সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ

সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “বিপণন পরিবেশ, তথ্য সংগ্রহ ও চাহিদার পূর্বপরিকল্পনা” ইউনিট ৩ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ

 

বিপণনে সবসময়ই সামষ্টিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করতে হয় কারণ বিপণন পরিবেশ সবসময়ই পরিবর্তিত হয়। কোনো পণ্য হঠাৎ বাজারে প্রবেশ করে বাজারে তীব্র চাহিদা পূরণ করে অল্প সময়ের মধ্যেই হঠাৎ করে হারিয়ে যেতে পারে; কোনো পণ্য দীর্ঘদিন বাজারে চাহিদা অপরিবর্তিত থাকে, আবার কোনো পণ্য নির্দিষ্ট সময়ে বা সাময়িক সময়ের জন্য বাজারে অবস্থান করতে পারে। পণ্যের চাহিদার এই বিভিন্নতা তৈরি হয় সামষ্টিক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে। এই পরিবর্তনের কারণে নতুন নতুন পণ্যের প্রয়োজন ও চাহিদাও তৈরি হয়ে থাকে।

 

বিপণনে সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ

Analyzing Macro-environment in Marketing

একজন সফল বিপণনকারী সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে এখনও সনাক্ত বা পূরণ করা যায়নি, এমন প্রয়োজন ও প্রবণতা বের করে এবং সেই অনুযায়ী লাভজনক বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে। নিম্নে কিভাবে সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করা হয় তা আলোচনা করা হলো-

 

 

১. জনসংখ্যাগত পরিবেশ (Demographic Environment): কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনসংখ্যার আয়তন, ঘনত্ব, অবস্থান, গতিশীলতার ধারা, বয়স, বর্ণ, পেশা ইত্যাদি উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত অবস্থাই জনসংখ্যা পরিবেশ। জনসংখ্যা পরিবেশ বিপণনকারীর কাছে মূল আগ্রহের বিষয়, কারণ এর সাথে জনগণ জড়িত এবং জনগণ বাজার সৃষ্টি করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের জনসংখ্যার পরিমান, ধর্মের পার্থক্য, জীবনধরণ পদ্ধতির পার্থক্য প্রভৃতি জনগনের ভোগের পরিমান, ক্রয়, অভ্যাস, রুচি ইত্যাদিতে পার্থক্য সৃষ্টি করে। যে কোন পণ্যের বিপণন করার পূর্বে বিপণনকারীকে জনসংখ্যা সম্পর্কিত যে সকল বিষয় জানা প্রয়োজন বা বিবেচনা করা উচিত তা হলো-

  • জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অনেক সময় চাহিদা এবং যোগানের মধ্যে সমন্বয় সাধন কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। আবার এ বৃদ্ধি মানুষের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে তাই বিপণনকারীকে জনসংখ্যাগত পরিবেশ সম্পর্কে জানতে হয়।
  • একটি দেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা কতভাগ শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ ইত্যাদি বিভিন্ন বয়সের শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে তা একজন বিপণনকারীকে জানতে হয়। কারণ বিভিন্ন বয়সের জনগণের বিভিন্ন ধরনের চাহিদা রয়েছে।
  • উন্নয়নশীল, উন্নত এবং অনুন্নয়নশীল দেশসমূহে পারিবারিক জীবন ধারায় ভিন্নতা দেখা যায়। কর্মজীবী মহিলার সংখ্যা, বিলম্বে বিবাহ, শিক্ষার প্রসার, স্বাস্থ্য সচেতনা বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পারিবারিক জীবন ধারায় পরিবর্তন এসেছে। বিপণনকারী সে তথ্য জেনে তার কৌশল নির্ধারণ করতে পারেন।
  • বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক দূর্যোগ, ব্যবসায়িক এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সুবিধা, জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সুযোগ ইত্যাদির কারণে মানুষ এক দেশ হতে অন্য দেশে অথবা এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি পরিলক্ষিত হয়। এ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যতা তাদের মনোভাব, বিশ্বাস, মূল্যবোধ ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়। সেইকারণে বিপণনকারী বিভিন্ন জাতীয়তা বা এলাকার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী সংস্কৃতি জেনে কৌশল গ্রহণ করতে পারে।
  • সমাজে শিক্ষার হার এবং পেশার বণ্টন সম্পর্কে বিপণনকারীকে অবগত থাকতে হয়। শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ও তাদের রুচি, চাহিদা ক্রয় ইত্যাদির মধ্যেকার পার্থক্য জানা প্রয়োজন । কারণ বিভিন্ন পেশার মানুষের মধ্যে আচরণগত পার্থক্য দেখা যায় যা বিপণনের উপর প্রভাব বিস্তার করে।

 

২. অর্থনৈতিক পরিবেশ (Economic Environment): একটি দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মানের দ্বারা সে দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়। ভোক্তাদের ক্রয় ক্ষমতা এবং ব্যয়ের ধরনকে প্রভাবিত করে এমন সকল উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত অবস্থাই হলো অর্থনৈতিক পরিবেশ। বাজারে শুধুমাত্র পণ্য সরবরাহ করাই বিপণনকারীর প্রধান কাজ নয় বরং বাজারে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনা করে পণ্য সরবরাহ করতে হয়। সুতরাং পণ্যের বিপণনে ক্রেতার অর্থনৈতিক অবস্থাও প্রভাব বিস্তার করে। যে কোন পণ্য বিপণনের পূর্বে বিপণনকারীকে অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে নিম্ন লিখিত বিষয়সমূহ জানতে হয়-

  • কোন কোন কারণে ক্রেতার আয়ের হ্রাস-বৃদ্ধি হয়, তা বিপণনকারীকে জানতে হয়। মাত্রাতিরিক্ত মুদ্রাস্ফীতি, ব্যাপক বেকারত্ব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ইত্যাদির কারণে ক্রেতার অবস্থার পরিবর্তন হতে পারে ।
  • সময় এবং আয়ের পরিবর্তনের ফলে ভোক্তাদের ভোগের পরিবর্তন হয়ে থাকে। ক্রেতাদের আয়, জীবনযাত্রার মান, সুদের হার, সঞ্চয়, ঋণ ইত্যাদি মানুষের ভোগের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
  • সঞ্চয়ের প্রবনতা, ঋণের প্রাপ্যতা, বাকিতে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদি ভোক্তাদের ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে। ভোক্তাদের সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পেলে ভোগের পরিমাণ কম হয়। আবার ঋণের সহজ লভ্যতা ভোগের পরিমানকে বৃদ্ধি করতে পারে। সুতরাং জনগণের এ বিষয়সমূহকে বিপণনকারীকে বিবেচনায় নিয়ে আসতে হয়।

 

৩. প্রাকৃতিক পরিবেশ (Natural Environment): কোনো দেশের জলবায়ু, নদ-নদী, আবহাওয়া, প্রাকৃতিক সম্পদ, ইত্যাদির সমন্বয়ে সেই দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ গঠিত হয়। এ সকল প্রাকৃতিক পরিবেশের উপাদান প্রতিষ্ঠানের অজান্তেই বিপণন কার্যাবলিকে প্রভাবিত করে। প্রাকৃতিক পরিবেশ কোনো দেশের উৎপাদন, বণ্টন, ভোগ, জীবনযাত্রা ইত্যাদির ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে থাকে। এ পরিবেশ বিপণনের অনুকূলে এবং প্রতিকূলে কাজ করতে পারে। তাই বিপণনকারীকে প্রাকৃতিক পরিবেশের বিষয়টি সর্বদা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়। নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি বিপণনকারীকে গুরুত্ব দিতে হয়-

  • পৃথিবীর প্রাপ্ত কাঁচামালসমূহ অসীম নয়। বিশুদ্ধ পানি, বন-জঙ্গল, তেল, খনিজ পণ্য, গ্যাস ইত্যাদির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাই কাঁচামালের স্বল্পতা বিপণনে প্রভাবিত করে ।
  • উৎপাদনসহ ব্যবসায়িক সকল কর্মকান্ডের সাথে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে শক্তি সম্পদ জড়িত থাকে। বিপণনের ক্ষেত্রে উৎপাদন, বণ্টন থেকে শুরু করে এই শক্তি সম্পদ প্রভাব বিস্তার করে। যেমন- তেলের সহজলভ্যতা না থাকলে এর প্রভাব পড়ে সকল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর। তাই এর বিকল্প হিসাবে সৌর শক্তি এবং পারমানবিক শক্তি ইত্যাদি ব্যবহারের প্রচেষ্টা চলছে।
  • বিভিন্ন শিল্পের কার্যক্রমের কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। পরিবহন, কলকারখানা থেকে নির্গত ধোঁয়া পরিবেশকে দূষিত করছে। যার ফলে জনজীবন, জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রভাব বিপণনের কার্যক্রমের উপর প্রভাব বিস্তার করছে।
  • সরকার অনেক সময় পরিবেশ দূষণ রোধ ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার জন্য সরাসরি হস্তক্ষেপ করে । সরকারি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিষ্ঠানের বিপণন কাজে পরিবর্তন সাধিত হয়।

 

৪. প্রযুক্তিগত পরিবেশ (Technological Environment): প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মাধ্যমে নিত্যনতুন বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনের করে ব্যবসায়-বাণিজ্যকে সচল থাকে। এর ফলে বিপণন পরিবেশে নতুন সুযোগ ও হুমকির সৃষ্টি হয়। তাই প্রযুক্তিগত বিষয়টি বিশ্লেষণের জন্য বিপণনকারীকে নিম্ন লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি লক্ষ রাখতে হয়-

  • বর্তমানের প্রযুক্তি পরিবর্তনের ধারা মানুষের জীবনযাত্রার গতিকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। যোগাযোগের ক্ষেত্রে ই-মেইল, ইন্টারনেট, ফ্যাক্স, মোবাইল ফোন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাই প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে পুরাতন পণ্যের চাহিদা লুপ্ত হয়ে নতুন চাহিদার সৃষ্টি হচ্ছে।
  • বর্তমানে যে সকল প্রযুক্তি প্রচলিত রয়েছে ভবিষ্যতে আরো উন্নত মানের প্রযুক্তির সৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসতে পারে। এসব আবিষ্কার বিপণনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
  • প্রতিষ্ঠানকে প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য গবেষণা এবং উন্নয়ন খাতকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন হয়। বর্তমানে একক ভাবে গবেষণার পিছনে ব্যয় বৃদ্ধি না করে দলগত ভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

 

৫. রাজনৈতিক পরিবেশ (Political Environment): বিভিন্ন সরকারি সংস্থা এবং সামাজিক স্বার্থ সংরক্ষণকারী সংগঠন বিপণনের কার্যক্রমের ওপর প্রভাব সৃষ্টিকারী করে। তাই সরকারি আইনকানুন, রাজনৈতিক দল পদ্ধতি, সরকারি ব্যবস্থার ধরন ইত্যাদি বিষয়গুলোর প্রতি বিপণনকারীকে নজর দিতে হয়। রাজনৈতিক পরিবেশের নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর প্রতি বিপণনকারী গুরুত্ব দেয়-

  • ব্যবসায় পরিবেশ সুরক্ষার জন্য যেকোনো দেশের প্রচলিত আইন কানুন এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। সাধারণত সুস্থ প্রতিযোগিতা, ব্যবসায়িক অসাধুতা থেকে ক্রেতাদের রক্ষা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ক্ষতিকর দিক থেকে সমাজকে রক্ষা করার জন্য ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণকারী আইন ও অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বিপণনকারী এসব আইন জেনে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে ।
  • জনস্বার্থরক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ভোক্তাদের অধিকার, নাগরিকের অধিকার, পরিবেশ রক্ষা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার জন্য কঠোর চেষ্টা করছে। ফলে বিপণনকারী এই সকল সংস্থার কার্যক্রমের সাথে সংগতি রেখে বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

 

৬. সাংস্কৃতিক পরিবেশ (Cultural Environment): সাংস্কৃতিক পরিবেশ হলো সমাজের উপাদানসমূহ যা মৌলিক মূল্যবোধ, প্রত্যক্ষণ, অগ্রাধিকার এবং আচরণকে প্রভাবিত করে। এসব উপাদান পণ্য উৎপাদন ও বিপণনকে প্রভাবিত করে। তাই সমাজের সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো সম্পর্কে বিপণনকারীকে জানতে হয় এবং সেভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

 

সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ

 

সারসংক্ষেপ

একজন সফল বিপণনকারী সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে এখনও সনাক্ত বা পূরণ করা যায়নি এমন প্রয়োজন ও প্রবণতা বের করে এবং সেই অনুযায়ী লাভজনক বিপণন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এক্ষেত্রে বিপণনকারী জনসংখ্যাগত, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক, প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে বাজারের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে।

সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ

১ thought on “সামষ্টিক পরিবেশ বিশ্লেষণ”

Leave a Comment