলে। নিম্নে বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতাসমূহ ব্যাখ্যা করা হলো।

১। কোম্পানির প্রতি বাধ্যবাধকতা (Obligation to company)
একজন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তার পণ্য ও সেবা বিক্রয়ের জন্য বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে বিনিময়ে বিক্রয়কর্মীকে মাসিক বেতনসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করে তাকে। ফলে কোন কারণে যদি প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায় তবে বিক্রয়কর্মী তার চাকরী হারাবে। আবার প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন হলে বিক্রয়কর্মীদের সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে। ফলে প্রতিষ্ঠান এবং বিক্রয়কর্মী একে অপরের উপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিক্রয়কর্মীর কিছু নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নিম্নে প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিক্রয়কর্মী কর্তব্য ও বাধ্যবাধকতাসমূহ আলোচনা করা হলো :
ক) অর্থ উপার্জন (To make money): অর্থ উপার্জন ছাড়া একটা প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা সম্ভবপর নয়। প্রতিষ্ঠান বিক্রয়কর্মী নিয়োগ দিয়ে থাকে পণ্য ও সেবা বিক্রয় করে অর্থ উপার্জন করার জন্য। বিক্রয়কর্মী প্রেষণার মাধ্যমে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে পণ্য বিক্রয় করে এবং সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের বিষয় নিশ্চিত করে। মুনাফা অর্জনের জন্য বিক্রয়কর্মী নিম্নলিখিত কাজগুলো সম্পাদন করে থাকে।
- সম্ভাব্য ক্রেতাদের খুঁজে বের করা;
- গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতাদের লক্ষ্য নির্দিষ্ট করা;
- গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ করা ;
- বাজারে অবস্থান গ্রহণের কৌশল ও বাস্তবায়ন করা;
- পণ্য প্রসারের ব্যবস্থা করা;
- প্রতিযোগিদের কলাকৌশল জেনে বিক্রয় পরিচালনা করা।
খ) বিবেকের সাথে কাজ করা (To work conscientiously): একজন নতুন বিক্রয়কর্মী নিয়োগে অনেক ঝুঁকি থাকে। আবার একজন দক্ষ বিক্রয়কর্মী গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠান অনেক অর্থ ও সময় ব্যয় করতে হয়। প্রতিষ্ঠান অনেক ঝুঁকি এবং বিনিয়োগ করে দক্ষ বিক্রয়কর্মী গড়ে তোলার একমাত্র কারণ হলো পণ্য বিক্রয় করে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা তথা প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব বজায়ে রাখা। আর এই কারণে একজন বিক্রয়কর্মীকে অবশ্যই বিবেকের সাথে কাজ করতে হয়।
বিক্রয়কর্মীর উচিৎ একটা প্রতিষ্ঠানকে নিজের প্রতিষ্ঠান মনে করা। তাই প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রমকে নিজের অনুভূতি দিয়ে দেখা। এমতাবস্থায় বিক্রয়কর্মীর উচিত তার প্রতি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখা এবং বিবেক বুদ্ধিসম্পন্ন লোক হিসেবে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পরিচালনা করা। তাই বিক্রয়কর্মীকে সচেতন থেকে নিম্নলিখিত কাজগুলো পরিচালনা করা ।
- তার দায় দায়িত্ব সম্পর্কে অবহিত হওয়া;
- তার দায় দায়িত্বের পরিধি জেনে ঝুঁকি গ্রহণ করা;
- বাজারে তার পণ্যের প্রকৃত অবস্থার তথ্য সংগ্রহ করা;
- পণ্যের জন্য নতুন নতুন ক্রেতা সৃষ্টি করা;
- তার নিয়োগের উদ্দেশ্য অনুধাবন করা;
- কোম্পানির নীতিমালা ও সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করা;
- পণ্য বিক্রয় উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা;
- তার বিক্রয় এলাকায় সুনাম সৃষ্টি করা;
- প্রতিষ্ঠানের কাছে বিশ্বস্ততা অর্জন করা;
- অর্পিত দায় দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করা;
- নিজেকে একজন দক্ষ বিক্রয়কর্মী হিসেবে প্রমাণ করা ।
গ) সহযোগিতা করা (To co-operate): প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সাথে সাথে বিক্রয়কর্মীকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করা। কোম্পানি যেমন বিক্রয়কর্মীকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করে তেমনি বিক্রয়কর্মীও প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয় করে থাকে। ফলে বিক্রয়কর্মীকে প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে সহযোগিতা করতে হবে। বিশেষ করে পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মী বিশেষ যত্নবান হবে। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিভাগের সাথে সমন্বয় করে তাকে বিক্রয়কার্য পরিচালনা করতে হবে। একজন নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত বিক্রয়কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা আদেশ ও অনুরোধ অনুযায়ী কাজ করতে হবে। দক্ষ বিক্রয়কর্মীদের কাজের সময় ফ্রেম অনুযায়ী কাজ করতে হবে।
যেমন বিক্রয়কর্মীকে বলা হলো নতুন ক্রেতার জন্য ২০ ভাগ সময় দিতে হবে আর যদি সে নতুন ক্রেতার জন্য ৮০ ভাগ সময় দেয় তবে এ জাতীয় সহযোগিতা প্রতিষ্ঠানের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিক্রয়কর্মীর কাছে যেকোন সহযোগিতা চাওয়া হলে তাকে যতদূর সম্ভব সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে বিক্রয়কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে আন্তরিক হতে হবে। ফলে আধুনিক ব্যবসায় সাফল্য আনতে হলে বিক্রয়কর্মী ও প্রতিষ্ঠানের পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব না ।
ঘ) অনুগত্য ও আস্থা অর্জন (To be loyal and have faith): বিক্রয়কর্মীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাধ্যবাধকতা হলো তাকে কোম্পানির পক্ষে অনুগত থাকতে হবে। তার সবচেয়ে বড় কাজ হলো প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাভাজন হওয়া। একজন বিক্রয়কর্মী তখনই সফল বলে প্রমাণিত হয় যখন সে প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত ও আস্থাভাজন হয়। বিক্রয়কর্মীর উপর অর্জিত দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে ও সততার সাথে পালন করা বিক্রয়কর্মীর নৈতিক দায়িত্ব। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান চায় তার বিক্রয়কর্মীরা প্রতিষ্ঠানের আদর্শ, লক্ষ্য, নীতি, কর্মসূচি ও পণ্য ইত্যাদির উপর আস্থা রাখুক।
অন্যদিকে একজন বিক্রয়কর্মী বিভিন্ন ভাবে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করতে পারে। প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিষয় বিক্রয়কর্মীর ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না হলেও সেই সকল কাজের প্রতি তাকে আস্থা রাখতে হবে। প্রয়োজনে প্রতিষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাভাজন হতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনুগত ও আস্থাভাজন হওয়ার জন্য বিক্রয়কর্মীদের নিম্নলিখিত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়।
- প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্য বিক্রয়;
- নিজস্ব দক্ষতা ও যোগ্যতা প্রয়োগ করে পণ্য বিক্রয় করা;
- তার প্রতি অর্পিত নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্য অর্জন করা;
- ক্রেতা সাক্ষাৎকারের জন্য কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করা;
- হিসাব নিকাশ ও লেনদেন যত্ন সহকারে সম্পাদন করা;
- প্রতিষ্ঠানের প্রতি আগ্রহশীল ও আশাবাদী হতে হবে;
- বিক্রয়কার্যক্রম সংক্রান্ত নিয়মিত রিপোর্ট তৈরি ও সরবরাহ করা;
- সবসময় প্রতিষ্ঠানের সফলতার জন্য কাজ করা ।

২। বর্তমান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রতি বাধ্যবাধকতা
(Obligations to Present and Potential Customer)
যারা কোম্পানির পণ্য ক্রয় ও ব্যবহার করছে তাদেরকে বলা হয় বর্তমান ক্রেতা। যারা বর্তমানে পণ্য ক্রয় করছে না কিন্তু ভবিষ্যতে পণ্য ক্রয় সম্ভাবনা রয়েছে তাদেরকে বলা হয় সম্ভাব্য ক্রেতা। বিক্রয়কর্মীর সবচেয়ে বড় সফলতা হলো সম্ভাব্য ক্রেতাকে বর্তমান ক্রেতায় রূপান্তরিত করা। বিপণনের মূল দর্শন হলো ক্রেতাদের সন্তুষ্টি বিধানের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করা। এ কাজটি একটি প্রতিষ্ঠান যত সুন্দরভাবে করতে পারবে তার অস্তিত্বও তত দীর্ঘস্থায়ী হবে।
বর্তমান বিপণনে বলা হয়ে থাকে সন্তুষ্ট ক্রেতা হলো কোম্পানির সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাছাড়া যত বেশি সম্ভাব্য ক্রেতাকে বর্তমান ক্রেতায় পরিণত করা যাবে কোম্পানির সফলতা তত বেশি বৃদ্ধি পাবে। সেই কারণে বর্তমান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রতি বিক্রয়কর্মীদের অনেক দায় দায়িত্ব ও নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ক্রেতাদের প্রতি বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতাসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো ।
ক. যুক্তিসঙ্গতভাবে ক্রেতাদের বিবেচনা করা (To treat the customer logically ) : প্রতিষ্ঠানের মত একজন বিক্রয়কর্মীকে তার ক্রেতাদের প্রতি অনুগত হতে হবে। ক্রেতাদের সাথে অনুগত হওয়ার জন্য বিক্রয়কর্মীকে যথেষ্ট কৌশলী হতে হয়। কোন বিষয়ে বিক্রয়কর্মীর কোন আচরণে নৈতিকতাহীন বিষয় পরিলক্ষিত হয় তবে তার উপর ক্রেতাদের আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ক্রেতা হারানোর ভয় থাকে। ক্রেতার সাথে অযৌক্তিক কোন আচরণ প্রদর্শন করা যাবে না। পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিক্রেতারা প্রায় সময় যে সকল অযৌক্তিক বিষয় উপস্থাপন করে তা পরিহার করতে হবে। এছাড়া মিথ্যা বা ছলচাতুরীর আশ্রয় না নিয়ে সঠিক ভাবে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা।
খ. সঠিক ক্রেতা সমন্বয় সাধন (Proper customer coordination) : সুষ্ঠু ক্রেতা সমন্বয় বিক্রয়কর্মীদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ । প্রতিষ্ঠান সবসময় চেষ্টা করে অধিক মূল্যে পণ্য বিক্রয় করে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করা। আবার ক্রেতারা চেষ্টা করে সর্বনিম্ন মূল্যে পণ্য ক্রয় করে তৃপ্তি লাভ করা। এই দুই পক্ষের সমন্বয় সাধন করতে অনেক সময় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। এখানে যেমন চাপ থাকে প্রতিষ্ঠানের তেমনি চাপ থাকে ক্রেতাদের। ক্রেতা সন্তুষ্টি বিধানের জন্য বিক্রয়কর্মীকে এই বিষয়টির একটি সঠিক সমন্বয় সাধন করতে হয়।
খ. ক্রেতাকে সাহায্য করা (To help the customer) : ক্রেতা সাধারণত পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে বিক্রয়কর্মীদের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ক্রেতারা বিভিন্ন ব্যাপারে বিক্রয়কর্মীদের নিকট থেকে বিভিন্ন ধরণের সাহায্য ও সহযোগিতা আশা করে। প্রথমত বিভিন্ন বিকল্প পণ্য থেকে সঠিক পণ্য নির্বাচন করা ক্রেতাদের সবচেয়ে কঠিন কাজ। পণ্যের মূল্যের ব্যাপারে ক্রেতারা নানা ধরণের সহযোগিতা আশা করে।
পণ্যের ব্যাপারে বিক্রেতাদের নিকট এমন কিছু তথ্য থাকে বা ক্রেতাদের নিকট উপস্থাপন করলে ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। পণ্য বণ্টনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে পণ্য পরিবহন ও পণ্য মজুদ বিষয়গুলোর ব্যাপারে বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের সাহায্য করে থাকে। কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে বিক্রয়োত্তর সেবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সকল ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীরা যদি ক্রেতাদের যথাযথ সেবা প্রদান করে তবে সর্বোচ্চ ক্রেতা সন্তুষ্টি লাভ করতে পারবে।
খ. ক্রেতাদেরকে পরামর্শ প্রদান (To advice the customer): বিক্রয়কর্মীদের সবসময় ক্রেতাদের একজন সুপরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতে হবে। ক্রেতারা প্রায় সময় পণ্য ক্রয় এবং বিক্রয়ের অন্যান্য বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না। সেই ক্ষেত্রে বিক্রয়কর্মীদের সঠিক পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করতে হবে। কিছু পণ্যের ক্ষতিকর দিক রয়েছে সে সম্পর্কে ক্রেতাদের অবহিত করতে হবে। আবার অনেক পণ্যের ব্যবহারবিধি সম্পর্কে ক্রেতাদের কোন জ্ঞান থাকে না সেই ক্ষেত্রে পণ্যের যথাযথ ব্যবহারবিধি সম্পর্কে ক্রেতাদের অবহিত করতে হবে। নতুন পণ্যের তথ্য, পণ্যের চাহিদা ও যোগান, মূল্যের হ্রাস বৃদ্ধি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত ক্রেতাদের পরামর্শ প্রদান করা বিক্রয়কর্মীর নৈতিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে পড়ে।

৩। নিজেদের প্রতি বাধ্যবাধকতা (Obligations to Himself)
কোম্পানি ও ক্রেতার প্রতি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ক্রেতাকে নিজেদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিক্রয় পেশায় অনেক ধরণের কাজের সাথে বিক্রয়কর্মীকে জড়িত থাকতে হয়। ফলে পেশাগত শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ছাড়া একজন বিক্রয়কর্মী নিজের উন্নয়ন সাধন করতে পারবে না। সব মিলিয়ে নিজের প্রতি বিক্রয়কর্মীর কিছু বাধ্যবাধকতা থাকে যা নিম্নে আলোচনা করা হলো ।
ক. নীতিবান হওয়া (To have principles): অন্যান্য পেশার মত বিক্রয় কাজে অনেক অসৎ ও নীতি বিবর্জিত লোক রয়েছে তথাপি একজন বিক্রয়কর্মীকে নিজের জন্য নীতিবান হওয়া একান্ত কর্তব্য। নিজের সুনাম অর্জনের জন্য একজন বিক্রয়কর্মীকে নীতিবান হওয়া একান্ত প্রয়োজন। ফলে বিক্রয়কর্মীকে সৎ গুণাবলীর অধিকারী হতে হবে এবং নিষ্ঠার সাথে কার্য সম্পাদন করতে হবে। তানাহলে নিজের তথা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন ব্যাহত হবে।
খ. মানসিক প্রস্তুতি (Mental preparation): বিক্রয় কার্যক্রমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে সকল বিক্রয়কর্মী নিজেদের মানসিকভাবে প্রস্তুত তথা স্বাভাবিক রাখতে পারবে তারা তুলনামূলক ভাবে সফল হতে পারবে। বিক্রয়কর্মীদের উপর অনেক দায়িত্ব থাকে এবং তাকে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরণের ক্রেতাকে সামাল দিতে হয়। এই সকল দায়িত্ব পালনের জন্য তাকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। বিভিন্ন ধরণের পরিস্থিতি কিভাবে মোকাবেলা করতে হবে সেই প্রস্তুতি একজন বিক্রয়কর্মীর সব সময় থাকতে হবে। এতে বিক্রয়কর্মী তার পেশায় উন্নতি লাভ করতে পারবে।
গ. উন্নতি লাভ করা (To grow): বিক্রয় কার্যে বিক্রয়কর্মী বিশেষজ্ঞের ভূমিকা পালন করে। তিনি বিভিন্ন সভায় প্রতিষ্ঠানকে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ প্রদান করে এবং ক্রেতারা বিক্রয়কর্মীর নিকট থেকে বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ করে। কোম্পানির মুনাফার জন্য ক্রেতাদের বিক্রয় সংক্রান্ত আনুষাঙ্গিক সেবা প্রদান করতে হয়। এই সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য বিক্রয়কর্মীকে মানসিক উৎকর্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচুর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে উন্নতি লাভ করতে হবে। বিক্রয়ের সকল কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন করার জন্য বিক্রয়কর্মীকে অধ্যবসায়ী হতে হবে। সেই কারণে অনেক বিক্রয়কর্মী বিদেশ থেকে বিক্রয় কাজের উপর উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে থাকে।
ঘ. স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া (Careful to health): বিক্রয়কর্মীকে প্রতিনিয়ত কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। প্রতিদিন বহু সংখ্যক ক্রেতাদের মুখোমুখি হতে হয়। বিক্রয়কর্মীকে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন ধরণের শারীরিক ও মানষিক পরিশ্রমের মধ্যে থাকতে হয়। এছাড়া একজন বিক্রয়কর্মীকে তার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে তাকে প্রচুর ভ্রমণ করতে হয়। এমতাবস্থায় সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হওয়া বিক্রয়কর্মীর অন্যতম গুণ। এ জন্য তাকে সুস্থ দেহ ও মনের অধিকারী হতে হবে। নিজের সফলতার জন্য বিক্রয়কর্মীর স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া একান্ত বাঞ্ছনীয় ।

সারসংক্ষেপ
একজন বিক্রয়কর্মীকে বিক্রয় সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরণের কাজ করতে হয়। বিক্রয় কার্যক্রমের সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করে বিক্রয়কর্মীর মেধা ও দক্ষতার উপর। এই জন্য বিক্রয়কর্মীদের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ। এই গুরুত্বপূর্ণ ও দায়িত্বপূর্ণ কাজের জন্য বিক্রয়কর্মীর কিছু বাধ্যবাধকতা রয়েছে যা সুষ্ঠুভাবে পালন করার উপর বিক্রয়ের স্বার্থকতা ও প্রতিষ্ঠানের সফলতা নির্ভর করে। বিক্রয়কর্মীর বাধ্যবাধকতাসমূহ তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্তব্য, বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রতি কর্তব্য এবং নিজের প্রতি কর্তব্য। একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতি বিক্রয়কর্মীর কিছু | নৈতিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যেমন- প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অর্থ উপার্জন করা, বিবেকের সাথে কাজ করা, প্রতিষ্ঠানকে | বিভিন্নভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করা, অনুগত ও আস্থা অর্জন করা। বর্তমান এবং সম্ভাব্য ক্রেতাদের প্রতি বিক্রয়কর্মীদের অনেক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেমন- যুক্তিসঙ্গতভাবে ক্রেতাদের বিবেচনা করা, সঠিক ক্রেতা সমন্বয় | সাধন করা, ক্রেতাকে সাহায্য করা ও ক্রেতাদের পরামর্শ প্রদান করা। এছাড়া নিজের প্রতি বিক্রয়কর্মীর কিছু | বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেমন- নীতিবান হওয়া, মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা, উন্নতি লাভ করা ও স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া ইত্যাদি।
