ব্র্যান্ড অবস্থানগ্ৰহণ

ব্র্যান্ড অবস্থানগ্ৰহণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “বাজার অবস্থান গ্রহণ ও ব্র্যান্ড প্রস্তুতকরণ” ইউনিট ৭ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

ব্র্যান্ড অবস্থানগ্ৰহণ

বিপণনকারী কিভাবে বাজার বিভক্তকরণ, লক্ষ্যায়ন ও অবস্থানগ্রহণের কার্যক্রম গ্রহণ করেছে তার উপর নির্ভর করে বিপণন কৌশল গ্রহণ করা হয় । বাজারে অবস্থানগ্রহণের জন্য ব্র্যান্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্রেতার মনে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানদের তুলনায় আকর্ষর্ণীয় ও সবলভাবে নিজের ব্র্যান্ডের গুণাগুণ, বৈশিষ্ট্য ও ভাবমূর্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে ব্র্যান্ড অবস্থানগ্রহণ বলা হয়। ক্রেতাদের মনে প্রতিষ্ঠানের অনুকূল অবস্থান তৈরি করার জন্য বিপণনকারী তিনটি ধাপে কাজ করতে পারে। সেগুলো হলো – (১) প্রতিযোগিতামূলক ফ্রেম অব রেফারেন্স প্রস্তুতকরণ, (২) পার্থক্য নির্দেশক বিন্দু ও পয়েন্টস অব প্যারিটি শনাক্তকরণ এবং (৩) ব্র্যান্ড মন্ত্র সৃষ্টি ।

 

প্রতিযোগীতামূলক ফ্রেম অব রেফারেন্স (Competitive Frame of Reference):

ফ্রেম অব রেফারেন্সের মাধ্যমে প্রতিযোগীতামূলক বিশ্লেষণ করে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত অনেকগুলো ব্র্যান্ডের মধ্যে কোন কোন ব্র্যান্ডের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হবে তা নির্ধারণ করা হয়। এরজন্যে বিপণনকারী প্রথমে প্রতিযোগী শনাক্ত ও প্রতিযোগীদের বিশ্লেষণ করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি কোম্পানি তার প্রতিযোগীদের রেটিং এর জন্য পাঁচটি গুণাগুণের (গ্রাহক সচেতনতা, পণ্য মান, পণ্যের সহজলভ্যতা, কারিগরি সহযোগিতা ও বিক্রয়কর্মীর ব্যবহার) উপর ভিত্তি করে ক, খ এবং গ তিনটি কোম্পানির সবলতা-দুর্বলতা অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।

তথ্য সংগ্রহ করে কোম্পানীগুলোর অবস্থা সারণী ৬.১ এ উপস্থাপন করা হয়েছে। তথ্যাদি বিশ্লেষণ করে বোঝা যাচ্ছে যে কোনো কোম্পানি অবস্থান গ্রহণের কৌশল হিসেবে কোম্পানি ক- এর পণ্যের সহজলভ্যতা এই দিক দিয়ে আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু কোম্পানি খ-এর কোনো দিকেই তেমন কোনো দুর্বলতা না থাকায় আক্রমণ করা লাভজনক হবে না। অপরদিকে কোম্পানি গ-এর প্রায় সকল দিকই কম-বেশি আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে পারে। এসব বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে বিপণনকারী আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ফ্রেম অব রেফারেন্স তৈরি করে অবস্থানগ্রহণ কৌশল নির্ধারণ করে থাকে।

 

 

পার্থক্য নির্দেশক বিন্দু ও পয়েন্টস অব প্যারিটি (Points of Diference and Points of Parity):

বিপণনকারী অবস্থান গ্রহণ কৌশল নির্ধারণে প্রতিযোগীতামূলক ফ্রেম অব রেফারেন্স স্থির করার পর সঠিক পার্থক্যের বিন্দু এবং পয়েন্টস অব প্যারিটিকে ব্যবহার করে। পার্থক্য নির্দেশক বিন্দু হচ্ছে কোনো ব্র্যান্ডের সাথে সংযুক্ত এমন কিছু বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ বা সুবিধা যা প্রতিযোগী ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকে এবং যা গ্রাহকরা অনুকূলভাবে মূল্যায়ন করে। একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ডের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশক অনেকগুলো উপাদান একই সাথে ক্রিয়াশীল থাকতে পারে। যেমন-Apple এর ক্ষেত্রে হালনাগাদ ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তির ব্যবহার, সুন্দর ও কার্যকরী ডিজাইন ও সহজ ব্যবহারোপযোগিতা ইত্যাদি হলো পার্থক্য নির্দেশক বিন্দু।

যেকোনো ব্র্যান্ডের জন্য শক্তিশালী, অনুকুল, অভিনব ও চমৎকার ব্র্যান্ড বৈশিষ্ট্য তৈরি করা একটি কঠিন কাজ। কিন্তু প্রতিযোগীতামূলক পরিবেশে শক্ত ব্র্যান্ড অবস্থান তৈরির জন্য এ বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কার্যকর পার্থক্যসূচক বৈশিষ্ট্যযুক্ত করে ব্র্যান্ড উন্নয়নের ক্ষেত্রে তিনটি উপাদান গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হতে পারে- (১) ব্র্যান্ড বৈশিষ্ট্য অবশ্যই ভোক্তাদের কাছে কাঙ্খিত, প্রয়োজনীয় ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। (২) প্রতিষ্ঠান লাভজনকভাবে গ্রাহকের মনে ব্র্যান্ড অবস্থান তৈরি ও বজায় রেখে সে অনুযায়ী কাজ করার মত প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রতিষ্ঠানের আছে কিনা সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। (৩) প্রতিযোগীদের তুলনায় ব্র্যান্ড বৈশিষ্ট্য কতটুকু স্বতন্ত্র ও উন্নততর সে বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করপ প্রয়োজন হয়।

সুতরাং, ব্র্যান্ডে সেইসব সুবিধা বা বৈশিষ্ট্য যোগ করা প্রয়োজন হয় যা গ্রাহকদের কাছে কাঙ্খিত, সরবরাহযোগ্য, পৃথকীকরণযোগ্য, নকলপ্রতিরোধযোগ্য, বিশ্বাসযোগ্য, গুরুত্বপূর্ণ বা মূল্যবান । অন্যদিকে, পয়েন্টস অব প্যারিটি হলো কোনো পণ্যের ব্র্যান্ডের এমন কিছু গুণাগুণ বা সুবিধা যা বাজারে প্রচলিত অন্যান্য ব্র্যান্ডের প্রায় অনুরূপ। অর্থাৎ ক্রেতা এক্ষেত্রে প্রতিযোগী ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট্যের সাথে তেমন কোনো পার্থক্য করতে পারে না । পয়েন্টস অব প্যারিটি হলো সেসব গুণাগণ বা সুবিধা যা ভোক্তারা কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবার মধ্যে বিদ্যমান থাকা একেবারেই যুক্তিসঙ্গত ও প্রয়োজনীয় বলে মনে করে।

অন্যভাবে বলা যায়, ব্র্যান্ড পছন্দের ক্ষেত্রে পণ্যের মধ্যে এ ধরনের গুণাগুণ বা সুবিধা থাকা প্রয়োজন কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় তা পর্যাপ্ত শর্ত পূরণ করে না । উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, যেকোনো প্রকৃত ট্রাভেল এজেন্সির পয়েন্টস অব প্যারিটি হলো বিমানের টিকিট ও হোটেল রিজার্ভেশনের সুবিধা প্রদান করা। এর পাশাপাশি ট্রাভেল এজেন্সি যদি গ্রাহকদের ট্যুর প্যাকেজ পরিকল্পনায় সহায়তা করে (যানবাহনের ব্যবস্থা, গাইড সার্ভিস, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণে সহায়তা), বিভিন্ন উপায়ে টিকেটের অর্থ পরিশোধ (কার্ড, নগদ, অনলাইন) ও বুকিং (একমাস, ৭দিন, ৩দিন বা ১দিনের) সুযোগসহ অন্যান্য সুবিধা গ্রাহকদের প্রদান করে তাহলে তাকে পার্থক্য নির্দেশক বিন্দু বলা যাবে।

ব্র্যান্ড অবস্থানগ্ৰহণ

 

ব্র্যান্ড মন্ত্র (Brand Mantra):

ব্র্যান্ডের অবস্থানগ্রহণ কৌশল উন্নয়নে অপরিহার্য উপাদান হিসেবে ব্র্যান্ড মন্ত্র বিবেচনা করা হয়। ব্র্যান্ড মন্ত্র হচ্ছে কোনো ব্র্যান্ডের অন্তর্নিহিত বিষয় যা উচ্চারণযোগ্য ও বোধগম্য। এরমাধ্যমে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়েই ব্র্যান্ডের মূল প্রতিজ্ঞাকে সহজে বুঝতে পারে এবং এটি অন্যান্য ব্র্যান্ড ধারণা ও কার্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত থাকে। ব্র্যান্ড মন্ত্র সাধারণত খুব সংক্ষিপ্ত হয় ও সাধারণত তিন থেকে পাঁচটি শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। ব্র্যান্ড মন্ত্রের কাজ হলো ব্র্যান্ডের মূল ভাবধারাকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ভোক্তাদের সামনে উপস্থাপন করা। এর মাধ্যমে বিপণনকারী কি ধরনের পণ্য বিক্রয় করতে চাচ্ছে এবং পণ্যটি কীভাবে ভোক্তাদের প্রয়োজন ও অভাব পূরণ করবে তার সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা থাকে। ব্র্যান্ড মন্ত্রের তিনটি মূল শর্ত হলো- (১) ব্র্যান্ড মন্ত্রের মাধ্যমে ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা থাকে এবং এটি ব্র্যান্ডের স্বতন্ত্রতা প্রকাশ করে।

(২) একটি কার্যকর ব্র্যান্ড মন্ত্র অবশ্যই সহজবোধ্য ও স্মরণযোগ্য হয়ে থাকে। সে কারণে এটি সংক্ষিপ্ত এবং অর্থপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন; এবং

(৩) প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও সম্ভাব্য ক্রেতা সকলের কাছে ব্র্যান্ড মন্ত্র আবেদনসম্পন্ন ও উৎসাহব্যাঞ্জক হওয়া আবশ্যক ।

 

 

ব্র্যান্ড অবস্থানগ্ৰহণ পাঠের সারসংক্ষেপ:

ফ্রেম অব রেফারেন্সের মাধ্যমে প্রতিযোগীতামূলক বিশ্লেষণ করে প্রতিযোগীতায় লিপ্ত অনেকগুলো ব্র্যান্ডের মধ্যে কোন কোন ব্র্যান্ডের ওপর গুরুত্ব প্রদান করা হবে তা নির্ধারণ করা হয়। এইজন্যে বিপণনকারী প্রথমে প্রতিযোগী শনাক্ত ও প্রতিযোগীদের বিশ্লেষণ করা হয়। বিপণনকারী অবস্থান গ্রহণ কৌশল নির্ধারণে প্রতিযোগীতামূলক ফ্রেম অব রেফারেন্স স্থির করার পর সঠিক পার্থক্যের বিন্দু এবং পয়েন্টস অব প্যারিটিকে ব্যবহার করে। পার্থক্য নির্দেশক বিন্দু হচ্ছে কোনো | ব্র্যান্ডের সাথে সংযুক্ত এমন কিছু বৈশিষ্ট্য, গুণাগুণ বা সুবিধা যা প্রতিযোগী ব্র্যান্ডের বৈশিষ্ট্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকে এবং যা গ্রাহকরা অনুকূলভাবে মূল্যায়ন করে। পয়েন্টস অব প্যারিটি হলো কোনো পণ্যের ব্র্যান্ডের এমন কিছু গুণাগুণ বা সুবিধা যা বাজারে প্রচলিত অন্যান্য ব্র্যান্ডের প্রায় অনুরূপ। ব্র্যান্ড মন্ত্র হচ্ছে কোনো ব্র্যান্ডের অন্তর্নিহিত বিষয় যা উচ্চারণযোগ্য ও বোধগম্য ।

১ thought on “ব্র্যান্ড অবস্থানগ্ৰহণ”

Leave a Comment