বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার পদক্ষেপসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “বিজ্ঞাপন-বিপণন প্রসারের মূল হাতিয়ার” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার পদক্ষেপসমূহ
বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার পদক্ষেপসমূহ
Steps in Advertising Campaign Planning
বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের পরিকল্পনা বলতে প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের একটি সিরিজকে বুঝায়। সু-পরিকল্পিত প্রচারাভিযান পরিকল্পনা বিভিন্ন বিজ্ঞাপন কার্যক্রম সমন্বয় করতে সাহায্য করে এবং সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার বিভিন্ন পদক্ষেপকে ধাপে ধাপে সম্পাদন করতে হয়। প্রচারাভিযান পরিকল্পনার এই প্রক্রিয়াটি প্রায়শই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বাজার পরিস্থিতি গবেষণা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে শুরু হয়।
১। বাজার গবেষণা সম্পাদন (Conducting market research): বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজটি শুরু হয় প্রতিযোগিতামূলক বাজার পরিস্থিতি এবং ভোক্তা মনোভাব বোঝার জন্য গবেষণা কার্য পরিচালনা করার মধ্য দিয়ে। বিজ্ঞাপনদাতা বা প্রচারাভিযান পরিকল্পনাকারীকে কে তাই ভোক্তা, পণ্য এবং প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য বাজার গবেষণা করতে হয়। পণ্যটি কে ক্রয় করবে, কখন ক্রয় করবে, কি পরিমানে ক্রয় করবে, ভোক্তার বয়স, আয় বা আর্থিক সঙ্গতি, বাজারে বিদ্যমান একই ধরণের অন্যান্য পণ্যের সহজলভ্যতা, মূল্য ইত্যাদি বিষয় জানার জন্য বাজার গবেষণা জরুরি।
২। বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ (Defining advertising objectives): বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য প্রচারাভিযান পরিকল্পনা প্রণয়নে অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। বিজ্ঞাপনদাতার এক বা একাধিক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য প্রচারাভিযান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই প্রচারাভিযান কর্মসূচী হাতে নেওয়ার সময় কোম্পানির সামগ্রিক বিপণন উদ্দেশ্য, বিজ্ঞাপন উদ্দেশ্য এবং প্রচারাভিযান উদ্দেশ্যের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করতে হয়। বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান নিম্নলিখিত উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য হাতে নেওয়া হয়:
- কোম্পানির ভালো ভাবমূর্তি তৈরি
- বাজার শেয়ার বাড়ানো
- ব্যবসা বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা
- ক্রেতাদের প্রভাবিত করা
- ব্র্যান্ডের ভ্যালু বাড়ানো
- ব্র্যান্ডের ভ্যালু বাড়ানো নতুন পণ্য পরিচয় করিয়ে দেওয়া
- প্রতিযোগিতামূলক অগ্রগতি অর্জন করা
- ভোক্তাদের ক্রয় পছন্দ বাড়ানো
- নতুন ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা
- ভোক্তাদের শিক্ষিত করা
- বিক্রয় পুনরুজ্জীবিত করা
- ভোক্তাদের মনে পণ্য/সেবার অবস্থান জোরদার করা ইত্যাদি।
৩। অভীষ্ট অডিয়্যান্স শনাক্তকরণ (Identifying target audience): প্রচারাভিযানের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়ে গেলে পরিকল্পনাকারীকে এই পর্যায়ে এসে যাদের উদ্দেশ্যে প্রচারণা চালানো হবে সে অভীষ্ট অডিয়্যান্সদের নির্বাচন করতে হয়। অভীষ্ট অডিয়্যান্স হলো পূর্বনির্ধারিত ভোক্তাদের মধ্যেকার একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী যাদেরকে নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপন বার্তার প্রাপক হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রচারাভিযানের জন্য অভীষ্ট অডিয়্যান্স শনাক্তকরণ ও সংজ্ঞায়িত করার প্রক্রিয়ায় ভোক্তার ভৌগোলিক, জনসংখ্যাগত, আর্থ-সামাজিক, মনস্তাত্বিক এবং আচরণগত উপাদানগুলো বিশ্লেষনের মাধ্যমে সঠিক অডিয়্যান্সকে সম্ভাব্য নির্ভুলভাবে নির্বাচন করতে হয়। সঠিকভাবে লক্ষ্যস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের শনাক্ত করা সম্ভব হলে তাদের শারীরিক এবং মানসিক বৈশিষ্ট্যগুলো বিবেচনায় নিয়ে আরও ভালো বিজ্ঞাপনবার্তা প্রদান করা সম্ভব হয়, কেননা প্রচারাভিযানের উদ্দেশ্যগুলো মূলতঃ লক্ষ্যস্থিত বা অভীষ্ট অডিয়্যান্সের বিশ্লেষণ থেকে উদ্ভূত হয়।
৪। বিজ্ঞাপন বার্তা প্রণয়ন (Designing advertising message): বিজ্ঞাপনের জন্য একটি প্রভাবশালী বার্তা তৈরি করা প্রচারাভিযান পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি সৃজনশীল ও অর্থবহ বার্তা প্রচারের সাফল্য অর্জনে ব্যাপকভাবে অবদান রাখতে পারে। যদিও অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপন বার্তার প্রাথমিক লক্ষ্য থাকে কোম্পানি, পণ্য বা সেবা সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্য যোগাযোগ করা, তবে এটি ক্রেতাদের মতামতকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রেও মূল ভূমিকা পালন করে থাকে। একটি বিজ্ঞাপন বার্তার সাফল্য এবং ব্যর্থতা বিপণনকারীদের অফার এবং লক্ষ্যস্থিত দর্শকদের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা ও তাদের চাহিদা এবং প্রয়োজনীয়তার মধ্যেকার সামঞ্জস্যের উপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।
একটি সফল ও কার্যকর বিজ্ঞাপন বার্তার মূল উপাদানগুলো হলো-
- বার্তার অর্থবহতা
- বার্তার অসাধারণতা
- বার্তার বিশ্বাসযোগ্যতা ইত্যাদি।
৫। বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ (Determining advertising budget): বিজ্ঞাপনের বাজেট সাধারণত বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার পূর্বেই কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত হয়ে থাকে। তাই বিজ্ঞাপন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কি পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ আছে তার উপর ভিত্তি করে প্রচারাভিযান পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হয়।
বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান কর্মকান্ড সম্পাদনের জন্য কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে তা কোম্পানির উদ্দেশ্য, পণ্যের প্রকৃতি, পণ্যের জীবনচক্রের পর্যায়, কোম্পানির আর্থিক সঙ্গতি, প্রতিযোগিতামূলক অবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের উপর নির্ভর করে। বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের জন্য বিক্রয়ের শতাংশ পদ্ধতি, প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতি, উদ্দেশ্য ও কার্যভিত্তিক পদ্ধতি, বহনযোগ্য পদ্ধতি ইত্যাদি বিভিন্ন রকম পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে ।
৬। মাধ্যম পরিকল্পনা প্রণয়ন (Developing media plan): বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের সফলতা বহুলাংশেই উপযুক্ত মাধ্যম নির্বাচনের উপর নির্ভর করে। কেননা সকল পণ্য বা ভোক্তার জন্য সকল মাধ্যম সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিচালনার জন্য অনেক ধরণের মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে যেমন- সম্প্রচারিত মাধ্যম (টেলিভিশন ও রেডিও), মুদ্রিত মাধ্যম (সংবাদপত্র ও সাময়িকী বা ম্যাগাজিন), এবং সহায়ক মাধ্যম (আউট-অফ- হোম মাধ্যম)- যার মধ্যে রয়েছে বহিঃবিজ্ঞাপন, ট্রানজিট বিজ্ঞাপন, স্ট্রিট ফার্নিচার বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড ইত্যাদি; বিশেষায়িত মাধ্যম-
যার মধ্যে রয়েছে ইয়েলো পেজ বিজ্ঞাপন এবং প্রচারমূলক পণ্য বিপণন মাধ্যম যথা ব্যবসায়িক উপহার, স্মারক ইত্যাদি; এবং অন্যান্য বিজ্ঞাপন মাধ্যম- যার মধ্যে রয়েছে মুভি থিয়েটার বিজ্ঞাপন, ভিডিও গেম বিজ্ঞাপন, পার্কিং লট বিজ্ঞাপন, গ্যাস স্টেশন বিজ্ঞাপন ইত্যাদি।
৭। প্রচারাভিযান পরিচালনা / বাস্তবায়ন (Executing the campaign): বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার এই পর্যায়ে এসে বিজ্ঞাপন প্রচারণাকে বাস্তবায়ন করতে হয়। অর্থাৎ, মাঠ পর্যায়ে প্রচারাভিযান কর্মকান্ড চূড়ান্তভাবে শুরু করতে হবে। প্রচারাভিযান কর্মসূচীর সঠিক বাস্তবায়নের সময় কোম্পানির সামগ্রিক বিপণন কর্মসূচী, বিশেষ করে প্রসার কর্মসূচীর সাথে একে সমন্বয় করে নিতে হবে।
৮। প্রচারাভিযান মূল্যায়ন (Evaluating effectiveness of campaign): বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার সর্বশেষ ধাপে এসে কর্মসূচীর কার্যকারিতা পরিমাপ করে দেখতে হয়। প্রচারাভিযান মূল্যায়নের এই কাজ প্রচারাভিযান চলাকালীন সময়েও করা যায়, আবার প্রচারাভিযান শেষ করে ফলাফল মূল্যায়নের মাধ্যমেও করা যায়। প্রচারাভিযার মূল্যয়ন মূলতঃ নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর দিকে ফোকাস করে থাকে-
- লক্ষ্যস্থিত অডিয়্যান্স সঠিক বার্তাটি পেয়েছে কি না;
- প্রচারাভিযানের ফলে বিক্রয় বৃদ্ধি পেয়েছে কি না;
- প্রচারাভিযানের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সমূহ অর্জন সম্ভব হয়েছে কি না ইত্যাদি।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার পদক্ষেপসমূহ ধাপে ধাপে একটির পর আরেকটি বাস্তবায়ন করতে হয়। কোনভাবেই একটি পদক্ষেপকে বাদ দিয়ে অন্য পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলে সামগ্রিক প্রচারাভিযানের উদ্দেশ্য অর্জন সম্ভবপর হয় না ।

বিজ্ঞাপন কি অপচয়?
Is Advertising Wasteful?
প্রতিযোগিতার এই যুগে প্রসারের বিকল্প নেই। বলা হয়ে থাকে প্রসারেই (প্রচারেই) প্রসার। আর প্রসারের সর্বাধিক জনপ্রিয় হাতিয়ার হলো বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন ছাড়া তাই কোম্পানির বিপণন কার্যক্রমকে চিন্তাই করা যায় না। পণ্য, সেবা বা কোম্পানির পরিচিতি ও চাহিদা তৈরি থেকে শুরু করে বাজারে গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে বিজ্ঞাপনের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক সময়ই বিজ্ঞাপনের মাত্রাধিক ব্যবহার বা কিছু অপব্যবহারের কারণে অনেকেই বিজ্ঞাপনকে অপচয় বলে থাকেন। বিজ্ঞাপনকে অপচয় বলার পিছনের যুক্তিসমূহ হলো-
- বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য কেনে, ফলে আর্থিক স্বচ্ছলতা নষ্ট হয়।
- প্রতিযোগিদের সাথে বিজ্ঞাপন যুদ্ধে নেমে কোম্পানি অনেক সময় মাত্রাতিরিক্ত অর্থ খরচ করে, ফলে অর্থের অপচয় হয়।
- বিজ্ঞাপনের খরচ তুলে আনতে কোম্পানিগুলো পণ্য মূল্য বাড়িয়ে দেয়।
- অনেক বিজ্ঞাপনে অতিরঞ্জিত তথ্য বা অফার পরিবেশিত হয়ে থাকে, যেগুলোতে আকৃষ্ট হয়ে ক্রেতারা প্রতারিত হতে পারেন।
- ক্ষতিকর পণ্য যেমন- সিগারেট, অ্যালকোহল ইত্যাদির বিজ্ঞাপন (সারোগেট বিজ্ঞাপন) প্রচারের মাধ্যমে সমাজে ক্ষতিকর দ্রব্যের অযাচিত চাহিদা তৈরি হতে পারে।
- বড় কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে একচেটিয়া বাজার তৈরি করে।
- আবেগময় অনেক বিজ্ঞাপন দেখে ক্রেতারা যৌক্তিক চিন্তা ছাড়াই পণ্য ক্রয় করে থাকেন, যা ব্যক্তি স্বাধীনতা খর্ব করে ।
- বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে অপ্রয়োজনীয় পণ্যের পিছনে ক্রেতারা ছুটতে থাকেন, ফলে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি হয়।
- বিজ্ঞাপন ক্রেতাদের মধ্যে ভোগবাদী মনোভাব গড়ে তোলে।
- অনেক সময় বিজ্ঞাপন আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক বা নৈতিক মূল্যবোধের বিপরীত বার্তা দেয় যা সামাজিক অবক্ষয়ের সূত্রপাত ঘটায় ।
উপোরোক্ত কারণে অনেকেই বিজ্ঞাপনকে অপচয় বলে থাকেন। তবে বিজ্ঞাপনের অনেক কল্যাণকর দিকও রয়েছে যার কারণে বিজ্ঞাপনকে অপচয় বলা যায় না। বিজ্ঞাপনের উপকারী দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে-
- বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতারা তাদের প্রয়োজনীয় পণ্য বা সেবার সম্পর্কে জানতে পারেন এবং এর গুণাগুণ, ব্যবহারবিধি, দাম বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জেনে তা ব্যবহারের মাধ্যমে জীবন যাত্রার মান বাড়ানোর সুযোগ পান ।
- বিজ্ঞাপন এজেন্সিগুলোতে কাজের মাধ্যমে হাজারো লোকের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়।
- বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্যের নতুন বাজার সৃষ্টি হয় বলে শিল্পোন্নয়নের সুযোগ তৈরি হয় ।
- বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে বৃহদায়তন উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয় বলে পণ্য মূল্য কমানো সম্ভব হয়।
- বিজ্ঞাপন কোম্পানির এবং কোম্পানির পণ্য বা সেবার পরিচিতি বাড়ায়, যা কোম্পানির পণ্য বা সেবার চাহিদা তৈরিতে সহায়তা করে ।
- বিজ্ঞাপনের ফলে দেশে-বিদেশের বাজারে কোম্পানির বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধি পায় ৷ বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা যায়।
- বিজ্ঞাপনের ফলে ক্রেতাদের রুচির উৎকর্ষ সাধিত হয় ।
- বিজ্ঞাপন জাতীয়তাবোধ তৈরিতেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
উপোরোক্ত কারণে বিজ্ঞাপনকে অপচয় বলা যায় না। বরং বিজ্ঞাপনকে একটি উপকারি বিনিয়োগ হিসেবে চিন্তা করার প্রয়াস পাওয়া যায় ।

বিজ্ঞাপন কি প্রতারণামূলক
Is Advertising Deceptive?
আধুনিক এই যুগে উন্নত প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, মানুষের দক্ষতা এবং অন্যান্য সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে বলে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে বহুগুন। উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্ধিত উৎপাদনের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক ভোক্তার কাছে পণ্য বা সেবা পৌঁছে দিতে বিপণন কাজের চাহিদাও বেড়েছে অনেক। সেইসাথে বেড়েছে কোম্পানিগুলোর মধ্যেকার বাজার দখলের প্রতিযোগিতার তীব্রতা। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সুষ্ঠু বিপণনের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে বিজ্ঞাপন।
পাশাপাশি পণ্য সম্পর্কে বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতাদের অবহিত করা, প্ররোচিত করা এবং পণ্য কিনতে উদ্বুদ্ধ করা, চাহিদা তৈরি করা, বিক্রয় ও মুনাফা বৃদ্ধি করা এবং উন্নত পণ্য ভোগের সুযোগ তৈরির মাধ্যমে জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতেও কাজ করছে বিজ্ঞাপন। তবে বিজ্ঞাপনের এই বহুল ব্যবহারের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর উৎপাদনকারী এবং বিপণনকারী নানা ধরণের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করছেন বলে অভিযোগ তৈরি হচ্ছে। যেমন –
- বিজ্ঞাপন বার্তায় অতিরঞ্জিত করে পণ্য বা সেবার গুনাগুণ বর্ণনা করা হচ্ছে।
- অতিকথনের মাধ্যমে চটকদার ভাবে মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্যাবলী তুলে ধরা হচ্ছে বস্তুত যা অবাস্তব।
- পণ্যের আকারকে বিকৃত বা বর্ধিত করে চোখ ধাঁধানো ভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে ।
- সারোগেট বিজ্ঞাপন কৌশলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাধারণ ভোক্তা সমাজ বুঝতেই পারছে না এমন উপায়ে ক্ষতিকর পণ্য যেমন- সিগারেট, অ্যালকোহল ইত্যাদির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে।
- বিশেষ অফার বা ছাড়ের সুযোগ দিয়ে দোকানে নিয়ে যাওয়ার পর বিজ্ঞাপিত অফার থেকে সড়ে গিয়ে দামী পণ্য গছিয়ে দেওয়ার (Bait and switch) ঘটনাও ঘটছে।
এসব কারণে অনেক বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞই এক শ্রেণীর বিজ্ঞাপনকে প্রতারণামূলক বলে অভিহিত করে থাকেন। কেননা এ ধরণের বিজ্ঞাপনের কারণে কোম্পানিগুলো ইমেজ বা ভাবমূর্তির সংকটে পড়ছে, ক্রেতা হারাচ্ছে এবং মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে বিজ্ঞাপনের এমন প্রতারণামূলক তৎপড়তার কারণে অনেক সময় সামগ্রিক বিপণন ব্যবস্থার উপর থেকে ভোক্তাদের আস্থা কমে যাচ্ছে। তাছাড়া প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে স্বল্প সময়ের জন্য বাজার তৈরি করা গেলেও তা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী ব্যবসা করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি অনেক দেশেই আইন করে এই ধরণের বিজ্ঞাপন প্রচার বন্ধ করা হচ্ছে। তাই ঢালাওভাবে বিজ্ঞাপনকে প্রতারণামূলক বলা উচিৎ নয়।
সারসংক্ষেপ:
কোম্পানি বা বিজ্ঞাপনদাতা প্রসার উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য যখন সামগ্রিক বিপণন কার্যক্রমের সাথে সামঞ্জস্য রেখে একটি সুন্দর ও সমন্বিত বিজ্ঞাপন পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন, তাকে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান বলা হয়। দর্শক-শ্রোতার ভিত্তিতে, বিজ্ঞাপন মাধ্যমের ভিত্তিতে, বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে বা ভৌগোলিক সীমানার ব্যপ্তির ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানকে বিভিন্ন শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। অডিয়্যান্স বা দর্শক-শ্রোতা-পাঠকের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানকে ভোক্তা প্রচারাভিযান, ব্যবসায় প্রচারাভিযান, শিল্প প্রচারাভিযান এবং পেশাগত প্রচারাভিযান ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়।
বিজ্ঞাপন মাধ্যমের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানকে সংবাদপত্র প্রচারাভিযান, সাময়িকী প্রচারাভিযান, রেডিও প্রচারাভিযান, টেলিভিশন প্রচারাভিযান, চলচ্চিত্র প্রচারাভিযান, বহিঃবিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান, পরিবহন প্রচারাভিযান ইত্যাদি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানকে প্রাথমিক চাহিদা সৃষ্টির | প্রচারাভিযান, নির্ধারিত চাহিদা সৃষ্টির প্রচারাভিযান, প্রত্যক্ষ প্রতিক্রিয়া প্রচারাভিযান, প্রবর্তনমূলক প্রচারাভিযান বা চাহিদা বজায় রাখার প্রচারাভিযান ইত্যাদি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়।
ভৌগোলিক এলাকার বিস্তৃতি বা সীমার ব্যাপকতার ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানকে স্থানীয় প্রচারাভিযান, আঞ্চলিক প্রচারাভিযান, জাতীয় প্রচারাভিযান এবং আন্তর্জাতিক প্রচারাভিযান ইত্যাদি ভাগে ভাগ করা যায়। এছাড়াও বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানকে সেবার প্রচারাভিযান, কর্পোরেট | প্রচারাভিযান, সামাজিক সচেতনতা তৈরির প্রচারাভিযান, গেরিলা প্রচারাভিযান ইত্যাদি বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনা পরিচালনার জন্য বিজ্ঞাপনদাতাকে নানাবিধ বিষয় যেমন- প্রতিষ্ঠান, পণ্য, বাজার, প্রতিযোগিদের কর্মকাণ্ড, পণ্য মূল্য, বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য, বিজ্ঞাপন মাধ্যম, বণ্টন প্রণালী, বিজ্ঞাপন বাজেট, বিজ্ঞাপনের আবেদন, সরকারি বিধিবিধিান ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে হয়।
বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান পরিকল্পনার বিভিন্ন পদক্ষেপকে ধাপে ধাপে সম্পাদন করতে হয়। ধাপগুলো হলো- বাজার গবেষণা সম্পাদন, | বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, অভীষ্ট অডিয়্যান্স শনাক্তকরণ, বিজ্ঞাপন বার্তা প্রণয়ন, বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ, মাধ্যম পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রচারাভিযান পরিচালনা / বাস্তবায়ন এবং প্রচারাভিযান মূল্যায়ন।
