বিপণন পরিকল্পনা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “বিপণন কৌশল ও পরিকল্পনা” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিপণন পরিকল্পনা
বিপণন পরিকল্পনা
Marketing Planning
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে কী করা হবে, কীভাবে করা হবে, কোথায় করা হবে, কে করবে ইত্যাদির একটি অগ্রীম কর্মসূচি প্রণয়নকে বিপণন পরিকল্পনা বলা হয়। এটি একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। কখনো এক বছর, অথবা দীর্ঘমেয়াদের জন্য বিপণন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সুতরাং বিপণন পরিকল্পনা হলো সকল কাজের লিখিত ও সংক্ষিপ্ত একটি রূপ যা নির্দেশ করে বাজার বিশ্লেষণ করে বিপণনকারীর অর্জিত জ্ঞান এবং প্রতিষ্ঠানের বিপণন উদ্দেশ্য অর্জনের কর্মপন্থা। এ পরিকল্পনায় বিপণন প্রোগ্রামের কার্যপদ্ধতির এবং নির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনাকালীন সময়ে অর্থ বন্টনের নির্দেশনা রয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ- কোনো প্রতিষ্ঠানের বিপণন উদ্দেশ্য যদি ধরা হয় বাৎসরিক ৫০০০ ইউনিট পণ্য বিক্রয় করা; তাহলে প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন বিভাগসমূহ এ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য একসাথে কাজ করবে। উৎপাদন বিভাগ ৫০০০ ইউনিট পণ্য প্রস্তুত করার প্রস্তুতি নিবে, অর্থ বিভাগ পণ্য প্রস্তুত করার জন্য কাঁচামাল ক্রয়সহ বিভিন্ন খাতে খরচ করবে, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা বিভাগ পণ্য প্রস্তুত ও বিক্রয়ের জন্য কর্মী নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ দিবে।
এর সাথে সাথে বিপণন প্রোগ্রাম বা কর্মকাণ্ড যেমন পণ্যের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, সঠিক স্থানে পণ্য পৌছে দেওয়া এবং বিপণন প্রসারের জন্য কাজ করা। এসবগুলো কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধিত হলেই বিপণন উদ্দেশ্য অর্থাৎ ৫০০০ ইউনিট পণ্য বাৎসরিক বিক্রয়ের লক্ষ্য মাত্রা করা- অর্জন করা সম্ভব হবে।
বিপণন পরিকল্পনার উপাদানসমূহ
Contents of Marketing Planning
প্রতিষ্ঠান তার প্রতিটি ব্যবসায়, পণ্য বা ব্র্যান্ডের জন্য বিপণন পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে। ছোট ব্যবসায় সাধারণত অনেক ছোটো পরিসরে অথবা কঠোরভাবে কাঠামো অনুসরণ না করে সহজ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বিপণন পরিকল্পনা প্রস্তুত করে; অন্যদিকে বড় প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে। বিপণন পরিকল্পনায় যে সকল বিষয় বা উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকে সেগুলো নিম্নে সারণীর মাধ্যমে দেখানো হলো-

১. নির্বাহী সারসংক্ষেপ (Executive Summary): বিপণন পরিকল্পনার মূল কথা বা সারমর্মই হচ্ছে নির্বাহী সারসংক্ষেপ। নির্বাহী সারসংক্ষেপের মাধ্যমে উচ্চস্তরীয় ব্যবস্থাপকগণ পরিকল্পনার প্রধান প্রধান বিষয়গুলো দ্রুত খুঁজে পেয়ে থাকেন এবং সামগ্রিক পরিকল্পনা সম্পর্কে একত্রে ধারণা পেতে সহায়তা করে।
২. পরিস্থিতি বিশ্লেষণ (Situation Analysis): পরিস্থিতি বলতে লক্ষ্য বাজার এবং উক্ত বাজারে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থানকে বুঝায়। পরিস্থিতি পর্যালোচনার সময় নিম্নোক্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়- ২.১. বাজার পরিস্থিতি (Market Summary): বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার জন্য বাজার চাহিদা, বাজার প্রবণতা, বাজার প্রবৃদ্ধি এর সাথে সাথে বাজার বিভাজনের ভিত্তিসমূহ, মোট বাজারের আয়তন এবং ক্রেতার চাহিদাকে প্রভাবিত করে এমন পরিবেশগত উপাদানগুলোর তথ্য সংগ্রহ ও বর্ণনা করা হয়।
২.২. SWOT বিশ্লেষণ (SWOT Analysis): যে সকল অপ্রত্যাশিত বা অস্বাভাবিক অবস্থা ব্যবসায় কর্মকান্ডের উপর বাধা সৃষ্টি করে তাকে হুমকি বলে। অন্যদিকে যে সকল আকর্ষণীয় ক্ষেত্রসমূহে প্রতিষ্ঠানের লাভজনকভাবে বিপণন কার্যাবলি সম্পাদন করে তাকে বিপণন সুযোগ বলে। বিপণনকারীকে প্রতিনিয়ত হুমকি ও সুযোগ বিশ্লেষণ করতে হয়। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে সাম্প্রতিক এবং সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলো দ্বারা কিভাবে প্রতিষ্ঠান প্রভাবিত, আক্রান্ত বা উপকৃত হবে তা যেনো পূর্বানুমান করা যায়। বিপণনকারী তাদের চিন্তা-শক্তির সামর্থ্য অনুযায়ী সম্ভাব্য সকল হুমকি এবং সুযোগ অনুমান করে।
বিপণনকারীকে হুমকির প্রকৃতি অনুযায়ী সম্ভাব্য ক্ষতির মূল্যায়ন করে এবং যে সকল হুমকিতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ বেশি, সেগুলো মোকাবিলার জন্যে পূর্বপরিকল্পনা তৈরি করে। অন্যদিকে সম্ভাব্য সুযোগের তুলনামূলক আকর্ষণীয়তা এবং এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানের সফলতার সম্ভাবনা পর্যালোচনা করে সুযোগগুলো গ্রহণ করে বাজারে টিকে থাকার পূর্বপরিকল্পনা প্রস্তুত করে। প্রতিষ্ঠান তার সামর্থ্য ও দুর্বলতা অনুযায়ী বাহ্যিক পরিবেশের সুযোগ গ্রহণ ও হুমকি মোকাবেলা করে ।
২.৩. প্রতিযোগিতা (Competition): বাজারে প্রধান প্রধান প্রতিযোগীদের নাম, তাদের বাজার শেয়ার, তাদের পণ্যের মান, গৃহীত বিপণন কৌশল ইত্যাদির বিবরণ দেওয়া হয়।
২.8. পণ্য অর্পণ (Product Review) : এখানে প্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও আসন্ন পণ্য সারি ও সেবা, পণ্য সারির প্রধান প্রধান পণ্যগুলোর বিক্রয়, পণ্যের মূল্য ও মোট মুনাফার বর্ণনা করা হয়।
২.৫. অন্যান্য (Others): এখানে বাজার পরিস্থিতির সাথে বিবেচ্য অন্যান্য বিষয়গুলো আলোচনা করা হয়; যেমন- মৌলিক সামর্থ্য।
৩. বিপণন কৌশল (Marketing Strategies): বিপণন উদ্দেশ্যাবলি অর্জনের জন্য যে কর্মপন্থা গ্রহণ করা হয় তাকে বিপণন কৌশল বলে। বিপণন কৌশল হচ্ছে বিপণন ‘যৌক্তিকতা’ যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তার বিপণন উদ্দেশ্য অর্জনের প্রত্যাশা করে। বিপণন কৌশলে পরিকল্পনায় বর্ণিত হুমকিসমূহ কীভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং সুযোগ গ্রহণের কৌশল কী হবে তার ব্যাখ্যাও এতে প্রদান করা হয় । বিপণন কৌশলে উল্লেখ করা হয়- মিশন (Mission), বিপণন লক্ষ্য (Marketing objectives), আর্থিক লক্ষ্য (Financial objectives), অভীষ্ট বাজার (Target markets), মিশন (Positioning)।
৪. বিপণন কার্যপদ্ধতি (Marketing Tactics): বিপণন কৌশল কার দ্বারা, কীভাবে, কখন, কত অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত হবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বিপণন কার্যপরিকল্পনা বলে । অর্থাৎ, কর্মপরিকল্পনা হচ্ছে এমন পরিকল্পনা যাতে কে বিপণন কার্যাবলির জন্য দায়ী থাকবেন এবং বিপণন কৌশল নির্বাহের কী পরিমাণ বাজেট ও সময়ের প্রয়োজন তার খুঁটিনাটি বর্ণনা থাকে। বিপণন কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করার জন্য পণ্য ( Product), মূল্য (Pricing), বণ্টন (Distribution), যোগাযোগ (Communications), বিপণন গবেষণা (Marketing Research) ইত্যাদি বিষয়ের কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করা হয় ।
৫. আর্থিক পরিকল্পনা (Financial Projection): বিক্রয়, ব্যয় ও ব্রেক ইভেন পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে প্রতিষ্ঠান আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এছাড়াও ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে অনির্দিষ্ট চলকগুলো সম্পর্কে ধারণা নিতে পারে ।
৬. নিয়ন্ত্রণ (Control): পূর্বনির্ধারিত আদর্শমান অনুযায়ী বিপণন কার্য সম্পাদিত হচ্ছে কি না তা তদারকি করা এবং আদর্শমান হতে বিচ্যুত হলে সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাকে বিপণন নিয়ন্ত্রণ বলে। অর্থাৎ, বিপণন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে বিপণন কৌশল ও পরিকল্পনার ফলাফল পরিমাপ ও মূল্যায়ন এবং সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, বিপণনের উদ্দেশ্য অর্জনের নিশ্চয়তা প্রদান করে।

সারসংক্ষেপ
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ভবিষ্যতে কী করা হবে, কীভাবে করা হবে, কোথায় করা হবে, কে করবে ইত্যাদির একটি অগ্রীম কর্মসূচি প্রণয়নকে বিপণন পরিকল্পনা বলা হয়। এটি একটি নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া ।
বিপণন পরিকল্পনায় যে সকল বিষয় বা উপাদান অন্তর্ভুক্ত থাকে সেগুলো সারণীর মাধ্যমে দেখানো হয়েছে- (১) নির্বাহী সারসংক্ষেপ -পরিকল্পনার সারমর্ম বা মূল তথ্যসমূহ, (২) পরিস্থিতি বিশ্লেষণ- বাজার পরিস্থিতি, SWOT বিশ্লেষণ, প্রতিযোগিতা, পণ্য অর্পণ, অন্যান্য বিষয়সমূহ; (৩) বিপণন কৌশল- মিশন, বিপণন উদ্দেশ্য, অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য, অভীষ্ট বাজার, বাজার অবস্থান গ্রহণ; (৪) বিপণন কার্যপদ্ধতিসমূহ- পণ্য, মূল্য, বণ্টন, যোগাযোগ, বিপণন গবেষণা; (৫) আর্থিক সিদ্ধান্ত- ব্রেক ইভেন পয়েন্ট, বিক্রয় পূর্বানুমান, খরচ পূর্বানুমান ; এবং (৬) নিয়ন্ত্রণ- বাস্তবায়ন, বিপণন | প্রতিষ্ঠান, দৈবঘটনার জন্য পরিকল্পনা।


১ thought on “বিপণন পরিকল্পনা”