ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “ব্যবসায় বাজার বিশ্লেষণ” ইউনিট ৫ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া

 

ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ে এসব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই পণ্য ক্রয়ের কার্যক্রম শুরু করা হয়। ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের প্রক্রিয়ায় আটটি ধাপ সম্পন্ন করে ব্যবসায় পণ্য ক্রয় করা হয়।

 

ব্যবসায় ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া

Business Buyers’ Decision-Making Process

ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতারা নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে পণ্য ক্রয় করে না করে মূলত পুনঃউৎপাদনের জন্য পণ্য ক্রয় করে। একারণে এ পণ্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভিন্নতা রয়েছে। সাধারণত নতুন ধরনের পণ্য অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রথমবার ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা নিম্নলিখিত চিত্র ৫.২ এর আটটি স্তর অতিক্রম করে পণ্য ক্রয় করে থাকে।

 

 

১. সমস্যা শনাক্তকরণ (Problem Recognition) : প্রতিষ্ঠান যখন কোনো সমস্যা বা প্রয়োজন অনুভব করে, যা পণ্য বা সেবার ক্রয়ের মাধ্যমে মেটানো যায়, তখন থেকেই ব্যবসায় পণ্যের ক্রয় প্রক্রিয়া আরম্ভ হয়। বিভিন্ন ভাবে এ সমস্যা শনাক্ত করা যায়। যেমন- কোনো নতুন পণ্য উৎপাদনের জন্য আবার, বর্তমান পণ্যকে উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল, মেশিন-যন্ত্রপাতি ইত্যাদির প্রয়োজন হতে পারে।

২. প্রয়োজনের বর্ণনা (Need Description): সমস্যা শনাক্ত করার পর ক্রেতাকে প্রয়োজনের বর্ণনা করে এবং পণ্যের বৈশিষ্ট্য এবং পরিমাণ নির্ধারণে অগ্রসর হয়। ধরা যাক- কোনো পণ্যের মান উন্নয়ন অথবা মোড়ক পরিবর্তন দরকার অথবা মেশিন বিকল হবার কারণে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বিষয় তিনটির আলাদা হবার জন্য প্রয়োজনকে ভিন্ন ভিন্নভাবে বর্ণনা করতে হয়। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের পক্ষে তার প্রয়োজনের বর্ণনা প্রদান সম্ভবপর হয় না। সেই ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ বিপণনকারি ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাকে তার প্রয়োজনের বর্ণনা প্রদান সহায়তা করতে পারে ।

 

৩. পণ্য সুনির্দিষ্টকরণ (Product Specification) : পণ্য প্রয়োজনের বর্ণনার পর ক্রেতাকে পণ্যের কারিগরি মান ও বৈশিষ্ট্য ঠিক করে। পণ্য সুনির্দিষ্ট করার জন্য ক্রেতা কতগুলো প্রশ্নের মাধ্যমে পণ্যকে সুনির্দিষ্ট করে যা নিম্নরূপ-

 

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয়

 

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার মাধ্যমে ভ্যালু বিশ্লেষণ করে ক্রেতা পণ্যকে সুনির্দিষ্ট করে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্য মান নির্দিষ্টকরণে বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয় করে থাকে ।

৪. সরবরাহকারী অনুসন্ধান (Supplier Search): ক্রেতা এরপরে সর্বোত্তম বিক্রেতা বা সরবরাহকারী খুঁজে বের করার জন্য চেষ্টা চালায়। বিভিন্ন উৎস থেকে ক্রেতা এ সরবরাহকারীর অনুসন্ধান করতে পারে। ক্রেতা প্রথমত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের তালিকা বা ট্রেড ডিরেক্টরী থেকে তার সরবরাহকারীর তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। এক্ষেত্রে তার সময় এবং খরচের উভয়ই কম হয়ে থাকে। এছাড়াও ইন্টারনেট, টেলিফোনে অথবা সরাসরি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে সরবরাহকারীর তথ্য নেয়া যেতে পারে। ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতাদের সর্বদা সরবরাহকারিদের উৎস সম্পর্কে জ্ঞান রাখতে হয় যেন প্রয়োজনের সময় সহজেই তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়।

৫. প্রস্তাব সংগ্রহ (Proposal Solicitation): সরবরাহকারি অনুসন্ধানের পরবর্তী কাজ হলো সরবরাহকারিদের নিকট থেকে প্রস্তাব আহ্বান। অনুসন্ধানের সময়ই সরবরাহকারিদের সম্পর্কে ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতার একটা প্রাথমিক ধারণা জন্ম নিয়ে থাকে। সেই ভাবে কিছু নির্বাচিত সরবরাহকারিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আহ্বানের জন্য আমন্ত্রণ করা হয়। এ সময় সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ, ক্যাটালগ ইত্যাদি বিষয় ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতার নিকট প্রেরণ করে অথবা তাদের বিক্রয় প্রতিনিধি প্রেরণ করে থাকে। বিক্রয় প্রতিনিধি পণ্য বিক্রয়ের বিবিধ বিষয় নিয়ে সরাসরি ক্রেতার নিকট আলোচনা করে থাকে। জটিল ও ব্যয়বহুল পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতা সাধারণত সরবরাহকারির নিকট থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত বিস্তারিত প্রস্তাব আহ্বান করেন।

৬. সরবরাহকারী নির্বাচন (Supplier Selection) : প্রস্তাব আহ্বানের পরবর্তী পদক্ষেপ হলো সরবরাহকারী নির্বাচন। ক্রয় কেন্দ্রের সদস্যরা প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে এবং সেখান থেকে তারা সরবরাহকারি নির্বাচন করে। সাধারণত সরবরাহকারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটি প্যানেল তৈরি করা হয় যারা সরবরাহকারির বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে থাকেন। সরবরাহকারী নির্বাচনে নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ বিবেচনা করা হয়-

পণ্যের গুণ (Quality of Product): কোনো একটি প্রতিষ্ঠান মান সম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারলে তাকে নির্বাচন করা হয়ে থাকে ।

খ) অভিজ্ঞতা (Experience): নির্বাচনের সময় অভিজ্ঞতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়। বিশেষ করে কিছু জটিল পণ্যের ক্ষেত্রে সরবরাহকারী প্রথম বারের মত পণ্য সরবরাহ করছে কিনা, এর পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কিনা, যদি থাকে তবে কি ধরনের অভিজ্ঞতা- বিবেচনায় আনা হয়।

গ) ব্যবসায় শর্ত (Trade Term) : ক্রেতার প্রত্যাশিত শর্ত অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কিনা যেমন- কিছু ক্রেতা বাকিতে পণ্য ক্রয় করতে চায়, কিছু ক্রেতা অগ্রীম পণ্য পেতে চায়। যে সকল সরবরাহকারি ক্রেতার সার্বিক শর্ত পূরণের ক্ষমতা রাখে তাদের নির্বাচনের সময় গুরুত্ব দেয়া হয় ।

ঘ) সুযোগ সুবিধা (Other Facilities): ক্রেতা সরবরাহকারি নিকট থেকে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রত্যাশা করে। যেমন- পরিবহরণ সুবিধা, গুদামজাতকরণ সুবিধা, কারিগরি সুবিধা, অব্যবহৃত পণ্য ফেরত সুবিধা ইত্যাদি। এ সকল সুবিধা প্রদানের সরবরাহকারির ক্ষমতা কতটুকু তা বিবেচনা করা হয়।

যতার্থতা (Appropriate): সরবরাহকারির যথাযথ যোগ্যতা আছে কিনা পণ্য সররাহের জন্য সেই দিকটি নির্বাচনের সময় দেখতে হয়।

চ) মূল্য (Price): সরবরাহকারি নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রধান বিষয় হলো মূল্য। সরবরাহকারী সঠিক মূল্যে মানসম্মত পণ্য সরবরাহ করতে পারবে কিনা তা বিবেচনা করা হয়।

অন্যান্য (Others): এছাড়া সরবরাহকারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সরবরাহকারির আচার আচরণ, সরবরাহকারি প্রতিষ্ঠানের সুনাম, কাজের মূল্যায়ন, সরবরাহকারি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি সকল বিষয় বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া

৭. অর্ডার রুটিন নির্দিষ্টকরণ (Order Routine Specification) : সরবরাহকারী নির্বাচন শেষ হলে ব্যবসায় পণ্যের ক্রেতা এ পর্যায়ে অর্ডার রুটিন নির্দিষ্ট করবে। অর্ডার নির্দিষ্টকরণের সময় আনুষ্ঠানিক কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয়। পণ্যশর্ত এবং ব্যবসায়িক শর্তগুলি আনুষ্ঠানিক ভাবে উল্লেখ থাকে। পণ্যের বিস্তারিত বিবরণ, বিশেষ করে ক্রয় নীতির প্রধান দিকসমূহ যেমন- সঠিক গুন, সঠিক পরিমাণ, সঠিক সময়, সঠিক মূল্য ইত্যাদি বিষয়গুলো উল্লেখ করতে হয়। এছাড়াও এতে আরো কিছু বিষয় উল্লেখ থাকে যেমন- নির্ধারিত সরবরাহকারিকে চূড়ান্ত অর্ডার প্রদান, কারিগরি মানের তালিকা প্রণয়ন, পণ্য পরিমাণ, ফেরত প্রদান নীতি, গ্যারান্টি ইত্যাদি।

 

৮. কার্যসম্পাদন পর্যালোচনা (Performance Review): অর্ডার রুটিন নির্দিষ্টকরনের পর থেকে সরবরাহকারি অর্ডার অনুযায়ী ক্রেতাকে পণ্য সরবরাহ করবে। এ স্তরে ক্রেতা সরবরাহকারির নানাবিধ কার্যক্রম মূল্যায়ন করবে। বিশেষ করে অর্ডার নির্দিষ্টকরণে যে সকল বিষয় উল্লেখ ছিল তার সাথে সরবরাহকারির কার্যক্রম কতটা সংগতিপূর্ণ সেটা মূল্যায়ন করবে; সরবরাহকারির সরবরাহকৃত পণ্যের গুনগতমান ঠিক আছে কিনা; সরবরাহকারি সময়মত পণ্য সরবরাহ করেছে কিনা ইত্যাদি। সর্বোপরি রুটিন অর্ডারে যে সকল শর্ত ছিল সেশর্তগুলোর ক্ষেত্রে সরবরাহকারি তার দায় দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করেছে কিনা এ সকল বিষয় মূল্যায়ন করে ক্রেতা সরবরাহকারির সাথে নিয়মিত ব্যবসা করতে পারে, অথবা বিভিন্ন লেনদেনের সংশোধন করে ব্যবসা চালাতে পারে কিংবা তাকে বাদও দিতে পারে।

পরিশেষে বলা যায় যে, ব্যবসায় পণ্যের ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত উল্লেখিত আটটি স্তর অতিক্রম করতে হয়। ছোট প্রতিষ্ঠান এবং নিয়মিত সাধারণ পণ্য ক্রয়ের সময় ক্রেতা অতিক্রম করে না তবে জটিল পণ্যের ক্ষেত্রে সকল স্তর অতিক্রম করতে হয়।

 

সারসংক্ষেপ:

সাধারণত নতুন ধরনের পণ্য অথবা প্রতিষ্ঠানের প্রথমবার ব্যবসায় পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতা আটটি স্তর অতিক্রম করে পণ্য ক্রয় করে থাকে। সেগুলো হলো- সমস্যা শনাক্তকরণ, প্রয়োজনের বর্ণনা, পণ্য সুনির্দিষ্টকরণ, সরবরাহকারী অনুসন্ধান, প্রস্তাব সংগ্রহ, সরবরাহকারী নির্বাচন, অর্ডার রুটিন নির্দিষ্টকরণ এবং কার্যসম্পাদন পর্যালোচনা।

১ thought on “ব্যবসায় ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া”

Leave a Comment