ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ

ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “বাজার অবস্থান গ্রহণ ও ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ” ইউনিট ৭ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ

 

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিপণনকারী বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে। ব্র্যান্ড প্রস্তুত করার মাধ্যমে বিপণনকারী পণ্যের একটি অভিন্ন পরিচয় তৈরি করে। এই ব্র্যান্ড প্রস্তুতের জন্য বিভিন্ন সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। ব্র্যান্ড সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হলে বিপণনকারী ব্র্যান্ড ইক্যুইটির মাধ্যমে প্রতিযোগীতার বাজারে কার্যকরভাবে টিকে থাকতে পারে।

 

ব্র্যান্ড কী? (What is Brand?):

ব্র্যান্ড হলো কোনো চিহ্ন, প্রতীক, নকশা, নাম বা এইসবকিছুর সংমিশ্রণ, যা বিপণনকারী প্রতিযোগী পণ্য বা সেবা থেকে পৃথক করার জন্য ব্যবহার করে। Philip Kotler & Gary Armstrong ব্র্যান্ডকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে, “পণ্য বা সেবা উৎপাদনকারী বা বিক্রেতা পণ্য বা সেবা চিহ্নিত করার জন্য যে সকল নাম, টার্ম, সংকেত, প্রতীক বা নকশা অথবা এইসবকিছুর মিশ্রণে যা ব্যবহার করে তাকে ব্র্যান্ড বলে।” সাধারণত শিল্প পণ্যের তুলনায় তিনটি পাতা দিয়ে তাদের ব্র্যান্ড তৈরি করেছে। আবার, বাংলালিংক কমলা ও কালো রঙের মিশ্রণে ডোরাকাটা নকশার মাধ্যমে তার ব্র্যান্ডকে প্রস্তুত করেছে। ক্রেতা এই দুইটি প্রতিষ্ঠানকে খুব সহজেই আলাদা করতে পারে তাদের প্রতিষ্ঠিত চিহ্ন বা প্রতীকের মাধ্যমে।

ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারে। ক্রেতা ব্র্যান্ডের মাধ্যমে পণ্য চিহ্নিত করতে পারে সহজে, পণ্যের প্রতি আস্থা তৈরি হয়, পণ্য বাছাইয়ে সুবিধা হয়, সময় ও পরিশ্রম সাশ্রয় হয়, অন্যান্য পণ্যের সাথে তুলনা করতে পারে এবং প্রতারিত হবার সম্ভাবনা কম থাকে। আবার, বিক্রেতাও ব্র্যান্ড প্রস্তুতের মাধ্যমে কিছু সুবিধা ভোগ করে। ব্র্যান্ড প্রস্তুতের মাধ্যমে বিক্রেতা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ভাবমূর্তি তৈরি করতে পারে, প্রতিযোগিতায় সফলভাবে টিকে থাকতে পারে, নকল প্রতিহত করতে পারে এবং বাজার সম্প্রাসারণ করাও সহজ হয়। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ড বেশি ব্যবহৃত হয়।

 

 

ব্র্যান্ডিং সিদ্ধান্তসমূহ (Branding Decisions):

ব্র্যান্ডিং হলো এমন একটি পণ্যকে অন্য কোনো পণ্য থেকে আলাদা করার জন্য সংকেত, চিহ্ন, নাম, প্রতীক, ডিজাইন, বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করার সাথে সম্পৃক্ত সকল কার্যক্রমের সমষ্টি। প্রতিষ্ঠান সাধারণত ব্র্যান্ড সম্পর্কিত যেসব সিদ্ধান্তের মুখোমখি হয় তা চিত্র ৭.৩ এ দেখানো হলো-

 

 

১. ব্র্যান্ডিং সিদ্ধান্ত (Branding Decicions):

বিপণনকারী প্রথমেই সিদ্ধান্ত নেয় যে পণ্য বিপণনে ব্র্যান্ড করা হবে কি হবে না। ব্র্যান্ড ব্যবহারে বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে যেমন- ক্রেতা পণ্যের মান সম্পর্কে অবগত থাকে আবার পরিচিতি তৈরি করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে বিক্রেতা স্থায়ী ও অনুগত ক্রেতা সৃষ্টি করতে পারে।

 

২. ব্র্যান্ড পৃষ্ঠপোষক সিদ্ধান্ত (Brand Sponsor Decisions):

ব্র্যান্ড পৃষ্ঠপোষকের ক্ষেত্রে বিপণনকারী তিন ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

(ক) উৎপাদনকারী নিজে যে ব্র্যান্ড তৈরি বা উৎপাদন এবং বিপণন করে তখন তাকে উৎপাদকের ব্র্যান্ড বলে।

(খ) মধ্যস্থ ব্যবসায়ী যখন নিজের ব্র্যান্ড নামে পণ্য বিপণন করে তখন তাকে ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড বলে।

(গ) কোন কোম্পানি যখন নিজের ব্যবহৃত বা তৈরিকৃত পণ্য বা সেবার নাম অন্য উৎপাদকের ব্র্যান্ড নামে টাকার বিনিময়ে বিক্রয় করার লাইসেন্স দেয় তখন তাকে লাইসেন্স ব্র্যান্ড বলে।

 

৩. ব্র্যান্ড নাম সিদ্ধান্ত (Brand Name Decisions):

যেকোন প্রতিষ্ঠানের জন্য ব্র্যান্ড নাম নির্বাচন করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এক্ষেত্রে বিপণনকারী সহজ, সুন্দর, মনে রাখার মতো ও অর্থপূর্ণ ব্র্যান্ড নাম তারা নির্বাচন করে থাকে। এক্ষেত্রে চার ধরণের কৌশল অবলম্বন করা হয়। যথা-

(ক) প্রতিষ্ঠান যখন প্রতিটি পণ্যের জন্য সুনির্দিষ্ট ব্র্যান্ড নাম ব্যবহার করে তখন তাকে একক ব্র্যান্ড নাম বলে।

(খ) প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত সকল পণ্যের জন্য একটি নামই ব্যবহার করতে পারে এতে প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও বিজ্ঞাপন খরচ কম হয়।

(গ) প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণের পণ্য উৎপাদন করে, প্রতিটি ভিন্ন ভিন্ন পণ্যপরিবারের জন্য আলাদা আলাদা পণ্য নাম নির্ধারণ করতে পারে।

(ঘ) অনেকক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান উৎপাদিত পণ্যের জন্য আলাদা আলাদা নাম ব্যবহার করলেও এর সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানের নামও ব্যবহার করতে পারে।

 

৪. ব্র্যান্ড কৌশল সিদ্ধান্ত ( Brand Strategy Decisions) :

প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড কৌশল অবলম্বন করার ক্ষেত্রে কার্যভিত্তিক, ভাবমূর্তি ও পরীক্ষামূলক ব্র্যান্ড বাজারে উপস্থাপন করতে পারে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রতিষ্ঠান চারধরণের কৌশল ব্যবহার করে থাকে। যথা-

(ক) বাজারে প্রচলিত ব্র্যান্ডের সফল নাম ব্যবহার করে একই পণ্যবিভাগের পণ্যের রং, ডিজাইন, মোড়কের সামান্য সংযোজন ও পরিবর্তন করে বাজারে আনাকে পণ্য সারি বর্ধিতকরণ বলে।

(খ) একটি সফল ব্র্যান্ড ব্যবহার করে নতুন কোনো পণ্য বিভাগে নতুন পণ্য বাজারে সরবরাহকে ব্র্যান্ড বর্ধিতকরণ বলে।

(গ) প্রতিষ্ঠানের বর্তমান পণ্যবিভাগের মধ্যে আগের ব্র্যান্ডগুলোর সাথে নতুন কোনো ব্র্যান্ড অর্ন্তভূক্ত করা হলে তাকে বহু ব্র্যান্ড বলে। প্রতিষ্ঠান যখন নতুন পণ্যবিভাগের জন্য নতুন কোনো ব্র্যান্ড নিয়ে বাজারে প্রবেশ করে তখন তাকে নতুন ব্র্যান্ড বলে।

 

৫. ব্র্যান্ড পুনঃঅবস্থানগ্রহণ সিদ্ধান্ত (Brand Repositioning Decisions) :

প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময় পর পর নিয়মিতভাবে তার ব্র্যান্ডসমূহের শক্তিশালী ও দুর্বল দিক বিশ্লেষণ করে এবং সিদ্ধান্ত নেয় ব্র্যান্ডের পুনঃঅবস্থানগ্রহণ করা প্রয়োজন কিনা।

ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ

 

ব্র্যান্ড ইক্যুইটি কী? (What is Brand Equity?)

সফলভাবে ব্র্যান্ড প্রস্তুত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান ব্র্যান্ড ইক্যুইটির সুবিধা ভোগ করতে পারে ব্র্যান্ড ও ব্র্যান্ডিং এর মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে প্রভাবিত করার জন্য প্রতিষ্ঠান যে সুবিধা ভোগ করে তাকেই ব্র্যান্ড ইক্যুইটি বলে। অর্থাৎ ব্র্যান্ড ইক্যুইটি হলো ব্র্যান্ডের সার্বিক শক্তি যা বাজার অবস্থান ও প্রতিষ্ঠানের ভ্যালু প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বিপণনকারীর বিপণন কার্যক্রমে ঝুঁকি হ্রাস পায়; ক্রেতা ও ভোক্তার মধ্যে আনুগত্যতা (Loyalty) বৃদ্ধি পায়; মূল্য বৃদ্ধি পেলেও ক্রেতার মধ্যে অধিক অনমনীয় প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যায়। আবার উচ্চ ব্র্যান্ড ইক্যুইটির কারণে ব্যবসায়ে সহযোগিতা ও সমর্থন বৃদ্ধি পায় । উদাহরণ হিসেবে, প্রযুক্তি f সম্পর্কিত শিল্পে এ্যাপেল (Apple) ব্র্যান্ডের সর্বোচ্চ ইক্যুইটি ভ্যালু যা প্রায় ২৪১.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার।

চিত্র ৭.৪ বিশ্বের মূল্যবান ব্র্যান্ডসমূহের ২০২০ সালের র‍্যাংকিং অনুযায়ী তথ্য দেওয়া হয়েছে। বিপণনকারীকে ব্র্যান্ড ইক্যুইটি ব্যবস্থাপনা নিতে হয় কারণ এর মাধ্যমে ভোক্তাদের মাঝে ব্র্যান্ডের শক্তিশালী আবেদন সৃষ্টি করা যায় এবং ভবিষ্যতে বিপণনের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।

 

ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ

 

ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ পাঠের সারসংক্ষেপ:

ব্র্যান্ড হলো কোনো চিহ্ন, প্রতীক, নকশা, নাম বা এইসবকিছুর সংমিশ্রণ, যা বিপণনকারী প্রতিযোগী পণ্য বা সেবা থেকে পৃথক করার জন্য ব্যবহার করে। ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করতে পারে। ব্র্যান্ডিং হলো এমন একটি পণ্যকে অন্য কোনো পণ্য থেকে আলাদা করার জন্য সংকেত, চিহ্ন, নাম, প্রতীক, ডিজাইন, বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করার সাথে সম্পৃক্ত সকল কার্যক্রমের সমষ্টি। ব্র্যান্ডিং-এ যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় সেগুলো হলো – ব্র্যান্ডিং, ব্র্যান্ড পৃষ্ঠপোষক, ব্র্যান্ড নাম, ব্র্যান্ড কৌশল ও ব্র্যান্ড পুনঃঅবস্থানগ্রহণ সিদ্ধান্ত । ব্র্যান্ড ও ব্র্যান্ডিং এর মাধ্যমে ভোক্তাদেরকে প্রভাবিত করার জন্য প্রতিষ্ঠান যে সুবিধা ভোগ করে তাকেই ব্র্যান্ড ইক্যুইটি বলে।

১ thought on “ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ”

Leave a Comment