বিন্যাস কাকে বলে? আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “বিজ্ঞাপন-বিপণন প্রসারের মূল হাতিয়ার” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিন্যাস কাকে বলে?
বিন্যাস কাকে বলে? ( What is Layout?)
বিন্যাস বা অঙ্গসজ্জা বলতে বিজ্ঞাপনকে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করাকে বোঝায়। যদিও একটি বিজ্ঞাপনের প্রতিটি উপাদানই যেমন- শিরোনাম, উপশিরোনাম, প্রতিলিপি, চিত্রণ বা যে কোন শনাক্তকারী চিহ্ন ইত্যাদি নিজস্বতার বিচারে গুরুত্বপূর্ণ, তবে বিজ্ঞাপনের এই বিভিন্ন উপাদানের বা অংশের ভৌত অঙ্গরূপায়ন। বিজ্ঞাপনের প্রতিটি অংশকে কোথায়, কীভাবে উপস্থাপন করা হবে সে সম্পর্কিত পূর্ব পরিকল্পনা বা নীল নকশা প্রণয়ন করাকেই বিজ্ঞাপন বিন্যাস বলা হয়। বিন্যাস যত সুন্দর হবে, বিজ্ঞাপনটি গ্রাহকদের তত বেশি আকৃষ্ট করতে পারবে। বিন্যাস শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের উপাদানসমূহের সুশৃঙ্খল অবস্থানকেই নিশ্চিত করে না, বরং বিজ্ঞাপনে কাজ করা সংশ্লিষ্ট লোকেদের প্রয়োজনীয় নির্দেশিকাও দেয়।
এটি কপিরাইটার বা মুদ্রণকারীকে কতটা জায়গা নিয়ে কাজ করতে হবে এবং কতটা প্রতিলিপি লিখতে হবে তা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। এছাড়াও এটি চিত্রণে ব্যবহৃত ছবির আকারে এবং ধরণ নির্ধারণে শিল্প পরিচালককেও দিক নির্দেশনা দিতে পারে। আকর্ষণীয় বিন্যাস বিজ্ঞাপনটিকে মিডিয়া-বিশৃঙ্খলা থেকে বেরিয়ে আসতে এবং বিজ্ঞাপনে দর্শক-শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সহায়তা করে ।
Belch and Belch-4, “A layout is the physical arrangement of the various parts of the ad, including the headline, subheads, body copy illustrations, and any identifying marks,” (অর্থাৎ, বিন্যাস হলো বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশের ভৌত বিন্যাস, যার মধ্যে শিরোনাম, উপশিরোনাম, মূল অংশ, চিত্রণ এবং যেকোন শনাক্তকারী চিহ্ন অন্তর্ভুক্ত থাকে।)
Sandage, Fryburger and Rotzoll-এর মতে, “The plan of an advertisement, detailing the arrangement of various parts and relative spatial importance of each is referred to as layout.” (অর্থাৎ, একটি বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশের সজ্জিতকরণের বিশদ বিবরণ এবং প্রতিটি অংশের আপেক্ষিক স্থানিক গুরুত্ব নির্ধারণের পরিকল্পনাকে বিন্যাস বলা হয়।)
C. N. Sontakki-এর মতে, “ A layout is the format in which the various elements of the advertisement are combined.” (অর্থাৎ, বিন্যাস হলো একটি বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশকে সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিতকরণের পদ্ধতি।)
উপরের আলোচনা ও সংজ্ঞাসমূহকে বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে, বিন্যাস হলো-
- একটি বিজ্ঞাপনের উপাদানগুলোর যৌক্তিক বিন্যাস;
- বিজ্ঞাপনের সামগ্রিক কাঠামোর পূর্ব পরিকল্পনা বা নীল নকশা প্রণয়ন;
- শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, স্লোগান, চিত্র, শনাক্তকরণ চিহ্ন, মূল অংশ ইত্যাদির সুশৃঙ্খল সজ্জা;
- বিজ্ঞাপনের সমস্ত দৃশ্যমান উপাদানের সমন্বিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ভৌত পরিবেশনা;
- বিজ্ঞাপন কার্যকারিতা নিশ্চিতকরণের অন্যতম প্রভাবক ।

বিন্যাসের উদ্দেশ্য (Objectives of Layout):
বিন্যাস বা অঙ্গসজ্জা হলো বিজ্ঞাপনের সামগ্রিক পরিকল্পনা বা কাঠামোর পূর্ব পরিকল্পিত নীল নকশা প্রণয়ন করা। বিন্যাসের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের প্রতিলিপির শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, স্লোগান, চিত্রণ, শনাক্তকরণ চিহ্ন ইত্যাদিকে সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিত করে উপস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা ও আকর্ষণীয়তা বহুলাংশেই বিজ্ঞাপন বিন্যাসের উপর নির্ভর করে। নিম্নে বিজ্ঞাপন বিন্যাসের উদ্দেশ্য সমূহ আলোচনা করা হলো :
১। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদানকে সংগঠিত করা (Assembling different elements of advertisement):
বিন্যাসের প্রধান উদ্দেশ্যই হলো বিজ্ঞাপন চিত্রের বিভিন্ন অংশ বা উপাদান যেমন- শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, স্লোগান, চিত্রণ, ব্র্যান্ড নাম, কোম্পানির লোগো ইত্যাদি এবং অন্যান্য গ্রাফিক উপাদান গুলোকে সংগঠিত করা এবং সুশৃঙ্খল ভাবে সাজানো। এতে বিজ্ঞাপনের পরিপূর্ণতা আসে এবং বিজ্ঞাপন আবেদন জোরালো হয়।
২। পরিবর্তনের সুযোগ প্রদান করা (Providing opportunity of modification):
বিন্যাস বিজ্ঞাপনের সামগ্রিক চিত্রের পূর্ব উপস্থাপনার সুযোগ তৈরি করে দেয় বলে সৃজনশীল দল, এজেন্সি ব্যবস্থাপনা এবং বিজ্ঞাপনদাতাদের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং বিজ্ঞাপনের প্রকৃত নির্মাণ ও উৎপাদন শুরু হওয়ার আগে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পথ তৈরি করে দেয়।
৩। চূড়ান্ত বিজ্ঞাপনকে দৃশ্যমান করে তোলা (Visualizing the final advertisement):
বিন্যাস হলো প্রকাশিতব্য বিজ্ঞাপনটি কেমন হবে তার পূর্ব পরিকল্পিত নকশা প্রণয়ন। তাই চূড়ান্ত বিজ্ঞাপনটি কেমন দেখাবে, কি আকার ধারণ করবে বা কি রূপ পাবে তা বিজ্ঞাপন প্রকাশ হয়ে পড়ার পূর্বেই দৃশ্যমান করে তোলা হলো বিজ্ঞাপনের আরেকটি উদ্দেশ্য।
৪। বিজ্ঞাপনকে আকর্ষণীয় করে তোলা (Making the advertisement attractive) :
বিজ্ঞাপনকে কিভাবে আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী করে তোলা যায়, তা নিশ্চিত করা বিন্যাসের অন্যতম উদ্দেশ্য। কেননা সুন্দর ও সুশৃঙ্খল বিন্যাস গ্রাহকদেরকে বিজ্ঞাপনটি দেখতে উৎসাহিত করে, ক্রয় প্রবৃত্তি জাগ্রত করে এবং বিজ্ঞাপিত পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্ররোচিত করে ।
৫। বিজ্ঞাপনের মূল বক্তব্যকে সহজবোধ্য করে তোলা (Clarifying the key theme of the advertisement):
বিন্যাসের আরেকটি উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞাপন প্রতিলিপির মূল বক্তব্যকে দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বোধগম্য করে তোলা। সুচিন্তিত, পরিচ্ছন্ন এবং সুপরিকল্পিত বিন্যাস প্রতিলিপির সব উপাদানের অর্থপূর্ণ ও স্পষ্ট উপস্থাপনা নিশ্চিত করে বিধায় বিজ্ঞাপন প্রতিলিপির মূল বিষয়বস্তুকে সহজবোধ্য করে তোলে।
৬। প্রতিলিপি বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা দেওয়া (Providing guide to the copy specialists):
বিন্যাস প্রতিলিপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিশেষজ্ঞদের যেমন- টাইপ-সেটার, খোদাইকারী, মুদ্রণকারী এবং অন্যান্য কারিগরদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে। কোন উপাদান কোথায়, কিভাবে বসলে সর্বাধিক কার্যকারিতা নিশ্চিত হবে, তা বিন্যাসের মাধ্যমেই পরিষ্কারভাবে জানা যায়।
৭। বিজ্ঞাপনদাতা, প্রতিলিপি লেখক এবং শিল্প পরিচালকের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি (Creating understanding among the advertiser, copywriter and art director) :
বিন্যাসের সাহায্যে মুদ্রণকারী প্রতিলিপি লেখকের চিন্তাভাবনাকে শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, চিত্রণ, স্লোগান, পটভূমি বা মূল বক্তব্য ইত্যাদির মাধ্যমে কোথায় কিভাবে উপস্থাপন করতে হবে তা শিল্প নির্দেশকের সাহায্যে চূড়ান্ত বিজ্ঞাপন মুদ্রণের পূর্বেই বিজ্ঞাপনদাতার সামনে উপস্থাপনের সুযোগ পান। ফলে বিজ্ঞাপনের অঙ্গসজ্জার ব্যাপারে বিজ্ঞাপনদাতা, প্রতিলিপি লেখক ও শিল্প নির্দেশকের মধ্যে সমঝোতার পথ তৈরি হয় এবং সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি রোধ করা সম্ভব হয়।
পরিশেষে বলা যায় যে, গ্রাহকদেরকে বিজ্ঞাপনের দিকে আকৃষ্ট করে বিজ্ঞাপিত পণ্য বা সেবা ক্রয়ে প্ররোচিত করতে পারে এমন একটি কার্যকর, চিত্তাকর্ষক ও হৃদয়গ্রাহী বিজ্ঞাপন তৈরির পথকে সুগম করাই বিন্যাসের উদ্দেশ্য।
বিন্যাসের মৌলিক নীতি (Principles of Layout):
বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদান যেমন- প্রতিলিপি, শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, চিত্রণ, স্লোগান, ট্রেডমার্ক, লোগো ইত্যাদির ধারাবাহিক ও সুশৃঙ্খল পরিবেশনাকে বিন্যাস বলা হয়। বিন্যাসকে ফলপ্রসূ ও কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে চাইলে বিন্যাসের আকর্ষণীয়তা ও শৈল্পিক ভাবের দিকে লক্ষ্য রাখা খুবই জরুরী। একটি সুন্দর, হৃদয়গ্রাহী ও স্বার্থক বিজ্ঞাপন তৈরির জন্য তাই বিন্যাসের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করতে হয় যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো:
১। প্রভাবশালী উপাদানের উপর ফোকাস (Focus on dominant element):
প্রতিটি ভালো বিন্যাসেরই একটি সূচনা বিন্দু থাকে যাকে বলা হয় প্রভাবশালী উপাদান। এই উপাদানটি বিজ্ঞাপনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিজ্ঞাপন ভেদে এটি শিরোনাম, চিত্রণ, স্লোগান, বডি কপি ইত্যাদি হতে পারে। প্রতিলিপি লেখককে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার বিজ্ঞাপনের কোন অংশটি সবচেয়ে প্রভাবশালী। সাধারণত একটি বিজ্ঞাপনে শুধুমাত্র একটিই প্রভাবশালী উপাদান থাকে। প্রভাবশালী উপাদানটিকে বড় হতে হবে, উজ্জ্বল রং থাকতে হবে এবং অবশ্যই বিজ্ঞাপনের অন্যান্য অংশের চেয়ে ভালো দেখতে হতে হবে। বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা বা সফলতার জন্য ভোক্তাকে অবশ্যই বিজ্ঞাপনের প্রভাবশালী অংশের প্রতি আকৃষ্ট করতে হবে।
২। প্রথম ছাপ বা ধারণা (First impression):
ইংরেজিতে একটি কথা প্রচলিত আছে যে, “First impression is the best impression.” অর্থাৎ, কোন কিছু সম্পর্কে প্রথম ধারণাই হলো সেরা ধারণা। যদি বিজ্ঞাপনটি প্রথম দর্শনেই গ্রাহকের ভালো লেগে যায়, তাহলে গ্রাহক সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন বার্তা পড়বেন এবং ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাবেন। পক্ষান্তরে, বিজ্ঞাপনটি যদি প্রথম দর্শনেই গ্রাহকের মনে একটি ভালো ছাপ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গ্রাহক সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন বার্তাটি পড়বেন না। গ্রাহক বিজ্ঞাপনটি মনে রাখতে পারবেন না, বিজ্ঞাপিত পণ্য বা সেবার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন এবং সেক্ষেত্রে কোন বিক্রয় নাও ঘটতে পারে।
ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞাপনটি তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হবে। অতএব, প্রতিলিপি লেখককে অবশ্যই বিজ্ঞাপনের প্রথম ছাপটিকে শক্তিশালী করতে হবে যাতে করে প্রতিলিপিটি প্রথম দর্শনেই গ্রাহকের মনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে। একটি আকর্ষণীয় স্লোগান, আকর্ষণীয় রং, প্রচুর সাদা স্থান, ভাল চিত্রণ ইত্যাদি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন প্রতিলিপিতে একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অর্জন করা যেতে পারে।
৩। সমস্ত বিজ্ঞাপন অংশের একতা বা সমরূপতা (Unity of all ad parts):
একেকটি বিজ্ঞাপন অনেকগুলো অংশ নিয়ে গঠিত। বিজ্ঞাপনের সমস্ত অংশ বা উপাদান একে অপরের সাথে ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কিত। বিজ্ঞাপন বিন্যাসের একটি প্রভাবশালী নীতি হলো বিজ্ঞাপনের সকল উপাদানের মধ্যেকার ঐক্য বা সমরূপতা।
অর্থাৎ, বিজ্ঞাপনে প্রতিলিপি, শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, চিত্রণ, স্লোগান, ট্রেডমার্ক, লোগো ইত্যাদি উপাদানকে এমনভাবে সাজাতে হবে যেন সবকিছুকে মিলে বিজ্ঞাপনটিকে একটি একক ও সংঘবদ্ধ বিজ্ঞাপন মনে হয়। বিজ্ঞাপনের সমস্ত অংশের একটি সম্মিলিত উদ্দেশ্য থাকতে হবে ভোক্তাকে পণ্য সম্পর্কে অবহিত করা এবং পণ্য ক্রয়ের জন্য তাদের প্ররোচিত করা। সুতরাং, বিজ্ঞাপনের সমস্ত অংশ বা উপাদানকে একসাথে কাজ করতে হবে। যদি ঐক্য বজায় থাকে, তাহলে সম্মিলিত প্রভাবও ভালো হবে।
৪। বৈসাদৃশ্যের উত্তম ব্যবহার (Good use of contrast) :
বিন্যাসের আরেকটি নীতি হলো শৈল্পিক ডিজাইন নিশ্চিত করার জন্য বৈসাদৃশ্যের উত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা। বিন্যাসের বৈসাদৃশ্য মানে বিজ্ঞাপনে বিপরীত রং ব্যবহার করা, যেমন- কালো এবং সাদা রং ব্যবহার করা। কন্ট্রাস্ট বিজ্ঞাপনগুলো আলাদাভাবে চোখে পড়ে কারণ এসব বিজ্ঞাপনের উপস্থাপনাও আলাদা হয়। যেমন- একটি পত্রিকার সব বিজ্ঞাপন যদি রঙিন হয় এবং একটি মাত্র বিজ্ঞাপন সাদা-কালো হয়, তবে এই সাদা-কালো বিজ্ঞাপনটিই আলাদাভাবে চোখে পড়বে।
৫। স্থানের অনুপাত বজায় রাখা (Maintain proportion of space):
বিজ্ঞাপনের প্রতিটি উপাদান ও অংশের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে। ব্যবহারযোগ্য সম্পূর্ণ স্থান বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশের মধ্যে এমনভাবে বিভক্ত করতে হবে যেন উপাদানের গুরুত্বানুসারে স্থান বিভাজনের অনুপাত বজায় থাকে। স্থানের বিভাজন সমান হওয়া উচিত নয়। কেননা যদি সমস্ত উপাদানের জন্য একই রকম স্থান বরাদ্দ থাকে, তবে বিজ্ঞাপনটি ভালো দেখাবে না। বিজ্ঞাপনের প্রভাবশালী উপাদানের জন্য বেশি স্থান প্রদান করতে হবে এবং কম গুরুত্বপূর্ণ অংশের জন্য কম জায়গা দিতে হবে।
৬। উপাদানের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা (Right balance of elements):
ভোক্তা আকর্ষণ ধরে রাখতে চাইলে বিজ্ঞাপনে অবশ্যই উপাদানগুলোর মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য থাকতে হবে। উপাদানের ভারসাম্য মানে বিজ্ঞাপনের ডানদিকের এবং বাম দিকের মধ্যেকার সামঞ্জস্য। এক্ষেত্রে দুই ধরণের ভারসাম্য লক্ষ্য করা যায়:
আনুষ্ঠানিক ভারসাম্য:
আনুষ্ঠানিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের ডান পাশের শব্দ এবং ছবি বিজ্ঞাপনের বাম দিকের শব্দ এবং ছবির সমান হয়। সুতরাং, বিজ্ঞাপনের ডান এবং বাম দিক আকার, আকৃতি এবং রঙে একে অপরের সাথে মেলে। তাই এদেরকে একে অপরের ঠিক বিপরীত দিকে স্থাপন করা হয়।
অনানুষ্ঠানিক ভারসাম্য:
অনানুষ্ঠানিক ভারসাম্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশকে এলোমেলোভাবে পৃষ্ঠায় স্থাপন করা হয়। বিজ্ঞাপনের ডান পাশ এবং বাম পাশের মধ্যে কোনও ভারসাম্য থাকে না। তবুও সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞাপনটিকে ভারসাম্যপূর্ণ দেখায়। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদানকে বিচ্ছিন্নভাবে উপস্থাপন করা সত্বেও বিজ্ঞাপনটি একটি একক বিজ্ঞাপন হিসেবে পরিবেশিত হতে পারে। তবে অনানুষ্ঠানিক ভারসাম্য অর্জন করা বেশ কঠিন। এটির জন্য উচ্চ স্তরের সৃজনশীল দক্ষতা এবং কল্পনা প্রয়োজন ।
৭। সরলতা (Simplicity):
সরলতা বিজ্ঞাপন বিন্যাসের অন্যতম মৌলিক একটি নীতি। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদান ও অংশকে সহজ, সরল, প্রাঞ্জল ও সাবলীলভাবে সাজিয়ে উপস্থাপন করতে হবে। এটিতে খুব কম উপাদান থাকতে হবে। উপাদান যত কম হবে, প্রভাব (ইমপ্রেশন) তত শক্তিশালী হবে। যেসব বিষয় বিজ্ঞাপনের বিন্যাস ও পরিবেশনাকে জটিল করে তোলে এবং বোধগম্যতাকে কঠিন করে ফেলে, সেসব বিষয়কে পরিহার করা উচিৎ। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশকে যেমন- প্রতিলিপি, শিরোনাম, উপ-শিরোনাম, চিত্রণ, স্লোগান, ট্রেডমার্ক, লোগো ইত্যাদিকে এমন ভাবে বিন্যস্ত করতে হবে যেন দর্শক-শ্রোতা সহজেই বিজ্ঞাপনের মূল বার্তা উপলব্ধি করতে পারেন।
৮। ছন্দ (Tone):
ছন্দের দক্ষ ব্যবহার বিজ্ঞাপনের উপযোগিতা অনেকগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাই বিজ্ঞাপন বিন্যাসের ক্ষেত্রে উপাদান সমূহের অভ্যন্তরীণ ছন্দ রক্ষা করা খুবই জরুরী। একটি উপাদান যেন অন্য উপাদানের পরিস্ফুটনের পথে বাঁধার সৃষ্টি না করে, সেদিকে তাই সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন উপাদানের উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও সঠিক শব্দ, রেখা রং ব্যবহারের মাধ্যমে পুরো বিজ্ঞাপনকে ছন্দময় পরিবেশে উপস্থাপন করতে হয়।
৯। চোখের নড়াচড়া অনুসরণ করা (Follow the eye movement):
বিজ্ঞাপনটিকে অবশ্যই চোখের নড়াচড়া কভার করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সাধারণত চোখের নড়াচড়া বাম থেকে ডানে হয় এবং একজন মানুষ প্রথমে উপরে তাকায় তারপর নিচের দিকে তাকায়। সুতরাং, বিজ্ঞাপনের ধারণাটিকে অবশ্যই বাম থেকে ডানে এবং উপর থেকে নিচে যেতে হবে। বিজ্ঞাপনদাতা সফল বিন্যাসের জন্য নিম্নলিখিত পয়েন্টগুলো ব্যবহার করে চোখের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন:
দৃষ্টি নড়াচড়া: গবেষণা অনুসারে একজন ব্যক্তির চোখ অন্যদের চোখকে অনুসরণ করবে। অর্থাৎ, যদি অনেক লোক একটি নির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে একজন নতুন লোকও সেই দিকেই তাকাবে। এমন আচরণ স্বাভাবিক। তাই দর্শক-পাঠকরাও বিজ্ঞাপনে উপস্থিত বা উপস্থাপিত মানুষ ও পশু-পাখির দৃষ্টিকে অনুনরণ করবেন।
আকার: সাধারণত, বড় আকারের উপাদান গুলো মানুষকে প্রথমে আকর্ষণ করে। তাই বিজ্ঞাপনের মূল বড় হতে হবে। ‘
অংশটিকে নির্দেশক যন্ত্র বা চিহ্ন: হাত, আঙুল, তীর ইত্যাদির মতো নির্দেশক যন্ত্র বা চিহ্ন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যবহৃত হয়।
কার্টুন: কার্টুন এবং কমিক ছবিও পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যবহৃত হয়।
১০। সহজপাঠ্যতা (Easy readability):
উত্তম বিন্যাসের আরেকটি নীতি হলো এর সহজপাঠ্যতা। অর্থাৎ, দর্শক-পাঠক অবশ্যই সহজে এবং দ্রুত বিজ্ঞাপনটি পড়তে বা দেখতে পারেন। তাই বিজ্ঞাপনের শব্দগুলো আকারে ছোট হওয়া উচিত নয়। আবার সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন বার্তার জন্য বড় অক্ষর ব্যবহার করা এড়িয়ে চলতে হবে। শুধুমাত্র উল্লেখযোগ্য শব্দ বা বাক্য বড় অক্ষরে লিখতে হবে যেন তা দর্শক-পাঠকের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করতে পারে ।
১১। সাদা/ফাঁকা জায়গার ব্যবহার (Use of whitespace):
বিজ্ঞাপন বিন্যাসে বার্তার আধিক্য বা ভিড় থাকা উচিত নয়। এটিকে সুশোভিত, প্রাঞ্জল এবং আনন্দদায়ক দেখাতে যথেষ্ট সাদা (ফাঁকা) স্থান থাকতে হবে। ফাঁকা স্থান বিজ্ঞাপনটিকে সমৃদ্ধ করবে এবং গ্রাহকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়তা করবে।
১২। বিজ্ঞাপন বার্তার স্বচ্ছতা (Clarity of ad message):
বিজ্ঞাপন বিন্যাসকে অবশ্যই তার উদ্দেশ্য সম্পর্কে খুব স্পষ্ট হতে হবে। বিজ্ঞাপন বিন্যাস এমন হবে যেন দর্শক-শ্রোতাদের কাছে বিজ্ঞাপননের মূল বিষয় বা আবেদন খুব সহজেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দর্শক-শ্রোতা যেন কোনভাবেই বিজ্ঞাপনের কেন্দ্রীয় বার্তা উপলব্ধি করতে বিভ্রান্ত না হয়ে পড়েন। তাই স্বচ্ছতার নীতি বিজ্ঞাপন বিন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি ।
১৩। ভালো বিজ্ঞাপন পরিবেশ (Good ad atmosphere):
বিজ্ঞাপনের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকে কোনভাবেই উপেক্ষা করা বা অবজ্ঞা করা উচিত নয়। বিজ্ঞাপনটিকে আকর্ষণীয় এবং আনন্দদায়ক দেখানোর জন্য বিজ্ঞাপনের পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞাপন প্রতিলিপির বিভিন্ন অংশকে বিন্যস্ত করতে হবে। সঠিক পারিপার্শ্বিকতার অভাব একটি ভালো এবং ভোক্তা মনোযোগ আকর্ষণে সক্ষম বিজ্ঞাপনকেও কম আকর্ষণীয় করে তোলে। তাই বিজ্ঞাপন বিন্যাসের ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিকতা ও প্রাসঙ্গিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে ।
উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায় যে, বিজ্ঞাপন বিন্যাসের উপরোক্ত নীতিমালা যতো ভালোভাবে অনুসরণ করা যাবে, বিজ্ঞাপন ততো বেশি আকর্ষণীয় ও আবেদনময় হয়ে উঠবে এবং কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হবে।

পাঠের সারসংক্ষেপ:
বিজ্ঞাপন প্রতিলিপি হলো বিজ্ঞাপনের মূল বিষয়বস্তুর শাব্দিক উপস্থাপনা। বিজ্ঞাপনের সারসংক্ষেপ, পাঠ্য এবং শিরোনাম | সহ যাবতীয় বিষয়বস্তু লিখিত আকারে সুশৃঙ্খলভাবে যে মাধ্যমে তুলে ধরা হয় তাকে বিজ্ঞাপন প্রতিলিপি বলে। বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা ও সফলতা বহুলাংশেই উত্তম প্রতিলিপি তৈরির উপর নির্ভর করে থাকে। প্রতিলিপিকে তাই মৌলিক, সংক্ষিপ্ত, স্পষ্ট, উপযুক্ত, বিশ্বাসযোগ্য, শিক্ষামূলক, মানানসই এবং স্মরণযোগ্য হতে হয়। শিরোনাম বিজ্ঞাপন প্রতিলিপির অবিচ্ছেদ্য একটি অংশ। গ্রাহকদের বিজ্ঞাপিত পণ্য বা সেবার দিকে আকর্ষণ করার প্রথম কাজটিই করে থাকে শিরোনাম।
দর্শক-শ্রোতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বিজ্ঞাপনের উপরিভাগে বা মধ্যভাগে কিংবা সুবিধাজনক কোন স্থানে বড় বড় অক্ষরে যে বার্তা তুলে ধরা হয় তাকে বিজ্ঞাপনের শিরোনাম বলে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিরোনাম ছাড়াও বিজ্ঞাপন প্রতিলিপিতে নির্দেশক, যৌক্তিক, কৌতূহলোদ্দীপক, আবেগময়, গিমিক এবং নেতিবাচক শিরোনাম ব্যবহার করা হয়ে থাকে । স্লোগান প্রতিলিপির খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ কেননা এটি বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযানের কেন্দ্রীয় বার্তা হিসেবে কাজ করে। স্লোগান হলো কোন শব্দ বা শব্দমালা যা বিজ্ঞাপনদাতা গ্রাহকদের মনে তার পণ্য বা সেবা সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা তৈরি করার জন্য নিয়মিতভাবে ব্যবহার করে থাকেন।
বিজ্ঞাপনকে চিত্তাকর্ষক আর আবেগময় করতে ছন্দময় স্লোগানের পাশাপাশি উত্তম চিত্রণের ব্যবহার খুবই জরুরী। বিজ্ঞাপনের আবেদনকে আকর্ষণীয় ভাবে | উপস্থাপনের জন্য বিজ্ঞাপন প্রতিলিপিতে যেসব চিত্র বা ছবি ব্যবহৃত হয় তাকে বিজ্ঞাপন চিত্রণ বলে। চিত্রণ হলো বিজ্ঞাপনের অলঙ্কার বা ভূষণস্বরূপ। সর্বশেষ, বিন্যাস বা অঙ্গসজ্জা বলতে বিজ্ঞাপনকে সুশৃঙ্খলভাবে বিন্যস্ত করাকে বুঝায়। বিন্যাস যত সুন্দর হবে, বিজ্ঞাপনটি গ্রাহকদের তত বেশি আকৃষ্ট করতে পারবে। বিন্যাস হলো একটি বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন অংশ যেমন- শিরোনাম, উপশিরোনাম, মূল অংশ, চিত্রণ এবং যেকোন শনাক্তকারী চিহ্ন ইত্যাদিকে সুশৃঙ্খলভাবে সজ্জিতকরণের পদ্ধতি।
বিন্যাস বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদানকে সংগঠিত করে, চূড়ান্ত বিজ্ঞাপনকে দৃশ্যমান ও আকর্ষণীয় করে তোলে, বিজ্ঞাপনের মূল বক্তব্যকে সহজবোধ্য করে তোলে, এবং বিজ্ঞাপনদাতা, প্রতিলিপি লেখক এবং শিল্প পরিচালকের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টি করে। একটি সুন্দর, হৃদয়গ্রাহী ও স্বার্থক বিজ্ঞাপন তৈরির জন্য তাই বিজ্ঞাপন বিন্যাসের ক্ষেত্রে কিছু মৌলিক নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়।
বিজ্ঞাপন বিন্যাসের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে বিজ্ঞাপনের প্রভাবশালী উপাদানের উপর ফোকাস করা, সমস্ত বিজ্ঞাপন অংশের ঐক্য বা সমরূপতা নিশ্চিত করা, স্থানের বিভাজন ও অনুপাত বজায় রাখা, উপাদানের সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা, সহজপাঠ্যতা নিশ্চিত করা, বিজ্ঞাপন বার্তার স্বচ্ছতা বিধান করা এবং ভালো বিজ্ঞাপন পরিবেশ এর দিকে গুরুত্ব দেওয়া।
