বাজার নেতার কৌশল

বাজার নেতার কৌশল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “প্রতিযোগিতা মোকাবেলা” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

বাজার নেতার কৌশল

 

বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভোক্তার প্রয়োজন ও চাহিদা কত ভালোভাবে পূরণ করছে, মোট বাজার দখল করে আছে ইত্যাদির উপর নির্ভর করে বাজার কাঠামো তৈরি হয়। চিত্র ৮.২ এ দেখানো হয়েছে একটি বাজার কাঠামো সাধারণত বাজার নেতা, বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী, বাজার অনুসারি ও বাজার নিশার দ্বারা গঠিত হয়। পরবর্তী পাঠগুলোতে বাজার কাঠামোর প্রতিটি অংশগ্রহণকারী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

 

 

বাজার নেতা কে?

Who is Market Leader?

নির্দিষ্ট কোনো বাজার কাঠামোতে বাজার নেতার বাজার শেয়ার সবচেয়ে বেশি যা প্রায় ৪০%। বাজার নেতা যে মূল্য নির্ধারণ করে, পণ্য প্রবর্তন করে, বণ্টন বা প্রসারের কৌশল অবলম্বন করে অন্যান্য প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান তা অনুসরণ করে থাকে। প্রায়ই বাজার নেতা অন্যদের আক্রমণের শিকার হয়ে থাকে। বাজার নেতা তার অবস্থান ধরে রাখার জন্য সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ কৌশল, বাজার শেয়ার রক্ষা কৌশল এবং বাজার শেয়ার সম্প্রসারণ কৌশল অবলম্বন করে থাকে।

 

বাজার নেতার কৌশল

Market Leader’s Strategies

বাজার নেতা অবস্থান ধরে রাখার জন্য নিম্নোক্ত তিনটি কৌশলের যেকোনো একটি গ্রহণ করতে পারে-

 

১. সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ (Expanding the Total Market): নতুন ক্রেতা অনুসন্ধান বা বর্তমান ক্রেতাদের বেশি ব্যবহার করানোর মাধ্যমে নেতা সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারিত করতে পারে।

ক) নতুন ক্রেতা (New Customers ) : নতুন ক্রেতা খুঁজে বের করে বাজার নেতা পণ্যের সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে। এজন্য তিনটি কৌশল ব্যবহার করা যেতে পারে। যথা- (i) বাজার প্রবেশ কৌশল; (ii) নতুন বাজার বিভাজন কৌশল ও (iii) ভৌগোলিক সম্প্রসারণ কৌশল। এই কৌশলগুলো পাঠ ২.২ এ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

খ) বেশি ব্যবহার (More usage): প্রতিষ্ঠান দুইভাবে পণ্যের ব্যবহার বাড়িয়ে বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে। যথা- ব্যবহারের পরিমাণ ও ব্যবহারের ঘনত্ব। (i) ব্যবহার পরিমাণ: প্রতিবার বেশি পরিমাণে ব্যবহার করার জন্য উদ্বুদ্ধ করে প্রতিষ্ঠান পণ্যের সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ করতে পারে। যেমন- টুথপেস্ট দিয়ে দিনে দুইবার দাঁত পরিষ্কার করলে দাঁত ভালো থাকবে- এইধরণের বিজ্ঞাপন প্রচার করে টুথপেষ্ট বিক্রেতা বেশি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করছে। (ii) ব্যবহারের ঘনত্ব: নতুন ও ভিন্ন উপায়ে পণ্যটি ব্যবহার করে পণ্য ব্যবহারের ঘনত্ব বাড়ানো যায়। যেমন- জিরোক্যাল চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার কর হয়। এই জিরোক্যাল ব্যবহার করে চা ছাড়াও সেমাই, আইসক্রিম, কুলফি, কেক, হালুয়া এবং বিভিন্ন ধরনের ঘরে তৈরি মিষ্টি রেসিপি প্রকাশ করেছে।

 

২. বাজার শেয়ার রক্ষা করা (Protecting Market Share): যেহেতু নেতার বাজার শেয়ার সবচেয়ে বেশি তাই আত্মরক্ষা বাজার নেতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজার শেয়ার বেশি হওয়ায় প্রতিযোগীরা বাজার নেতাকেই আক্রমণের জন্য বেছে নেয়। এজন্য নেতাকে আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হয়। দুইটি উপায়ে বাজার শেয়ার রক্ষার জন্য কাজ করতে পারে; যথা- পূর্বক্রিয়া বিপণন ও আত্মরক্ষামূলক বিপণন। নিচে এ দু’টি কাজের আলোচনা করা হলো-

ক) পূর্বক্রিয়া বিপণন (Proactive Marketing): অনেক প্রতিষ্ঠান মনে করে তাদের কাজ হলো ক্রেতাদের প্রয়োজনের সাথে খাপ খাওয়ানো। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান পূর্বক্রিয়া বিপণন অনুশীলন করে তারা ক্রেতার পূর্বেই ক্রেতার প্রয়োজনকে চিহ্নিত করে ও বিপণন কার্যক্রম গ্রহণ করে। ক্রেতাদের প্রয়োজন মিটানোর ক্ষেত্রে তিন ধরনের বিপণন কার্যক্রম চালানো হয়। যথা-

(i) সাড়ামূলক বিপণন ( Responsive Marketing) : এক্ষেত্রে বিপণনকারী প্রকাশিত প্রয়োজন খুঁজে বের করে এবং তা পূরণের চেষ্টা করে।

(ii) আগাম আভাসমূলক বিপণন (Anticipative Marketing) : পূর্বাভাসমূলক বিপণনকারী নিকট ভবিষ্যতে প্রয়োজন হবে, ক্রেতার এমন প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করা।

(iii) সৃষ্টিশীল বিপণন (Creative Marketing): এক্ষেত্রে যেসব সমাধান ক্রেতা চায়নি বিপণনকারী এমন প্রয়োজনের সমাধান আবিষ্কার করে। সুতরাং পূর্বক্রিয়া বিপণনকারীর পূর্বক্রিয়া দক্ষতা থাকা প্রয়োজন। মানুষের প্রয়োজন পূর্বানুমানের ক্ষমতা, এবং সমাধান উদ্ভাবনের সৃজনশীলতা থাকলেই পূর্বক্রিয়া বিপণন কার্যক্রম চালানো সম্ভব ।

খ) আত্মরক্ষামূলক বিপণন (Defensive Marketing): বাজার নেতাকে নিজের অবস্থান ধরে রাখার জন্য আত্মরক্ষামূলক কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন হয়। প্রতিষ্ঠান আত্মরক্ষামূলক বিপণন কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিযোগীদের কাছ থেকে নিজের অর্জিত বাজার শেয়ারকে রক্ষা করতে পারে। চিত্র ৮.৩ এর মাধ্যমে নেতার ৬টি আত্মরক্ষার কৌশল দেখানো হলো:

 

 

i) অবস্থান প্রতিরক্ষা (Position Defense): বাজার নেতা উৎকৃষ্ট ব্র্যান্ড শক্তি তৈরি করে নিজের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। এজন্য নেতাকে ক্রমাগতভাবে বিদ্যমান পণ্যের মান উন্নয়ন করতে হয় এবং নতুন পণ্য বাজারে ছাড়তে হয়। এতে কোম্পানির প্রতি ক্রেতাদের আস্থা তৈরি হয় যা প্রতিযোগীদের দূরে ঠেলে দেয়। উৎকৃষ্ট ব্র্যান্ড শক্তি সৃষ্টির মাধ্যমে ব্র্যান্ডটিকে শক্তিশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা অবস্থান প্রতিরক্ষার অন্তর্ভুক্ত।

 

(ii) পার্শ্ব প্রতিরোধমূলক প্রতিরক্ষা (Flank Defense): প্রতিযোগীরা সাধারণত নেতার দুর্বল স্থানে আঘাত করে এজন্য নেতাকে দুর্বল স্থানের প্রতি মনোযোগ দিতে হয়।

(iii) নিবৃত্তিমূলক প্রতিরক্ষা (Preemptive Defense): এ কৌশলে বাজার নেতা প্রতিযোগী আক্রমণ করার পূর্বেই প্রতিযোগীকে আক্রমণ করা হয়। প্রতিযোগী কর্তৃক আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকলেই সাধারণত এ কৌশল ব্যবহার করা হয়। যেমন- মূল্য হ্রাস করে, বিজ্ঞাপন দিয়ে, বা নতুন মডেল প্রবর্তন, ব্যয় হ্রাস, বণ্টন দক্ষতা বৃদ্ধি ইত্যাদি মাধ্যমে আক্রমণ করা যায়।

(iv) প্রতি-আক্রমণাত্মক প্রতিরক্ষা (Counter-offensive Defense): এক্ষেত্রে প্রতিযোগী আক্রমণ করলে নেতা প্রতিযোগীকে পাল্টা আক্রমণ করে। বাজার নেতা প্রতিযোগীকে মুখোমুখি বা পার্শ্ব আক্রমণ করতে পারে। প্রতি-আক্রমণাত্মক কৌশলে আক্রমণকারীর মূল এলাকায় আক্রমণ করা হয়ে এতে মূল এলাকা রক্ষা করার জন্য প্রতিযোগী কিছু দুর্বল স্থান ছেড়ে দেয়। সেই স্থান তখন বাজার নেতা দখল করে নিতে পারে। এইক্ষেত্রে বাজার নেতা মূল্য হ্রাস, মান উন্নয়ন, পণ্য ক্রয়ে ক্রেতাদের নিরুৎসাহিত করা, প্রতিযোগীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ প্রভৃতি কৌশল ব্যবহার করে।

(v) ভ্রাম্যমান প্রতিরক্ষা ( Mobile Defense): এ কৌশলে বাজার নেতা নতুন নতুন এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে যেনো ভবিষ্যতে সেইসব এলাকাকে কেন্দ্র করে আক্রমণ বা আত্মরক্ষা করতে পারে। দুইভাবে ভ্রাম্যমান প্রতিরক্ষা করা যায়। প্রথমত, বাজার সম্প্রসারণ করা। এতে বর্তমান পণ্যের বাইরে নতুন প্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়। দ্বিতীয়ত, বাজার বৈচিত্র্যকরণ করা। এতে বর্তমান পণ্যের সাথে সম্পর্কহীন পণ্য তৈরি করা হয় যাতে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়।

(vi) সংকোচনমূলক প্রতিরক্ষা (Contraction Defense): এক্ষেত্রে বাজার নেতা কম লাভজনক বাজার অংশ ত্যাগ করে বেশি লাভজনক অংশে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারে। এরফলে দুর্বল অবস্থান থেকে সম্পদ শক্তিশালী স্থানে নিয়োজিত করা হয়।

 

৩. বাজার শেয়ার সম্প্রসারণ (Expanding Market Share): এক্ষেত্রে বাজার নেতা তার বাজার শেয়ার সম্প্রসারণের চেষ্টা চালায়। সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণে বাজার নেতা নিজের ব্র্যান্ডের বিক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করে। তবে বাজার শেয়ার বাড়লেই মুনাফাযোগ্যতা বাড়বে তা সব সময় ঠিক নয়। যেমন- বাজার শেয়ার বৃদ্ধি করার ব্যয় যদি বেশি হয় তাহলে মুনাফা নাও বাড়তে পারে। বাজার শেয়ার সম্প্রসারণে ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে নিম্নোক্ত বিষয়সমূহ খেয়াল রাখতে হয়-

ক) একক ব্যয় হ্রাস (Unit Cost Decrease): বাজার শেয়ার বৃদ্ধি পেলে পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি পাবে। এতে বেশি পরিমাণে উৎপাদন হবে যা একক প্রতি উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করবে যারফলে কোম্পানি লাভবান হবে। কিন্তু বাজার শেয়ার বাড়লেও যদি একক ব্যয় না কমে, তাহলে লাভ ততটা হবে না ।

খ) উৎকৃষ্ট মানের পণ্য অর্পণ (Offering Superior Quality Product): প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগী অপেক্ষী উৎকৃষ্ট মানের পণ্য অর্পণ করে উচ্চ মূল্য ধার্য করতে পারে। তবে যদি মান উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে বেশি মল্য আদায় করা যায় তাহলে প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে। নতুবা বেশি মূল্যের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থ মান উন্নয়নের জন্য ব্যয় হয়ে যাবে। বাজার শেয়ার বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে নেতাকে চারটি বিষয় ভালভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

গ) একচেটিয়া ব্যবসায় (Monopoly Business): বাজার নেতার বাজার শেয়ার বৃদ্ধি করাকে অন্য প্রতিযোগীরা একচেটিয়া ব্যবসায় সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে অভিযোগ তুলতে পারে। তাই এ বিষয়ে নেতাকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

ঘ) ভুল বিপণন মিশ্রণ কৌশল (Wrong Marketing Mix Strategy): বাজার শেয়ার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বাজার নেতার বিপণন মিশ্রণ কৌশল ভুল হতে পারে। এতে বাজার শেয়ার বৃদ্ধি নাও পেতে পারে, বা বৃদ্ধি পেলেও তা নেতার জন্য লাভজনক নাও হতে পারে ।

ঙ) প্রকৃত এবং উপলব্ধিকৃত মানের প্রভাব (Effect of Actual and Perceived Quality): অনেকসময় ক্রেতা মনে করে যে, প্রতিষ্ঠানের ক্রেতা বেশি হলে সবাইকে যথাযথভাবে সেবা দেয়া সম্ভব হবে না। এক্ষেত্রে নেতাকে বাজার শেয়ার সম্প্রসাণের সময় পণ্যের প্রকৃত ও উপলব্ধিকৃত মানের বিষয়টি বিবেচনা করতে হয়।

বাজার নেতার কৌশল

সারসংক্ষেপ :

নির্দিষ্ট কোনো বাজার কাঠামোতে বাজার নেতার বাজার শেয়ার সবচেয়ে বেশি থাকে। বাজার নেতা তার অবস্থান ধরে রাখার জন্য সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ কৌশল, বাজার শেয়ার রক্ষা কৌশল এবং বাজার শেয়ার সম্প্রসারণ কৌশল অবলম্বন করে থাকে। নতুন ক্রেতা অনুসন্ধান বা বর্তমান ক্রেতাদের বেশি ব্যবহার করানোর মাধ্যমে নেতা সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারিত করতে পারে। যেহেতু নেতার বাজার শেয়ার সবচেয়ে বেশি তাই আত্মরক্ষা বাজার নেতার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাজার শেয়ার বেশি হওয়ায় প্রতিযোগীরা বাজার নেতাকেই আক্রমণের জন্য বেছে নেয়। এজন্য নেতাকে আত্মরক্ষার কৌশল গ্রহণ করতে হয়। আবার, অনেকসময় বাজার নেতা তার বাজার শেয়ার সম্প্রসারণের চেষ্টা চালায়। নিজের ব্র্যান্ডের বিক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করে বাজার নেতা সামগ্রিক বাজার সম্প্রসারণ করে ।

১ thought on “বাজার নেতার কৌশল”

Leave a Comment