ব্র্যান্ডিং কৌশলসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “পণ্য, সেবা ও ব্র্যান্ড” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।
ব্র্যান্ডিং কৌশলসমূহ
ব্র্যান্ড কী?
What is Brand?
ব্র্যান্ড হলো কোনো নাম, শর্ত, প্রতীক বা নকশা অথবা এগুলোর সংমিশ্রণ, যা ব্যবহার করে বিক্রেতা তার পণ্য বা সেবাকে অন্যদের পণ্য থেকে আলাদা করে। কোম্পানি বা বিক্রেতাদের পণ্য বা সেবাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে প্রতিযোগীদের পণ্য থেকে পৃথক সেবা প্রদানসহ নতুনভাবে উপস্থাপনকে ব্র্যান্ডিং বলে।
Philip Kotler & Gary Armstrong ব্র্যান্ডকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে, “Brand is a name, term, sign, symbol or design or a combination of these that identifies the maker or seller of a product or service.” অর্থাৎ পণ্য বা সেবা উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা পণ্য বা সেবা চিহ্নিত করার জন্য যে সকল নাম, টার্ম, সংকেত, প্রতীক বা নকশা অথবা এই সবকিছুর মিশ্রণে যা ব্যবহার করে তাকে ব্র্যান্ড বলে । Mccarthy and Perreault-এর মতে, “Branding means the use of a name, term, symbol or design or a combination of these to identify a product.” অর্থাৎ ব্র্যান্ডিং হলো কোনো নাম, টার্ম, সংকেত বা ডিজাইন বা এসবের সংমিশ্রণ, যা একটি পণ্যকে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়।
ভোক্তারা ব্র্যান্ডকে পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ইমেজের কারণেই কোনো পণ্য ভোক্তা ক্রয় করে এবং অন্যকে প্ররোচিত করে ব্যবহার করার জন্য। ব্র্যান্ডের মাধ্যমেই একটি পণ্য বা সেবার সম্পর্কে পরিচিতি ভোক্তা বা ক্রেতার কাছে প্রকাশ করা হয়। অতএব, একটি ব্র্যান্ডের মাধ্যমেই একটি পণ্য বা সেবার সব কিছু ভোক্তা বা ক্রেতার কাছে প্রকাশ পায়।
ব্র্যান্ডিং কৌশলসমূহ
Brand Strategy
বিপণনকারীর কাছে পণ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ওই পণ্যের ব্র্যান্ড ভ্যালু ভোক্তাদের কাছে কীভাবে বিবেচিত হয়। ব্র্যান্ড বলতে শুধু পণ্যের পরিচয়ই প্রকাশ পায় না বরং এটি প্রতিষ্ঠানের ভোক্তাদের সাথে মূল সম্পর্কের চাবিকাঠি। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড তৈরি করার জন্য পূর্বশর্ত হলো ব্র্যান্ড ইক্যুইটি। ব্র্যান্ড ইক্যুইটি বলতে একটি পৃথক প্রভাবকে বোঝায়। কোনো পণ্যের ব্র্যান্ড নাম সম্পর্কে পরিচিত হওয়ার কারণে ওই পণ্যের এবং এর বিপণন সক্রান্ত কার্যাবলির প্রতি সাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে ভোক্তার মনের যে পৃথকীকরণ প্রভাব (Differential effect) কাজ করে তাকেই মূলত ব্র্যান্ড ইক্যুইটি বলে।
একটি ব্র্যান্ডের ধনাত্মক বা অনুকূল ইক্যুইটি থাকে যখন ক্রেতারা ওই ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য এবং আগ্রহ প্রকাশ করে অন্য প্রতিযোগীদের তুলনায়। ব্র্যান্ড ইক্যুইটির ম্যধমেই মূলত একটি পণ্যের ভোক্তা অভিরুচি, পছন্দ এবং আনুগত্য পরিমাপ করা হয়। যেহেতু ব্র্যান্ড ইক্যুইটি ভোক্তার মনে ব্র্যান্ড সম্পর্কিত ধারণার বহিঃপ্রকাশ, বিপণনকারীকে সবসময় উন্নত সেবা, গুণগত মান, বিপণন ব্যবস্থা বিজ্ঞাপন এবং ভোক্তার সাথে সুসম্পর্কের মাধ্যমে ঋণাত্মক ব্র্যান্ড ইক্যুইটি তৈরির চেষ্টায় থাকতে হয়। ব্র্যান্ড ইক্যুইটি তৈরির চেষ্টায় থাকতে হয়। ব্র্যান্ড ইক্যুইটি একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। কারণ উচ্চ ব্র্যান্ড ইক্যুইটিই উচ্চ মুনাফা এবং ভোক্তা সুসম্পর্কের মূল ভিত্তি।
সফল ব্র্যান্ড তৈরি
Building Strong Brands
উত্তম বা সফল ব্র্যন্ড তৈরি করা এবং বোক্তার মনে ব্র্যান্ডের অনুকূলের ভাবমূর্তি ধরে রাখা বিপণনকারীর জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কার্যাবলির একটি। ব্র্যান্ড হলো একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে ক্ষমতাসম্পন্ন সম্পদ এবং বিপণনকারীকে অনেক সতর্কতার সাথে একটি সফল ব্র্যান্ড গড়ে তুলতে হয়। সফল ব্র্যান্ড সৃষ্টির কৌশলসমূহর মধ্যে অন্যতম হলো-

১. ব্র্যান্ড অবস্থান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত (Brand Positioning Related Decisions): বিপণনকারীকে প্রথমেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে পণ্য সাধারণ স্তরের হবে নাকি পণ্যটির ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা হবে। যদি কোম্পানি চিন্তা করে পণ্যটি ব্র্যান্ড স্তরের হবে, তাহলে বিপণনকারীকে ভোক্তাদের মনে ব্র্যান্ড সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা তৈরি করতে হবে। সঠিক ব্র্যান্ড ধারণা তৈরির জন্য ভোক্তাদের পণ্য বৈশিষ্ট্য, পণ্যের সুবিধাদি, পণ্যসংক্রান্ত ভ্যালু এবং অনুকূল বিশ্বাস ও ভাবমূর্তি সম্পর্কে অবহিত করতে হবে যাতে ভোক্তা তার প্রয়োজনের সাথে ব্র্যান্ডের যোগসূত্র স্থাপন করতে পারে। অপারদিকে, কোন পণ্যের ব্র্যান্ড সৃষ্টি করতে গেলে উৎপাদক ও বিপণনকারীকে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জনের জন্য অবশ্যই মোট বিক্রয়ের পরিমাণ বহুলাংশে বাড়াতে হবে।
২. ব্র্যান্ড পৃষ্ঠপোষক সিদ্ধান্ত (Brand Sponsor Decision): ব্র্যান্ড উন্নয়নের জন্য উৎপাদনকারীর বাজার প্রয়োজন হয় এবং পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে তিনটি বিকল্প রয়েছে। যথা: ক. উৎপাদনকারী তার নিজেস্ব ব্র্যান্ডিং ব্যবহার করতে পারে, যা উৎপাদকের ব্র্যান্ড নামে পরিচিত। খ. উৎপাদক মধ্যস্থ ব্যবসায়ীকে ব্র্যান্ড উন্নয়নের জন্য দিতে পারে, যা ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড বা বণ্টনকারীর ব্র্যন্ড নামে পরিচিত। গ. কোন কোম্পানি যখন নিজের ব্যবহৃত বা তৈরীকৃত পণ্য বা সেবার নাম অন্য উৎপাদকের ব্র্যান্ড নামে টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করার লাইসেন্স দেয় তখন তাকে লাইসেন্স ব্র্যান্ড বলে।
৩. ব্র্যান্ড নাম সিদ্ধান্ত (Brand Name Decision): বিপণনের ভাষায় A Good name can greatly to a products success. এটি একটি অতিপরিচিত ব্র্যান্ড নাম, প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। যেসব কোম্পানির ব্র্যান্ড নাম পণ্যের নামের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে সমস্যার সৃষ্টি করে। একজন উৎপাদনকারী পণ্যের ব্র্যান্ড নাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত চারটি কৌশলের যেকোনোটি ব্যবহার করতে পারে। যথা:
ক. নির্দিষ্ট কোনো একটি পণ্যের ব্র্যান্ড নাম নির্ধারণ করাকে একক ব্র্যান্ড নাম বা Individual brand name বলা হয়। কোম্পানি একাধিক পণ্য উৎপাদন করলে প্রত্যেক পণ্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ড নাম নির্বাচন করতে পারে।
খ. একজন উৎপাদক সকল পণ্যের জন্য একটিমাত্র ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করলে তাকে Blanket family বলা হয়।
গ. কোম্পানি কয়েকটি বিভিন্ন প্রকৃতির পণ্য উৎপাদন এবং প্রত্যেক পরিবারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন নাম ব্যবহার করলে তাকে প্রত্যেক পণ্য পরিবারের জন্য পৃথক নাম কৌশল বলা হয়।
ঘ. প্রত্যেক পণ্যের একক ব্র্যান্ড নামের সাথে কোম্পানির নাম জড়িত করা হলে তাকে কোম্পানির ট্রেড নামের সাথে একক পণ্য নামের মিশ্রণ কৌশল বলা হয়। এক্ষেত্রে কোম্পানির সুনাম ব্যবহারের দ্বারা ব্র্যান্ড নাম পরিচিত করার চেষ্টা করা হয়।

৪. ব্র্যান্ড কৌশল সিদ্ধান্ত (Brand Strategy Decidion): প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড কৌশল অবলম্বন করার ক্ষেত্রে কার্যভিত্তিক, ভাবমূর্তি ও পরীক্ষামূলক ব্র্যান্ড বাজারে উপস্থাপন করতে পারে। একটি কোম্পানি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের ব্র্যান্ড কৌশল সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। এগুলো হলো-
ক. পণ্য সারি বর্ধিতকরণ (Product Line Extension): বাজারে প্রচালিত ব্র্যান্ডের আকৃতি পরিবর্তন, নতুন উৎপাদন মিশ্রণ, প্যাকেট পরিবর্তন তথা বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন করা হলে, তাকে পণ্য সারি বর্ধিতকরণ বলা হয়। খ. ব্র্যান্ড বর্ধিতকরণ (Brand Extension): কোম্পানি নতুন পণ্য উপস্থাপনের জন্য বর্তমানে প্রচালিত ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করলে, তাকে ব্র্যান্ড বর্ধিতকরণ কৌশল বলা হয়।
গ. বহু ব্র্যান্ড কৌশল (Multibrand Strategy): একই জাতীয় পণ্যের একাধিক নাম ব্যবহার করলে, তাকে বহু ব্র্যান্ড কৌশল বলা হয়।
ঘ. নতুন ব্র্যান্ড কৌশল (New Brand Strategy): নতুন পণ্যের নতুন ব্র্যান্ড নাম প্রবর্তন করা হলে, তাকে নতুন ব্র্যান্ড কৌশল বলা হয়।
৫. ব্র্যান্ড পুনঃ অবস্থানকরণ সিদ্ধান্ত (Brand Repositioning Decisions): প্রথমিকভাবে একটি ব্র্যান্ড বাজারে ভালো অবস্থান গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে কোম্পানিকে এ ব্র্যান্ডের অবস্থান পুনঃনির্ধারণ করতে হয়। প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান কোম্পানির ব্র্যান্ডের খুব কাছাকাছি ব্র্যান্ড বাজারে উপস্থাপন করলে কোম্পানির বাজার অংশ হ্রাস পেতে পারে বা ক্রেতারা অগ্রাধিকার পরিবর্তন করতে পারে।
তাই বর্তমান ব্র্যান্ডের প্রতি ক্রেতাদের স্বীকৃতি এবং আনুগত্য ধরে রাখার জন্য নতুন নতুন ব্র্যান্ডের পণ্য বাজারে উপস্থাপনের পূর্বে কোম্পানিকে চলতি ব্র্যান্ডের অবস্থান পুনঃনির্ধারণ সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত। শেষ ধাপে বিপণনকারীকে ব্র্যান্ডের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে। ভবিষ্যতে ব্র্যান্ডটি কীভাবে প্রসারিত হবে বা নতুন ব্র্যান্ড সংযোজন সংক্রান্ত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
সর্বপরি, বিপণনকারীকে প্রতিটি ধাপে পর্যবেক্ষণ এবং ফলাফল মূল্যায়ন ব্যবস্থা সংযোজন করতে হবে। একটি ব্র্যান্ড সফল বা শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভোক্তাদের মনে অনুকূল ভাবমূর্তি ধরে রাখার জন্য নিত্যনতুন কৌশল গ্রহণ ও সুব্যবস্থাপনার সমন্বয় একান্ত প্রয়োজন ।

সারসংক্ষেপ
ভোক্তারা ব্র্যান্ডকে পণ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মনে করে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড ইমেজের কারণেই কোনো পণ্য ভোক্তা ক্রয় করে এবং অন্যকে প্ররোচিত করে ব্যবহার করার জন্য। ব্র্যান্ড হলো কোনো নাম, শর্ত, প্রতীক বা নকশা | অথবা এগুলোর সংমিশ্রণ, যা ব্যবহার করে বিক্রেতা তার পণ্য বা সেবাকে অন্যদের পণ্য থেকে আলাদা করে। কোম্পানি বা বিক্রেতাদের পণ্য বা সেবাকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করে প্রতিযোগীদের পণ্য থেকে পৃথক সেবা প্রদানসহ নতুনভাবে | উপস্থাপনকে ব্র্যান্ডিং বলে। সফল ব্র্যান্ড সৃষ্টির কৌশলসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো: ব্র্যান্ড অবস্থান সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, ব্র্যান্ড | পৃষ্ঠপোষক সিদ্ধান্ত, ব্র্যান্ড নাম সিদ্ধান্ত, ব্র্যান্ড কৌশল সিদ্ধান্ত এবং ব্র্যান্ড পুনঃ অবস্থানকরণ সিদ্ধান্ত।
