ক্রেতা ভ্যালু ও কৌশলগত পরিকল্পনা

ক্রেতা ভ্যালু ও কৌশলগত পরিকল্পনা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “বিপণন কৌশল ও পরিকল্পনা” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ক্রেতা ভ্যালু ও কৌশলগত পরিকল্পনা

 

ক্রেতা ভ্যালু কী?

What is Customer Value?

বিপণনে ক্রেতা ভ্যালু হলো কোনো পণ্য ভোগ বা ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা। কোনো পণ্য গ্রহণ ও ব্যবহারের বিনিময়ে ক্রেতা কার্যভিত্তিক ও আবেগময়ী সুবিধা পেয়ে থাকে। আবার, সেই পণ্য গ্রহণের জন্য ক্রেতা অর্থ, সময়, শক্তি ইত্যাদি ব্যয় করে। যেমন-ক্রেতা কোনো কলম ক্রয় করে ব্যবহার বা ভোগ করার কার্যভিত্তিক মূল সুবিধা হলো মসৃণভাবে লিখতে পারা। এ সুবিধা অর্জন করার জন্য ক্রেতাকে শক্তি ব্যয় করে দোকানে যেতে হয়েছে, সময় ব্যয় করে কলম পছন্দ করেছে এবং নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে কলমটি ক্রয় করতে হয়েছে। সুতরাং, ক্রেতা ভ্যালু = ক্রেতার সুবিধাসমূহ – ক্রেতার ব্যয়সমূহ।

 

ক্রেতা ভ্যালু

 

ক্রেতা ভ্যালু যেসকল নির্ধারক দিয়ে সাধারণত পরিমাপ করা হয় তা চিত্র নং ২.১ এ দেখানো হলো। বিপণনকারী ভোক্তার প্রয়োজন ও অভাব পূরণের জন্য লাভজনকভাবে ক্রেতাকে ভ্যালু সরবরাহ করে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ক্রেতার সামনে বিভিন্ন পণ্য থেকে নিজের পছন্দমতো পণ্য ক্রয় করার স্বাধীনতা রয়েছে। একারণে বিপণনকারী সঠিক ভ্যালু সৃষ্টি ও সরবরাহ প্রক্রিয়া গ্রহণ করে যেনো ক্রেতার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করতে পারে। বিপণনকারী ভ্যালু সৃষ্টি ও সরবরাহ করার সময় প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সামর্থ্য নির্ধারণ করতে হয় এবং এর পর সঠিক বিপণন কৌশলের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয়।

 

ভ্যালু সরবরাহ প্রক্রিয়া

Value Delivery Process

বিপণন মতবাদ অনুযায়ী, পরিকল্পনার শুরুতে ভোক্তাদের সুবিধা বা ভ্যালুর কথা বিবেচনা করা হয়। চিত্র নং ২.২ এ ভ্যালু সরবরাহ প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেকোনো পণ্য প্রবর্তনের পূর্বে বিপণনকারীকে বাজারের ভিন্নতা অনুযায়ী ক্রেতা বিভাজন করার প্রয়োজন হয়। এরপর যথোপযুক্ত বাজার নির্বাচন এবং ভ্যালুর অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। ক্রেতা বিভাজন, বাজার নির্বাচন ও ভ্যালু অবস্থান তৈরির ওপর ভিত্তি করে ভ্যালু নির্বাচন করা হয়। এ ভ্যালু নির্বাচনের অংশকে কৌশলগত বিপণন বলা হয়। এরপর ভ্যালু প্রদানের জন্য কার্যক্রম শুরু করা হয়। যাকে কার্যপদ্ধতিগত বিপণন বলে।

এ কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে পণ্য ও সেবার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে পণ্য ও সেবা উন্নয়ন, মূল্য নির্ধারণ, উৎস নির্ধারণ করে পণ্য তৈরি এবং ক্রেতার কাছে পণ্য বণ্টন করে সেবা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। ভ্যালু প্রদানের জন্য বিপণনকারীকে অনবরত ক্রেতা ও ভোক্তার সাথে যোগাযোগ করতে হয়। বিপণনকারী বিক্রয়কর্মী, বিক্রয় প্রসার ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ক্রেতা বা ভোক্তার সাথে যোগাযোগ করে ।

 

 

ভ্যালু চেইন

Value Chain

অধিক সন্তোষজনক ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি করার জন্য Michael Porter ভ্যালু শিকলের কথা বলেছেন যা চিত্র ২.৩ নং এ দেখানো হয়েছে। এ ভ্যালু চেইনে পণ্য নকশাকরণ থেকে, উৎপাদন, সরবরাহ এবং সমর্থনমূলক নয়টি কার্যাবলি চিহ্নিত করেছে। এ কার্যাবলি সম্পাদন করার জন্য প্রতিষ্ঠান অর্থ ব্যয় করে। এর মধ্যে প্রাথমিক কাজ রয়েছে ৫টি সেগুলো হলো ইনবাউন্ড লজিষ্টিকস (Inbound logistics) এর মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ করে পণ্য উৎপাদনের কার্য (Operations) করা, এরপর আউটবাউন্ড লজিষ্টিকস (Outbound logistics) ব্যবহার করে পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া।

এর সাথে সাথে বিপণন ও বিক্রয় (Marketing and Sales) কার্যক্রমের মাধ্যমে ক্রেতাকে পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী করা এবং পণ্যের মালিকানা হস্তান্তর করা। সর্বশেষে যথোপযুক্তভাবে সেবা প্রদান (After sales service) করে ক্রেতাকে সন্তুষ্ট করা। ভ্যালু চেইন ৪টি সহযোগী কার্যক্রম সম্পাদন করে সেগুলো হলো ফার্মের অবকাঠামো (Firm’s Infrastructures), মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা (Human Resource Management), প্রযুক্তির উন্নয়ন (Technology Development) ও প্রকিউরমেন্ট (Procurement) বা কাঁচামাল সংগ্রহ। প্রতিষ্ঠান প্রত্যেকটি ভ্যালু সৃষ্টিকারী কাজের খরচ ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করে ও তা উন্নয়নের উপায় খুঁজে বের করে। প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করে প্রতিটি বিভাগ কতটা ভালোভাবে কাজটি সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে সম্পাদন করতে পারছে তার ওপর ।

 

 

মৌলিক সামর্থ্য

Core Competencies

মৌলিক সামর্থ্য বলতে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের এমনসব বৈশিষ্ট্যকে বুঝায় যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে ও বাজার ধরে রাখতে পারে। অর্থাৎ মৌলিক সামর্থ্য হলো কোনো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধার উৎস যা ক্রেতাদেরকে সুবিধা প্রদানে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখে, এ সামর্থ্যের কারণে বৈচিত্র্যময় বাজারে প্রবেশ করতে সুবিধা হয় এবং প্রতিযোগীদের পক্ষে অনুকরণ করা কঠিন হয়। যেমন- অ্যাপেল ইনক্ (Apple Inc.) এর উদ্ভাবনী দক্ষতা ও প্রযুক্তিতে অনন্য পারদর্শীতার কারণে আইফোন, আইপ্যাড, আইপড, অ্যাপেল টিভি ইত্যাদি পণ্য বাজারে নিয়ে এসেছে।

তাদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে পণ্য ভোক্তার কাছে সরবরাহ করা। এ জন্য এ প্রতিষ্ঠান ক্রেতাদেরকে তাদের পণ্য সম্পর্কে ধারণা দেয় এইভাবে ‘ভিন্নভাবে চিন্তা করুন (Think Differently)। অ্যাপেলের প্রযুক্তিতে পারদর্শীতা, বিশেষজ্ঞতা, ধারাবাহিকভাবে মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি ও সরবরাহের বৈশিষ্ট্য হলো তার মৌলিক সামর্থ্য।

 

কৌশলগত পরিকল্পনা

Strategic Planning

বিপণন ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে তার অন্তর্গত বিভিন্ন বিভাগ (Departments) একসাথে কাজ করে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন করার জন্য এসব বিভাগগুলোকে একসাথে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কাজ করার প্রয়োজন হয়। কোনো এক বিভাগের কার্যসম্পাদনের অসমর্থ্যতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ এক বিভাগের কাজের সাথে আরেক বিভাগ পারষ্পরিকভাবে জড়িত থাকে। প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

প্রতিষ্ঠান সাধারণত বার্ষিক পরিকল্পনা (Annual Planning)- একবছর মেয়াদী, দীর্ঘসময়ব্যাপী পরিকল্পনা (Longterm Planning)- একবছরের বেশি সময়ের জন্য এবং কৌশলগত পরিকল্পনা (Strategic Planning) – পরিবর্তিত পরিস্থিতির জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এখানে কৌশলগত পরিকল্পনা হলো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও সামর্থ্যের সাথে ব্যবসায় পরিবেশের পরিবর্তনশীল সুযোগগুলোর কৌশলগত সমতা বিধানের প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ। সহজ ভাষায় কৌশলগত বিপণন পরিকল্পনা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সামর্থ্যের সাথে পরিবর্তনশীল বিপণন সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো যায়।

কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়: ১) প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগ পোর্টফোলিও (Portfolio) হিসেবে ব্যবস্থাপনা করা; ২) বাজার প্রবৃদ্ধির হার এবং বাজারের সাথে মানানসই কিনা তা বিবেচনার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যবসায়ের সামর্থ্য নির্ণয় করা; এবং ৩) কৌশল প্রতিষ্ঠা করা। অধিকাংশ বড় কোম্পানি সাধারণত চারটি সাংগঠনিক স্তরে কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা চিত্র নং ২.৪ এ দেখানো হয়েছে। সাধারণত কর্পোরেট হেড কোয়ার্টার পুরো ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের কর্পোরেট কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এ পরিকল্পনার সময় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগে কী পরিমাণ সম্পদ হস্তান্তর করা হবে এবং কোনো

 

ব্যবসায় শুরু বা শেষ করা প্রয়োজন হবে কিনা। বিভাগীয় পরিকল্পনায় প্রতিটি বিভাগ, বিভাগের মধ্যে অবস্থিত ব্যবসায়িক ইউনিটের অর্থ প্রাপ্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরপর ব্যবসায় পরিকল্পনার মাধ্যমে লাভজনকভাবে ব্যবসায় পরিচালনার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। সর্বশেষে, প্রতিটি ব্যবসায় ইউনিটের অন্তর্গত প্রতিটি পণ্যের জন্য পণ্য পরিকল্পনা ও বিপণন পরিকল্পনা গ্রহণ করে লক্ষ্য অর্জন করা হয়। বিপণন পরিকল্পনা দুইটি স্তরে কাজ করে।

প্রথম স্তরে রয়েছে, কৌশলগত (Strategic) বিপণন পরিকল্পনায় বাজারের সর্বোৎকৃষ্ট সুযোগ বিশ্লেষণের মাধ্যমে কীভাবে উদ্দিষ্ট বাজার দখল করা যায় তার দিক নির্দেশনা। আর দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে, কার্যপদ্ধতিগত (Tactical) পরিকল্পনায় পণ্যের বৈশিষ্ট্য, প্রসার, মূল্য, বিক্রয় প্রণালি এব সেবা সংক্রান্ত বিপণন কৌশল নির্ধারণ করা হয়। এই ইউনিটের পরবর্তী পাঠগুলোতে কর্পোরেট, বিভাগীয়, ব্যবসায় ও বিপণন পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

সারসংক্ষেপঃ

প্রতিষ্ঠানের বিপণনে ক্রেতা ভ্যালু হলো কোনো পণ্য ভোগ বা ব্যবহারের মাধ্যমে অর্জিত সুবিধা। ভ্যালু নির্ণয়ের সূত্রটি হলো- ক্রেতা ভ্যালু ক্রেতার সুবিধাসমূহ – ক্রেতার ব্যয়সমূহ। বিপণন মতবাদ অনুযায়ী, পরিকল্পনার = শুরুতে ভোক্তাদের সুবিধা বা ভ্যালুর কথা বিবেচনা করা হয়। যেকোনো পণ্য প্রবর্তনের পূর্বে বিপণনকারিকে বাজারের ভিন্নতা অনুযায়ী ক্রেতা বিভাজন করা প্রয়োজন হয়। এরপর যথোপযুক্ত বাজার নির্বাচন এবং ভ্যালুর অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। ক্রেতা বিভাজন, বাজার নির্বাচন ও ভ্যালু অবস্থান তৈরির ওপর ভিত্তি করে ভ্যালু নির্বাচন করা হয়। ভ্যালু নির্বাচনের এই অংশকে কৌশলগত বিপণন বলা হয়।

এরপর ভ্যালু প্রদানের জন্য কার্যক্রম শুরু করা হয় যাকে কার্যপদ্ধতিগত বিপণন বলে। অধিক সন্তোষজনক ক্রেতা ভ্যালু সৃষ্টি করার জন্য Michael Porter ভ্যালু শিকলের কথা বলেছেন। এ ভ্যালু চেইনে পণ্য নকশাকরণ থেকে, উৎপাদন, সরবরাহ এবং সমর্থনমূলক নয়টি কার্যাবলি চিহ্নিত করা হয়েছে এই কার্যাবলি সম্পাদন করার জন্য প্রতিষ্ঠান অর্থ ব্যয় করে। এর মধ্যে প্রাথমিক কাজ রয়েছে পাঁচটি এবং চারটি সহযোগি কার্যক্রম সম্পাদন করে। মৌলিক সামর্থ্য বলতে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের এমনসব বৈশিষ্ট্যকে বুঝায় যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা অর্জন করতে ও বাজার ধরে রাখতে পারে।

কৌশলগত বিপণন পরিকল্পনা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ, যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সামর্থ্যের সাথে পরিবর্তনশীল বিপণন সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো যায়। কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়: ১) প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগ পোর্টফোলিও হিসেবে ব্যবস্থাপনা করা; ২) বাজার প্রবৃদ্ধির হার এবং বাজারের সাথে মানানসই কিনা তা বিবেচনার মাধ্যমে প্রতিটি ব্যবসায়ের সামর্থ্য নির্ণয় করা; এবং ৩) কৌশল প্রতিষ্ঠা করা ৷

ক্রেতা ভ্যালু ও কৌশলগত পরিকল্পনা
ক্রেতা ভ্যালু ও কৌশলগত পরিকল্পনা

১ thought on “ক্রেতা ভ্যালু ও কৌশলগত পরিকল্পনা”

Leave a Comment