ভোক্তা আচরণের প্রভাবক সমূহ

ভোক্তা আচরণের প্রভাবকসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “ভোক্তা বাজার বিশ্লেষণ” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ভোক্তা আচরণের প্রভাবক সমূহ

 

ভোক্তা আচরণের প্রভাবক সমূহ

Influencing Factors on Consumer Behavior

ভোক্তার ক্রয় তার সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা জোরালোভাবে প্রভাবিত হয়। এ উপাদনগুলো চিত্র ৪.২ এ দেখানো হলো-

 

 

যেকোনো পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে উল্লেখিত বিষয়সমূহ প্রভাব বিস্তার করে। এরফলে বিভিন্ন ক্রেতা ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করে থাকে। এ উপাদানসমূহ বেশির ভাগই বিপণনকারীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলেও এ বিষয়গুলি বিবেচনার মধ্যে এনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।

 

১. সাংস্কৃতিক উপাদান (Cultural Factors): ভোক্তা আচরণের ওপর সাংস্কৃতিক উপাদান ব্যাপক এবং গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করে।

ক) সংস্কৃতি (Culture): সংস্কৃতি বলতে সমাজের রীতিসিদ্ধ আচরণকে বুঝায়। একজন ক্রেতা কোন সময়কে তার সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করতে পারে না। এ সংস্কৃতি দ্বারাই মানুষের অভাব এবং আচরণ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। একটি শিশু বড় হওয়ার সাথে সাথে পরিবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল কলেজ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান থেকে মৌলিক মুল্যবোধ, আচরণ, প্রত্যক্ষণ ইত্যাদি শিক্ষার মাধ্যমে সংস্কৃতিকে আয়ত্ত্ব করে। এক এক সংস্কৃতি এক এক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি অনুযায়ি বাংলাদেশিরা মাছ-ভাত খেতে পচ্ছন্দ করে, শাড়ি-লুঙ্গি পরিধান করে, বাংলা ভাষায় কথা বলে। বিপণনকারী সাংস্কৃতিক পরিবর্তনগুলো চিহ্নিত করে নতুন পণ্যের চাহিদা পূর্বানুমান করার চেষ্টা করছে। তাই বলা যায়, ক্রেতারা কোন ধরনের বণ্টন পদ্ধতি গ্রহণ করবে, কীভাবে ক্রয় করবে, কীভাবে মূল্য পণ্য ক্রয় করবে, কোন পণ্য ক্রয় করবে ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ দেশের সংস্কৃতি দ্বারা নির্ধারিত হয়।

খ) উপ-সংস্কৃতি (Subculture): প্রতিটি সংস্কৃতিতে বিভিন্ন দরনের উপসংস্কৃতি রয়েছে। ধর্ম, পেশা, সম্প্রদায়, জাতীয়তাবোধ, বয়স, অঞ্চল ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে সংস্কৃতিকে বিভিন্ন উপ সংস্কৃতিতে বিভক্ত করা যায়। বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে বিভিন্ন প্রকার উপ-সংস্কৃতিতে বিভক্ত করা যায়। ধর্মের ভিত্তিতে চার ধরনের উপ-সংস্কৃতি দেখতে পাওয়া যায় যেমন- মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানে এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। মুসলিমরা ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদ আর, হিন্দুরা পূজা উদযাপন করে। ধর্মের পাথ্যক্যের কারণে ক্রেতাদের ক্রয় আচরণের মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। সুতরাং উপ-সংস্কৃতিও একজন ভোক্তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে ।

গ) সামাজিক শ্রেণি (Social Class): প্রায় প্রত্যেক সমাজেরই একটি সামাজিক শ্রেণি কাঠামো থাকে। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হয়। প্রত্যেক শ্রেণির মানুষের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য এবং গুনাবলী রয়েছে। এ সকল বিষয় তার ক্রয় আচরনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সাধারণত আয়, পেশা, শিক্ষা, সম্পদ, মূল্যবোধ ইত্যাদির সংমিশ্রণে সামাজিক শ্রেণি নির্ধারিত হয়। সাধারণত সমাজ কাঠামোকে উচ্চবিত্ত শ্রেনী, মধ্যবিত্ত শ্রেণি, ও নিম্নবিত্ত শ্রেণিতে ভাগ করা যায়।

এ সকল শ্রেণির মধ্যে আয়, রুচি, ভোগ, পোশাক, আসবাবপত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। উচ্চ বিত্ত শ্রেণির মানুষ বসবাসের জন্য বিলাসবহুল বাড়ি বা ফ্ল্যাট ক্রয় করে অন্যদিকে নিম্নবিত্তের মানুষ থাকার জন্য সাধারণ বাসা ভাড়া বা ক্রয় করে থাকে।

 

 

 

২. সামাজিক উপাদান (Social Factors) : সামাজিক উপাদান দ্বারাও ভোক্তার ক্রয় আচরণ প্রবাবিত হয়। সামাজিক উপাদানের প্রধান বিষয়গুলো হলো দল, পরিবার, সামাজিক ভূমিকা এবং মর্যাদা। সামাজিক এ সকল উপাদান দ্বারা যেহেতু ভোক্তার ক্রয় আচরণ ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয় তাই একজন বিপণনাকারীকে তার পণ্যের বিপণন কৌশল নির্ধারণের সময় এ সকল উপাদান বিবেচনায় রাখতে হয়।

ক) দল (Groups): একজন ব্যক্তির আচরণ অনেকগুলো ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র দল দ্বারা প্রভাবিত হয়। কোনো ব্যক্তির নির্দেশক দল (Reference Groups) হলো এমন কতগুলো দলের সমষ্টি যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যক্তির আচার আচরণ ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তির ওপর দুই ধরনের দল প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করতে দেখা যায়। তারা হলো প্রথমত, প্রাথমিক দল (Primary Groups) – যারা নিয়মিত এবং অনানুষ্ঠানিক ভাবে মেলামেশা করে।

যেমন- পরিবার, প্রতিবেশী, সহকর্মী ইত্যাদি। অন্যটি হলো মাধ্যমিক দল (Secondary Groups) যাদের সাথে নিয়মিত ভাবে যোগাযোগ হয় না বা অনুষ্ঠানিক যোগাযোগ হয়ে থাকে। যেমন- ধর্মীয় দল, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি। নির্দেশক দলে পরোক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে কাঙ্খিত দল (Aspirational Groups), বিচ্ছিন্নতা দল (Dissociative Groups) ও মতামতে নেতৃত্বদানকারী দল (Opinion Leader Groups)।

কাঙ্খিত দলের সদস্যরা হলো প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তি বা গোষ্ঠি যাদের দ্বারা অন্য কোনো ব্যক্তির মনোভাব, মূল্যবোধ এবং আচরণ প্রভাবিত হয়। যেমন- বাংলাদেশের একজন কিশোর লিওনেল মেসি -এর খেলা মত ফুটবল খেলতে চায়। সে লিওনেল মেসিকে অনুকরণ ও অনুসরণ করে যদিও লিওনেল মেসির সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। অন্যদিকে, ব্যক্তি যখন কোনো দলের মনোভাব বা মূল্যবোধকে অপচ্ছন্দের কারণে পরিত্যাগ করে তখন সেই দলকে বিচ্ছিন্নতা দল।

আবার, কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা দলের পারদর্শিতা ও সমাজে সক্রিয় অবস্থানের কারণে ভোক্তা কোনো পণ্য ক্রয় করার জন্য বা ক্রয় করা থেকে বিরত থাকার জন্য পরামর্শ বা প্রভাব বিস্তার করে তখন সেই ব্যক্তি বা দলকে মতামতে নেতৃত্বদানকারী দল বলা হয়। যেমন- একজন ডেন্টিস্ট বা দন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে ভোক্তা যখন কোনো নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট ব্যবহার করে। সুতরাং নির্দেশক দল একজন ভোক্তার ওপর কোন ধরনের আচরণ সে করবে, ভোগের প্রকৃতি কি হবে, কোন ধরনের পণ্য ক্রয় করবে ইত্যাদি বিষয়ে প্রভাব বিস্তার করে ।

গ) পরিবার (Family): পরিবার হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভোক্তা ক্রয় সংগঠন। সাধারণত পরিবারের বাবা, মা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী, সন্তান সদস্যরা একে অপরের ক্রয় আচরণে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। ফলে বিপণনকারীকে পরিবারের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বিপণন কৌশল গ্রহণ করতে হয়। যেমন- কোনো পরিবারে সাধারণত স্ত্রী বা মা সেই পরিবারের জন্য খাদ্য ও পোশাক ক্রয়ের বিষয়ে মূখ্য প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করে।

ঘ) ভূমিকা এবং মর্যাদা (Role and Status ) : সাধারণত ভূমিকা বলতে চারপাশের জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ব্যক্তির কার্য সম্পাদন করাকে ভূমিকা বলে। একজন ব্যক্তি একই সাথে পরিবার, প্রতিষ্ঠান, বন্ধুমহল, সংগঠন, অফিস ইত্যাদি বহুদলের সদস্য হতে পারেন। তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার ভূমিকার ভিন্নতা দেখা যায়। যেমন- একই ব্যক্তি পরিবারে বাবা, কর্মস্থলে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কখনো ক্লাবের সভাপতি হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। সমাজের প্রতি সাধারণত শ্রদ্ধাবোধ পোষণ করাকে মর্যাদা বলে। একজন ব্যক্তি তার সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে।

যেমন- সামাজিক মর্যাদা ভিন্নতার জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ও নিম্ন কর্মচারীর মধ্যে তাদের ক্রয় আচরণে ভিন্নতা দেখা যায়। আবার সেই একই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিভিন্ন দলে ভূমিকা এবং মর্যাদা আলাদা হবার কারণে ভূমিকা ও মর্যাদার সাথে যেন প্রতিফলন ঘটে এমনভাবে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য বা সেবা ক্রয় করবে। যেমন- পরিবারের সাথে থাকাকালিন ও কর্মস্থলে কর্মকালিন সময়ে ভিন্ন ভূমিকা পালনের জন্য সে ভিন্ন ভিন্ন পণ্য ক্রয় করবে।

ভোক্তা আচরণের প্রভাবকসমূহ

৩. ব্যক্তিগত উপাদান (Personal Factor) : একজন ব্যক্তির নিজস্ব বৈশিষ্ট্য যেমন- বয়স, আয়, পেশা, জীবন চক্র জীবন ধরণ, ব্যক্তিত্ব, নিজস্ব-ধারণার মত ইত্যাদি দ্বারা তার ক্রয় আচরণ প্রভাবিত হয়।

ক) বয়স ও জীবনচক্রের স্তর (Age and Life Cycle Stage): বয়সের পার্থক্যের কারণে পণ্য এবং সেবা ক্রয়ে যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। একজন মানুষ তার জীবনকালে বহুবার একই চাহিদা পূরণে বিভিন্ন পণ্য এবং সেবা ক্রয় করে। যেমন- শিশু কাল, যৌবন এবং বৃদ্ধ বয়সে মানুষ একই ধরনের খাদ্য গ্রহণ করে না। তাই জীবনচক্রের প্রত্যেকটি স্তর ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে।

খ) পেশা (Occupation): ব্যক্তির পেশা তার পণ্য এবং সেবা ক্রয়কে প্রভাবিত করে। একজন রিকশাচালক এবং একজন কর্মজীবির সেবা বা পণ্য ক্রয় এক রকম হয় না। পেশার ভিন্নতার কারণে ব্যক্তির আয়, মর্যাদা, চাহিদা ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন কর্মকর্তার কাছে গাড়ি প্রয়োজনীয় পণ্য কিন্তু একজন সাধারণ রিকশাচালকের নিকট তা বিলাস পণ্য হিসেবে পরিগণিত হয়। ফলে ব্যক্তির পেশার তারতম্য পণ্য বা সেবা ক্রয়ে ব্যাপকভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

গ) অর্থনৈতিক অবস্থা (Economic Conditions): ভোক্তার অর্থনৈতিক অবস্থা ভোগ আচরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দামি পণ্য ব্যবহার এবং কম দামি পণ্য ব্যবহার মূলত ব্যক্তির আয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন- বেশি আয়ের ব্যক্তি বিলাসবহুল বাড়ি ক্রয় করে বা ছুটি কাটাতে বিদেশ ভ্রমণ করে। কিন্তু কম আয় সম্পন্ন ব্যক্তি ছুটি কাটানোর জন্য বিদেশ ভ্রমণের কথা চিন্তা করতে পারে না। ঋণ গ্রহণের সুযোগ এবং ক্ষমতা ব্যক্তির জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। যদি অর্থনীতিতে মন্দা অবস্থা বিরাজ করে তবে বিপণনকারীকে তার পণ্যের এবং বিপণন প্রোগ্রামের বিভিন্ন বিষয়ের পরিবর্তনের পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঘ) জীবন ধাঁচ (Life Style) : একজন ব্যক্তির জীবন ধারা তার ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে। জীবন যাপন প্রণালী হচ্ছে ব্যক্তির জীবনধারণের ধরণ যা তার কাজকর্মে আগ্রহ এবং মতামতের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। দুই ব্যক্তির একই উপ-সংস্কৃতি, সামাজিক শ্রেণি এমনকি একই পেশার হলেও তাদের জীবনের ধাঁচ ভিন্নতার কারণে আচরণে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেমন- দুই জন শিক্ষকের মধ্যে পণ্য ও সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

একজনের কাছে সময় মূল্যবান হলে অপেক্ষাকৃত বেশিদামে শপিংমল থেকে পণ্য ক্রয় করবে। আবার আরেকজনের কাছে কমদামে পণ্য ক্রয় করার প্রতি আগ্রহ থাকার কারণে সাধারণ দোকান থেকে পণ্য ক্রয় করবে। এসব কারণে বিপণনকারীকে জীবন ধাঁচ খেয়াল রেখে তার পণ্য বাজারে বিপণন করতে হয়।

ঙ) ব্যক্তিত্ব এবং নিজস্ব ধারণা (Presonality and Self Concept): ব্যক্তিত্ব বলতে একজন ব্যক্তির নিজস্ব গুনাবলি অথবা ব্যক্তির দোষ-গুণ বুঝায়। একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিকে তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে আলাদা করা যায়। সাধারণত আত্মবিশ্বাস, মনোভাব, কর্তৃত্ব বজায়ে রাখা, সৃজনশীল, মূল্যবোধ, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা ইত্যাদি ব্যক্তিত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ সকল বৈশিষ্ট্য ব্যক্তির আচরণে প্রভাব বিস্তার করে। একজন সৃজনশীল ব্যক্তির ক্রয় সাধারণ ব্যক্তির চেয়ে ভিন্নতর হয়ে থাকে। অন্যদিকে ব্যক্তিত্বের সাথে ব্যক্তির নিজস্ব ধারণার সম্পর্ক থাকে। এখানে নিজস্ব ধারণা ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে অনুভূতি, বিশ্বাস ও প্রত্যক্ষণের সমন্বয় বুঝায়।

তাই বিপণনকারীকে পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পর্কিত নিজস্ব ধারণা ব্যবহার করতে হবে। ৪. মনস্তাত্ত্বিক উপাদান (Psychological Factors): ব্যক্তির ক্রয় আচরণ যেমন সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয় তেমনি মনস্তাত্ত্বিক উপাদান দ্বারাও ব্যক্তি প্রভাবিত হতে পারে। ব্যক্তির ক্রয়-পছন্দ চারটি প্রধান মনস্তত্ত্বিক উপাদান দ্বারা প্রভাবিত হয়, এগুলো হচ্ছে প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ, বিশ্বাস ও মনোভাব ।

ক) প্রেষণা (Motivation): কোনো প্রয়োজন যখন ব্যক্তিকে সন্তুষ্টির জন্য উদ্দীপিত করে তখন তাকে প্রেষণা বলে। ব্যক্তির দুই ধরনের প্রয়োজন থাকে। জৈবিক প্রয়োজন জীবন ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয় যেমন- খাদ্য, পানীয়, আশ্রয়, বাতাস ইত্যাদি। সামাজিক প্রয়োজন সমাজে বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়সমূহ যেমন- নিরাপত্তা, সম্মান, ভালবাসা ইত্যাদি। বিভিন্ন সময়ে বেঁচে থাকার জন্য মানুষ অনেকগুলো প্রয়োজন অনুভব করে। একটা প্রয়োজন তখনই উদ্দেশ্যে (Motive) পরিণত হয় যখন তা ব্যক্তির মধ্যে চাপ প্রয়োগ করার মতো তীব্রতা জাগ্রত করতে পারে। প্রেষণা এমন একটি শক্তি যা মানুষকে পরিচালিত করে এবং মানুষের মধ্যে কর্ম সম্পাদনের শক্তি যোগায়। মনোবিজ্ঞানীরা প্রেষণার বিভিন্ন মতামত প্রদান করেছেন। তবে নিম্নের মতবাদ দুইটি ভোক্তা বিশ্লেষণ ও বিপণনের জন্য বিশেষ অর্থ বহন করে।

ফ্রয়েডের প্রেষণা তত্ত্ব (Freud’s Theory of Motivation): মনোবিজ্ঞানী Sigmunel Freud বলেন, যে সকল মনস্তাত্ত্বিক শক্তিগুলো মানুষের আচরণ গঠনে সাহায্য করে সেসব শক্তি সম্পর্কে মানুষ অসচেতন থাকে। তবে মানুষ অনেক তাড়নাকে অবদমিত করে আস্তে আস্তে বড় হয়। এ তাড়নাগুলোকে মন থেকে বাদ দেওয়া বা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ব্যক্তি এসব তাড়নার বহিঃপ্রকাশ করে বিভিন্ন ভাবে। তাই ভোক্তার নির্বাচিত পণ্যের আকর্ষনীয় বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বিপণনকারীকে তার বিপণন কার্যক্রম সম্পাদন করতে হয় ।

মাসলোর প্রেষণা তত্ত্ব (Maslow’s Theory of Motivation) : বিখ্যাত মনস্তত্ত্ববিদ Abraham Maslow, মানুষ কেন একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট প্রয়োজন দ্বারা তাড়িত হয় তার ব্যাখ্যা প্রদানের চেষ্টা করেছেন। তার মতে, মানুষ তার প্রয়োজনের গুরুত্ব অনুযায়ী ক্রমাগতভাবে পণ্যের চাহিদা পূরণ করতে সচেষ্ট হয়। মানুষের অভাব আছে বলেই মানুষ কাজ করে। তার মতে, ব্যক্তির একটি অভাব পূরণ হবার সাথে সাথেই আরও একটি অভাব সে অনুভব করে। চিত্র ৪.৩ এ মানুষের প্রয়োজনের ধারাবাহিকতা দেখানো হলো। প্রথমে জৈবিক প্রয়োজন এর পর মানুষ নিরাপত্তার প্রয়োজন অনুভব করে। এর পর সামাজিক, তারপর শ্রদ্ধার এবং সবগুলো প্রয়োজন পরিপূর্ণ হলে উচ্চাকাংখার প্রয়োজন অনুভব করে ।

 

খ) প্রত্যক্ষণ (Perception) : প্রত্যক্ষণ ব্যক্তির ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে। ব্যক্তি একটি পরিস্থিতিকে কীভাবে প্রত্যক্ষণ করছে তার নির্ভর করে সে কাজ করে থাকে । দুই ব্যক্তি একই প্রেষণায় প্রেষিত হয়ে ভিন্ন ভিন্ন ক্রিয়া করতে পারে। একই বিজ্ঞাপন দুই জন ব্যক্তির ওপর দুই রকম ভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একজন বিজ্ঞাপনকে সৃষ্টিশীল হিসেবে প্রত্যক্ষণ করতে পারে অন্য জন্য একই বিজ্ঞাপনকে বিরক্তিকর মনে করতে পারে। বিভিন্ন ব্যক্তির নিকট বিভিন্নভাবে প্রত্যক্ষণ সৃষ্টির কারণ হচ্ছে তিনটি প্রত্যক্ষণ প্রক্রিয়া। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো-

 

 

* নির্বাচিত মনোযোগ (Selective Attention) : কোনো উপযোগ বা পণ্যের প্রতি মানুষের মনোযোগ আকর্ষিত হয় যখন ঐ উপযোগ বা পণ্য পাবার জন্য তার আগ্রহ অথবা প্রয়োজন থাকে। বিপণনকারী বিভিন্ন বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে ক্রেতা বা ভোক্তাকে আকর্ষিত করতে চেষ্টা করে। একজন মানুষ প্রতিদিন অসংখ্য উদ্দীপকের মুখোমুখী হয়। সবগুলোর প্রতি তার সমান মনোযোগ দেওয়া সম্ভবপর নয়। ধরা যাক, যদি কোনো ব্যক্তির একটি গাড়ির প্রয়োজন অনুভব করে তবে সে গাড়ির বিজ্ঞাপনের প্রতি মনোযোগী হবে। ফলে বিপণনকারীকে ভোক্তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করতে হয়।

নির্বাচিত বিকৃতকরণ (Selective Distortion): মানুষের তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা বা জ্ঞানের সাথে প্রাপ্ত তথ্যসমূহের খাপ-খাওয়ানো বা অভিযোজনের প্রবণতাকে নির্বাচিত বিকৃতকরণ বলে। যেমন- গাড়ির যতগুলো বিজ্ঞাপন ব্যক্তিটি দেখবে যেখান থেকে তার পূর্ব পরিচিত কোনো একটি ব্রান্ডের প্রতি একটা ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার চেষ্টা করবে। বিপণনকারীকে সেকারণে ভোক্তার অভিজ্ঞতা কীভাবে প্রসার কার্যক্রমে ও বিক্রয় তথ্যকে প্রভাবিত করবে তা বিবেচনা করতে হয়।

নির্বাচিত ধারণ ( Selective Retention): অনেক উদ্দীপক যাদের প্রতি ব্যক্তির আগ্রহ ও প্রয়োজন রয়েছে, তারপরও সে অনেক কিছুই ভুলে যায়। এ ক্ষেত্রে যে সকল বিষয় তাদের বিশ্বাস এবং মনোভাবকে সমর্থন করে সে সকল তথ্য মনে রাখার বা ধারণ করার প্রবণতা বেশী। তবে মানুষ তার ব্যক্তিগত অনুভূতি বা বিশ্বাস দ্বারা যতটুকু মনে রাখতে পারে তাকেই নির্বাচিত ধারণ বলে। যদি টয়োটা গাড়ির প্রতি তার দূর্বলতা থাকে তবে যে টয়োটার ইতিবাচক বিষয়গুলো মনে রাখার চেষ্টা করবে।

গ) শিক্ষণ (Learning): শিক্ষণ ভোক্তা আচরণের একটি মৌলিক উপাদান। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ভোক্তাদের আচরণ পরিবর্তনকেই শিক্ষন বলে। ব্যক্তি বিভিন্ন প্রকার সমস্যার সম্মুখীন হলে শিক্ষনের মাধ্যমে তার সমাধান খুঁজে নেই। ব্যক্তির বেশির ভাগ আচরণই শিক্ষালব্ধ। বিপণনকারী বার বার বিজ্ঞাপন প্রদর্শনের মাধ্যমে ব্যক্তির ক্রয় মনোভাবকে জাগ্রত করার চেষ্টা করে। আবার শিক্ষণের মাধ্যমে ক্রেতার মধ্যে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ড আনুগত্যতা সৃষ্টি করে। সুতরাং বিপণনকারী শিক্ষণের মাধ্যমে পণ্যকে তীব্র তাড়নার সাথে সম্পর্কিত করে ও প্রেষণামূলক সংকেত ব্যবহার করে তার পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি করতে পারে ।

ঘ) বিশ্বাস এবং মনোভাব (Beliefs and Attitudes): সাধারণত কর্ম ও শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তি তার বিশ্বাস ও মনোভাবের অধিকারী হয়। বিশ্বাস এবং মনোভাব ক্রয় আচরণকে প্রভাবিত করে। বিশ্বাস হলো কোনো বিষয় সম্পর্কে ব্যক্তির বর্ণনামূলক চিন্তাভাবনা। বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হয় মানুষের ধারণা, মতামত, ঘটনা বা পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতের এবং বিশ্বাসের ভিত্তিতেই মানুষের মনোভাব সৃষ্টি হয়। আর মনোভাব হলো কোনো বিশেষ কাজ বা ধারণার প্রতি ব্যক্তির তুলনামূলক মূল্যায়ন অনুভূতি এবং মানসিকতা। যেমন- ফোর্ড গাড়ির গুণগতমান সম্পর্কে ভোক্তার মনে ইতিবাচক বিশ্বাস থাকলে ভোক্তা ফোর্ড গাড়ি ক্রয় করতে বেশি আগ্রহী থাকবে। ভোক্তার মনে এ বিশ্বাস প্রকৃত জ্ঞান, আস্থা অথবা মতামতের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্টিত হয়।

বিপণনকারীর দায়িত্ব হচ্ছে ব্যক্তির মধ্যে বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা। যদি পণ্য সম্পর্কে ভোক্তাদের ভুল বিশ্বাস থাকে তবে সেটা সংশোধন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে মনোভাব দ্বারা ব্যক্তির কোনো ধারণা বা বিষয় সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে দৃঢ় মূল্যায়ন, অনুভূতি এবং প্রবনতা প্রকাশ পায়। রাজনীতি, ধর্ম, সংগীত, পোশাক, খাদ্য, জীবন প্রণালী এবং প্রায় সব বিষয়ে মানুষের একটা নিজস্ব মনোভাব থাকে। এ মনোভাব মানুষের মধ্যে এমন একটা কাঠামো তৈরি করে যা দ্বারা সে কোনো বিষয় নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করে অথবা সেখান থেকে বিরত থাকে। বিপণনকারী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে ভোক্তাদের ইতিবাচক মনোভাব তৈরী করা।

ঙ) স্মৃতি (Memory): স্মৃতি হলো মানুষের অভিজ্ঞতা ও শিক্ষণের বিষয়সমূহ সংরক্ষণের ক্ষমতা। স্মৃতির মাধ্যমে মানুষ তার পারিপার্শ্বিক অবস্থান থেকে যা শেখে এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা ধরে রাখতে সক্ষম হয়। স্মৃতি স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। বিপণনকারী সবসময়ই চেষ্টা করে এমনভাবে তথ্য ও অভিজ্ঞতা দেবার জন্য যেনো ক্রেতা ও ভোক্তা সেটা স্মৃতিতে ধরে রাখতে পারে।

চ) আবেগ (Emotions): আবেগ হলো একটি জটিল ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য মানসিক অবস্থা। ব্যক্তি আবেগের কারণে কখনো আনন্দ বা বিরক্তি প্রকাশ করে। বিপণনকারীকে এজন্য ক্রেতা ও ভোক্তার আবেগকে মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

অতএব বলা যায় যে, সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্বিক উপাদানের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবের কারণে ভোক্তা আচরণে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

 

সারসংক্ষেপ

ভোক্তার ক্রয় তার সাংস্কৃতিক, সামাজিক, ব্যক্তিগত এবং মনস্তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য দ্বারা জোরালোভাবে প্রভাবিত হয়। সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে সংস্কৃতি, উপ-সংস্কৃতি ও সামাজিক শ্রেণি। সামাজিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে রেফারেন্স গ্রুপ, পরিবার, ভূমিকা এবং মর্যাদা। আবার, ব্যক্তিগত উপাদানগুলো হলো বয়স ও জীবনচক্রের স্তর, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থা, জীবন ধাঁচ, ব্যক্তিত্ব এবং নিজস্ব ধারণা। সর্বশেষে মনস্তাত্ত্বিক উপাদানের মধ্যে প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ, বিশ্বাস এবং মনোভাব, স্মৃতি এবং আবেগ আলোচনা করা হয়েছে।

১ thought on “ভোক্তা আচরণের প্রভাবক সমূহ”

Leave a Comment