বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতিসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর “বিজ্ঞাপন-বাজেট” ইউনিট ৩ এর অন্তর্ভুক্ত।
বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতিসমূহ
বিজ্ঞাপন বাজেটের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপনখাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবে তা নির্ধারণ করে থাকে। বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন তাই প্রতিটি কোম্পানির জন্যই কৌশলগত সিদ্ধান্ত গুলোর মধ্যে একটি হিসেবে বিবেচিত হয়। একটি সঠিক ও কার্যকর বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন ছাড়া তাই শুধু কোম্পানির বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য অর্জনই ব্যর্থ হয়ে যায় না, বরং কোম্পানির সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনও বাধাগ্রস্থ হয়। প্রতিটি কোম্পানিই কোন না কোন নিয়ম-কানুন মেনে নিজেদের বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করে থাকে।
বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের এই কাজটি চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে। বাজেট প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো তথ্য সংগ্রহ ও বাজেট প্রস্তুতকরণ, বাজেট উপস্থাপনা ও অনুমোদন, বাজেট বাস্তবায়ন এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণ। এই ধাপগুলো যে কোন কোম্পানির বাজেট প্রক্রিয়ার একটি সাধারণ নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করে থাকে। এই ধাপগুলো মোটামুটিভাবে অনুসরণ করে একেকটি কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের পদ্ধতি একেক রকম হয়ে থাকে।
আবার প্রতিটি পদ্ধতিরই কিছু সুবিধা ও অসুবিধা রয়েছে। তাই কোম্পানিগুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করতে হয়। এই পাঠে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের প্রক্রিয়া বর্ণনার পাশাপাশি কিছু ঐতিহ্যগত পদ্ধতি এবং প্রতিটি পদ্ধতির তুলনামূলক সুবিধা ও অসুবিধাগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের প্রক্রিয়া
Procedures for Determining Advertising Budget
বিজ্ঞাপন প্রতিটি কোম্পানির জন্যই একটি অপরিহার্য বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। যেহেতু প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং সম্পদের সংস্থান রয়েছে, সেহেতু প্রতিটি কোম্পানি কী পরিমাণ অর্থ বিজ্ঞাপনের জন্য বরাদ্দ দেবে তা কোম্পানিভেদে আলাদা হয়ে থাকে। বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের কাজটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কোম্পানির উচ্চ ব্যবস্থাপনা স্তরে সম্পাদিত হয় অথবা উচ্চ ব্যবস্থাপনা বিজ্ঞাপন বিভাগকে এই দায়িত্ব দিয়ে থাকে। বিজ্ঞাপন বিভাগ কর্তৃক বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের কাজটি চারটি ধাপে সম্পাদিত হয়ে থাকে। বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের এই প্রক্রিয়াটিকে নিম্নের চিত্রের সাহায্যে সহজে উপস্থাপন করা যায়:

১। তথ্য সংগ্রহ ও বাজেট প্রস্তুতকরণ (Collection of Data and Preparation of Budget): বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে বিজ্ঞাপন বিভাগকে কোম্পানির অন্যান্য বিভাগ থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। বিজ্ঞাপন বিভাগ কোম্পানির অন্যান্য বিভাগের সাথে যোগাযোগ করে কোম্পানির উদ্দেশ্য, বিপণন ও বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য, পণ্যের প্রকৃতি · পণ্য মূল্য গ্রাহকের প্রকৃতি, গ্রাহকের সংখ্যা, গ্রাহকের বিস্তৃতি, বিক্রয়ের পরিমাণ, মুনাফার পরিমাণ, প্রতিযোগিদের বিজ্ঞাপন কৌশল, মাধ্যমের প্রাপ্যতা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সংগ্রহ করে থাকে। কেননা এসব বিষয় বিজ্ঞাপন বাজেটের আকারকে অর্থাৎ বাজেটে কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে সে বিষয়কে প্রভাবিত করে।
এছাড়া বিভিন্ন খাতে যেমন- বাজার অংশ, ভৌগলিক এলাকা, মাধ্যম, সময়ের ব্যপ্তি ইত্যাদি ভেদে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতে পারে তা নির্ধারণ করে যতটা সম্ভব বাস্তবভিত্তিক একটি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রস্তুত করতে হয়। বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক সাধারণত তার অধীনস্থ বিজ্ঞাপন দল ও বিজ্ঞাপনী সংস্থার লোকজনের সহায়তা নিয়ে বাজেট নির্ধারণের বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রস্তুত করে থাকেন।
২। বাজেট উপস্থাপনা ও অনুমোদন (Presentation and Approval of the Budget): বিজ্ঞাপন বাজেট প্রস্তুত হয়ে গেলে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক কোম্পানির উচ্চ ব্যবস্থাপনার কাছে প্রস্তাবিত বাজেট অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন। বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক এই পর্যায়ে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের সময় বাজেটের যৌক্তিকতা, অপরিহার্যতা, প্রয়োজনীতা বা প্রাসঙ্গিকতা ইত্যাদি বিষয় উচ্চ ব্যবস্থাপনার কাছে ব্যাখ্যা করে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন লাভ করার চেষ্টা করেন।
প্রতিষ্ঠানের বাজেট কমিটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তা অনুমোদনের জন্য সুপারিশসহ কোম্পানির উচ্চ ব্যবস্থাপনা বা প্রধান নির্বাহীর কাছে প্রেরণ করেন। কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অন্য কোন নির্বাহী কর্মকর্তা প্রস্তাবিত বাজেটে সন্তুষ্ট হলে তা অনুমোদন দিতে পারেন কিংবা প্রয়োজনীয় সংশোধনী দিতে পারেন। এরপর কাম্য সংশোধনী সংযোজিত হয়ে গেলে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী কর্মকর্তা বাজেটটি বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদন দিতে পারেন ।
৩। বাজেট বাস্তবায়ন (Budget Execution or Implementation): এই পর্যায়ে এসে অনুমোদিত বিজ্ঞাপন বাজেটটি বিজ্ঞাপন বাবদ বিভিন্ন খাতে ব্যয় কার্যকর করার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। বিজ্ঞাপন বাস্তবায়নের দায়িত্ব বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপকের উপরে ন্যস্ত থাকে। বিজ্ঞাপন বাজেট অনুযায়ী নির্দিষ্ট খাতসমূহে যথাযথভাবে অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক বরাদ্দকৃত বাজেটের সর্বোচ্চ কাম্য ব্যবহার নিশ্চিত করে থাকেন। বিজ্ঞাপন ব্যয়ের অনুমোদিত খাতসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিজ্ঞাপনী সংস্থার ফি, মাধ্যমের খরচ, বিজ্ঞাপনের জন্য জায়গা বা সময় কেনার খরচ ইত্যাদি। বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপককে ব্যয়ের ক্ষেত্রে অনুমোদিত সীমা অতিক্রম হয়ে যাচ্ছে কী না, সে ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হয়।
৪। বাজেট নিয়ন্ত্রণ (Control of Budget): বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপে এসে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপককে বিজ্ঞাপন বাজেটের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হয়। সঠিক সময়ে বাজেট নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক এটা নিশ্চিত করেন যে বিজ্ঞাপনের প্রকৃত ব্যয় বিজ্ঞাপন বাজেটে অনুমোদিত ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রয়েছে। বিজ্ঞাপন বাজেট নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলোর মধ্যে রয়েছে-
ব্যয় নিয়ন্ত্রণ: বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান ব্যয়, মাধ্যম ব্যয়, উপকরণ বা সেবা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যয় সীমিত রাখার মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বাজেট নিয়ন্ত্রণ করা যায়। পাশাপাশি পুরো বিজ্ঞাপন কার্যক্রম পরিচালনার বিভিন্ন স্তরে অপচয় রোধ করার মাধ্যমেও বিজ্ঞাপন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
প্ৰতিশ্ৰুতি নিয়ন্ত্রণ: বিজ্ঞাপনী সংস্থা কর্তৃক বিজ্ঞাপন প্রস্তুতকরণ, মাধ্যম নির্বাচন, বিজ্ঞাপন প্রচারের সময় ও ব্যপ্তি নির্বাচন ইত্যাদি পরিস্থিতিতে বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা প্রচারাভিযানের দায়িত্বে থাকা ব্যবস্থাপকের প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমেও বিজ্ঞাপন বাজেট নিয়ন্ত্রণ করা যায় ।
ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ: বিজ্ঞাপন কার্যক্রমের প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য এবং প্রচারাভিযানের মাধ্যমে অর্জিত ফলাফলের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল ও প্রকৃত ফলাফলের মধ্যেকার বৈসাদৃশ্য কমিয়ে আনার মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করে বিজ্ঞাপন বাজেট নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
উপরোল্লিখিত প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করে কোম্পানিগুলো ধাপে ধাপে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে থাকে। তবে সব কোম্পানিই যে এই ধাপগুলোকে একভাবে অনুসরণ করবে, এমনটা নাও হতে পারে। কোম্পানিভেদে বিজ্ঞাপন বাজেটের এই প্রক্রিয়াটির মধ্যেও তাই ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়।
বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের পদ্ধতিসমূহ
Approaches of Determining Advertising Budget
বিজ্ঞাপন প্রচারাভিযান কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণ করাকে বিজ্ঞাপন বাজেট বলে। বিজ্ঞাপন কর্মসূচীর সঠিক প্রণয়ন ও সফল বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বাজেট প্রণয়ন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সঠিক ও যথোপযুক্ত বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ। বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রতিটি কোম্পানিকেই কিছু নিয়ম-কানুন মেনে বাজেট তৈরি করতে হয়। তবে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রতিষ্ঠার তাত্ত্বিক পন্থা খুব কম সময়ই কাজে লাগে। ছোট কোম্পানি গুলোতে তাত্ত্বিক পন্থা গুলো বলতে গেলে কখনই ব্যবহার করা হয় না। বরং ক্রমাগত অনুশীলন এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে উদ্ভাবিত পদ্ধতি গুলোই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য ব্যবহৃত হয়।
G. E Belch and M. A Belch বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের বিভিন্ন পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেছেন যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো:
ক) টপ-ডাউন পদ্ধতি (Top Down Approaches): টপ-ডাউন পদ্ধতিতে কোম্পানির উপরের স্তরে (সাধারণত নির্বাহী স্তরে) বিজ্ঞাপন বাজেটের পরিমাণ নির্ধারিত হয় এবং এরপর বরাদ্দকৃত অর্থ বিভিন্ন বিভাগে পাঠানো হয়। অর্থাৎ, এই পদ্ধতিতে শীর্ষ ব্যবস্থাপকগণ ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেন আর বিজ্ঞাপন বাজেট ঐ সীমার মধ্যেই নির্ধারিত হয়ে যায়। যেহেতু এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট কোম্পানির উপরের স্তরে নির্ধারিত হয়ে তা বাস্তবায়নের জন্য ক্রমশ কোম্পানির নিচের স্তরের দিকে আসতে থাকে, তাই এই পদ্ধতি গুলোকে “টপ-ডাউন” পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। টপ-ডাউন পদ্ধতি অনুসরণ করে প্রণীত বাজেটগুলো মূলত পূর্বনির্ধারিত এবং এসব পদ্ধতির সত্যিকার অর্থে কোন তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই।
এসব পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতি, মনগড়া পদ্ধতি, বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতি, প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতি এবং বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতি ইত্যাদি।
১। সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতি (The affordable method): এই পদ্ধতিতে কোম্পানি তার সামর্থ্য অনুযায়ী বিজ্ঞাপনখাতে ব্যয়ের জন্য বাজেট বরাদ্দ দিয়ে থাকে। অর্থাৎ কোম্পানি তার আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে যে পরিমাণ অর্থ বিজ্ঞাপন বাবদ ব্যয় করতে সক্ষম, সেই পরিমাণ অর্থ বিজ্ঞাপন বাজেটে বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এই পদ্ধতিতে কোম্পানি তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেমন- উৎপাদন, বিক্রয় বা পরিচালন কর্মকাণ্ডে ব্যয় করার পরিমাণ নির্ধারণ করে দেয়। তারপরে কোম্পানি তহবিলে যা অবশিষ্ট থাকে তা বিজ্ঞাপন এবং প্রচারের জন্য বরাদ্দ করা হয়। সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট কোম্পানির আর্থিক সামর্থ্যের উপর ভিত্তি করে একেক বছর একেক রকম হয়ে থাকে।
সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের খুবই সহজ একটি পদ্ধতি;
- কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারিত হয় বলে কোম্পানির উপর আর্থিক চাপ থাকে না;
- পরিবর্তিত আর্থিক সামর্থ্যের পরিমাণ বিবেচনা করে বাজেট প্রণয়ন বা কম-বেশি করা যায় বলে এই পদ্ধতির নমনীয়তা অনেক বেশি;
- কোম্পানি তহবিল পর্যবেক্ষন করে বাস্তবতার নিরিখে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করা হয়;
- ছোট কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি খুবই উপযোগী একটি পদ্ধতি।
সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- বিজ্ঞাপন/প্রচার কার্যক্রম দ্বারা সম্পাদিত কাজটি বা অর্জিত উদ্দেশ্যটি বাজেট প্রণয়নে বিবেচনা করা হয় না বলে কম বা অতিরিক্ত ব্যয়ের সম্ভাবনা থাকে;
- এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন বাজেটের প্রভাব পরিমাপের জন্য কোনও নির্দেশিকা থাকে না;
- এই পদ্ধতির কোন তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই;
- এই পদ্ধতিতে কোম্পানি, বিপণন বা বিজ্ঞাপন উদ্দেশ্য থেকে শুরু করে বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক অন্যান্য উপাদানকে উপেক্ষা করা হয় বলে অনেকাংশেই এই পদ্ধতিটি বাস্তবসম্মত নয়;
- এই পদ্ধতি বিজ্ঞাপনের সৃজনশীলতার সুযোগ হ্রাস করে দেয়।
২। মনগড়া পদ্ধতি (Arbitrary allocation method): মনগড়া পদ্ধতিতে বাজেট প্রতিষ্ঠার জন্য কার্যত কোন তাত্ত্বিক ভিত্তি বিবেচনা করা হয় না এবং বাজেটের পরিমাণ প্রায়শই ব্যবস্থাপকের ক্ষমতা বা হুকুম দ্বারা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ এই পদ্ধতিতে কোম্পানির উদ্দেশ্য, প্রসারের উদ্দেশ্য, অর্থের প্রাপ্যতা, বিক্রয়ের পরিমাণ, মুনাফার পরিমাণ ইত্যাদি কোন কিছুই বিবেচনায় না নিয়ে বিপণনকারী বা বিজ্ঞাপনদাতা তার খেয়াল-খুশি মতো বিজ্ঞাপনের জন্য অর্থ বরাদ্দ দিয়ে থাকেন। মনগড়া পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনদাতা ধরে নেন যে বাজেট নির্ধারণে তার সিদ্ধান্তই সঠিক। তাই এই পদ্ধতিতে নির্ধারিত বিজ্ঞাপন বাজেটের কার্যকারিতা বাজেট প্রণেতার “মনস্তাত্ত্বিক প্রোফাইলের” উপর বহুলাংশেই নির্ভর করে থাকে ।
মনগড়া পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে সহজেই বাজেট প্রণয়ন করা যায়;
- বাজেট প্রণয়নে সময়ক্ষেপন হয় না;
- প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত প্রস্তাবিত বাজেট কম-বেশি করা যায়;
- এই পদ্ধতির নমনীয়তা অনেক বেশি;
- ছোট কোম্পানি এবং অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের জন্য এটি উপযোগী হতে পারে।
মনগড়া পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতির কোন তাত্ত্বিক ভিত্তি নেই;
- এই পদ্ধতিতে কোম্পানির উদ্দেশ্য, প্রসারের উদ্দেশ্য, অর্থের প্রাপ্যতা, বিক্রয়ের পরিমাণ, মুনাফার পরিমাণ ইত্যাদি উপাদানকে উপেক্ষা করা হয় বলে এই পদ্ধতিটি অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত নয়;
- এই পদ্ধতিতে প্রনীত বাজেট অযৌক্তিক হারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি ঘটাতে পারে;
- অনেক বিজ্ঞাপন বিশেষজ্ঞের মতে মনগড়া পদ্ধতি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের কোন পদ্ধতিই নয়।
৩। বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতি (Percentage of sales method): বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পদ্ধতি হলো বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে কোম্পানির বিক্রয়ের শতকরা হার হিসেবে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। অধিকাংশ বড় বড় কোম্পানিই বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতি অনুসরণ করে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য তিনটি আলাদা পন্থা অবলম্বন করা যায়। যথা:
১. অতীত বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতিতে বিগত কয়েক বছরের পণ্য বিক্রির গড় বের করে কিংবা সোজাসুজি গত বছরের বিক্রয়ের পরিমাণের শতকরা একটি নির্দিষ্ট হারে বিজ্ঞাপনখাতে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়। যেমন- কোম্পানির গত বছরের বিক্রি ১ লক্ষ টাকা হলে তার উপর ১০% হারে অর্থাৎ ১০ হাজার টাকা বিজ্ঞাপন খরচ হিসেবে বরাদ্দ দিতে পারে।
২. ভবিষ্যত বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতিতে কোম্পানি আগামী বছরের সম্ভাব্য বিক্রয়ের উপর শতকরা একটি নির্দিষ্ট হারে বিজ্ঞাপনখাতে অর্থ বরাদ্দ দিতে পারে। যেমন- কোম্পানি আগামী ১ বছরের জন্য সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ ১ লক্ষ টাকা হলে তার উপর ১৫% হারে অর্থাৎ ১৫ হাজার টাকা বিজ্ঞাপন খরচ হিসেবে বরাদ্দ দিতে পারে।
৩. সংযুক্ত বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতিতে কোম্পানি তার অতীত বিক্রয়ের শতকরা হার এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যত বিক্রয়ের শতকরা হারের গড়ের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন বাবদ অর্থ বরাদ্দ করে থাকে। যেমন- কোম্পানির গত বছরের বিক্রি ১ লক্ষ টাকা হলে তার উপর ১০% হারে অর্থাৎ ১০ হাজার টাকা এবং আগামী ১ বছরের জন্য সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ ১ লক্ষ টাকা হলে তার উপর ১৫% হারে অর্থাৎ ১৫ হাজার টাকার গড় অর্থাৎ ১০হাজার+১৫ হাজার = ২৫ হাজার / ২ = ১২,৫০০টাকা হবে সংযুক্ত বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতিতে কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেট ।
- এটি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের খুব সহজ একটি পদ্ধতি;
- এই পদ্ধতিতে বিক্রয় বাড়লে বাজেট বাড়ে এবং বিক্রয় কমলে বাজেট কমে বলে এই পদ্ধতির নমনীয়তা অনেক বেশি এই পদ্ধতি আর্থিকভাবে নিরাপদ এবং বিজ্ঞাপন ব্যয়ের উপর যৌক্তিক সীমা নির্ধারণে সাহায্য করে;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণে জটিল হিসাব-নিকাশের প্রয়োজন হয় না বলে সহজে বাস্তবায়নও করা যায়;
- বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতিতে প্রণীত বিজ্ঞাপন বাজেট মোটামুটি স্থিতিশীল হয়ে থাকে।
বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে কোম্পানির উদ্দেশ্য, প্রসারের উদ্দেশ্য, প্রতিযোগী কর্মকাণ্ড, বাজারের প্রকৃতি ইত্যাদি উপাদানকে উপেক্ষা করা হয় বলে এই পদ্ধতিটি অনেকক্ষেত্রেই বাস্তবসম্মত নয়;
- অতীত বিক্রয়কে ভিত্তি করে প্রণীত বাজেট ভবিষ্যতের বাজার ব্যবস্থায় অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে;
- ভবিষ্যত বিক্রির পূর্বানুমান খুব কঠিন বলে এই পদ্ধতিতে প্রণীত বাজেট ভিত্তিহীন হয়ে পড়তে পারে;
- নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা খুবই কঠিন;
- বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনকে বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা না করে ব্যয় বা খরচ হিসেবে বিবেচনা করা হয় যার ফলে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ সুবিধা নেওয়া বাধাগ্রস্থ হয়।
৪। প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতি (Competitive parity method): প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনদাতা বা বিপণনকারীরা প্রতিযোগিদের বিজ্ঞাপন ব্যয়ের সাথে মিল রেখে নিজেদের বিজ্ঞাপন বাজেটের পরিমাণ নির্ধারণ করে থাকেন। অর্থাৎ, প্রতিযোগী কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন বাবদ যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করে, তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে কোম্পানিও প্রায় একই পরিমাণ অর্থ বিজ্ঞাপন বাজেটে বরাদ্দ দেয়। এই পদ্ধতিতে বাজেট প্রণয়নের যুক্তি হলো এই পদ্ধতিতে বাজেট নির্ধারণে ইন্ডাস্ট্রি বা শিল্পের সম্মিলিত প্রজ্ঞার সুবিধা নেওয়া সম্ভব হয়।
প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো-
- এটি প্রতিযোগিতাকে বিবেচনায় নেয় বলে বিপণন যুদ্ধকে কমিয়ে বাজারকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যায়;
- প্রতিযোগীদের বিজ্ঞাপন বাজেটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাজেট প্রণীত হয় বলে এটি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের খুব সহজ একটি পদ্ধতি;
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বাজেট অস্বাভাবিক বা অবাস্তব বিজ্ঞাপন খরচ কমিয়ে দেয়;
- অন্যান্য কোম্পানির বাজেটের সাথে মিল রেখে এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা যায় বলে প্রণীত বাজেট অনেক বেশি যথোপযুক্ত ও আদর্শ হয়ে থাকে;
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বাজেটের নমনীয়তা অনেক বেশি হয়ে থাকে ।
প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- এক কোম্পানির উদ্দেশ্য বা কর্মপন্থার সাথে অন্য কোম্পানির উদ্দেশ্য বা কর্মপন্থার মিল না থাকায় একই পদ্ধতি অনুসরণ করে বাজেট প্রণয়ন করাটা অযৌক্তিক;
- অন্য কোম্পানির বিজ্ঞাপন ব্যয়ের ধরণকে অনুসরণ করা হয় বলে এই পদ্ধতি বিজ্ঞাপনের সৃজনশীলতার সুযোগ হ্রাস করে দেয়;
- প্রতিযোগীদের বিজ্ঞাপন কৌশল যে কোন সময় পরিবর্তন হয়ে গেলে কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেট অকার্যকর প্রমাণিত হয়ে যেতে পারে;
- প্রতিযোগী কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেট অপর্যাপ্ত হলে কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেটও অপর্যাপ্ত হয়ে যায়;
- বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা বা প্রেক্ষাপট ভিন্ন হওয়ায় এক কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেট অন্য কোম্পানির কাছে গ্রহনযোগ্য হয় না বলে সামগ্রিকভাবে এই পদ্ধতির গ্রহনযোগ্যতা কম ।

৫। বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতি ( Return on investment method): বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন বা রির্টান অন ইনভেস্টমেন্ট (ROI) পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনকে বিনিয়োগ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই পদ্ধতিতে বিশ্বাস করা হয় যে বিজ্ঞাপনের ফলে বিক্রয় বৃদ্ধি পায়। প্রান্তিক বিশ্লেষণ এবং এস-আকৃতির বক্ররেখা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, বিজ্ঞাপনে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ বিক্রয় বৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করে। ফলে বিজ্ঞাপনে নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ রির্টান অর্জন করার আশা করা হয়। এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেটের বরাদ্দ বিনিয়োগ হিসেবে কোম্পানিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ আয়ের দিকে নিয়ে যায়।
বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয় বলে একে বিক্রয় বৃদ্ধির কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন ব্যয়ের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা সহজ হয়;
- বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতিতে প্রণীত বিজ্ঞাপন বাজেট মোটামুটি স্থিতিশীল হয়ে থাকে।
বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতির কোন তাত্ত্বি ভিত্তি নেই বলে এটি বিজ্ঞান সম্মত নয়;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা তুলনামূলকভাবে জটিল;
- বিজ্ঞাপন প্রচেষ্টার মাধ্যমে কি পরিমাণ রির্টান পাওয়া যাবে তা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন বলে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণে বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতি বাস্তবে প্রয়োগ করা সময়সাপেক্ষ;
- এই পদ্ধতি বিজ্ঞাপনখাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়নে বাঁধার সৃষ্টি করে।
খ) বিল্ড-আপ পদ্ধতি (Build-Up Approaches): টপ-ডাউন পদ্ধতিতে প্রণীত বিজ্ঞাপন বাজেটের প্রধান ত্রুটি হলো যে এই বিচারমূলক পদ্ধতিগুলো পূর্বনির্ধারিত বাজেট বরাদ্দের দিকে নিয়ে যায় যা প্রায়শই কোম্পানি এবং বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য এবং সেগুলো অর্জন করার জন্য পরিকল্পনা করা কৌশলগুলোর সাথে মিলে না। তাই একটি কোম্পানির জন্য অধিক কার্যকর বিজ্ঞাপন বাজেটের কৌশল হবে কোম্পানির যোগাযোগের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্যগুলোকে অর্জনের জন্য যা প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হয়, বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের সময় তা বিবেচনা করা।
তাই বিল্ড-আপ পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোম্পানির বিপণন উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে সেগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রাক্কলন করে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বিল্ড-আপ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতি, পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতি, পরিমাণগত মডেলিং পদ্ধতি ইত্যাদি।
১। উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতি (Objective and task method): উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতিতে উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং বাজেট প্রণয়ন কর্মকান্ড ক্রমানুসারে না হয়ে যুগপৎ ভাবে চলে। কেননা কোম্পানির সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য মাথায় না রেখে একটি বাজেট প্রতিষ্ঠা করা যেমন কঠিন তেমনি কত টাকা পাওয়া যাবে তা বিবেচনা না করে লক্ষ্য নির্ধারণের কোন মানেই হয় না। উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতিতে কোম্পানির উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে সেই উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য যেসব বিজ্ঞাপন কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন তা চিহ্নিত করে সেসব কার্যক্রমের জন্য যে রকম ব্যয় হতে পারে তার ভিত্তিতে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটি কোম্পানি তার লক্ষ্যস্থিত বাজারের X শতাংশের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য একটি নূন্যতম বাজেটের পরিমাণ প্রয়োজন হবে এবং কোম্পানিকে অবশ্যই এই পরিমাণ ব্যয় করতে ইচ্ছুক হতে হবে। বাজেট নির্ধারণের উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতি তিনটি ধাপের সমন্বয়ে একটি বিল্ড-আপ পদ্ধতি ব্যবহার করে:
১. বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্যগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা;
২. উদ্দেশ্যগুলো অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট কৌশল এবং কাজগুলো নির্ধারণ করা; এবং
৩. কাজগুলো সম্পাদনের জন্য সংশ্লিষ্ট খরচগুলো অনুমান করা ।
উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো-
- এটি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের বিজ্ঞানসম্মত একটি পদ্ধতি;
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বাজেট সর্বোৎকৃষ্ট ও যৌক্তিক হিসেবে বিবেচিত হয়;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য অর্জনের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়;
- নতুন পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নে এই পদ্ধতি অধিক কার্যকর;
- উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণীত হলে অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হয়।
উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- কোন উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য কোন কাজটি সম্পাদন করা উচিৎ, অনেক ক্ষেত্রেই তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা খুবই জটিল;
- বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য ও কাজগুলোকে সংজ্ঞায়িত করা বেশ সময়সাপেক্ষ;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য বিজ্ঞাপনদাতার পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতা প্রয়োজন;
- কোম্পানির আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকলে উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতিতে পর্যাপ্ত অর্থ বিজ্ঞাপন বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয় না ।

২। পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতি (Payout planning): একটি নতুন পণ্যের প্রবর্তনের প্রথম মাসগুলোতে সাধারণত উচ্চ স্তরের সচেতনতা এবং পরীক্ষামূলক ব্যবহারকে উদ্দীপিত করার জন্য স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বিজ্ঞাপন বরাদ্দের প্রয়োজন হয়। একটি নতুন পন্য সফলভাবে প্রবর্তন করার জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞাপন ব্যয় ও বিক্রয়ের পরিমাণের আনুপাতিক গড় হার হলো প্রায় ১.৫:২।
এর অর্থ হলো যে, একটি নতুন পণ্য প্রবর্তনের সময় কাঙ্ক্ষিত বাজার শেয়ারের প্রায় দ্বিগুণ অর্থ বিজ্ঞাপন বাবদ খরচ করা উচিৎ। যেমন- গবেষণায় উঠে এসেছে যে খাদ্য শিল্পে মোট বিজ্ঞাপন খাতের ৩৪ শতাংশ ব্যয় করে ১২.৬ শতাংশ বাজার শেয়ার অর্জন করা যায়। এখন বিজ্ঞাপনের জন্য কতটা ব্যয় করতে হবে তা নির্ধারণ করার জন্য বিপণনকারীরা প্রায়শই একটি পে-আউট পরিকল্পনা তৈরি করে থাকেন যা বিজ্ঞাপন এবং প্রচারের সুবিধার বিনিয়োগ মূল্য নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, রির্টানের প্রত্যাশিত হারের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন বাবদ কতটা ব্যয় প্রয়োজনীয় হবে এবং কখন রির্টান প্রত্যাশিত হতে পারে তা নির্ধারণ করতে পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতির সুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বিজ্ঞাপন বাজেটের মাধ্যমে বাজারে প্রত্যাশিত ইম্প্যাক্ট অর্জন করা যায়;
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বিজ্ঞাপন বাজেট তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল হয়ে থাকে;
- পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতিতে যে বাজেট প্রণয়ন করা হয় তা মূলত নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে কোম্পানির ব্যয়ের নির্দেশিকার প্রতিফলন।
পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতির অসুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বাজেটের নমনীয়তা কম হয়;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন বেশ জটিল;
- বাজার শেয়ার অর্জন করার চেয়ে ধরে রাখা কঠিন বলে বিজ্ঞাপন ব্যয় বাজারের শেয়ারের সাথে সাথে দ্রুত কম- বেশি করার প্রয়োজন হয় বলে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা সীমিত হয়ে থাকে।
৩। পরিমাণগত মডেল (Quantitative models): পরিমাণগত মডেল বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সংযোজন। তবে কাগজে কলমে এই ধরণের মডেলের ব্যবহার থাকলেও বাস্তবিক ক্ষেত্রে কোন কোম্পানিই এসব মডেল ব্যবহার করতে চায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিগুলো কম্পিউটার সিমুলেশনের সাহায্যে কিংবা পরিসংখ্যানগত কৌশল বা উপায় যেমন- computer simulations, multiple regressions ইত্যাদিকে কাজে লাগিয়ে কোম্পানির বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করে থাকে।
পরিমাণগত মডেলগুলোর সুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞানসম্মত বিভিন্ন উপায়ে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা হয়;
- পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণীত হয় বলে প্রাপ্ত বাজেট তুলনামূলক নির্ভুল হয়;
- এই পদ্ধতিতে প্রণীত বাজেটের নমনীয়তা বেশি থাকে।
পরিমাণগত মডেলগুলোর অসুবিধাগুলো হলো-
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা খুবই জটিল;
- বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য আধুনিক কম্পিউটার ও সফটওয়্যার প্রয়োজন হয়, যা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ;
- এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য প্রযুক্তিগত দক্ষতা আবশ্যক ।
গ) অন্যান্য পদ্ধতি (Other approaches): Belch and Belch বর্ণিত উপরের পদ্ধতিসমূহ ছাড়াও বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য কোম্পানিগুলো আরও কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে। যেমন-
১। মুনাফা পরিকল্পনা পদ্ধতি (Profit planning method): এই পদ্ধতিতে প্রত্যাশিত মুনাফার পরিমাণের উপর ভিত্তি করে বিজ্ঞাপন বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে। মুনাফার পরিমাণ বাড়লে বিজ্ঞাপন বাজেটও বাড়বে, মুনাফার পরিমাণ কমলে বিজ্ঞাপন বাজেটও কমে যাবে।
২। গো-ফর-ব্রোক পদ্ধতি (Go for broke method): এই পদ্ধতিতে এমনভাবে বিজ্ঞাপন বাজেটের পরিমাণ নির্ধারিত হয় যাতে বিজ্ঞাপন বাবদ বরাদ্দ পাওয়া প্রতিটি টাকাই শুধুমাত্র বিজ্ঞাপনের জন্যই ব্যয় করা সম্ভব হয় এবং প্রতিটি টাকাই কোম্পানির জন্য বিক্রয় বৃদ্ধির মাধ্যমে মুনাফা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে ।
৩। একক প্রতি বিক্রয় পদ্ধতি (Per unit sales method): এই পদ্ধতিতে প্রতি একক পণ্যের বিক্রয়মূল্যের উপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট হার ধরে বিজ্ঞাপন বাজেট বরাদ্দ করা হয়। পণ্যের একক মূল্য বেশি হলে সাধারণত এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করা যায়।
৪। প্রয়োজনমাফিক বরাদ্দ পদ্ধতি (Need based allocation method): এই পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঠিক যে পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, ঠিক সেই পরিমাণ অর্থ বিজ্ঞাপন বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া হয়। এটি বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের খুবই নমনীয় একটি পদ্ধতি।
৫। বিজ্ঞাপনী সংস্থার সুপারিশ ভিত্তিক পদ্ধতি (Appropriation based on recommendations from advertising firm method): এই পদ্ধতিতে কোম্পানি বিভিন্ন বিশেষায়িত বিজ্ঞাপনী সংস্থার পরামর্শ বা সুপারিশের ভিত্তিতে বিজ্ঞাপনের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দিয়ে থাকে।
উপরে উল্লিখিত পদ্ধতিগুলো ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানি পরিস্থিতি ভেদে বিভিন্ন রকম পদ্ধতি যেমন- ইন্ডাস্ট্রি বিশেষজ্ঞদের মতামত ভিত্তিক পদ্ধতি, বিক্রয়কর্মীদের মতামত ভিত্তিক পদ্ধতি, ক্রমবর্ধমান ব্যয় পদ্ধতি, ঐতিহাসিক পদ্ধতি ইত্যাদি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করে থাকে। তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় সতর্কতার সাথে মনে রাখতে হবে যে, সবগুলো পদ্ধতি সব কোম্পানির জন্য সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। তাই কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য উপরের এক বা একাধিক পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুয়ায়ী ব্যবহার করে থাকে ।

সারসংক্ষেপ
প্রতিযোগিতামূলক বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় কোম্পানিগুলোর টিকে থাকার জন্য সঠিক বিজ্ঞাপন কর্মসূচী প্রণয়ন এবং তার ফলপ্রসূ বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর বাজেট প্রণয়ন করা অত্যন্ত জরুরী। একটি সঠিক ও কার্যকর বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করা ছাড়া যেমন কোম্পানির বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য অর্জন ব্যর্থ হয়ে যায়, তেমনি কোম্পানির সামগ্রিক লক্ষ্য অর্জনও সম্ভবপর হয় না। প্রতিটি কোম্পানিই তার নিজস্ব, বিপণন বা বিজ্ঞাপন উদ্দেশ্য, আর্থিক সামর্থ্য, বাজার ও প্রতিযোগিতামূলক অন্যান্য উপাদানকে বিবেচনা করে বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করে নিজেদের বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করে থাকে। বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণের এই কাজটি সাধারণত চারটি ধাপে সম্পন্ন হয়ে থাকে।
বাজেট প্রক্রিয়ার ধাপগুলো হলো তথ্য সংগ্রহ ও বাজেট প্রস্তুতকরণ, বাজেট উপস্থাপনা ও অনুমোদন, বাজেট বাস্তবায়ন এবং বাজেট নিয়ন্ত্রণ। যে কোন কোম্পানি এই ধাপগুলো অনুসরণ করে প্রচলিত বিভিন্ন পদ্ধতিতে তাদের কাম্য বিজ্ঞাপন বাজেট | নির্ধারণ করতে পারে। টপ-ডাউন পদ্ধতিতে কোম্পানির শীর্ষ ব্যবস্থাপকগণ বিজ্ঞাপন খাতে ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেন এবং এরপর বিভিন্ন বিভাগ ঐ সীমার মধ্যেই নিজেদের বিজ্ঞাপন বাজেট নির্ধারণ করে থাকে। এসব পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় পদ্ধতি, মনগড়া পদ্ধতি, বিক্রয়ের শতকরা হার পদ্ধতি, প্রতিযোগিতামূলক সমতা পদ্ধতি এবং বিনিয়োগের প্রত্যাবর্তন পদ্ধতি ইত্যাদি।
অন্যদিকে বিল্ড-আপ পদ্ধতিতে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোম্পানির বিপণন উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে সেগুলোকে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়ের প্রাক্কলন করে বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়ন করা হয়। বিল্ড-আপ পদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্দেশ্য এবং কার্যভিত্তিক পদ্ধতি, পে-আউট পরিকল্পনা পদ্ধতি, পরিমাণগত মডেলিং পদ্ধতি ইত্যাদি। এসব পদ্ধতি ছাড়াও বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য কোম্পানিগুলো আরও কিছু পদ্ধতি ব্যবহার করে থাকে।
যেমন- মুনাফা পরিকল্পনা পদ্ধতি, গো-ফর-ব্রেক পদ্ধতি, এককপ্রতি বিক্রয় পদ্ধতি, প্রয়োজনমাফিক বরাদ্দ পদ্ধতি, বিজ্ঞাপনীসংস্থার সুপারিশ ভিত্তিক পদ্ধতি, বিশেষজ্ঞদের মতামত ভিত্তিক পদ্ধতি, বিক্রয়কর্মীদের মতামত ভিত্তিক পদ্ধতি, ক্রমবর্ধমান ব্যয় পদ্ধতি, ঐতিহাসিক পদ্ধতি ইত্যাদি। প্রতিটি পদ্ধতিরই নিজস্ব কিছু সুবিধা-অসুবিধা রয়েছে। কোম্পানিগুলো তাই বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের জন্য উপরের পদ্ধতিগুলো থেকে | সুবিধাজনক এক বা একাধিক পদ্ধতি পরিস্থিতি অনুযায়ী বেছে নিতে পারে ।

১ thought on “বিজ্ঞাপন বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া এবং পদ্ধতিসমূহ”