বিজ্ঞাপন গবেষণা ধারণা, গুরুত্ব ও প্রকারভেদ

বিজ্ঞাপন গবেষণা ধারণা, গুরুত্ব ও প্রকারভেদ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর  “বিজ্ঞাপন গবেষণা” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।

বিজ্ঞাপন গবেষণা ধারণা, গুরুত্ব ও প্রকারভেদ

Table of Contents

বিজ্ঞাপন গবেষণা ধারণা, গুরুত্ব ও প্রকারভেদ

 

বিজ্ঞাপন গবেষণা হলো ঠিক কী ধরণের বিজ্ঞাপন তৈরি করা উচিৎ, বিজ্ঞাপনের বার্তা কিরূপ হওয়া উচিৎ, কোন ধরণের মাধ্যম ব্যবহার করে কখন বিজ্ঞাপনটি প্রদর্শন করা উচিৎ ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য পদ্ধতিগতভাবে সংগ্রহ, লিপিবদ্ধ এবং বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা উন্নত করার একটি প্রচেষ্টা। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপন বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে, বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান বাস্তবায়নে পছন্দসই মাধ্যম নির্বাচন করতে, অভীষ্ট দর্শকদের উপর বিজ্ঞাপনের প্রভাব পরিমাপ করতে এবং বিজ্ঞাপনের ব্যয়- কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

বিজ্ঞাপনের নিজস্ব এবং প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞাপন গবেষণাকে কাস্টমাইজড বা স্বনির্ধারিত বিজ্ঞাপন গবেষণা, সিন্ডিকেট বিজ্ঞাপন গবেষণা, বিজ্ঞাপন-পূর্ব বা প্রি-টেস্টিং গবেষণা এবং বিজ্ঞাপন প্রকাশোত্তর বা পোস্ট-টেস্টিং গবেষণা ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।

 

বিজ্ঞাপন গবেষণা কাকে বলে?

What is Advertising Research?

বিজ্ঞাপন গবেষণা হলো বিজ্ঞাপন সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য বিস্তারিতভাবে সংগ্রহ, লিপিবদ্ধ ও বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা উন্নত করার একটি পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা। পণ্য, সেবা, ব্র্যান্ড বা প্রতিষ্ঠানের প্রতি গ্রাহকদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য ঠিক কী ধরণের বিজ্ঞাপন তৈরি করা উচিৎ, বিজ্ঞাপনের বার্তা কিরূপ হওয়া উচিৎ, কোন ধরণের মাধ্যম ব্যবহার করে কখন বিজ্ঞাপনটি প্রদর্শন করা উচিৎ উত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে নির্ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য বিজ্ঞাপন গবেষণার কোন বিকল্প নেই।

এছাড়াও অভীষ্ট গ্রাহকরা কীভাবে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনে সাড়া দেয় তা জানার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারের সাফল্য নির্ধারণ করতেও বিজ্ঞাপন গবেষণা পরিচালিত হয়। অর্থাৎ, বিজ্ঞাপন তৈরি করা এবং প্রচারাভিযানের কার্যকারিতা পরিমাপ করা, দুই পর্যায়েই বিজ্ঞাপন গবেষণার প্রয়োজনীতা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে G. E. Belch and M. A. Belch-এর মতামত উল্লেখ করা যেতে পারে। তাদের মতে প্রচারমূলক কর্মসূচীর কার্যকারিতা পরিমাপ করা প্রচারমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিপণন ব্যবস্থাপককে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয় এবং পরবর্তী সময়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট প্রদান করে। বিজ্ঞাপন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অব্যাহত প্রচার পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার একটি অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। বিজ্ঞাপন গবেষণার ধারণা দিতে গিয়ে তারা বলেন,

“Research that is conducted in an evaluative role-to measure the effectiveness of advertising and promotion and/or to assess various strategies before implementing them.”

(অর্থাৎ বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপন এবং প্রচারের কার্যকারিতা পরিমাপ করার জন্য কিংবা বিভিন্ন কৌশল বাস্তবায়নের আগে সেগুলো মূল্যায়ন করার জন্য একটি মূল্যায়নমূলক ভূমিকায় পরিচালিত হয়।)

এ প্রসঙ্গে Terence A. Shimp বলেন, বিজ্ঞাপন গবেষণার মধ্যে বিভিন্ন উদ্দেশ্য, পদ্ধতি, ব্যবস্থা এবং কৌশল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তিনি বিস্তৃতপরিসরে বিজ্ঞাপন গবেষণার দুটি সাধারণ রূপকে আলাদা করার কথা বলেছেন, যেমন- মাধ্যমের কার্যকারিতার পরিমাপ এবং বার্তার কার্যকারিতা পরিমাপ। তার মতে,

“Advertising research involves both pretesting messages during developmental stages (prior to actual placement in advertising media) and posttesting messages for effectiveness after they have been aired or printed. Pretesting is performed to eliminate ineffective ads before they are ever run, while posttesting is conducted to determine whether messages have achieved established objectives.”

(অর্থাৎ, বিজ্ঞাপন গবেষণায় উন্নয়নমূলক পর্যায়ে বিজ্ঞাপন মাধ্যমে বার্তার স্থান নির্ধারণের আগে বার্তার প্রি-টেস্টিং এবং প্রচারিত বা মুদ্রিত হওয়ার পরে তার কার্যকারিতা পরিমাপের জন্য বার্তার পোস্ট-টেস্টিং উভয়ই অন্তর্ভুক্ত থাকে। অকার্যকর বিজ্ঞাপনগুলো প্রচারের আগে তা অপসারন করার জন্য প্রি-টেস্টিং করা হয় এবং বার্তাগুলো বিজ্ঞাপনের পূর্বনির্ধারিত উদ্দেশ্যগুলো অর্জন করতে পেরেছে কিনা তা যাচাই করার জন্য পোস্ট- টেস্টিং করা হয়।)

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য, পণ্যের আবেদন, অনুলিপি পরীক্ষা এবং বার্তা ও মাধ্যমের কার্যকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়নের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের প্রভাব পরীক্ষা বা প্রচেষ্টার ফলাফল মূল্যায়ন করার জন্য বিজ্ঞাপন গবেষণা পরিচালনা করা হয়।

 

 

বিজ্ঞাপন গবেষণার গুরুত্ব [ Importance of Advertising Research ]:

বিজ্ঞাপন গবেষণা হলো বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের কার্যকারিতা সম্পর্কিত তথ্যের পদ্ধতিগত সংগ্রহ, লিপিবদ্ধকরণ এবং বিশ্লেষণের একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। বিজ্ঞাপন গবেষণা একটি নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনকে ভোক্তারা কীভাবে উপলব্ধি করে বিজ্ঞাপনদাতার সাথে কীভাবে যোগাযোগ করে এবং বিজ্ঞাপনের প্রতি কিরকম প্রতিক্রিয়া জানায় তা মূল্যায়নের একটি মূল্যবান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিপণনকারীদের তাদের অভীষ্ট গ্রাহকদের সাথে ভালোভাবে যোগাযোগ করতে এবং তাদের সামগ্রিক বিজ্ঞাপন কৌশলকে উন্নত করতেও সাহায্য করে থাকে। বিজ্ঞাপন গবেষণার মূল উদ্দেশ্যগুলোর দিকে তাকালে বিজ্ঞাপন গবেষণার গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপন বাজেটের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে, বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান বাস্তবায়নের পছন্দসই মাধ্যম নির্বাচন করতে, অভীষ্ট দর্শকদের উপর বিজ্ঞাপনের প্রভাব পরিমাপ করতে এবং বিজ্ঞাপনের ব্যয়-কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। নিম্নে বিজ্ঞাপন গবেষণার গুরুত্বসমূহ বর্ণনা করা হলো:

 

১. সচেতনতা বাড়ায় (Increases awareness) :

বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য হলো গ্রাহককে কোম্পানি এবং এর পণ্য বা সেবা সম্পর্কে সচেতন করা। পক্ষান্তরে বিজ্ঞাপন গবেষণার উদ্দেশ্য হলো কোম্পানিকে তার অভীষ্ট বাজার বা অভীষ্ট গ্রাহক সম্পর্কে সচেতন করা যাতে করে কোম্পানি একটি কার্যকর বিজ্ঞাপন নির্মাণ করতে পারে।

 

২. পরিবর্তিত বাজার বিশ্লেষণ (Analyzes changing market):

যদি একটি কোম্পানি দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে চায় তাহলে কোম্পানিকে সর্বপ্রথম তাদের গ্রাহকদের যথাযথভাবে জানতে হবে। বাজার বা পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সাথে গ্রাহকদের মনোভাবও ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়, কারণ কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন এবং উদ্ভাবনী পণ্য বাজারে প্রবর্তন করে। বিজ্ঞাপন গবেষণা গ্রাহকদের এই ক্রমপরিবর্তনশীল মনোভাব সম্পর্কে জানতে এবং এই পরিবর্তনগুলোকে বিশ্লেষণ করতে কোম্পানিকে সাহায্য করে।

 

৩. বিজ্ঞাপন যোগাযোগ (Advertising Communication) :

বিজ্ঞাপনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো পণ্য বা ব্র্যান্ডকে তার অভীষ্ট বা সম্ভাব্য গ্রাহকের সাথে যোগাযোগ করা। বিজ্ঞাপন গবেষণার মাধ্যমে পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, গ্রাহকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন বা পণ্য সম্পর্কে গ্রাহকের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণকে মূল্যায়ন করে বার্তাগুলোর যোগাযোগের সফলতা পরিমাপ করা যেতে পারে।

 

৪. সৃজনশীলতার বিকাশ (Developing creativity):

বিজ্ঞাপন গবেষণার মাধ্যমে গ্রাহক, প্রতিযোগী পণ্য, প্রতিযোগী বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন অফার বা প্রতিলিপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য সঠিক সময়ে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। যখন এসমস্ত তথ্য সহজলভ্য হয় তখন প্রতিষ্ঠানের আরও উন্নয়নের জন্য একটি সুগঠিত সৃজনশীল কৌশল প্রণয়নের কাজটি সহজ হয়ে যায়।

 

৫. ব্যবসায়িক অবস্থান উন্নত করে (Improves business position):

বিজ্ঞাপন গবেষণা একটি কোম্পানিকে তাদের পণ্যগুলো চালু করার জন্য উপযুক্ত সময় এবং উপায় খুঁজে পেতে সাহায্য করে। ফলে নতুন পণ্যের সাফল্যের সাথে সাথে কোম্পানির সার্বিক ব্যবসায়িক অবস্থান দৃঢ় হয় ।

 

৬. বাজার অবস্থান ক্রম নির্ধারণ (Ranks market position) :

বিজ্ঞাপন গবেষণা একটি কোম্পানির সাথে অন্য কোম্পানির তুলনা করতে সাহায্য করে। বিজ্ঞাপন গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে একটি কোম্পানি অন্যদের তুলনায় বাজারে কতটুকু এগিয়ে বা পিছিয়ে রয়েছে, তার পরিষ্কার অবস্থান জানতে পারে ।

 

৭. সম্ভাব্য সমস্যার পূর্বাভাস দেয় (Predicts likely issues):

বিজ্ঞাপন গবেষণা কোম্পানির বিজ্ঞাপন বা প্রচার সংশ্লিষ্ট সমস্যা গুলো খুঁজে পেতে বা সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ বাতলে দিতে পারে। পাশাপাশি কার্যকর বিজ্ঞাপন গবেষণা কোম্পানির আসন্ন সমস্যাগুলোর ভবিষ্যদ্বাণীও করে যা কোম্পানিকে সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে ।

 

৮. ব্যর্থতার সম্ভাবনা হ্রাস (Lessening chances of failures ) :

কার্যকর বিজ্ঞাপন গবেষণার মাধ্যমে বাজার ও প্রতিযোগিদের সম্পর্কে নানা গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা যায় এবং ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য রেখে প্ররোচক কৌশল হাতে নেওয়া সম্ভব হয়। বিজ্ঞাপন গবেষণা পুঙ্খানুপুঙ্খ হলে ব্যর্থতার ঝুঁকি কমে যায়।

বিজ্ঞাপন গবেষণা ধারণা, গুরুত্ব ও প্রকারভেদ

৯. প্রতিক্রিয়া প্রদান (Provide Feedback):

বিজ্ঞাপন প্রদানকারী সংস্থা তার পছন্দসই ফলাফল পেয়েছে কি না তা পরীক্ষা না করা পর্যন্ত বিজ্ঞাপন শেষ হয় না। কাম্য ফলাফল পরিমাপ করার একটি প্রচেষ্টা হচ্ছে বিজ্ঞাপন তৈরিতে বিনিয়োগের ফলে লক্ষ্যগুলো অর্জন করা বা গ্রাহকদের সন্তুষ্টি প্রদান করা সম্ভব হয়েছে কি না তা জানা। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা সম্পর্কে কোম্পানিকে প্রতিক্রিয়া প্রদান করে ।

 

১০. ফলাফল প্রদান (Provide Results ) :

বিজ্ঞাপনের মূল্যায়ন বলতে বিজ্ঞাপনের কার্যক্ষমতা পরিমাপের জন্য প্রতিষ্ঠিত মানের সাথে বিজ্ঞাপনের প্রকৃত ফলাফলের তুলনা করাকে বোঝায়। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপনের বার্তাটি লক্ষ্যস্থিত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে কি না বা কাঙ্ক্ষিত প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে কি না তা জানতে সাহায্য করে। বিজ্ঞাপনের ফলাফল মূল্যায়নের এই কাজটি বিজ্ঞাপনের শুরুতে, মাঝখানে বা বিজ্ঞাপনের শেষে যে কোন পর্যায়ে করা যেতে পারে।

 

উপোরিল্লিখিত আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বিজ্ঞাপন গবেষণা প্রতিটি কোম্পানির সাফল্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে ।

 

Marketing, Marketing Gurukul, GOLN, মার্কেটিং, মার্কেটিং গুরুকুল, বিপণন, مارکیٹنگ , تسويق , विपणन

 

বিজ্ঞাপন গবেষণার প্রকারভেদ [ Types of Advertising Research ]:

গবেষণাকে ফলপ্রসূ ও কার্যকর হতে হলে তা বিজ্ঞানসম্মত এবং পদ্ধতিগতভাবে সম্পাদিত হতে হয়। ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, প্রয়োগ, পদ্ধতিগত মূলনীতি, তথ্যের উৎস বা উপাত্ত আহরণের ক্ষেত্র ও ব্যবহারের ভিত্তিতে গবেষণাকে নানাভাবে বিভক্ত করা যায়। যেমন- উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে গবেষণাকে উদ্ঘাটনমূলক, ব্যাখ্যামূলক ও বর্ণনামূলক গবেষণা; প্রয়োগের ভিত্তিতে মৌলিক গবেষণা, ফলিত গবেষণা ও কার্যমূলক গবেষণা; পদ্ধতিগত মূলনীতির ভিত্তিতে গুণগত, পরিমাণগত ও মিশ্র গবেষণা; তথ্যের উৎসের ভিত্তিতে গবেষণাকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক গবেষণা; উপাত্ত আহরণের ক্ষেত্র ও ব্যবহারের ভিত্তিতে গবেষণাকে প্রামাণিক, মাঠ ও ল্যাবরেটরি গবেষণা উত্যাদি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।

বিজ্ঞাপন গবেষণা উপরের যে কোন ধরণের এক বা একাধিক গবেষণা প্রকারের আওতায় পড়তে পারে। তবে উপরের ধরণগুলোর বাইরেও বিজ্ঞাপনদাতারা বিজ্ঞাপন গবেষণাকে প্রায়োগিক দিক থেকে আলাদাভাগে বিভক্ত করে থাকেন। নিম্নে বিজ্ঞাপনের নিজস্ব এবং প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞাপন গবেষণার শ্রেণিবিভাগ আলোচনা করা হলো:

 

১। কাস্টমাইজড বা স্বনির্ধারিত বিজ্ঞাপন গবেষণা (Customized Advertising Research):

কাস্টমাইজড বা স্বনির্ধারিত বিজ্ঞাপন গবেষণা কোম্পানি তার সুনির্দিষ্ট চাহিদা মেটাতে সম্পাদন করে থাকে। যেমন- কোকা কোলা কোম্পানি একটি নতুন স্বাদের পানীয় চালু করতে চায় এবং গ্রাহকরা তার বিজ্ঞাপনের প্রতি কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা তারা গবেষণা করে দেখতে চায়। গবেষণাটি কোম্পানি নিজেই করুক বা অন্য কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দিয়ে করিয়ে থাকুক না কেন, গবেষণার ফলাফল শুধুমাত্র কোকা কোলা কোম্পানিই ব্যবহার করবে। একেই কাস্টমাইজড বা স্বনির্ধারিত বিজ্ঞাপন গবেষণা বলে ।

 

২। সিন্ডিকেট বিজ্ঞাপন গবেষণা (Syndicated Advertising Research):

সিন্ডিকেট বিজ্ঞাপন গবেষণা নির্দিষ্ট কোম্পানি বা গবেষক দ্বারা সম্পাদন করা হয়ে থাকে। তবে এই ধরণের গবেষণার ফলাফল চাইলে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান নিজেদের জন্যও ব্যবহার করতে পারে। যদি কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণার ফলাফলে আগ্রহী হন তবে তারা একটি নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধের মাধ্যমে কিংবা আলোচনার ভিত্তিতে বিনামূল্যেও সেই গবেষণার ফলাফল পেতে পারেন।

যেমন- একটি কোম্পানি একটি নির্দিষ্ট পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়ার সর্বোত্তম উপায় সম্পর্কে গবেষণা করে। এই গবেষণাটি অনুরূপ পণ্য উৎপাদনকারী অন্যান্য কোম্পানির কাছেও সহজলভ্য করা হয় এবং যে কেউ এর ফলাফল কিনে নিয়ে নিজেদের কাজে লাগাতে পারে। একেই সিন্ডিকেট বিজ্ঞাপন গবেষণা বলে ।

 

৩। বিজ্ঞাপন-পূর্ব বা প্রি-টেস্টিং গবেষণা (Pre-testing Advertising Research):

প্রায় সকল প্রক্রিয়ায় কোন না কোন ধারণা দিয়ে শুরু হয়। একটি ধারণাকে বাস্তবে রূপান্তর করার সাথে অনেক ধরণের ঝুঁকি জড়িত থাকে। আবার সৃজনশীল সমস্যার কারণে অর্ধেকের বেশি ধারণা বাস্তবে রূপ পাওয়ার আগেই ব্যর্থ হয়ে যায়। তাই কোম্পানিকে নিশ্চিত করতে হয় যে তার ধারণা অভিষ্ট দর্শকদের কাছে ঠিকভাবে পৌঁছেছে। বিজ্ঞাপন গবেষণার প্রাক-পরীক্ষা পর্ব কোম্পানিকে তাই অভিষ্ট দর্শকদের বিশদভাবে অধ্যয়ন করতে সাহায্য করে এবং তারা বিজ্ঞাপনের ধারণাটিকে গ্রহণ করবে নাকি প্রত্যাখ্যান করবে তা জানতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ, বিজ্ঞাপন প্রচার শুরুর আগেই নির্ধারিত বিজ্ঞাপনটি পরীক্ষা করার জন্য বিজ্ঞাপন-পূর্ব বা প্রি-টেস্টিং বিজ্ঞাপন গবেষণা করা হয়। বিজ্ঞাপন-পূর্ব গবেষণা বিজ্ঞাপন গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কারণ এটি পণ্য বা ব্র্যান্ডটি যে মূল পয়েন্টগুলোর ভিত্তিতে তৈরি করা হবে তা নির্ধারণ করে এবং ভোক্তদের পছন্দ, ভোক্তা অনুভূতি এবং ব্র্যান্ডের প্রতি অভিষ্ট দর্শকদের প্রতিক্রিয়া খুঁজে বের করতে সাহায্য করে থাকে ।

 

৪। বিজ্ঞাপন প্রকাশোত্তর বা পোস্ট-টেস্টিং গবেষণা (Post-testing Advertising Research):

বিজ্ঞাপন বার্তা প্রচারের প্রক্রিয়াটি একটি দ্বিমুখী প্রক্রিয়া। কোম্পানি যখন তার পণ্যের বিজ্ঞাপন দেয় তখন এটি শুরু হয় এবং গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতিক্রিয়া পেলে এই প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয়। কোম্পানি বিজ্ঞাপন প্রকাশোত্তর গবেষণা থেকে বিজ্ঞাপনের ফলাফল পরিমাপ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিক্রিয়া পায়। বিজ্ঞাপনটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে কি না, পোস্ট-টেস্টিং গবেষণা কোম্পানিকে তা জানতে সাহায্য করে। অর্থাৎ পোস্ট-টেস্টিং বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান শুরু করার পরে সম্পাদন করা হয়। এটি কোম্পানিকে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের কার্যকারিতা পরিমাপ বা যাচাই করতে সহায়তা করে থাকে।

এভাবে বিজ্ঞাপন গবেষণাকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। তবে একটি বিষয় এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে যে, বিজ্ঞাপন গবেষণা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট প্রকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং একইসাথে দুই বা ততোধিক প্রকারেরও হতে পারে ।

 

বিজ্ঞাপন গবেষণা ধারণা

 

সারসংক্ষেপঃ

বিজ্ঞাপন গবেষণা হলো সংশ্লিষ্ট নানা তথ্য বিস্তারিতভাবে সংগ্রহ, লিপিবদ্ধ এবং বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা উন্নত করার একটি পদ্ধতিগত প্রচেষ্টা। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিপণন ব্যবস্থাপককে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনের কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন করার সুযোগ করে দেয় এবং পরবর্তী সময়ের পরিস্থিতি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ইনপুট প্রদান করে। বিজ্ঞাপন গবেষণা বিজ্ঞাপন কার্যকারিতা পরিমাপে, কোম্পানির গ্রাহক সচেতনতা বাড়াতে, পরিবর্তিত বাজার বিশ্লেষণ করতে, সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটাতে, কোম্পানির ব্যবসায়িক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে, ভবিষ্যতের  সম্ভাব্য সমস্যার পূর্বাভাস দিতে এবং বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা সম্পর্কে কোম্পানিকে প্রতিক্রিয়া প্রদান করতে সহায়তা  করে থাকে।

ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য, প্রয়োগ, পদ্ধতিগত মূলনীতি, তথ্যের উৎস বা উপাত্ত আহরণের ক্ষেত্র ও ব্যবহারের ভিত্তিতে গবেষণাকে নানাভাবে বিভক্ত করা যায়। তবে বিজ্ঞাপনের নিজস্ব এবং প্রায়োগিক দৃষ্টিকোণ থেকে | বিজ্ঞাপন গবেষণাকে কাস্টমাইজড বা স্বনির্ধারিত বিজ্ঞাপন গবেষণা, সিন্ডিকেট বিজ্ঞাপন গবেষণা, বিজ্ঞাপন-পূর্ব বা প্রি- টেস্টিং গবেষণা এবং বিজ্ঞাপন প্রকাশোত্তর বা পোস্ট-টেস্টিং গবেষণা ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।

Leave a Comment