বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর কৌশল আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “প্রতিযোগিতা মোকাবেলা” ইউনিট ৮ এর অন্তর্ভুক্ত।

বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর কৌশল
বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী কে?
Who is Market Challenger?
বাজার নেতার নিকটতম প্রতিযোগীই হলো বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী। বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিযোগিতামূলক কৌশল অবলম্বন করে বাজার নেতাকে আক্রমণ করে। উচ্চ ঝুঁকি থাকলেও বাজার নেতার দুর্বল দিকগুলো জেনে আঘাত করলে এরা অনেকসময়ই সফল হতে পারে। তাদের মূল লক্ষ্য থাকে বাজার নেতা হওয়া। আবার অনেক সময় বাজার নেতাকে আক্রমণ না করে বাজারে নিজের আয়তনের সমান বা ছোটো প্রতিষ্ঠানকেও বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী আক্রমণ করতে পারে। সমগ্র বাজার কাঠামোতে তারা প্রায় ৩০% বাজার দখল করে থাকে।

বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর কৌশলসমূহ ( Strategies for Market Challenger):
বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিযোগীতামূলক কৌশলসমূহ সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হলো-
১. কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং প্রতিপক্ষ সংজ্ঞায়িত করা (Defining the Strategic Objective and Opponents):
প্রথমেই বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীকে তার কৌশলগত উদ্দেশ্য স্থির বা সংজ্ঞায়িত করতে হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য থাকে বাজার শেয়ার বৃদ্ধি করা। বাজার শেয়ার বৃদ্ধির জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রতিপক্ষ বা কাকে আক্রমণ করবে তা ঠিক করতে হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী তিন ধরনের প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করতে পারে-
ক) বাজার নেতাকে আক্রমণ (Attack the Market Leader):
বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার নেতাকে আক্রমণের জন্য বেছে নিতে পারে। নেতাকে আক্রমণ করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নির্দিষ্ট পরিমাণ বাজার শেয়ার দখল করা। বাজার নেতৃত্ব গ্রহণ করার ঝুঁকি বেশি থাকলেও এখানে লাভের সম্ভাবনাও অনেক বেশি। তবে এক্ষেত্রে সফল হতে হলে কিছু প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা থাকা আবশ্যক। যেমন- মূল্য কমানোর জন্য উৎপাদন খরচ কম হওয়া বা একই মূল্যে অধিক সেবা দানের সামর্থ্য থাকা ।
খ) সম-আয়তনের প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ (Attack Firms of its Own Size):
বাজার নেতার আয়তন ও সম্পদ বেশি হওয়া নেতাকে পরাজিত করা কঠিন হয়। তাই প্রতিদ্বন্দ্বী নিজের সম-আয়তনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে আক্রমণ করতে পারে। সেক্ষেত্রে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী যথাযথভাবে ক্রেতাদের সেবা দিতে পারে না বা আর্থিকভাবে দুর্বল এমন প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করে প্রতি সহজেই সফল হতে পারে।
গ) ছোট স্থানীয় বা আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ (Attack Small Local or Regional Firms):
বাজার নেতার আয়তন ও সামর্থ্য এবং ঝুঁকি বেশি থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী ছোট স্থানীয় এবং আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করতে পারে। এদের আত্মরক্ষার ভাল কৌশল থাকে না তাই বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী সফল হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীর ছোট ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ করার মূল উদ্দেশ্য থাকে বাজার থেকে উচ্ছেদ করা বাজার শেয়ার দখল করা যায় ।
২. সাধারণ আক্রমণ কৌশল পছন্দ করা (Choosing a General Attack Strategy):
উদ্দেশ্য ও প্রতিপক্ষ সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা পর বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী আক্রমণ কৌশল অনুযায়ী কাজ করে। প্রতিদ্বন্দ্বী ৫টি কৌশলে আক্রমণ করতে পারে। নিচের চিত্র ৮.৪ এর মাধ্যমে তা দেখানো হলো-

ক) মুখোমুখি আক্রমণ (Frontal Attack):
এক্ষেত্রে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগীর পণ্য, বিজ্ঞাপন, মূল্য বা বণ্টন প্রচেষ্টার সাথে সামঞ্জস্য বিধান করে প্রতিযোগীকে মুখোমুখি আক্রমণ করে। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগীর দুর্বল স্থানে আক্রমণ না করে শক্তিশালী স্থানে আক্রমণ করে। এক্ষেত্রে আর্থিক দিক থেকে শক্তিশালী ও কৌশলগতভাবে দক্ষ কোম্পানিরই জেতার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই প্রতিযোগীর তুলনায় প্রতিদ্বন্দ্বীর আর্থিক অবস্থা খুব বেশি ভাল হলেই এ ধরনের আক্রমণে যাওয়া সমীচিন হয়। এছাড়াও প্রতিযোগীর অস্তিত্বের প্রশ্ন থাকায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর শক্তিশালী পাল্টা আঘাত হানতে পারে। তাই প্রস্তুতি নিয়েই আক্রমণ করতে হয়। পণ্য, মূল্য, বণ্টন বা বিজ্ঞাপন কোনো না কোনো দিক থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলে এই ধরণের আক্রমণে জিততে পারে।
খ) পার্শ্ব-আক্রমণ (Flank Attack):
এ কৌশলে প্রতিদ্বন্দ্বী মুখোমুখি আক্রমণ না করে পাশ দিয়ে প্রতিযোগীর দুর্বল জায়গা লক্ষ্য করে আক্রমণ করে এবং শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করে। পার্শ্ব-আক্রমণ দুটি কৌশলগত দিক থেকে পরিচালিত হতে পারে- (i) ভৌগোলিক (Geographical): এক্ষেত্রে প্রতিযোগী যেসব ভৌগোলিক এলাকায় এখনো ব্যাপকভাবে বিপণন কার্যক্রম চালাচ্ছে না সেসব স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বী বাজার দখল করার চেষ্টা করে। (ii) বিভাগভিত্তিক (Segmental): এ কৌশলে প্রতিদ্বন্দ্বী বাজারের নতুন নতুন চাহিদা চিহ্নিত করে তা পূরণের চেষ্টা করে। প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্পদ সীমিত হলে এ কৌশল উপযোগী এবং এতে জয়ের সম্ভাবনা বেশি।
গ) বেষ্টনি আক্রমণ (Encirclement Attack):
এই কৌশলে প্রতিদ্বন্দ্বী একযোগে প্রতিযোগীর বিভিন্ন বাজার অংশে আক্রমণ করে তাকে দিশেহারা করে দেয়া হয়। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিযোগীর চেয়ে আর্থিকভাবে শক্তিশালী হলে সব দিক দিয়ে এভাবে আক্রমণ করা সম্ভব হয়। এই আক্রমণের ফলে প্রতিযোগী দুর্বল বাজার অংশ ছেড়ে দিয়ে শক্তিশালী অংশ রক্ষায় সচেষ্ট হয়। সেইসুযোগে প্রতিযোগীর দুর্বল বাজার অংশগুলো প্রতিদ্বন্দ্বী দখল করে নেয়।
ঘ) বাইপাস আক্রমণ (Bypass Attack):
এক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে প্রতিযোগীকে আক্রমণ করা হয়। প্রতিযোগীকে এড়িয়ে বা বাইপাস করে সহজ বাজার অংশে আক্রমণ করা হয়। তিনভাবে বাইপাস আক্রমণ করা যায়। যথা- (i) নতুন প্রযুক্তি (New Technology): এ কৌশলে গবেষণার মাধ্যমে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে পণ্য তৈরি ও বিপণন করা হয়। (ii) সম্পর্কহীন পণ্য (Irrelevant Product ): এ কৌশলে প্রতিযোগী যে ধরনের পণ্য বিপণন করে, প্রতিদ্বন্দ্বী তার সাথে সম্পর্কহীন পণ্য বাজারে নিয়ে আসে। (iii) নতুন ভৌগোলিক বাজার (New Geographical Market): প্রতিদ্বন্দ্বী এমন ভৌগোলিক বাজারে পণ্য বিক্রয় করতে পারে, যেখানে প্রতিযোগী বিক্রয় করছে না ।
ঙ) গেরিলা আক্রমণ (Guarilla Attack):
প্রতিদ্বন্দ্বীর আর্থিক অবস্থা প্রতিযোগীর চেয়ে দুর্বল হলে এ কৌশলে আক্রমণ করা যেতে পারে। এতে প্রতিযোগীর বিভিন্ন বাজার বিভাগে হঠাৎ হঠাৎ আক্রমণ করা হয়। এই আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য থাকে প্রতিযোগিকে ব্যস্ত রাখা ও মনোবল হ্রাস করা। প্রচলিত ও অপ্রচলিত অনেক উপায়ে গেরিলা আক্রমণ চালানো হয়। যেমন- কিস্তিতে পণ্য বিক্রয়, মূল্যহ্রাস, হোম ডেলিভারী ইত্যাদি।
৩. সুনির্দিষ্ট আক্রমণ কৌশল পছন্দ করা (Choosing a Specific Attacking Technique):
এছাড়াও প্রতিদ্বন্দ্বীকে আরও কিছু সুনির্দিষ্ট কৌশল অবলম্বন করতে পারে। যথা- উৎপাদন ব্যয় হ্রাস, মূল্য বাট্টা, পণ্য বিস্তার, কম দামি পণ্য, ভ্যালু মূল্য ভিত্তিক পণ্য ও সেবা, বণ্টন দ্ভাবন, ব্যাপক বিজ্ঞাপন প্রচার ইত্যাদি।

সারসংক্ষেপ :
বাজার নেতার নিকটতম প্রতিযোগীই হলো বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী। বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীরা প্রতিযোগিতামূলক কৌশল অবলম্বন করে বাজার নেতাকে আক্রমণ করে। তিনটি উপায়ে প্রতিদ্বন্দ্বী আক্রমণ করে থাকে। প্রথমত, কৌশলগত উদ্দেশ্য এবং | প্রতিপক্ষ সংজ্ঞায়িত করা; এক্ষেত্রে বাজার প্রতিদ্বন্দ্বীকে তার কৌশলগত উদ্দেশ্য স্থির বা সংজ্ঞায়িত করতে হবে। | বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য থাকে বাজার শেয়ার বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত, সাধারণ আক্রমণ কৌশল পছন্দ করা; | উদ্দেশ্য ও প্রতিপক্ষ সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা পর বাজার প্রতিদ্বন্দ্বী পাঁচ ধরণের আক্রমণ কৌশল অনুযায়ী কাজ করে। এবং সর্বশেষে, সুনির্দিষ্ট আক্রমণ কৌশল পছন্দ করা ।
