পণ্য জীবনক্র আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “পণ্য, সেবা ও ব্র্যান্ড” ইউনিট ৬ এর অন্তর্ভুক্ত।

পণ্য জীবনক্র
পণ্য জীবনচক্র ( Product Life Cycle) কী?
নতুন পণ্য বাজারের আনয়নের পর বিপণনকারী বা উৎপাদনকারী চাই যে পণ্যটি বাজারে দীর্ঘস্থায়ী ও সর্বোচ্চ মুনাফা লাভ করুক। কোনো পণ্যই আজীবন বাজারে টিকে থাকে না। তাই বিপণনকারী নির্দিষ্ট সময়সীমার বা পণ্যের জীবনচক্রের মাঝে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনে সচেষ্ট হয়। পণ্যের জীবনচক্র বলতে একটি পণ্যের বাজারে টিকে থাকা পর্যন্ত বিক্রয় এবং মুনাফার ভিত্তিতে উত্থান-পতনের যে ধাপগুলো অতিক্রম করে থাকে তাকে বোঝানো হয়। যেকোনো পণ্য প্রথমে বাজারে প্রবেশ করে ধীরে ধীরে প্রবৃদ্ধি লাভ করে।
একসময় পূর্ণতা পায় এবং একটা পর্যায়ে ক্রমে বাজার থেকে বিলীন হয়ে যায়। প্রতিটি পণ্যের জীবনচক্রের ধারা একই রকম হয় না এবং চক্রের বিভিন্ন ধাপে পরিবর্তনের সাথে বিক্রয় মুনাফা এবং প্রতিযোগিতার গতিপথও পরিবর্তিত হয়ে থাকে । পণ্যের জীবনচক্রের ধাপসমূহ নিচে চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হলো ।

১. পণ্যের উন্নয়ন স্তর ( Product Development) :
নতুন পণ্য ধারণা সংগ্রহ এবং নির্বাচন থেকে পণ্যের জীবনচক্র শুরু হয়। নির্বাচিত ধারণা থেকে নতুন পণ্য উন্নয়ন কর্যক্রম সাধারণত এ পর্যায়ে পরিচালিত হয়। বিপণনকারী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান পণ্য উন্নয়ন ধাপে উচ্চমাত্রয় বিনিয়োগ করে থাকে।
২. সূচনা বা (Introduction stage):
এ পর্যায়ে নতুন পণ্য বাজারে উপস্থাপন করা হয় এবং সচেতনতামূলক বিপণন ও অন্যান্য প্রসারমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্রেতাদের পণ্যে চাহিদা বৃদ্ধি, পরিচিতিকরণ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বিপণনের দৃষ্টিতে এটাই পণ্যের জীবনচক্রের প্রথম ধাপ। সূচনা স্তরে পণ্যের বিক্রয় এবং মুনাফার হার খুবই সামান্য থাকে এবং তুলনামূলকভাবে বিপণন, উৎপাদন, প্রসার ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বেশি হয়। ভোক্তা আকর্ষণ সৃষ্টি এবং বণ্টন প্রণালিতে পণ্যের ধারণার নিশ্চয়তা করাই মূল কাজ হিসেবে গণ্য হয়।
৩. প্রবৃদ্ধি বা উন্নতি স্তর (Grawth stage):
সূচনা স্তরের পণ্য এবং পণ্য আকর্ষণ সৃষ্টির মাধ্যমে ভোক্তারা পণ্য ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়। বিপণনকারীর পণ্য যদি ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জনে সক্ষম হয় তখন উক্ত পণ্য প্রবৃদ্ধি স্তরে প্রবেশ করে। এ পর্যায়ে পণ্যের বিক্রয় এবং মুনাফার বৃদ্ধির সাথে সাথে নতুন নতুন প্রতিযোগিতা মোকাবিলা এবং সর্বোচ্চ মুনাফা নিশ্চিতকরণে বিপণনকারী নতুন নতুন কৌশল ব্যবহার করে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা (Competitive advantage) অর্জনে সচেষ্ট হয়ে থাকে।
৪. পূর্ণতা বা পরিণত স্তর (Maturity stage):
পূর্ণতা স্তরে পণ্যের প্রবৃদ্ধির হার হ্রাস পেতে থাকে এবং বিক্রয় ও মুনাফার পরিমাণ সার্বাধিক হয়। প্রতিযোগীদের আধিক্য, নতুন নতুন পণ্য কৌশল দ্বারা আক্রমণ এবং পণ্যের অব্যাহত গুণগত মানের চাহিদার ফলে একপর্যায়ে পূর্ণতা স্তরের পণ্যের বিক্রয় এবং মুনাফা পরিমাণ কমতে থাকে । এক্ষেত্রে বিপণনকারী পণ্য তুলে নেওয়ার চিন্তা-ভাবনা করে থাকে ।

৫. পতন স্তর (Decline stage):
পণ্যের জীবনচক্রের সর্বশেষ ধাপ হলো পতন স্তর বা Decline stage। পূর্ণতা স্তর থেকে পণ্যের বিক্রয় এবং মুনাফার হার কমতে থাকে এবং এ পর্যায়ে এসে পণ্য সংক্রান্ত ব্যয় প্রতিষ্ঠানের জন্য অলাভজনক হয়ে পড়ে । অনেক ক্ষেত্রে নতুন কৌশল ও ব্যবস্থাপনার পর ও পণ্যের বিলীনতা রোধ করা সম্ভব হয় না এবং একপর্যায়ে পণ্য বাজার থেকে বিলীন হয়ে যায়।
উপরোক্ত অলোচনা থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, বিপণনকারীকে পণ্যের স্থায়িত্ব ধরে রাখা এবং সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের নিমিত্তে সর্বদা পণ্য ভ্যালু সর্বোচ্চকরণ এবং নতুন নতুন ভোক্তা কৌশল প্রয়োগ করতে হবে।
পেয়াঁজ গুড়া মোড়কজাত করার নতুন প্রযুক্তি
বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মাসুদ আলম ১৮ ধরনের মসলার গুঁড়া, স্পাইস কিংবা পেস্ট বা সস- আচার ইত্যাদি তৈরি ও মোড়কজাত করার নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন। মসলাগুলো হচ্ছে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, রসুন, আদা ও অলস্পাইসের ( চায়নিজ মসলা) গুঁড়া, কাঁচা মরিচের পেস্ট ও আচার, শুকনা মরিচের আচার ও সস, কাঁচা মরিচ খাদ্যজাতকরণ, রসুনের আচার, কেচাপ ও চাটনি, আদার আচার ও জ্যাম, হলুদের পেস্ট, অলস্পাইসের পেস্ট এবং অ্যানাটো পাউডার।
প্রাণ গ্রুপসহ নামীদামি কিছু কোম্পানি ইতিমধ্যে মো. মাসুদ আলমের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের মসলার গুঁড়া, পেস্ট, সস, আচার ইত্যাদি বিপণনে আগ্রহ দেখিয়েছে। ভোক্তা পর্যায়েও এসব পণ্য তৈরি ও সংরক্ষণ করে ব্যবহার করা যাবে বলে জানান মাসুদ আলম। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভোক্তা পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলে তাতে দেশে মসলার অপচয় ও আমদানি নির্ভরতা কমবে। মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা বলছেন, পেঁয়াজ একটি পচনশীল পণ্য। দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশ অপচয় হয়। আমদানি করা পেঁয়াজে অপচয়ের হার ৫ থেকে ৭ শতাংশ ।
মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলার পর তা প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে গুঁড়া কিংবা স্লাইস করে সংরক্ষণ করা সম্ভব হলে অপচয় রোধ করা সম্ভব। কারণ, প্রক্রিয়াজাত পেঁয়াজ দুই-তিন বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যাবে। এতে পণ্যটির ঘাটতি ঠেকানো ও আমদানিনির্ভরতা কমানো সম্ভব। শুধু তাই নয় পেঁয়াজগুঁড়া ব্যবহার-বান্ধব, স্বাদ ও গুণগত মানও অক্ষুন্ন থাকে। একইভাবে রসুন, কাঁচা মরিচ, আদাসহ অন্য মসলার অপচয়ও রোধ করা সম্ভব। দেশে সংরক্ষণের অভাবে যে মসলা অপচয় হয়, তা উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও পদ্ধতি ব্যবহার করে পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচ, আদার মতো মসলা গুঁড়া করার মাধ্যমে রোধ করা সম্ভব। এরফলে কৃষকের ন্যায্য দাম পাওয়াও নিশ্চিত হবে ।

সারসংক্ষেপ
পণ্যের জীবনচক্র বলতে একটি পণ্যের নির্দিষ্ট সময়ের সাথে বিক্রয় এবং মুনাফার পরিবর্তনকে বোঝায়। প্রতিটি পণ্যের | জীবনচক্রের মূলত পাঁচটি ধাপ এবং প্রতিটি ধাপে এর বিক্রয় এবং মুনাফার উত্থান ও পতন পরিলক্ষিত হয়। যথা: পণ্যের উন্নয়ন, পণ্য সূচনা, প্রবৃদ্ধি, পূর্ণতাপ্রাপ্তি ও পতন স্তর ।
