কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা

কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “বিপণন কৌশল ও পরিকল্পনা” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা

 

বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও প্রযুক্তি পরিবেশের কারণে বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে ব্যবসায় জগতে প্রতিযোগিতার পরিমাণ অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বাজারে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার জন্য ক্রেতাদের সাথে সম্পর্ক তৈরি করে তাদেরকে দীর্ঘদিন ধরে রাখার চেষ্টা করছে এর সাথে সাথে নতুন নতুন ক্রেতা সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এ কাজগুলোর জন্য বিপণনকারিকে নিত্যনতুন কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় আর দক্ষতার সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করতে হয়। এই পাঠে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার প্রথম পর্যায় কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তী পাঠে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার পরবর্তী পর্যায় ব্যবসায় একক কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করা হবে।

 

কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা

Corporate and Divisional Strategic Planning

প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনায় কর্পোরেট মিশন অনুযায়ী নীতি কৌশল এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে একটি কাঠামো গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ এবং ব্যবসায় ইউনিট তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি করে। কর্পোরেট বলতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিসকে বোঝায়। কর্পোরেট হেডকোয়ার্টার চার ধরনের পরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যাবলি সম্পন্ন করে; সেগুলো হলো-

১. কর্পোরেট মিশন সংজ্ঞায়িতকরণ;

২. কৌশলগত ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা;

৩. প্রত্যেক কৌশলগত ব্যবসায় এককে সম্পদ বরাদ্দকরণ;

৪. প্রবৃদ্ধির সুযোগসমূহ নির্ধারণ।

 

কর্পোরেট মিশন সংজ্ঞায়িতকরণ

Defining Corporate Mission

কর্পোরেট হেডকোয়ার্টারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মিশন এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। মিশন হচ্ছে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি যা ব্যবস্থাপককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বৃহত্তর পরিবেশে কোম্পানি কী করতে চায় তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিকে মিশন বিবৃতি (Mission Statement) বলে। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে মিশন তৈরি করতে হয়। মিশন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জানা প্রয়োজন; আমাদের ব্যবসায় কী, ক্রেতা কে, ক্রেতার নিকট এ ব্যবসায়ের মূল্য কতটুকু, ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ কী হবে; ভবিষ্যৎ কী হওয়া উচিত ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর জানা হলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য মিশন সংজ্ঞায়িত করা সহজ হয়।

 

যেকেনো সুস্পষ্ট ও সুচিন্তিত মিশন বিবৃতি অবশ্যই ব্যবস্থাপক, কর্মী, ক্ষেত্রবিশেষে ক্রেতাদের সাথে নিয়ে সহযোগিতামূলক মনোভাব রেখে নির্ধারণ করা হয় এবং এর মাধ্যমে সামষ্টিক উদ্দেশ্য, নির্দেশনা ও সুযোগ প্রকাশ পায়। ভালো মিশন বিবৃতির পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে-

সীমিত সংখ্যক লক্ষ্যের প্রতি আলোকপাত করা হয়;

প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রধান নীতি ও ভ্যালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়;

প্রধান প্রতিযোগিতামূলক বলয় বা ক্ষেত্র নির্ধারণ যার মধ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হবে;

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং সংক্ষিপ্ত, স্মরণীয় এবং অর্থপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

 

 

কৌশলগত ব্যবসায় একক প্রতিষ্ঠা

Establishing Strategic Business Units

বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি একের অধিক পণ্য বা সেবা নিয়ে ব্যবসায় কার্যক্রম পরিচালনা করে। কৌশলগত ব্যবসায় একক বলতে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের একক কোনো পণ্য হতে পারে বা একক পণ্য সারি বা একক বিভাগ অথবা সমগ্র কোম্পানিকে বুঝায়, যার পৃথক মিশন ও উদ্দেশ্য থাকে এবং তা অর্জনের জন্য স্বাধীন পরিকল্পনা গ্রহণ করে। একটি কৌশলগত ব্যবসায় এককের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট থাকে; যথা-

এটি একটি একক ব্যবসায় বা কতগুলো সম্পর্কযুক্ত ব্যবসায়ের সমষ্টি যা প্রতিষ্ঠানের অন্যান্য ব্যবসায় পরিকল্পনা থেকে পৃথক;

H এর নিজস্ব প্রতিযোগী থাকে এবং 1 এর কৌশলগত পরিকল্পনা, মুনাফা কার্যক্রম এবং মুনাফার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এমন উপাদানের নিয়ন্ত্রণের জন্য একজন ব্যবস্থাপক থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, স্কয়ার ফুড এন্ড বেভারেজ এর অধীনে রাঁধুনি, রুচি ও চাষী তিনটি পৃথক ব্যবসায় একক। কৌশলগত ব্যবসায় একক নির্ধারণের মাধ্যমে প্রতিটি এককের জন্য পৃথক কৌশল অবলম্বন করা হয় এবং প্রতিটি ব্যবসায় এককের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন করা হয়।

 

কৌশলগত ব্যবসায় এককে সম্পদ নিয়োগ

Assigning Resources to Strategic Business Unit

কৌশলগত ব্যবসায় একক নির্ধারণ করার পর প্রতিটি কৌশলগত ব্যবসায় এককের আকর্ষণীয়তা ও শক্তি মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ করে। কৌশলগত ব্যবসায় একক মূল্যায়নের জন্য দুইটি জনপ্রিয় এ্যাপ্রোচ বা উপায় হলো- বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ এ্যাপ্রোচ (BCG – Boston Consulting Group Approach) এবং জেনারেল ইলেকট্রিক এ্যাপ্রোচ (GE-General Electric Approach)। এখানে শুধুমাত্র বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ এ্যাপ্রোচ (BCG) বিস্তারিত আলোচনা করা হলো-

বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ এ্যাপ্রোচ (Boston Consulting Group Approach): কৌশলগত ব্যবসায় একক মূল্যায়নের জন্য শীর্ষস্থানীয় ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফার্ম বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ প্রবৃদ্ধি শেয়ার ম্যাট্রিক্স (Growth Share Matrix) তৈরি করেছে যেখানে বাজার প্রবৃদ্ধির হার (Market Growth) ও তুলনামূলক বাজার অংশ (Relative Market Share) বিষয় দুইটি বিবেচনা করা হয়েছে। চিত্র নং ২.৫ এ কোনো একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের নয়টি বৃত্তকে কৌশলগত ব্যবসায় একক ধরে BCG প্রবৃদ্ধি শেয়ার ম্যাট্রিক্স দেখানো হলো।

১. স্টার্স (Stars): উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ বাজার অংশ সম্পন্ন ব্যবসায় একক বা পণ্যসমূহকে স্টার্স বলে। এ ধরনের ব্যবসা এককের বাজার প্রবৃদ্ধি, সংরক্ষণ এবং প্রতিযোগীদের আক্রমণ ঠেকানো কোম্পানিকে জন্য ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। অবশ্য এ সকল ব্যবসায়ের প্রবৃদ্ধি একসময় কমে আসে এবং তখন এরা ক্যাশ কাউজ- এ পরিণত হয়। চিত্র ২.৫এ দুইটি ব্যবসায় একক স্টার্স এ অবস্থান করছে।

২. ক্যাশ কাউজ (Cash Cows): নিম্ন বাজার প্রবৃদ্ধি এবং উচ্চ বাজার অংশ সম্পন্ন ব্যবসায় বা পণ্যকে ক্যাশ কাউজ বলে। এ সকল ব্যবসায় এককে উচ্চ বা অল্প বিনিয়োগ করে বাজার ধরে রাখা যায়। এসকল ব্যবসায় একক বা পণ্য হতে প্রতিষ্ঠানের প্রচুর অর্থ অর্জিত হয়, যা দিয়ে বিভিন্ন খরচ, দেনা পরিশোধ ও অন্যান্য ব্যবসায় এককে বিনিয়োগ করা সম্ভব হয়। চিত্র ২.৫ এ শুধুমাত্র দুইটি ব্যবসায় একক ক্যাশ কাউজে এ অবস্থান করছে। এর আকার অন্য সকল ব্যবসায় একক থেকে তুলনামূলকভাবে বড় হওয়াতে বোঝা যাচ্ছে এ ব্যবসায় একক দুইটি সবচেয়ে বেশি বিক্রয় হচ্ছে।

৩. কোয়েশ্চেন মার্কস (Question Marks) : উচ্চ বাজার প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন তুলনামূলক বাজার অংশ সম্পন্ন ব্যবসা বা পণ্যসমূহকে কোয়েশ্চেন মার্কস বলা হয়। এসকল ব্যবসায় এককের বাজার অংশ বৃদ্ধির জন্য প্রচুর টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। প্রতিষ্ঠানকে বিবেচনা করতে হয় কোন কোয়েশ্চেন মার্কস ব্যবসায় একককে স্টারে রূপান্তর করা যাবে এবং কোনটিকে বাদ দিতে হবে। চিত্র ২.৫ এ শুধুমাত্র দুইটি ব্যবসায় একক কোয়েশ্চেন মার্কস এ অবস্থান করছে।

 

 

৪. ডগস (Dogs): নিম্ন বাজার প্রবৃদ্ধি ও নিম্ন বাজার অংশ সম্পন্ন ব্যবসায় বা পণ্যসমূহকে ডগস বলে। এ ধরনের ব্যবসায় হতে অর্জিত আয় খুবই সামান্য থাকে যা নিজেকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যয় হয়ে থাকে। এ কারণে এ ধরনের ব্যবসায় একক বা পণ্য পরিহার যোগ্য বলে বিবেচিত হয়। চিত্র ২.৫ এ শুধুমাত্র তিনটি ব্যবসায় একক ডগস এ অবস্থান করছে।

কৌশলগত ব্যবসায় এককের অবস্থান জানার পর, প্রতিটি কৌশলগত ব্যবসায় এককের জন্য কৌশল ও অর্থ পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। কৌশলগত ব্যবসায় এককগুলোর জন্য চার ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হয়। নিম্নে এ চারটি কৌশলের বর্ণনা করা হলো-

 

১. বাজার শেয়ার গঠন বা বৃদ্ধি (Building Market Share): কোনো ব্যবসায় অধিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বাজার বৃদ্ধির কৌশলকে বাজার গঠন বা বৃদ্ধি করা বলে। কোয়েশ্চেন মার্কস ও স্টার্স ঘরে অবস্থিত সম্ভাবনাময় ব্যবসায়গুলোর জন্য এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হয়।

২. ধরে রাখা (Holding) : কোনো ব্যবসায় যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন সে পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগের কৌশলকে বাজার ধরে রাখা কৌশল বলা হয়। ক্যাশ কাউজ এ অবস্থানকারি ব্যবসায় একক বা পণ্যের ক্ষেত্রে এ কৌশল গ্রহণ করা হয়।

৩. তুলে নেয়া (Harvesting): দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিবেচনা না করে স্বল্প মেয়াদে কোনো ব্যবসায় হতে যত বেশি সম্ভব নগদ টাকা তুলে নেয়ার কৌশলকে তুলে নেয়া বলা হয়। বিশেষ করে দুর্বল ক্যাশ কাউজ, সম্ভাবনাহীন কোয়েশ্চেন মাকর্স ও ডগ এ অবস্থানকারী ব্যবসায় একক বা পণ্যের জন্য এ কৌশল গ্রহণ করা হয়।

৪. পরিত্যাগ বা তরলীকরণ (Divesting) : কোন ব্যবসায় বন্ধ বা বিক্রির মাধ্যমে পুঁজি প্রত্যাহার করে নেয়ার কৌশলকে তরলীকরণ বা পরিত্যাগ বলে। কোয়েশ্চেন মার্কস ও ডগ এ অবস্থানকারী ব্যবসায় একক বা পণ্যের ক্ষেত্রে এ ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হয়। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কৌশলগত ব্যবসায় এককগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হয়। পণ্য জীবন চক্রের শুরুতে কোনো ব্যবসায় বা পণ্য কোয়েশ্চেন মার্কস এ অবস্থান করলেও পরবর্তীতে তা স্টারে পরিণত হতে পারে এবং স্টার হতে ক্যাশ কাউজে ও সর্বশেষে ডগসে এ পরিণত হতে পারে। তবে এর ব্যতিক্রমও হতে পারে; যেমন কোয়েশ্চেন মার্কস বা স্টার্স হতে ডগস এ যেতে পারে। পণ্য কোনো ধারাবাহিক কাঠামো অনুসরণ করে না বরং বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিষ্ঠানের কৌশলের ওপর নির্ভর করে ব্যবসায় একক বা পণ্যের অবস্থান নির্ভর করে।

কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা

প্রবৃদ্ধি সুযোগ পরিমাপ

Assessing Growth Opportunities

প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধির সুযোগ নির্ধারণ করার সাথে দুইটি বিষয় জড়িত; নতুন ব্যবসায়ের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পুরাতন ব্যবসায় ছাঁটাইকরণ।

ক) নতুন ব্যবসায়ের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন (Planning New Business): নতুন ব্যবসায়ের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় প্রতিষ্ঠান প্রাক্কলনকৃত ও প্রত্যাশিত বিক্রয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করে। প্রাক্কলনকৃত বিক্রয় হলো বর্তমান ব্যবসায়ের পরিকল্পনা থেকে প্রতিষ্ঠান একটি নির্দিষ্ট সময়ের বিক্রয়ের পূর্বানুমান; অন্যদিকে, যে পরিমাণ বিক্রয় একই সময়ে প্রত্যাশা করে তাকে প্রত্যাশিত বিক্রয় বলে। আর প্রত্যাশিত ভবিষ্যত বিক্রয় ও প্রাক্কলনকৃত বিক্রয়ের ব্যবধানকে কৌশলগত পরিকল্পনা শূণ্যস্থান বলে । এ শূন্যস্থান পূরণের জন্য নতুন নতুন ব্যবসায় উন্নয়ন করার প্রয়োজন হয়। চিত্র নং ২.৬ এ দেখানো হয়েছে, প্রতিষ্ঠান তিন ধরনের প্রবৃদ্ধি কৌশল অবলম্বন করে কৌশলগত পরিকল্পনা শূণ্যস্থান পূরণ করতে পারে ।

 

 

১. নিবিড় প্রবৃদ্ধি (Intensive Growth): চলতি ব্যবসায়ের আরো প্রবৃদ্ধির সুযোগ চিহ্নিত করাকে নিবিড় প্রবৃদ্ধি বলে। প্রতিষ্ঠান বর্তমানে যেসব পণ্য ও বাজার নিয়ে কাজ করে তার ওপর ভিত্তি করে নিবিড় প্রবৃদ্ধির সুযোগ চিহ্নিত করা হয়। চিত্র ২.৭ এ পণ্য ও বাজার সম্প্রসারণ গ্রিড এ নিবিড় প্রবৃদ্ধির কৌশলগুলো দেখানো হলো ।

বাজার প্রবেশ কৌশল (Market Penetration Strategy): চলতি বাজার বা পণ্যের কোনো পরিবর্তন না এনে; বর্তমান বাজারে, বর্তমান পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশল অবলম্বনকে বাজার প্রবেশ কৌশল বলে। বেশি বিজ্ঞাপন প্রদান, মূল্য হ্রাস, সেবার মান উন্নয়ন, দোকানের সজ্জা পরিবর্তন, নতুন স্থানে দোকান খোলা ইত্যাদির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান বাজার প্রবেশ কৌশল অবলম্বন করতে পারে।

 

কর্পোরেট ও বিভাগীয়

 

বাজার উন্নয়ন কৌশল (Market Development Strategy): নতুন কোনো আকর্ষণীয় বাজার চিহ্নিত করে, বর্তমান পণ্য সেখানে বিক্রির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশলকে বাজার উন্নয়ন কৌশল বলে। এ কৌশল অবলম্বন করে প্রতিষ্ঠান নতুন এলাকা বা নতুন ক্রেতাদের নিকট পণ্য বিক্রয় করে। যেমন- হাজী বিরিয়ানীর নতুন শাখা কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় স্থাপন করে সেখানকার নতুন ক্রেতাদের কাছে একই বিরিয়ানী বিক্রয় করে বাজার উন্নয়ন করা ।

পণ্য উন্নয়ন কৌশল ( Product Development Strategy): বর্তমান বাজারে নতুন বা পরিবর্তিত বা সংশোধিত পণ্য বিক্রয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশলকে পণ্য উন্নয়ন কৌশল বলে। এ কৌশলে পণ্যের মান, মোড়ক, ডিজাইন, আকার-আকৃতি ইত্যাদি পরিবর্তন বা সম্পূর্ণ নতুনভাবে পণ্য উন্নয়ন করে বর্তমান ক্রেতার কাছে বিক্রয় করা হয়। যেমন- হাজী বিরিয়ানী স্বাস্থ্য সচেতন ও সবজিপ্রিয় ক্রেতাদের জন্য সবজি বিরিয়ানী নতুন কোনো খাবার বাংলাদেশের পুরান ঢাকা ও বসুন্ধরা শাখায় বিক্রয় করতে পারে। এখানে একই বাজারে নতুন পণ্য নিয়ে বাজার সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

বৈচিত্রকরণ কৌশল (Diversification Strategy): নতুন বাজারের জন্য নতুন পণ্য বিক্রয়য়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশলকে বৈচিত্রকরণ কৌশল বলে। যেমন- যদি হাজী বিরিয়ানি সম্পূর্ণ নতুন পণ্য সবজি বিরিয়ানী নতুন একটি বাজার কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় শাখা খুলে বিক্রয় করে।

২. সমন্বিত প্রবৃদ্ধি (Integrated Growth): বর্তমান ব্যবসায়ের সাথে সম্পর্কিত সকল ব্যবসায় সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি অর্জনের কৌশলকে সমন্বিত কৌশল বলে। নিচে সমন্বিত কৌশলের ধরনগুলো উল্লেখ করা হলো-

পশ্চাদমুখী সমন্বয় (Backward Integration) : প্রতিষ্ঠান পণ্য প্রস্তুত করার জন্য বিভিন্ন সরবরাহকারীর নিকট থেকে কাঁচামাল নিয়মিতভাবে ক্রয় করে থাকে। অধিক নিয়ন্ত্রণ বা মুনাফা অর্জনের আশায় প্রতিষ্ঠান এক বা একাধিক সরবরাহকারীর নিকট হতে কাঁচামাল সংগ্রহ করলে তাকে পশ্চাদমুখী সমন্বয় বলে ।

সম্মুখমুখী সমন্বয় (Forward Integration) : পণ্য প্রস্তুত করার পর প্রতিষ্ঠান খুচরা বা পাইকারী ব্যবসায়ীর মাধ্যমে পণ্য ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়। অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠান এক বা একাধিক পাইকার বা খুচরা ব্যবসায়ীর সাথে একত্রিত হয়ে কার্যাবলি সম্পাদনে করলে তাকে সম্মুখমুখী সমন্বয় বলে।

সমান্তরাল সমন্বয় (Horizontal Integration): প্রতিষ্ঠান এক বা একাধিক প্রতিযোগী ব্যবসায় ক্রয় করে বা তাদের সাথে একত্রে কার্যাবলি পরিচালনা করলে তাকে সমান্তরাল সমন্বয় বলে। সাধারণত বাজার নিয়ন্ত্রণ ও অধিক মুনাফা অর্জনের জন্য এ ধরনের সমন্বয় করা হয়।

 

৩. বৈচিত্রকরণ প্রবৃদ্ধি (Diversification Growth): বর্তমান ব্যবসায়ের সাথে সম্পর্কহীন আকর্ষণীয় ব্যবসায় যুক্ত করে বিক্রয় বৃদ্ধির প্রচেষ্টাকে বহুমুখী প্রবৃদ্ধি বলে। এ ধরনের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে তিনটি কৌশল রয়েছে। যথা-

কেন্দ্রীভূত বহুমুখী কৌশল (Concentric Diversification Strategy): বর্তমান পণ্যের সাথে প্রযুক্তিগতভাবে বা বিপণনের দৃষ্টিকোণ হতে সম্পর্কযুক্ত নতুন পণ্য উন্নয়ন এবং নতুন ক্রেতার নিকট তা বিক্রয়ের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূত বহুমুখী কৌশল বলে ।

সমান্তরাল বহুমুখী কৌশল ( Horizontal Diversification Strategy): বর্তমান পণ্যের সাথে প্রযুক্তিগতভাবে সম্পর্কহীন কিন্তু বর্তমান ক্রেতার নিকট এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে এমন নতুন পণ্য উন্নয়ন ও বিক্রয়ের প্রচেষ্টাকে সমান্তরাল বহুমুখী কৌশল বলে ।

সংমিশ্রিত বহুমুখী প্রবৃদ্ধি (Conglomerate Diversification Strategy): বর্তমান প্রযুক্তি, পণ্য বা বাজারের সাথে সম্পর্কহীন নতুন পণ্য উন্নয়ন ও বিক্রয়ের প্রচেষ্টাকে সংমিশ্রিত বহুমুখী প্রবৃদ্ধি বলে ।

 

খ) পুরাতন ব্যবসায় ছাঁটাই বা বন্ধ করার জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন (Downsizing or Terminating Older Business): নতুন ব্যবসায় উন্নয়ন করার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানকে পুরাতন বা দুর্বল ব্যবসায়কে বাতিল করার প্রয়োজন হয়। কারণ ব্যবসায় এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার এবং ব্যয় হ্রাস করতে পারে। কোনো কম লাভজনক বা পুরাতন হলে প্রতিষ্ঠান সেই ব্যবসায়টির পরিস্থিতি অনুযায়ী কাটছাঁট করে, বিনিয়োগ তুলে নেয় বা পুঁজি প্রত্যাহার করে এবং লাভজনক ব্যবসায়ে তা বিনিয়োগ করে ।

 

সারসংক্ষেপঃ

প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনায় কর্পোরেট মিশন অনুযায়ী নীতি কৌশল এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে একটি কাঠামো গঠন করা হয়। যার মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ এবং ব্যবসায় ইউনিট তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি করে। মিশন হচ্ছে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি যা ব্যবস্থাপককে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। কৌশলগত ব্যবসায় একক নির্ধারণ করার পর প্রতিটি কৌশলগত ব্যবসায় এককের আকর্ষণীয়তা ও শক্তি মূল্যায়নের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ বরাদ্দ করে।

এক্ষেত্রে বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ বা BCG এ্যাপ্রোচে কৌশলগত ব্যবসায় একক মূল্যায়নের জন্য শীর্ষস্থানীয় ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফার্ম বোস্টন কন্সাল্টিং গ্রুপ প্রবৃদ্ধি শেয়ার ম্যাট্রিক্স তৈরি করেছে যেখানে বাজার প্রবৃদ্ধির হার ও তুলনামূলক বাজার অংশ বিষয় দুইটি বিবেচনা করে চারটি কৌশল স্টার্স, ক্যাশ কাউজ, কোয়েশ্চেন মার্কস, ডগস বর্ণনা করা হয়েছে। কৌশলগত ব্যবসায় এককের অবস্থান জানার পর, প্রতিটি কৌশলগত ব্যবসায় এককের জন্য কৌশল ও অর্থ পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়। কৌশলগত ব্যবসায় এককগুলোর জন্য চার ধরনের কৌশল গ্রহণ করা হয়।

সেগুলো হলো- (১) বাজার শেয়ার গঠন বা বৃদ্ধি, (২) ধরে রাখা, (৩) তুলে নেয়া, এবং (৪) পরিত্যাগ তরলীকরণ। প্রতিষ্ঠান প্রবৃদ্ধির সুযোগ নির্ধারণ করার সাথে দুইটি বিষয় জড়িত; নতুন ব্যবসায়ের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং পুরাতন ব্যবসায় ছাঁটাইকরণ। চলতি ব্যবসায়ের আরো প্রবৃদ্ধির | সুযোগ চিহ্নিত করাকে নিবিড় প্রবৃদ্ধি বলে। নতুন ব্যবসায়ের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রতিষ্ঠান চারটি কৌশল নিতে পারে- (১) বাজার প্রবেশ কৌশল, (২) বাজার উন্নয়ন কৌশল এবং (৩) পণ্য উন্নয়ন কৌশল, (৪) বৈচিত্রকরণ কৌশল। সমন্বিত প্রবৃদ্ধির জন্য প্রতিষ্ঠান পশ্চাদমুখী সমন্বয়, সম্মুখমুখী সমন্বয় ও সমান্তরাল সমন্বয় করে।

অন্যদিকে  বৈচিত্র্যকরণ প্রবৃদ্ধির জন্য কেন্দ্রীভূত বহুমুখী কৌশল, সমান্তরাল বহুমুখী কৌশল ও সংমিশ্রিত বহুমুখী প্রবৃদ্ধি অবলম্বন করে। সর্বশেষে, নতুন ব্যবসায় উন্নয়ন করার সাথে সাথে প্রতিষ্ঠানকে পুরাতন বা দুর্বল ব্যবসায়কে বাতিল করার প্রয়োজন হয় । কারণ ব্যবসায় এর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার এবং ব্যয় হ্রাস করতে পারে ।

১ thought on “কর্পোরেট ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনা”

Leave a Comment