বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি সমূহ

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি সমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর  “ব্যক্তিক বিক্রয়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি সমূহ

Table of Contents

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি সমূহ

 

সম্ভাব্য বাজার থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করা হয়। এর মধ্যে বিক্রয় প্রসার একটি অন্যতম কৌশল। বিক্রয় প্রসার বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন ধরণের কৌশল অবলম্বন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বিক্রয় প্রসার হলো স্বল্পকালীন উদ্দীপনা যা পণ্য বা সেবার ক্রয় কিংবা বিক্রয়কে ত্বরান্বিত করে। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমকে সফল করার জন্য বিপণন নির্বাহী বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি ও কৌশল গ্রহণ করে থাকে। তবে বাজারে বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে এবং বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিভিন্ন উপ গ্রুপ রয়েছে। সকল গ্রুপ বা উপ গ্রুপের জন্য একই বিক্রয় কৌশল প্রযোজ্য হয় না। মেয়েদের জন্য যে বিক্রয় প্রসার কৌশল প্রযোজ্য সেটা ছেলেদের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে।

আবার ছোট শিশুদের জন্য যে কৌশলটা প্রযোজ্য সেটা বৃদ্ধদের জন্য প্রযোজ্য হবে না। তাই বিক্রয় প্রসার কৌশল নির্ধারণের সময় স্থান, কাল, পরিবেশ বিশেষ বিবেচনায় আনতে হবে। বিক্রয় প্রসার কৌশল বাস্তবায়নের সময় বিপণন প্রসারের অন্যান্য হাতিয়ারগুলোর সাথে বিক্রয় প্রসার কৌশলমূল্যের সুষ্ঠু সমন্বয় করতে হবে নইলে বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম সঠিক ভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে না। বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম যেহেতু পুনঃপুনঃ বাস্তবায়ন করা হয় না এবং সাধারণভাবে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য গৃহীত হয়ে থাকে সেহেতু বিক্রয় প্রসার কৌশল নির্বাচন ও বাস্তবায়নে বিপণন নির্বাহীকে অত্যন্ত কৌশলী হতে হয়।

 

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি / হাতিয়ার (Methods / Tools of Sales Promotion ):

কোন প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করে স্বপ্ন মেয়াদে বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য যেসব কৌশল গ্রহণ করে সেগুলোকেই বিক্রয় প্রসার বলে। বিপণন প্রসারের যতগুলো হাতিয়ার রয়েছে তার মধ্যে বিক্রয় প্রসার অন্যতম। বিক্রয় প্রসারের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধরণের পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ অনুকরণ করা হয়। এ সকল পদ্ধতিসমূহকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। প্রথমত, ভোক্তাদের জন্য বিক্রয় প্রসার যেখানে ক্রতাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ ও পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধি করা হয়। দ্বিতীয়ত, ডিলারদের জন্য বিক্রয় প্রসার যেখানে পণ্য বিক্রয়ে ডিলারদের আগ্রহ সৃষ্টি করা। তৃতীয়ত, বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিক্রয় প্রসার যেখানে লক্ষ্য হলো বিক্রয় কাজে বিক্রয়কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। নিম্নে বিক্রয় প্রসারের বিভিন্ন পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করা হলো ।

 

ক) ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসার (Consumer Oriented Sales Promotion):

ভোক্তাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে সকল বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় সেগুলোকে বলা হয় ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসার। অনেক ধরণের কৌশলের মাধ্যমে ভোক্তাদের পণ্য ক্রয়ে আকৃষ্ট করা হয়। ভোক্তাদের ধরণ, পেশা, বয়স, শিক্ষা ইত্যাদি বিবেচনা করে ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালানা করা হয়। সকল শ্রেণীর ভোক্তাদের জন্য একই ধরণের বিক্রয় প্রসার কার্যকরী হয় না। তাই ক্রেতার ভিন্নতা অনুযায়ী বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে। নিম্নে ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসারের গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি বা কৌশলসমূহ আলোচনা করা হলো :

 

১. মূল্য ছাড় (Price reduction):

ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসারের সবচেয়ে প্রচলিত পদ্ধতি হলো মূল্য ছাড়। পণ্যের মূল্য হঠাৎ কমিয়ে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। বিশেষ করে পণ্যের যখন বিশাল মজুদ তৈরি হয়, তখন বিপণন নির্বাহী মূল্য ছাড় কৌশল গ্রহণ করে থাকে। আজকাল অনেক পণ্যের বিক্রয় কেন্দ্রের সামনে “ বিরাট মূল্য ছাড়”, “আকর্ষণীয় মূল্য হ্রাস” ইত্যাদি শীর্ষক সাইনবোর্ড বা ব্যানার ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়। বিশেষ করে ঈদের সময় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মূল্য ছাড় কর্মসূচি দেখতে পাওয়া যায়।

 

২. কুপণ (Coupons):

কুপন হচ্ছে এক ধরণের সার্টিফিকেট যা পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেতাকে আর্থিক সুবিধা দেয়ার ব্যবস্থা করে। কুপন হচ্ছে বিপণন নির্বাহী কর্তৃক ক্রেতাদেরকে দেওয়া বিশেষ ধরণের প্রতিশ্রুতি যার মাধ্যমে ক্রেতা নির্দিষ্ট পরিমাণ মূল্য সুবিধা পেয়ে থাকে। কুপন ডাকযোগে প্রেরণ করা যায়, পণ্য কেনার সময় প্রদান করা যায় অথবা বিজ্ঞাপনের সাথে সংযুক্ত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে ইমেইল ও ক্ষুদে বার্তার (SMS) সাহায্যে কুপণ প্রেরণ করা হয়। ওয়েব সাইটে দেখা যায় একটি কুপন কোড ব্যবহার করে নির্দিষ্ট মূল্যের পণ্য ক্রয় করলে বিনা পরিবহন খরচে পণ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে।

 

৩. নমুনা প্রেরণ (Sample):

নমুনা প্রেরণের মাধ্যমে ভোক্তাকে পণ্য পরীক্ষা করার সুযোগ দেয়া হয়। কিছু পণ্য ভোক্তাদের মাঝে বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। নমুনা ভোক্তাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে দেওয়া হয়, দোকানে আগত ক্রেতাদের মাঝে বিতরণ করা হয় অথবা ডাকযোগে পাঠানো হয়। এটা বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের পূর্ব যাচাই পদ্ধতি। সাধারণত নতুন পণ্যের পরিচিতির জন্য এটা খুবই প্রচলিত পদ্ধতি। নমুনা বিতরণ খুবই কার্যকর কিন্তু ব্যয়বহুল পদ্ধতি। বাজারে সাবান, শ্যাম্পু, কফি, চকলেট ইত্যাদি পণ্যের নমুনা বিতরণ প্রায়শই দেখা যায়। এটি বিক্রয় প্রসারের একটি পুরাতন এবং জনপ্রিয় বিক্রয় কৌশল।

 

৪. নগদ অর্থ ফেরত (Cash refund offers):

নগদ অর্থ ফেরত অনেকটা কুপনের মতই তবে এ ক্ষেত্রে মূল্য হ্রাসের ব্যাপারটি ঘটে প্রকৃত ক্রয় সম্পন্ন হওয়ার পরে। ক্রেতারা পণ্য ক্রয় করার পর পণ্য ভোগ বা ব্যবহার করে সন্তুষ্ট না হয় তবে কোম্পানির নিকট অভিযোগ করলে কোম্পানি ক্রেতাকে কিছু অর্থ বা পুরো অর্থ প্রদানের অঙ্গীকার করে থাকে। এই অঙ্গীকার সাধারণত পণ্যের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে। ভোক্তার অভিযোগ অনুযায়ী এই মোড়ক দেখে কোম্পানি অর্থ ফেরত দিয়ে থাকে। নতুন পণ্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি অত্যন্ত কার্যকর। আমাদের দেশে ইলেকট্রনিক দ্রব্যসামগ্রীর বিক্রয়ের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ ফেরত কৌশলটি বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

 

৫. প্রিমিয়াম (Premium):

কোন নির্দিষ্ট পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাদের উৎসাহিত করার জন্য উক্ত পণ্যের সাথে পণ্য সংশ্লিষ্ট কোন বিষয় বিনা মূল্যে প্রদান করাকে প্রিমিয়াম বলে। আবার পণ্যের সাথে বিনা মূল্যে বা কম খরচে যে সকল পণ্য অর্পণ করা হয় এগুলোকে প্রিমিয়াম বলে। পূর্বের দামে ২ লিটার কোকা কোলার সাথে ২৫০ মিলি একটি ছোট কোকা কোলা ফ্রি। প্রিমিয়াম পণ্য প্যাকেটের মধ্যে থাকতে পারে আবার আলাদা ভাবেও থাকতে পারে । বিক্রয় বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্র্যান্ডের আনুগত্য সৃষ্টি, ক্রেতার আগ্রহ সৃষ্টি, মন্দা মৌসুমে বিক্রয়ের গতি অব্যহত রাখা, প্রতিযোগী পণ্যের তুলনায় বিক্রয় বৃদ্ধি ইত্যাদি উদ্দেশ্যে প্রিমিয়াম কৌশল ব্যবহৃত হয়।

 

৬. প্রতিযোগিতা (Contests):

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন কোন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরণের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। বহুল প্রচলিত প্রতিযোগিতা হলে সর্বোচ্চ ক্রয়। যে সকল ক্রেতা সারা বছর সবচেয়ে বেশি পণ্য ক্রয় করে তাদের বিভিন্ন ধরণের সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। মাঝে মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠান তারা বিভিন্ন ধরণের কুইজের আয়োজন করে। আবার প্রতিযোগিতা ডাকা হয় একটি বিষয়ে ধাঁধার উত্তর দান অথবা নাম বা পণ্য সম্পর্কে উপদেশ চাওয়ার জন্য। আর বিচারকমন্ডলী সেখান থেকে পুরস্কারের জন্য কিছু ক্রেতা মনোনীত করে থাকে ।

 

৭. লটারি (Sweepstakes):

ক্রেতাদের মনে ব্যাপক সাড়া ও আলোড়ন সৃষ্টির জন্য কোম্পানিসমূহ মাঝে মাঝে লটারির আয়োজন করে থাকে। এখানে খুবই আকর্ষণীয় পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরস্কার প্রাপ্তির আশায় ক্রেতারা বেশি বেশি পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হয়। পণ্যের বিক্রয়ের রশিদকে লটারির কুপন হিসাবে ব্যবহার করা হয়। যে যত বেশি পণ্য ক্রয় করবে তার কুপনের সংখ্যা তত বেশি হবে এবং তার পুরস্কার প্রাপ্তির সম্ভাবনা তত বেশি হবে। ভাগ্য পরীক্ষার একটি কৌশল হিসেবে কোম্পানিগুলো লটারি প্রবর্তন করে থাকে। বিভিন্ন উপায়ে ভাগ্য পরীক্ষার মাধ্যমে ক্রেতা অর্থ, পণ্য বা সেবা উপহার হিসেবে পেতে পারে।

 

৮. মেয়াদী গ্যারান্টি প্রদান (Time bound guarantee) :

মেয়াদী গ্যারান্টি প্রদান বহুল প্রচলিত একটি কার্যকরী বিক্রয় প্রসার কৌশল। একেবারেই নতুন ব্র্যান্ড ক্রয় করতে ক্রেতারা যখন উৎসাহ বোধ করে না তখন মেয়াদী গ্যারান্টি ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আকৃষ্ট করে। এই পদ্ধতিতে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত পণ্যের স্থায়ীত্ব বা কার্যক্ষমতার নিশ্চয়তা প্রদান করে থাকে। নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে পণ্যটি নষ্ট হয়ে গেলে বা ঠিকমত সেবা প্রদান না করলে অথবা কোন ত্রুটি দেখা দিলে উৎপাদক তার অঙ্গীকার অনুযায়ী পণ্যটি মেরামত অথবা পণ্য বদল করে নতুন পণ্য প্রদান করে থাকে। আমাদের অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি দেখা যায়। তবে ইলেকট্রিক বা ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ক্ষেত্রে এটা বহুল প্রচলিত।

 

৯. উপহার (Presentation):

ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য একটি কার্যকরী পদ্ধতি হলো উপহার প্রদান । সকল ক্রেতাই পণ্য ক্রয়ের পর বিশেষ কিছু উপহার পেলে আনন্দিত হয়। ক্রেতাদের এই আবেগকে জয় করার জন্য এবং ক্রেতাদের মনে পণ্যের বিষয়ে অনুকূল মনোভাব সৃষ্টির জন্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন জিনিষ উপহার দিয়ে থাকে। বছরের প্রথমে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের ক্রেতাদের জন্য বিভিন্ন ধরণের উপহার সামগ্রী যেমন- ডায়েরী, ক্যালেন্ডার, কলম, চাবির রিং ইত্যাদি বিতরণ করে থাকে। এই সকল উপহার সামগ্রীর গায়ে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, ঠিকানা, লোগো মুদ্রিত থাকে ।

 

১০. মোড়ক (Package):

ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য পণ্যের আকর্ষণীয় মোড়ক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিক্রয় প্রসার কৌশল। অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের জন্য আকর্ষণীয় মোড়ক তৈরি করে থাকে। বিশেষ করে খাদ্য দ্রব্য ও প্রসাধনীর ক্ষেত্রে উৎপাদকগণ ব্যয়বহুল মোড়ক তৈরি করে থাকে। মোড়কের একটি প্রধান বিষয় হলো মোড়কের পুনঃব্যবহার। চকলেট, বিস্কুট, আচার, কফি ইত্যাদি পণ্যের আকর্ষণীয় মোড়ক ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আকৃষ্ট করে থাকে। শিশুদের জন্য কিছু পণ্যের মোড়ক তাদের আদলে তৈরি করা হয় যা দেখে একজন শিশু পুলকিত হয়ে থাকে।

 

১১. জীবনযাত্রা ও গ্রুপ ডিসকাউট (Lifestyle and group discount):

বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জন্য বিশেষ ধরণের ছাড় প্রদান এখন একটি জনপ্রিয় বিক্রয় প্রসার কৌশল। সমাজ বিভিন্ন ধরণের গ্রুপ বিদ্যমান রয়েছে যেমন- মহিলা, পুরুষ, শিশু, ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, পুলিশ ইত্যাদি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গ্রুপকে ফোকাস করে বিশেষ বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে। বিশ্ব মহিলা দিবসে জেনি ওয়াকার নাম দিয়ে পণ্য বিপণন করা হচ্ছে। বই মেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ছাড় দেওয়া হচ্ছে। আবার বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজকরা ক্রিকেট খেলোয়াড়দের জন্য সুলভ মূল্যে টিকেট প্রদান করছে। অনেক হাসপাতাল চক্ষু ক্যাম্প বা ডায়াবেটিক ক্যাম্প এর আয়োজনে স্বল্প মূল্যে রোগিদের সেবা প্রদান করছে।

 

১২. পৃষ্ঠপোষকতা পুরস্কার (Patronage reward):

বিক্রয় প্রসারের এই পদ্ধতিতে যারা প্রতিষ্ঠানের অনুগত ক্রেতা বা নিয়মিত ক্রেতা তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ সুবিধা বা পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়। নগদ অর্থ প্রদান, বিশেষ আর্থিক সুবিধা, বিশেষ সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদির মাধ্যমে ক্রেতাগণকে পুরস্কৃত করা হয়। কোন পরিবহন কোম্পানি তাদের নিয়মিত ক্রেতাদের জন্য বিশেষ ছাড় প্রদান করে থাকে। যেমন- ১০টি টিকিট ক্রয় করলে বা ১০ বার বিভিন্ন রুটে যাতায়াত করলে ১টি ফ্রি টিকিট দেওয়া হয়। কোন দোকানের নিয়মিত ক্রেতা বা হোটেলে দীর্ঘদিন অবস্থানরত গ্রাহকদের বিশেষ ছাড় ও সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়।

 

১৩. প্রদর্শনী বা মেলা (Exhibitions and shows):

দেশে বিদেশে যে সকল স্থানে বাণিজ্য মেলা বা পণ্য প্রদর্শনীর আয়োজন হয়ে থাকে সেখানে কোম্পানির অংশগ্রহণ ক্রেতাদের আকর্ষণ করে থাকে। অনেক কোম্পানি নিজেরাই এই ধরণের প্রদর্শনীর আয়োজন করে, আবার অনেকেই বাণিজ্য মেলার স্পন্সর করে থাকে। এই সকল প্রদর্শনী বা মেলায় কোম্পানিগুলো নানা ধরণের বিক্রয় কৌশল গ্রহণ করে ক্রেতা আকর্ষণের চেষ্টা করে। মেলা চলাকালীন বিশেষ মূল্য ছাড়, লটারি, পুরস্কার ইত্যাদি বিক্রয় প্রসার কৌশল অবলম্বন করে কোম্পানি তার পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি তথা বিক্রয় বৃদ্ধি করে থাকে।

 

১৪. সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ (Participation in social work):

বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমের আধুনিক এবং কার্যকরী পদ্ধতি হলো বিভিন্ন প্রকার সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ। প্রতিষ্ঠানের সুনাম বৃদ্ধি ও বিশেষ ভাবমূর্তি গড়ে তোলার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করে। বর্তমানে আধূনিক বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি হিসাবে বিভিন্ন সামাজিক কাজ যথা- দাতব্য প্রতিষ্ঠানে সাহায্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে ভূমিকা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় স্পন্সরশিপ, দেশের বিভিন্ন দুঃসময়ে মানুষের পাশে থাকা ইত্যাদি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। কোভিড-১৯ এর সময় পৃথিবীর অনেক বড় বড় কোম্পানি যেভাবে পৃথিবীব্যাপী মানুষকে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছিল তাতে সেই সকল প্রতিষ্ঠান পৃথিবীব্যাপী একটি বিশেষ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছে।

 

 

খ) ডিলার কেন্দ্রিক বিক্রয় প্রসার (Dealer Oriented Sales Promotion )

বিক্রয় প্রসার বণ্টন প্রণালীতে অংশগ্রহণকারী সদস্যগণ যেমন- খুচরা কারবারী, পাইকারি ব্যবসায়ী, ডিলার, ডিসট্রিবিউটর ইত্যাদিকে পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধিতে অধিক আগ্রহী করে তোলা হয়। ভোক্তাদের তুলনায় ডিলারদের জন্য বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমে অধিক অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। গবেষণায় দেখা যায় যে, যদি বিক্রয় প্রসারের ক্ষেত্রে কোম্পানি ভোক্তাদের ৩০ ভাগ অর্থ ব্যয় করে তবে মধ্যে ৭০ ভাগ অর্থ ব্যয় করতে হয় ডিলারদের জন্য। ডিলারদের বিক্রয় প্রসারের ব্যয় বৃদ্ধির কারণ মূলত তারা যেন বিশেষ প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয়ে বেশি প্রলুব্ধ হয় এবং ক্রেতাদেরকে উক্ত পণ্য ক্রয়ে প্রলুব্ধ করে। ডিলারদের জন্য যে সমস্ত বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় সেগুলো নিম্নে আলোচনা করা হলো:

 

১. ক্রয় ভাতা (Buying allowance) :

ডিলারগণ সাধারণত ব্যাপক ক্রয়ের সাথে জড়িত থাকে। তারা একসাথে লট ধরে প্রতিষ্ঠানের পণ্য ক্রয় করে থাকে। তাই তার পণ্য ক্রয়ের সময় কিছু বাড়তি ক্রয় সুবিধা আশা করে। কোন উৎপাদকের পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে এবং নির্দিষ্ট পরিমাণে ক্রয়ের জন্য প্রচলিত মূল্য অপেক্ষা কম দামে প্রদান করা হলে তাকে ক্রয় ছাড় বলে। এ ধরণের চুক্তির আওতায় ডিলারগণ সরাসরি পণ্য ডিসকাউন্ট বা মূল্য ডিসকাউন্ট পেয়ে থাকে। যেমন- কোন ডিলার যদি কোম্পানির এক হাজার ইউনিট পণ্য ক্রয় করে তবে তাকে আরো অতিরিক্ত একশত ইউনিট ফ্রি প্রদান করা হয়। এই ধরণের সুবিধার জন্য ডিলারগণ সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি পণ্য ক্রয়ে আগ্রহী হয়। নতুন পণ্য বাজারে ব্যাপক বিক্রয়ের জন্য এই পদ্ধতি খুবই কার্যকরী।

 

২. ক্রয় ফেরত ছাড় (Buy back allowance):

ডিলারগণ যখন কোন পণ্য ক্রয় করে তখন প্রথম ফেজে তাদেরকে ক্রয় ফেরত ছাড় প্রদান করা হয়। আবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিভিন্ন ফেজে ক্রয়ের সময় ডিলারদের ক্রয় ফেরত ছাড় প্রদান করা হয়। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া যা ডিলারদের বেশি বেশি পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করে। নতুন ক্রয়ের ক্ষেত্রে পরিমাণের উপর ভিত্তি করে ছাড় প্রদান করা হয়। তবে এই ছাড় পেতে হলে ডিলারদের একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয় করতে হয়। কি পরিমাণ পণ্য ক্রয় করলে ক্রয় ফেরত ছাড় পাওয়া যাবে তা সাধারণত নির্ধারিত হয়ে থাকে কোম্পানির নীতি নির্ধারকদের দ্বারা।

 

৩. বিজ্ঞাপন ভাতা (Advertising Allowances):

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ডিলারদের উৎসাহ প্রদানের জন্য বিজ্ঞাপন ভাতা প্রদান করে থাকে। বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিলারদের বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য বিজ্ঞাপন ভাতা প্রদান করা হয়। বিভিন্ন এলাকায় মধ্যস্থকারীদের বিজ্ঞাপনের জন্য যে অর্থ ব্যয় করে থাকে তার একটা বড় অংশ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বহন করে থাকে। মধ্যস্থতাকারীগণ যেন অধিক হারে পণ্য বিক্রয় করতে পারে সেই জন্য তাদের বিজ্ঞাপন স্থায়ীত্বতা প্রদান করা হয়। এই ধরণের ভাতা বিভিন্ন ভাবে নির্ধারিত হয়ে থাকে। যেমন- প্রকৃত ব্যয়ের ভিত্তিতে, ক্রয়ের শতাংশ হারে অথবা বার্ষিক বরাদ্দের ভিত্তিতে। এ জাতীয় বিজ্ঞাপনে ডিলারদের নাম সংযুক্ত করে দেওয়া হয় ।

 

৪. মূল্য ছাড় (Price discount):

এটা মূলত উৎপাদনকারী এবং ডিলারদের মধ্যে একটি চুক্তি। এই চুক্তির আওতায় অনেক ধরণের মূল্য ছাড় সংক্রান্ত বিষয় থাকে। মধ্যস্থকারীগণ যে আওতার মধ্যে তাদের ক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত করবে সেভাবে মূল্য ছাড় পেয়ে থাকে। যেমন- পরিমাণ ভিত্তিক মূল্য ছাড়ের কথা বলা যেতে পারে। যদি কোন পাইকারী ব্যবসায়ী দৈনিক যে পরিমাণ পণ্য ক্রয় করে থাকে সেখান থেকে তাকে ৫% মূল্য ছাড় দেওয়া হলো । কিন্তু ঐ ক্রয়ের সাথে যদি সে অতিরিক্ত আরো কিছু পণ্য ক্রয় করে তবে পরবর্তী ক্রয়ের জন্য তাকে ৭% মূল্য ছাড় দেওয়া হয়। এভাবে মৌসুমী ক্রয়, নগদ ক্রয় অথবা অন্যান্য সুবিধা বিবেচনা করে উৎপাদনকারী মধ্যস্থতাকারীদের বিশেষ মূল্য ছাড় দিয়ে থাকে। ডিলারদের জন্য এটি একটি বহুল প্রচলিত এবং কার্যকর বিক্রয় প্রসার পদ্ধতি ।

 

৫. পুশ মানি (Push money):

বিক্রয় প্রসারের এটি একটি আক্রমণাত্মক পদ্ধতি। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা পণ্য ক্রয় করার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকে না। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে তারা পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য হয়। ডিলারগণ তাদের পরিচিত স্বজন, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, অফিস সহকর্মী ইত্যাদির কাছে জোর পূর্বক পণ্য বিক্রয় করে থাকে। জাতীয় পর্যায়ের যে সকল লটারি বা অর্থ সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালিত হয় সেখানে বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সাথে বিভিন্ন ধরনের টিকিট বা লটারি বিক্রয় করা হয়। এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কোম্পানি ডিলারদেরকে নগদ অর্থ, সুবিধাদী বা বিভিন্ন ধরণের উপহার সামগ্রী প্রেরণ করে থাকে।

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতিসমূহ

৬. প্রদর্শনী ভাতা (Display allowance):

বর্তমান প্রতিযোগী বাজারে পণ্য প্রদর্শনী একটি গুরুত্বপূর্ণ বিপণন কার্যক্রম। যথাযথ পণ্য প্রদর্শন ক্রেতাদের পণ্য ক্রয়ে আকৃষ্ট করে। অনেক সময় সুন্দর এবং আকর্ষণীয়ভাবে পণ্য প্রদর্শন করা মধ্যস্থতাকারীদের পক্ষে সম্ভবপর হয় না। দুইটি কারণে ডিলারদের পক্ষে পণ্য প্রদর্শন যথাযথভাবে সম্ভবপর হয় না। প্রথমত এটি একটি ব্যয়বহুল বিষয় আর দ্বিতীয়ত এটি একটি রূচিশীল কারিগরি বিষয়। তাই ডিলারগণ পণ্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরণের সহযোগিতা আশা করে। মধ্যস্থতাকারীরা নির্দিষ্ট উৎপাদকের পণ্যের প্রদর্শনের জন্য ছাড় গ্রহণ করতে পারে।

 

৭. ডিলারদের প্রতিযোগিতা (Dealer’s competition):

উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ডিলারদের মধ্যে পণ্য বিক্রয় প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে। এদের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত হলো বিক্রয় প্রতিযোগিতা। যে ডিলার যত বেশি পরিমাণ বিক্রয় করবে তাদের জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকে। যেমন- কোম্পানির পক্ষে ঘোষণা করা হলে এবারের সবচেয়ে বেশি পণ্য বিক্রয়কারী ডিলারকে একটি টয়োটা গাড়ি উপহার দেওয়া হবে। এই পুস্কার প্রাপ্তির আশায় ডিলারা বেশি পণ্য বিক্রয়ের প্রতিযোগিতায় মেতে উঠবে। অন্য দিকে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ডিলারদের বিক্রয় লক্ষ্য ঠিক করে দেয়। যেমন- কোন ডিলার যদি মাসে এক হাজার পণ্য বিক্রয় করতে পারে তবে তাদের জন্য নির্ধারিত পুরস্কার থাকে। ফলে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে পারে ।

 

৮. বিক্রয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি (Sales training program):

ডিলারদের পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা দেখা যায় বিশেষ করে নতুন পণ্য এবং প্রযুক্তিগত পণ্যের নিয়ে। পণ্য ও বাজার নিয়ে ডিলারদের অনেক তথ্য জানা থাকে না। একজন ব্যবসায়ী হিসেবে মধ্যস্থকারীদের যথেষ্ট পরিমাণে প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জ্ঞান ও পণ্য সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। উৎপাদকগণ মধ্যস্থতাকারীদের দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য মাঝে মাঝে বিক্রয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে। প্রশিক্ষণের পর ডিলারদের বিক্রয় ম্যানুয়াল, পণ্য ও প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত পুস্তিকা ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়। আবার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষকবৃদ্ধ ডিলারদের শো-রুম বা বিক্রয় কেন্দ্রে গিয়ে হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে থাকে।

 

৯. কনভেনশন ও বাণিজ্য মেলা (Convention and trade show) :

অনেক কোম্পানি ও বাণিজ্য সংস্থা তাদের পণ্যের প্রসারের জন্য কনভেনশন ও বাণিজ্য মেলার আয়োজন করে থাকে। প্রদর্শনীর মাধ্যমে ডিলার ও বিক্রেতাগণ বিভিন্ন ভাবে উপকৃত হয়। নতুন, পুরাতন ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন হয়। নতুন ক্রেতাদের কাছে পণ্য বিক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয় এবং বর্তমান ক্রেতাদের কাছে অধিক পণ্য বিক্রয় করা যায়। এই প্রদর্শনীগুলোতে পণ্য প্রদর্শন, পণ্য তথ্যাবলী, প্রতিষ্ঠানের তথ্যসমূহ ডিলার ও বিক্রেতাদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান, প্রতিযোগী পণ্যের সাথে তুলনা ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করা যায়। এই সকল বাণিজ্য মেলাতে বড় বড় বিক্রয় অর্ডারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ব্যবসায় বিপণনকারীরা তাদের বাৎসরিক প্রসার বাজেটের শতকরা ৩৫ ভাগ বাণিজ্য মেলাতে ব্যয় করে থাকে।

 

Marketing, Marketing Gurukul, GOLN, মার্কেটিং, মার্কেটিং গুরুকুল, বিপণন, مارکیٹنگ , تسويق , विपणन

 

গ) বিক্রয়কর্মী কেন্দ্রিক বিক্রয় প্রসার (Sales Force Oriented Sales Promotion):

অধিকাংশ বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত হয় বিক্রয়কর্মীদের মাধ্যমে। বিক্রয়কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি পেলে বিক্রয়কর্মীগণ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। বিক্রয় কর্মীগণ যাতে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয়ে অধিক মনোযোগী হয় এবং অধিক উৎসাহ নিয়ে বিক্রয় কাজ পরিচালনা করে সেজন্য নানা ধরণের বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। নিম্নে বিক্রয় কর্মীদের জন্য গৃহীত বিক্রয় প্রসারের বিভিন্ন পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করা হলো :

 

১. বোনাস প্রদান (Pay bonus) :

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যেমন কর্মচারীদের জন্য বোনাসের ব্যবস্থা রয়েছে তেমন বিক্রয়কর্মীগন উৎপাদনকারী কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে বোনাস আশা করে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রয়কর্মীদের জন্য বাৎসরিক বোনাসের পরিমাণ নির্ধারণ করে। আবার কোন কোন প্রতিষ্ঠান বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিক্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয় এবং তার উপর ভিত্তি করে বোনাস প্রদান করা হয়। বিক্রয়কর্মীরা যখন তাদের বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে তখন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের বিক্রয় বোনাস প্রদান করে। এছাড়া বোনাসের পাশাপাশি কোম্পানি তাদের বিক্রয়কর্মীদের জন্য অনেক ধরণের সুযোগ সুবিধা প্রদান করে থাকে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যখন বিক্রয়কর্মীদের সঠিক ভাবে মূল্যায়ন করে এবং তাদের সার্বিক বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করে তখন বিক্রয়কর্মীগণ উৎসাহিত হয়ে বেশি বেশি পণ্যসামগ্রী বিক্রয়ের চেষ্টা চালায়।

 

২. বিক্রয়কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি (Creating sales force contests):

ভোক্তা প্রসার এবং ডিলার বিক্রয় প্রসারের মত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিক্রয়কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করে বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়াতে পারে। এখানে দুটো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যেমন- প্রথমত লক্ষমাত্রা পদ্ধতি, যেখানে বিক্রয়কর্মী তার নির্ধারিত বিক্রয় লক্ষ্য অর্জন করতে পারলে তাকে পুরস্কৃত করা হয়। দ্বিতীয়ত সর্বোচ্চ বিক্রয় পদ্ধতি, যেখানে যে বিক্রয়কর্মী সবচেয়ে বেশি বিক্রয় করবে তাকে পুরস্কৃত করা। এছাড়াও কোন কোন কোম্পানি বার্ষিক সভা বা অধিবেশনে বিক্রয়কর্মীদের জন্য পণ্য ও প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্যমূলক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। যারা এখানে অংশগ্রহণ করে তাদের মধ্যে থেকে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় স্থান নির্ধারণ করে পুরস্কার প্রদান করা হয়। এতে কোম্পানির পণ্য বিক্রয়ের প্রতি বিক্রয়কর্মীদের উৎসাহ অনেকাংশে বৃদ্ধি পায় ।

 

৩. বিক্রয় সভা (Sales meeting):

বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় কাজে উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিক্রয় সভা খুবই প্রচলিত এবং জনপ্রিয় পদ্ধতি। বিক্রয়কর্মীদের সাথে প্রতিষ্ঠানের কর্তা ব্যক্তিদের যোগাযোগ স্থাপন ও বিক্রয় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিক্রয় সভা আহ্বান করা হয়ে থাকে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মাঝে মাঝে বিক্রয়কর্মীদের সভা ও কনফারেন্সের আয়োজন করে। এখানে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পণ্য ও প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা, কৌশল, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়। অন্যদিকে বিক্রয় কর্মকাণ্ডে বিক্রয়কর্মীগণ কি ধরণের সমস্যার মধ্যে থাকে সেগুলো সমাধানের জন্য কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এই সভায় বিক্রয়কর্মীদের বিক্রয় বিষয়ে শিক্ষা দান, বিক্রয়ে উৎসাহিত করা ও বিক্রয়কর্মীদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন করে পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয়।

 

৪. প্রেষণামূলক কর্মসূচি (Motivational program) :

পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধির জন্য উপরোল্লিখিত কর্মসূচির বাইরে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিভিন্ন ধরণের প্রেষণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়। বিক্রয়কর্মী ক্রেতাদের উপর যেমন প্রভাব বিস্তার করে তেমনি বিপণন ব্যবস্থাপকগণ বিক্রয়কর্মীর উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এখানে লক্ষণীয় যে, সকল বিক্রয়কর্মীর জন্য একই ধরণের প্রেষণা কাজ করে না। ক্ষেত্র বিশেষে একজন বিক্রয়কর্মীর জন্য ভিন্ন ধরণের প্রেষণার প্রয়োজন হয়। বিক্রয়কর্মীদের প্রত্যেককে আলাদাভাবে গুরুত্ব প্রদান, প্রত্যেকের আয়ের স্তর, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মর্যাদা এবং ব্যক্তিগত আগ্রহ বিবেচনা করে প্রেষণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেবল অর্থনৈতিক প্রণোদনাকেই প্রাধান্য দিলে হবে না বরং বিনোদন, খেলাধুলা, প্রতিযোগিতার আয়োজন ইত্যাদি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে ।

 

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি

 

বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি সমূহের সারসংক্ষেপ:

বিক্রয় প্রসারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন ধরণের কৌশল ও পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এসকল | পদ্ধতিসমূহকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। প্রথমত, ভোক্তাদের জন্য বিক্রয় প্রসার। ভোক্তাদের পণ্য ক্রয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যে সকল বিক্রয় প্রসার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় সেগুলোকে বলা হয় ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসার। ভোক্তামুখী বিক্রয় প্রসারের উল্লেখযোগ্য কৌশল বা পদ্ধতিগুলো হলো— কুপন, নমুনা প্রেরণ, নগদ অর্থ ফেরত, প্রিমিয়াম, প্রতিযোগিতা, লটারি, মেয়াদী গ্যারান্টি প্রদান, উপহার প্রদান, আকর্ষণীয় মোড়ক, জীবনযাত্রা ও গ্রুপ ডিসকাউন্ট প্রদান, পৃষ্ঠপোষকতা, পুরস্কার প্রদান, প্রদর্শনী বা বাণিজ্য মেলার আয়োজন, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ইত্যাদি।

দ্বিতীয় বিক্রয় প্রসার পদ্ধতি হলো ডিলারদের জন্য বিক্রয় প্রসার। বিক্রয় প্রসারের মাধ্যমে বণ্টন প্রণালীতে অংশগ্রহণকারী সদস্যগণ যেমন- পাইকারী ব্যবসায়ী, খুচরা কারবারী, ডিলার, ডিসট্রিবিউটর ইত্যাদিকে পণ্য বিক্রয় বৃদ্ধিতে অধিক আগ্রহী করে তোলা হয়। | ডিলারদের জন্য প্রধান বিক্রয় প্রসার কৌশলসমূহ হলো— ডিলারদের জন্য ক্রয় ভাতা, ক্রয় ফেরত ছাড়, বিজ্ঞাপন ভাতা, বিশেষ মূল্য ছাড়, পুশ মানি পদ্ধতি, প্রদর্শনী ভাতা, ডিলারদের প্রতিযোগিতা, বিক্রয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, কনডেনশন ও বাণিজ্য মেলা ইত্যাদি। তৃতীয় পদ্ধতি হলো বিক্রয়কর্মীদের জন্য বিক্রয় প্রসার।

বিক্রয়কর্মীগণ যাতে প্রতিষ্ঠানের পণ্য বিক্রয়ে অধিক মনোযোগী হয় এবং অধিক উৎসাহ নিয়ে বিক্রয় কাজ পরিচালনা করে সেজন্য নানা ধরণের বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। বিক্রয়কর্মীদের জন্য যে সকল বিক্রয় প্রসার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয় সেগুলো হলো— বিক্রয়কর্মীদের বোনাস প্রদান, বিক্রয়কর্মীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করা, বিক্রয় সভার আয়োজন করা, বিভিন্ন ধরণের প্রেষণামূলক কর্মসূচি গ্রহণ ইত্যাদি ।

১ thought on “বিক্রয় প্রসারের পদ্ধতি সমূহ”

Leave a Comment