ব্যবসায় ক্রয় পরিস্থিতি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “ব্যবসায় বাজার বিশ্লেষণ” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।
ব্যবসায় ক্রয় পরিস্থিতি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী
ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতা ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রভাব বিস্তারকারি বিষয়সমূহ বিবেচনা করা হয় যা পূর্ববর্তী পাঠে আলোচনা করা হয়েছে। ক্রয়ের কার্যক্রম প্রক্রিয়া শুরু করার সময় প্রথমেই ক্রেতা জেনে নেয় কোনো ক্রয় পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায় পণ্য ক্রয় করছে। প্রয়োজন অনুসারে ক্রেতা কখনো নিয়মিত সরবরাহকারি বা সম্পূর্ণ নতুন সরবরাহকারির কাছ থেকে ব্যবসায় পণ্য ক্রয় করে থাকে। ব্যবসায় ক্রেতা পণ্য ক্রয় করার সময় সাধারণত একা সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মতিক্রমে ক্রয় করা হয়। ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ে এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই পণ্য ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করা হয়।

ক্রয় পরিস্থিতি
Buying Situations
ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে যা নির্ভর করে ব্যবসায়ের প্রকৃতির, নতুন পণ্য ক্রয় করার প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদির ওপর। ছোট প্রতিষ্ঠান এবং বড় প্রতিষ্ঠানের ক্রয় সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায় ৷ ক্রয় পরিস্থিতির ধরণ অনুযায়ী সিদ্ধান্তের সংখ্যা কম বেশি হয়। নিম্নে ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাদের বিভিন্ন প্রকার ক্রয় সিদ্ধান্তে ধরণ আলোচনা করা হলো-
ক) সরাসরি পুনঃক্রয় (Straight Rebuy): ব্যবসায় পণ্যের এ ক্রয় প্রক্রিয়া হলো নিয়মিত ক্রয় প্রক্রিয়া। এখানে ক্রেতা কোনো কিছু পরিবর্তন না করে সরাসরি পূর্ববর্তী ক্রয় অনুযায়ী পুনঃক্রয়ের অর্ডার দিয়ে তাকে। সাধারণত পূর্বের ক্রয় যদি ক্রেতাকে পুরোপুরি তৃপ্তি দিয়ে থাকে। তখন সে ক্রয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করেই পূর্বের সিদ্ধান্তকে অনুসরণ করে। এ ধরনের ক্রয় ক্ষেত্রে পণ্য পরিবর্তন এবং সরবরাহকারী পরিবর্তন করা হয় না বললেই চলে। সরবরাহকারীগণ নিয়মিত অর্ডার প্রাপ্তির আসায় পণ্য ও সেবার মান বজায় রাখতে চেষ্টা করে। নিত্যনৈমিত্তিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে বারবার অর্ডার প্রদানের ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়ার উদ্দেশ্যেই সাধারণত এ ধরনের সরাসরি পুনঃক্রয় অর্ডার দেয়া হয়।
খ) সংশোধিত পুনঃক্রয় (Modified Rebuying): সরাসরি পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পরিবর্তন আনা হয় না কিন্তু সংশোধিত পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা পণ্য ক্রয়ের বিভিন্ন ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন আনতে চায়। বিশেষত সংশোধিত পুনঃক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতারা পণ্য ক্রয়ের জন্য নতুন শর্ত প্রদান করে। সাধারণত পণ্যের গুনাগুন, মূল্য, সেবা শর্ত, সরবরাহ প্রক্রিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন নিয়ে আশা হয়। এ ক্রয়ের ক্ষেত্রে পুরাতন সরবরাহকারীদের মধ্যে অনিশ্চিয়তা কাজ করে এবং বর্তমান অবস্থা ধরে রাখার জন্য সর্বাত্নক চেষ্টা করে। অন্যদিকে বাইরের সরবরাহকারীরা এ শর্তগুলিকে একটা সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। অনেক সময় বড় প্রতিষ্ঠানসমূহ সংশোধিত পুনঃক্রয়ের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় করতে চায়।
গ) নতুন কাজ (New Task): এ ক্রয় সরাসরি অথবা সংশোধিত পুনঃক্রয়ের সাথে একেবারেই সংশ্লিষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রথমবারের মত একটি পণ্য বা সেবার ক্রয়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। নতুন কাজ বলতে কোনো পণ্যের নতুন ক্রয়ের সূচনাকে বুঝায়। এ ক্রয়ের জন্য ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। যেহেতু প্রথমবারের মত একটি প্রতিষ্ঠান ক্রয় কার্যে অংশগ্রহণ করে ফলে এখানে ক্রেতার ঝুঁকির পরিমাণ বেশি থাকে। এ ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য ক্রেতাকে ব্যাপক তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য মূল্যায়ন করতে হয়। এখানে প্রথমবারের মত পণ্যের বৈশিষ্ট্য, মূল্য, শর্ত, সেবা, অর্ডার ইত্যাদি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়। এ ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের উচ্চ ব্যবস্থাপনার (Top Management) সিদ্ধান্ত জড়িত থাকে।

ব্যবসায় ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারীরা
Participants in the Business Buying Process
ব্যবসায় পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় একটি জটিল প্রক্রিয়া। বিপুল পরিমাণ অর্থের সাথে সাথে একাধিক ব্যক্তি এ প্রক্রিয়াতে জড়িত থাকে। ক্রয়কারি প্রতিষ্ঠানের যেঅংশ এ সিদ্ধান্ত নেয় তাকে ক্রয় কেন্দ্র বলে। ক্রয় কেন্দ্রে যে সকল সদস্যগণ জড়িত থাকে তারা ক্রয় প্রক্রিয়াতে নিম্নলিখিত ভূমিকা পালন করে থাকে-
ক) সূচনাকারী (Initiators): ক্রয় প্রক্রিয়ায় সূচনাকারীরা প্রথম পণ্য ক্রয় সম্পর্কে প্রস্তাব করে। এরা পণ্যটির ব্যবহারকারী অথবা সংগঠনের অন্য যেকেউ হতে পারে। সূচনাকারী একটি পণ্যের প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে প্রথমে অনুভব (Feel) করে ।
খ) ব্যবহারকারী (Users) : যারা পণ্যটি বা সেবাটি ব্যবহার করে। এরা অনেক সময় ক্রয়ের প্রস্তাব দিয়ে থাকে এবং পণ্যের গুনাগুন, বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি বিশ্লেষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
গ) প্রভাব বিস্তারকারী (Influencers) : এ সদস্যরা পণ্য ক্রয় সিদ্ধান্তের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এ সদস্যদের পণ্য সম্বন্ধে বিশেষ জ্ঞান থাকে এবং ক্রয়ের ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়ে থাকে। বিশেষ কারিগরি জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরা সাধারণত প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে থাকে ও পণ্য মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণে বিশেষ ভূমিকা রাখে ।
ঘ) নির্ধারণকারী (Deciders): এ সদস্যরা বিভিন্ন পণ্য ক্রয় এবং তাদের কিছু মৌলিক প্রশ্নের উত্তরের সাথে জড়িত থাকে। কি পণ্য ক্রয় করা হবে, কোথা থেকে ক্রয় করা হবে, কত মূল্যে ক্রয় করা হবে, কোনো সময় ক্রয় করা হবে ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকেন।
ঙ) অনুমোদনকারী (Approvers): নির্ধারণকারী যে সকল বিষয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, অনুমোদনকারীরা সেসকল বিষয়ের আনুষ্ঠানিক অথবা আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের ক্ষমতা রাখেন। সাধারণত নির্ধারণকারীরা যে ক্রয় প্রস্তাব পেশ করেন অনুমোদানকারীরা সেই প্রস্তাব পাশ করে অথবা বাতিল করার ক্ষমতা রাখে ।
চ) ক্রেতা (Buyers): যারা পণ্য ক্রয়ের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক সকল প্রকার কার্যাবলি সম্পাদন করেন এবং চূড়ান্ত ক্রয় সম্পাদনের অধিকার রাখেন। এরা চূড়ান্তভাবে সরবরাহকারী নির্বাচন করে এবং ক্রয় শর্ত নির্ধারণের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতার অধিকারী হয়। যদিও সরবরাহকারী ঠিক করাই এ সদস্যদের প্রধান কাজ তারপরও চূড়ান্ত ক্রয়ের সময় বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। জটিল ক্রয়ের ক্ষেত্রে এরা কোম্পানির ক্রয় অর্ডার ও শর্ত অনুসরণ করে থাকে।
ছ) গেটকিপার (Gatekeepers ) : যারা ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ায় অন্যের নিকট তথ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে তারাই গেইটকিপার। অনেক সময় গেটকিপারের কারণে এজেন্ট বা সরবরাহকারীরা প্রকৃত ব্যবহারকারী, সিদ্ধান্তকারী অথবা অনুমোদনকারীর সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্থ হয়ে থাকে। তারা এ যোগাযোগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, অভ্যর্থনাকারী (Receptionists), টেলিফোন অপারেটর, এমনকি ব্যক্তিগত সচিব যারা প্রকৃত ব্যবহারকারী, সিদ্ধান্তপ্রদানকারীদের সাথে বিক্রয়কর্মীদের যোগাযোগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে গেটকিপার হিসেবে।
সাধারণত ছোট প্রতিষ্ঠানে এবং নিয়মিত পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে সকল সদস্যদের উপস্থিতি থাকেনা। এখানে সিদ্ধান্তকারী এবং ক্রেতার ভূমিকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ থাকে। কিন্তু জটিল অথবা কারিগরি ক্রয়ের ক্ষেত্রে সকল সদস্যদের উপস্থিতি দেখা যায়। বিপণনকারিকে ভালভাবে জানতে হবে কোন পণ্য প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এদের ব্যবহারকারী কারা, কারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িত, এবং কারা চূড়ান্ত ক্রয় সম্পাদন করবে ইত্যাদি বিষয় বিবেচনা করে সেভাবে তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে।

সারসংক্ষেপ:
ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে যা নির্ভর করে ব্যবসায়ের প্রকৃতির, নতুন পণ্য ক্রয় করার প্রয়োজন আছে কিনা ইত্যাদির ওপর। ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাদের বিভিন্ন প্রকার ক্রয় সিদ্ধান্তে ধরণগুলো হলো- সরাসরি পুনঃক্রয়, সংশোধিত পুনঃক্রয় ও নতুন কাজ। ক্রয়কারি প্রতিষ্ঠানের যেঅংশ এ সিদ্ধান্ত নেয় তাকে ক্রয় কেন্দ্র বলে। ক্রয় কেন্দ্রে যে সকল সদস্যগণ জড়িত থাকে তারা হলো- সূচনাকারী, ব্যবহারকারী, প্রভাব বিস্তারকারী, নির্ধারণকারী, অনুমোদনকারী, ক্রেতা ও গেটকিপার ।

১ thought on “ব্যবসায় ক্রয় পরিস্থিতি ও ক্রয় প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী”