খুচরা ব্যবসায় ও খুচরা ব্যবসায়ীর বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “বিপণন বা বণ্টন প্রণালি, খুচরা ব্যবসায়, পাইকারী ব্যবসায়” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

খুচরা ব্যবসায় ও খুচরা ব্যবসায়ীর বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ
খুচরা ব্যবসায় ও খুচরা ব্যবসায়ী [ Retailing and Retailers ]:
খুচরা ব্যবসায় ও খুচরা ব্যবসায়ী (Retailing and Retailers) বণ্টন প্রণালির মধ্যে ভোক্তার সবচেয়ে নিকট খুচরা ব্যবসায়ী অবস্থান করে। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে খুচরা ব্যবসায়ীরাই ভোক্তার সাথে যোগসূত্র স্থাপনের প্রধান ভিত্তি। উৎপাদনকারী বা অন্য উৎস হতে পণ্য ক্রয় করে চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট পৌঁছে দেওয়া সংক্রান্ত কার্যাবলিকে খুচরা ব্যবসায় বা Retailing বলে। যে ব্যক্তি খুচরা ব্যবসায়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করে তাকে খুচরা ব্যবসায়ী বা Retailer বলে। বাংলাদেশে স্বপ্ন, আগোরা, টপটেন ইত্যাদি নামকরা খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। খুচরা ব্যবসায়ীর কার্যাবলির মাঝে পণ্য বিক্রয়, পরিবহন, সংরক্ষণ, অর্থ সংস্থান, ঝুঁকি গ্রহণ, বাজার তথা সরবরাহ পণ্য ফেরত গ্রহণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
খুচরা ব্যবসায়ের শ্রেণিবিভাগ [ Types of retailers ]:
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান যেকোন আয়াতনের হতে পারে। ভোক্তার আবাসস্থলের পাশে ছোট মুদি দোকান থেকে স্বপ্নের বিশাল বিক্রয় শাখাও এর অন্তর্ভুক্ত। খুচরা ব্যবসায়ের ধরন বিভাজনে সেবা প্রদানের ধরন, পণ্য সারির দৈর্ঘ্য ও গভীরতা, তুলনামূলক মূল্য গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায়কে ভাগ করা হয়, যা নিচে আলোচনা করা হলো-
ক. সেবার পরিমাণভিত্তিক খুচরা ব্যবসায় (Amount of service ) :
ভিন্ন ভিন্ন পণ্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরিমাণ সেবার প্রয়োজন হয়। তাই সেবার পরিমাণ ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায়কে তিন ভাগে ভাগ করা হয় । যথা:
১. স্ব-সেবা খুচরা ব্যবসায় (Self service retailers):
যে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে চূড়ান্ত ভোক্তাদের নিজের প্রয়োজনীয় পণ্য নিজেকে খুঁজে বের করে ক্রয়ের জন্য নির্বাচন করতে হয় তাকে স্ব-সেবা খুচরা ব্যবসা বলে। যেমন: সুপার মার্কেট হলো স্ব-সেবা খুচরা ব্যবসায় ।
২. সীমিত সেবা খুচরা ব্যবসায় (Limited service retailers):
যে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান চূড়ান্ত ভোক্তাদের কতিপয় নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেবা প্রদান করে তাকে সীমিত সেবা খুচরা ব্যবসায় বলে। যেমন: সিয়ার্স (Sears), জেসি পেনি (JC Penny)এ ধরনের খুচরা ব্যবসায়।
৩. পূর্ণ সেবাদানকারী খুচরা ব্যবসায় (Full Service retailers):
যে সকল খুচরা ব্যবসায় চূড়ান্ত ভোক্তাদের প্রয়োজনীয় সকল সেবা প্রদান করে তাদেরকে পূর্ণ সেবাদানকারী খুচরা ব্যবসায় বলে ।

খ. পণ্য সারি ভিত্তিক খুচরা ব্যবসায় (Product lines retailing) :
পণ্য সারির ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায়ীকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যায়। যথা :
১. বিশিষ্ট পণ্যের দোকান (Speciality stores):
যে খুচরা ব্যবসায়ীরা সীমিত পণ্য সারির বৈচিত্র্যময় পণ্যসম্ভার চূড়ান্ত ভোক্তার জন্য উপস্থাপন করে তাকে বিশিষ্ট পণ্যের দোকান বলে ।
২. বিভাগীয় বিপণি (Deparmental stores):
একই দালানে অবস্থিত ও একই মলিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বিভিন্ন পণ্য পৃথক পৃথক বিভাগের মাধ্যমে চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট বিক্রয়ের ব্যবস্থাসংবলিত খুচরা ব্যবসায়কে বিভাগীয় বিপণি বলে। যেমন: Infinity Mega Mall.
৩. সুপার মার্কেট (Super market):
যে বৃহদায়তন খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান খাদ্যজাতীয় পণ্য বিক্রির পাশাপাশি অন্যান্য পণ্য বিক্রয় করে থাকে তাকে সুপার মার্কেট বলে। যেমন: আমেরিকান স্টোর, আগোরা (Agora ), স্বপ্ন (Swapno) ইত্যাদি সুপার মার্কেট।
৪. সুবিধাজনক স্টোরস (Convenience stores):
যে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠনে সীমিত পণ্য সারির উচ্চ মুনাফা অর্জনযোগ্য পণ্য বিক্রয় করা হয় এবং যার অবস্থান সাধারণত আবাসিক এলাকার কাছাকাছি হয় তাকে সুবিধাজনক স্টোরস বলে। যেমন ফ্যামিলি মার্ট (Family Mart), সেভেন-ইলেভেন (7Eleven)।
৫. সুপারস্টোরস (Superstores):
যে বৃহদায়তন খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান সুপার মর্কেটের চেয়ে বড় হয় এবং বৈচিত্র্যময় খাদ্য ও ব্যবহার্য পণ্যের সম্ভার থাকে সেই প্রতিষ্ঠানকে সুপারস্টোরস বলে।
৬. ক্যাটাগরি কিলার (Catagory killer):
যে বিশেষায়িত খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পণ্য সারির বিপুল পণ্যসম্ভার উপস্থাপন করা হয় এবং বিক্রয়কর্মীরা সাধারণত সকল পণ্য সম্পর্কে ব্যাপক ধারণা রাখে তাকে ক্যাটাগরি কিলার বলে । যেমন: আইকিয়া (IKEA), স্পোর্টমার্ট (Sports Mart)ইত্যাদি ক্যাটগরি কিলার।
গ. তুলনামূলক মূল্যের ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায় (Retailing on the basis of related price):
অধিকাংশ খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিক মূল্যের সাধারণ মানের পণ্য ও সেবা ব্যবহার করে থাকে। নিচে তুলনামূলক মূল্যের ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায়ের শ্রেণিবিভাগ বর্ণনা করা হলো-
১. বাট্টা স্টোরস (Discount stores):
যে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে কম মূল্যে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জনের মাধ্যমে অধিক পরিমাণ পণ্য বিক্রির প্রচেষ্টায় নিয়োজিত থাকে তাকে বাট্টা স্টোরস বলে।
২. অফ-প্রাইস খুচরা ব্যবসায়ী (Off-price retailers):
যে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান পাইকারি মূল্যের তুলনায় কম মূল্যে চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট পণ্য বিক্রয় করে তাকে অফ-প্রাইস খুচরা ব্যবসায়ী বলে।
৩. ওয়্যারহাউজ ক্লাব (Warehouse clubs) :
যে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান তার সদস্যদের একটি বিশেষ হারে কমিশন প্রদান করে ওয়্যারহাউজ ক্লাবের নামে মুদি পণ্য, কাপড়, যন্ত্রপাতি বিক্রয় করে তাকে ওয়্যারহাউজ ক্লাব বলে। যেমন: প্রাইসক্লাব, সামস্ হোলসোল ক্লাব হলো ওয়্যারহাউজ ক্লাব ।
ঘ. সংগঠনের ভিত্তিতে খুচরা কারবার (Organization based retailing):
খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান মালিকানার ভিত্তিতে পরিচালিত হলেও কর্পোরেট অথবা চুক্তিভিত্তিক খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। নিচে সংগঠনের ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিবিভাগ দেখানো হলো-
১. বিপণিমালা (Chain stores ) :
যে সকল খুচরা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান একই মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণাধীনে দুই বা ততোধিক শাখার মাধ্যমে যখন একই ধরনের পণ্য বিক্রয় করে তাকে বিপণিমালা বলে ।
স্বেচ্ছামূলক চেইন স্টোরস (Voluntary chain stores ) :
যে সকল খুচরা ব্যবসায়ী পাইকারি বাজারিদের সৌজন্যে সম্মিলিতভাবে পণ্য ক্রয় করে সাধারণভাবে চূড়ান্ত ভোক্তাদের নিকট বিক্রয় করে থাকে তাদের স্বেচ্ছামূলক চেইন স্টোরস বলে ।
সমবায় খুচরা ব্যবসায়ী ( Retailer cooperative):
যে সকল স্বাধীন খুচরা ব্যবসায়ী দলীয়ভাবে কেন্দ্রীয় ক্রয় সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে যৌথভাবে চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট বিক্রয় ও বাজার প্রসারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাকে সমবায় খুচরা ব্যবসায়ী বলে।
২. ফ্রাঞ্চাইজ সংগঠন (Franchise organization) :
যে খুচরা ব্যবসায়ী উৎপাদনকারী, পাইকারি বিক্রেতা, সেবা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদির সাথে একটি চুক্তির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে এক বা একাধিক দোকানের মালিকানা ও পরিচালনার অধিকার লাভ করে তাকে ফ্রাঞ্চাইজ সংগঠন বলে ।
৩. মার্চেন্ডাইজিং একত্রীকরণ (Merchandising conglomerates):
কেন্দ্রীয় মালিকানায় বিভিন্ন খুচরা ব্যবসায়ীর সমন্বয়ে গঠিত কর্পোরেশনকে মার্চেন্ডাইজিং একত্রীকরণ বলে ।
৪. বহুশাখা বিপণি (Multiple stores):
নিজেস্ব মালিকানা ও পরিচালনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে শাখা খুলে উৎপাদনকারী যখন তার উৎপাদিত পণ্যসামগ্রী ভোক্তাদের নিকট বিক্রয় করে তখন তাকে বহুশাখা বিপণী বলে । যেমন: আমাদের দেশে বাটা শু কোম্পনি, ইকরা সিরামিক, সাধনা ঔষধালয় (প্রাঃ) লিঃ ইত্যাদি।
ঙ. বিপণিবিহীন খুচরা ব্যবসায় (Non-stores etailing) :
খুচরা দোকান ছাড়াই যখন ভোক্তার নিকট পণ্য বিক্রয় করা হয় তখন তাকে বিপণিবিহীন খুচরা ব্যবসায় বলে ।
১. সরাসরি বিক্রয় (Direct selling):
ক্রেতার নিকট পণ্যসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তথ্য তুলে ধরে সরাসরি পণ্য বিক্রয় প্রক্রিয়াকে সরাসরি বিক্রয় বা প্রত্যক্ষ বাজারজাতকরণ বলা হয়। যেমন: বিভিন্ন ধরনের অনলাইন শপের মাধ্যমে খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্রেতার নিকট সরাসরি পণ্য বিক্রয় করে।
২. টেলি-মার্কেটিং (Tele-marketing):
টেলিফোনের মাধ্যমে ক্রেতাদের সাথে যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে টেলি- মার্কেটিং বলা হয়।
৩. অটোমেটিক ভেন্ডিং (Automatic Vending):
ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যতীত যন্ত্রের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করার প্রক্রিয়াকে অটোমেটিক ভেন্ডিং বলে । সাধারণত চা, কফি, কোমল পানীয় ইত্যাদি এ পদ্ধতিতে বিক্রয় করা হয়।

খুচরা ব্যবসায়ীর বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ [ Retailer Marketing Decisions ]:
ভোক্তা বা ক্রেতাদের জন্য বিপণনকারীর সার্বক্ষণিক নতুন নতুন বিপণন কৌশল শনাক্তকরণ এবং পরিচালনা করাই মূল কাজ। বিশ্বয়নের এ যুগে প্রথাগতভাবে ভোক্তা সন্তুষ্টি অর্জন এবং ভোক্তা আনুগত্য সৃষ্টি করা অনেক জটিল। ব্যবসায় পরিবেশে নতুন নতুন প্রতিযোগী, বহুশাখা বিপণিবিতান, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ব্যয় সংকোচনের চাপ, অধিক বিক্রয় ও অন্যান্য ও সহায়ক সেবার প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি কারণে খুচরা ব্যবসায় আগের থেকে অনেক বেশি জটিল ও চ্যালেঞ্জিং পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে।
ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধির সাথে সাথে বাজারমূল্য ও পণ্যের গুণগত মান যাচাই এবং পণ্য সংগ্রহের জন্য দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল উৎসের আধিক্য, ভোক্তাদের জন্য সহজ পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। এসব কারণে খুচরা ব্যবসায়ীকে বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ খুব সতর্কতার সাথে অবলম্বন করা বর্তমানে বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীর প্রধান বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো হলো বাজার বিভক্তিকরণ (Segmentation), লক্ষ্যায়ণ (Targeting), স্টোর / দোকান পৃথকীকরণ (Store Difterentiation), অবস্থান তৈরি (Positioning) এবং বিপণন মিশ্রণ সংক্রান্ত (Marketing Mix) কৌশলসমূহ নির্ধারণ।
ক) বিভক্তিকরণ, লক্ষ্যায়ণ, পৃথকীকরণ এবং অবস্থান তৈরীকরণ (Segmentation, Targeting, Difterentiation and Positioning):
খুচরা ব্যবসায়ীর প্রথম কাজ হলো পণ্যের বাজারকে (বর্তমান ও সম্ভাব্য ক্রেতার সন্তুষ্টি) বিভক্তি করে কোন কোন অংশে পণ্য বিক্রয় করবে তার লক্ষ্যায়ণ বা ( Target Market) নির্দিষ্ট করা। একটি পণ্যের লক্ষ্যায়িত বাজারের ওপর ভিত্তি করে খুচরা ব্যবসায়ের পৃথকীকরণ এবং অবস্থান সৃষ্টিকরণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়। লক্ষায়িত ভোক্তাদের চাহিদা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী খুচরা ব্যবসায়ী পণ্য ও সেবা সম্ভার, পণ্য মূল্য বিপণন, দোকানের সাজসজ্জা, অবস্থান, অনলাইন এবং অন্যান্য সাইট ডিজাইন এর বিক্রয় সংক্রান্ত যাবতীয় সিদ্ধান্তসমূহ নির্ধারণ করে।
ভোক্তা প্রয়োজন এবং ভোক্তা সংক্রান্ত বৃত্তান্ত খুচরা ব্যবসায়ীর জন্য গাইডলাইন বা নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। বাজার লক্ষ্যায়ণ সঠিকভাবে না হলে পরবর্তী সিদ্ধান্তসমূহে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। খুচরা ব্যবসায়ীর যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল ভিত্তি হলো সঠিক বাজার লক্ষ্যায়ণ করা এবং নির্দিষ্ট বাজারের প্রয়োজন অনুযায়ী অবস্থান তৈরির জন্য যাবতীয় কার্যাবলির সমন্বয় করা।
খ) বিপণন মিশ্রণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ (Marketing Mix Related Decisions):
১. পণ্যসম্ভার ও সেবার সিদ্ধান্তসমূহ ( Product mix and service related decisions):
খুচরা ব্যবসায়ীর পণ্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহের মধ্যে পণ্যসম্ভার নির্দিষ্টকরণ, সেবার মিশ্রণ এবং দোকানের পারিপার্শ্বিক পরিবেশের উন্নয়ন প্রধান বিবেচ্য বিষয়। পণ্যসম্ভার নির্দিষ্টকরণের ক্ষেত্রে লক্ষ্যায়িত বাজার বা টার্গেট মার্কেটের প্রত্যাশা এবং প্রয়োজনকে প্রধান্য দিতে হবে। ভোক্তারা সবসময় নিত্যনতুন ও উন্নতমানের পণ্য এবং অনলাইনের বদৌলতে আন্তর্জাতিক সহজলভ্যতা প্রত্যাশা করে। এ জন্য পণ্যসম্ভারের গভীরতা এবং প্রস্থ নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, উন্নত গুণগত মান, প্রতিযোগীদের পণ্যসম্ভার ব্র্যান্ড ভ্যালু বিবেচনা করা প্রয়োজন। পণ্যসম্ভারের ভিন্নতার সাথে সাথে প্রয়োজনীয় সেবার মিশ্রণ ব্যবহার করেও খুচরা ব্যবসায়ী ক্রেতা আকর্ষণ তৈরি করতে পারে।
যেমন: ক্রেতাকে নিজ থেকে প্রশ্ন করা, ভালো বিকল্পসমূহ প্রদর্শন, বাসায় পৌছে দেওয়া, পণ্য ফেরত সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুততার সাথে সমাধান করা ইত্যাদি । লক্ষ্যায়িত বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্য সংক্রান্ত সেবার আওতার বাহিরে ও অতিরিক্ত সেবা প্রদান করে ভোক্তার সন্তুষ্টি এবং আনুগত্য সৃষ্টি করা সম্ভব। এছাড়াও খুচরা ব্যবসায়ের স্টোর বা দোকানের পারিপার্শ্বিক উন্নয়নের দিকে নজর দিতে হবে। একজন ভোক্তা দোকানের সাজসজ্জা, মনোরম পরিবেশ ও ঝামেলাপূর্ণ কেনাকাটার ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার প্রদান করে এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় দোকানের সুন্দর পরিবেশের জন্য ভোক্তা বারবার নির্দিষ্ট দোকান থেকে পণ্য ক্রয় করতে উৎসাহিত হয় প্রতিযোগীদের থেকে ব্যয় সাপেক্ষতার পরও। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশে টপটেন ব্র্যান্ডকে উল্লেখ করা যায়। এর বিভিন্ন শাখা মনোরম পরিবেশ, আরামদায়ক ব্যবস্থাপনা, সব ধরনের পণ্যসম্ভার, দক্ষ বিক্রয়কর্মী ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার সমন্বয়ে সাজানো ।
২. মূল্য সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ( Price related decisions):
একজন খুচরা ব্যবসায়ী মূল্য সংক্রান্ত যেকোনো সিদ্ধান্ত অবশ্যই পণ্যের লক্ষ্যায়িত বাজার, ভোক্তার কাছে ব্র্যান্ডের অবস্থান, পণ্য ও সেবা সম্ভারের সহজলভ্যতা, প্রতিযোগী ব্র্যান্ড এবং অর্থনৈতিক পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করতে হয়। পণ্যের মূল্য পরিবর্তনের সাথে ভোক্তা মনোভাব এবং বিক্রয়ের পরিবর্তন সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন হয়।
এছাড়াও পণ্য মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্যসমূহ বিবেচনা করে খুচরা ব্যবসায়ী পণ্য মূল্য নির্ধারণ করে। যেমন: ওয়ালমার্ট (Walmart) , স্বপ্নের ( Swapno) মতো সুপারশপগুলো পণ্যের মূল্যকে বিজ্ঞাপনের অংশ হিসেবে ব্যবহার করে। প্রতিদিন সবচেয়ে কম খরচ’ স্লোগানের মাধ্যমে তাদের স্টোরে ক্রেতা সমাগম বৃদ্ধি এবং ভোক্তা আনুগত্য ধরে রাখার চেষ্টা করে ।
৩. বিপণন প্রসার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ (Promotion related decisions):
প্রাথমিকভাবে খুচরা ব্যবসায়ীর প্রত্যক্ষভাবে প্রসারমূলক কার্যক্রম প্রয়োজন পড়ে না বিপণনকারী বা উৎপাদনকারীর প্রসার কার্যক্রমের জন্য। কিন্তু ব্যবসায়ের ধরন, ভোক্তার চাহিদা, প্রতিযোগীদের কৌশল এবং বাজারে টিকে থাকার জন্য বর্তমান যুগে খুচরা ব্যবসায়ীরা বিজ্ঞাপন প্রদান, বিক্রয় প্রসার, জনসংযোগ প্রত্যক্ষ বিক্রয়কর্মী ব্যবহার এবং প্রত্যক্ষ বিপণন ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে প্রসারমূলক কার্যাবলি সম্পাদন করে।
প্রসারের ক্ষেত্রে লক্ষ্যায়িত বাজার বা Target Market-এর বৈশিষ্ট্য এবং এর বাজারের ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর সর্বোত্তম পন্থা খুঁজে বের করাই প্রধান কাজ। এছাড়া প্রসার সংক্রান্ত কার্যাবলির সামঞ্জস্যতা, ভোক্তা বিভ্রান্তি দূর করা এবং প্রসার সংক্রান্ত ব্যয় থেকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন পদ্ধতি গ্রহণ করাই সর্বোচ্চ মুনাফা তৈরির উপায় হিসেবে গণ্য হয়।
৪. স্থান সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ (Place related decisions):
ব্যবসায়ের জন্য সঠিক অবস্থান নির্ধারণ করা সবচেয়ে জটিল এবং ব্যয়বহুল কাজ। কেননা সঠিক স্থানে দোকান বা স্টোর স্থাপনই ক্রেতা সমাগম বৃদ্ধি এবং আকর্ষণ তৈরি করার সর্বশ্রেষ্ঠ মাধ্যম। খুচরা ব্যবসায়ীরা যেহেতু চূড়ান্ত ভোক্তাদের জন্য পণ্য বিক্রয় করে, তাই নির্দিষ্ট স্থানে স্টোর স্থাপন ক্রেতাদের জন্য সুবিধাজনক স্থান কি না বিবেচনা করে দেখতে হবে। স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভোক্তার অবস্থান, সুবিধা, ব্যয়, অন্যান্য প্রতিযোগীদের অবস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভোক্তা আনুগত্য সৃষ্টি করা, সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন ইত্যাদি বিষয় সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

সারসংক্ষেপ
খুচরা ব্যবসায় ও খুচরা ব্যবসায়ী (Retailing and Retailers) বণ্টন প্রণালির মধ্যে ভোক্তার সবচেয়ে নিকট খুচরা | ব্যবসায়ী অবস্থান করে। ভোগ্য পণ্যের ক্ষেত্রে খুচরা ব্যবসায়ীরাই ভোক্তার সাথে যোগসূত্র স্থাপনের প্রধান ভিত্তি। | উৎপাদনকারী বা অন্য উৎস হতে পণ্য ক্রয় করে চূড়ান্ত ভোক্তার নিকট পৌঁছে দেওয়া সংক্রান্ত কার্যাবলিকে খুচরা খুচরা ব্যবসায় বা Retailing বলে। যে ব্যক্তি খুচরা ব্যবসায়ের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করে তাকে খুচরা ব্যবসায়ী বা Retailer বলে। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায়কে ভাগ করা হয়।
যথা: ক. সেবার পরিমাণভিত্তিক খুচরা ব্যবসায় খ. পণ্য সারি ভিত্তিক খুচরা ব্যবসায় গ. তুলনামূলক মূল্যের ভিত্তিতে খুচরা ব্যবসায় ঘ. সংগঠনের ভিত্তিতে খুচরা কারবার ঙ. | বিপণিবিহীন খুচরা ব্যবসায় ইত্যাদি। খুচরা ব্যবসায়ীকে বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ খুব সতর্কতার সাথে অবলম্বন করতে হয়। খুচরা ব্যবসায়ীর প্রধান বিপণন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো হলো বাজার বিভক্তিকরণ, (Segmentation) ও লক্ষ্যায়ণ, (Targeting) স্টোর/দোকান পৃথকীকরণ, (Store Difterentiation) অবস্থান তৈরি (Positioning) এবং বিপণন | মিশ্রণ সংক্রান্ত (Marketing Mix) কৌশলসমূহ নির্ধারণ ।

