পণ্য সিদ্ধান্তসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “পণ্য ও সেবা কৌশল” ইউনিট ৯ এর অন্তর্ভুক্ত।

পণ্য সিদ্ধান্তসমূহ
বিপণনকারীকে পণ্য উন্নয়ন ও বিপণনের কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্যে একক পণ্য ও সেবা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তা চিত্র নং ৯.৩ এ দেখানো হলো-

পণ্য বিশেষণসমূহ (Product Attributes):
পণ্য ও সেবা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কী কী সুবিধা ক্রেতাদের প্রদান করা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে এবং তাদেরকে সরবরাহ করতে হবে। সুবিধাগুলো নিম্নরূপ হতে পারে :
ক) পণ্যমান ( Product Quality ) :
পণ্যমান হচ্ছে ক্রেতাদের গ্রহণযোগ্যতার অর্জন ও কর্মসম্পাদন প্রক্রিয়া। পণ্যমানের দুটি দিক আছে। যথা-
i) মানস্তর (Quality level):
বিপণনকারীকে পণ্যের মানস্তর প্রথমেই ঠিক করতে হবে। সর্বোচ্চ মানের পণ্য সব প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে এমনটি নাও হতে পারে। কেননা, সর্বোচ্চ মানের পণ্য খুব কম ক্রেতাই চায় বা তাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে। তাই প্রতিষ্ঠানকে অভীষ্ট ক্রেতাদের প্রয়োজন মিটানো এবং প্রতিযোগী পণ্যের মানস্তরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এমন একটি মানস্তর নির্ধারণ করতে হবে। পণ্যের কার্যসম্পাদনের যোগ্যতাই হচ্ছে কার্যকরী মান ( Performance Quality)।
ii) মানের ধারাবাহিকতা (Quality Consistency):
পণ্যমানের আরেকটি দিক হচ্ছে মানের ধারাবাহিকতা। বিপণনকারীকে লক্ষ্য রাখতে হবে যেন পণ্যটি ত্রুটিমুক্ত এবং নির্দিষ্ট মানস্তর সম্পন্ন হয়। এটিই হচ্ছে উপযোগী মান (Conformance Quality)। ভোক্তাদের প্রত্যাশা পূরণের জন্য সব প্রতিষ্ঠানের উচ্চস্তরের উপযোগী মান ধরে রাখার চেষ্টা করার প্রয়োজন হয়।
খ) পণ্য বৈশিষ্ট্য (Product Features):
প্রতিষ্ঠান যখন বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য যোগ করে তার পণ্যকে প্রতিযোগী পণ্য থেকে পৃথকভাবে উপস্থাপন করে তখন তাকে পণ্য বৈশিষ্ট্য বলে। এক্ষেত্রে পণ্যের ডিজাইন, স্থায়িত্ব, পরিবেশ উপযোগীতা, সহজ ব্যবহার, বাড়তি সুবিধা ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যযুক্ত করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত নতুন ডিজাইন ও বৈশিষ্ট্য সংযোজনের মাধ্যমে ক্রেতারে দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জন করতে পারে।
গ) পণ্য স্টাইল ও ডিজাইন ( Product Style and Design):
ভোক্তার সন্তুষ্টি বৃদ্ধি ও প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের আরেকটি উপায় হচ্ছে পণ্য স্টাইল ও ডিজাইন প্রবর্তন করা। স্টাইল অপেক্ষা ডিজাইন ব্যাপক অর্থ বহন করে। পণ্যের বাহ্যিক রূপকে স্টাইল বলে। যদিও ভোক্তার দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য স্টাইল কার্যকরী। কিন্তু স্টাইল দিয়ে ভোক্তা পণ্য থেকে কোনোপ্রকার বাড়তি সুবিধা পায় না। অন্যদিকে পণ্য ডিজাইন পণ্যের ভিতরের বিষয়। যথার্থ ডিজাইন হলে বিপণনকারীর পক্ষে পণ্য সাশ্রয়ীভাবে প্রস্তুত করা সম্ভব হয়।
ব্র্যান্ডিং
Branding
ব্র্যান্ডিং হলো পণ্য কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটি পণ্যকে চিহ্নিত করার জন্য ব্যবহৃত হয়। একটি পণ্যকে অন্য কোনো পণ্য থেকে আলাদা করার জন্য সংকেত, চিহ্ন, নাম, প্রতীক। ডিজাইন, বা অন্য কোনো বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করার সাথে সম্পৃক্ত সকল কার্যক্রমকে ব্র্যান্ডিং (Branding) বলে। পণ্য কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্র্যান্ডিং। কাজেই অনেক কোম্পানি নিজেরা পণ্য উৎপাদন করলেও ব্র্যান্ড তৈরির দায়িত্ব অন্যের উপর দেওয়াকে সহজ ও ব্যয়বহুল মনে করে। ব্র্যান্ডিং হচ্ছে পণ্যকে আলাদা করার জন্য নাম, টার্ম, প্রতীক, নকশা, প্রসার ঘটানো বা এসবের সংমিশ্রণ ইত্যাদি কার্যক্রম যা কোনো প্রতিযোগী পণ্য থেকে আলাদা করে। ব্র্যান্ডিং বিপণনকারীর দক্ষ ও সৃজনশীল কাজ। ব্র্যান্ডিং পণ্যের ভ্যালু বৃদ্ধি এবং স্বাতন্ত্রতা চিহ্নিত করে। ফলে, অনুগত ক্রেতা শ্রেণি সৃষ্টি হয়।

মোড়কীকরণ
Packaging
কোনো কোনো পণ্য এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, এর উপরে আলাদা বাহ্যিক আবরণ দেওয়া হলে নষ্ট হয়ে যেতে পারে, কিংবা স্বাদের তারতম্য ঘটতে পারে। আবার, কোনো কোনো পণ্যকে বিপণনের সুবিধার জন্য কাপড়, কাগজ, টিনের পাত বা কৌটা, পলিথিন পেপার ইত্যাদি জিনিস দিয়ে আবৃত করা হয়। পণ্যের এই আবরণ মোড়ক (Package) নামে পরিচিত। পণ্যের গায়ে মোড়ক লাগানোকেই মোড়কিকরণ বলা হয়। মোড়ক পণ্যকে অধিকতর নিরাপদ কিংবা সহজতর বহনযোগ্য করে তোলে। মোড়ক থাকলে পণ্য বহুদিন ধরে ব্যবহার করা সম্ভব হয়। ব্র্যান্ড নামের মতো আকর্ষণীয় মোড়ক পণ্যের প্রতি ক্রেতার মনোভাবকে প্রভাবিত করে। ফলে ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তও প্রভাবিত হয়। পণ্য তিন পর্যায়ে প্যাকেজিং করা যেতে পারে, যেমন-
ক) প্রাথমিক মোড়ক (Primary Package):
পণ্যকে ধরে রাখার জন্য প্রথম অবস্থায় যে ধারক ব্যবহৃত হয়, তাকে প্রাথমিক প্যাকেজ বলে ।
খ) মাধ্যমিক মোড়ক (Secondary Package):
কাগজের তৈরি আবরণ যা দ্বিতীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই এটি পণ্য ব্যবহারের সময় ফেলে দেওয়া হয়, তাকে মাধ্যমিক প্যাকেজ বলে।
গ) শিপিং মোড়ক (Shipping Package):
পণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন, শনাক্তকরণের জন্য তৃতীয় পর্যায়ে ব্যবহৃত আবরণকে শিপিং প্যাকেজ বলে ।
লেবেলিং
Labeling
লেবেলিং হচ্ছে প্যাকেজিং-এর অংশ- যাতে পণ্য, বিক্রেতা বা উৎপাদনকারী সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকে। এটি ছোট চিরকুট থেকে আরম্ভ করে জটিল গ্রাফিক্স পর্যন্ত হতে পারে। লেবেলিং-এর তিনটি দিক রয়েছে। যথা- (ক) শনাক্তকরণ (Identifying): লেবেল পণ্য বা ব্র্যান্ডকে শনাক্ত করতে সহায়তা করে; (খ) বর্ণনাকরণ (Describing): পণ্যের প্রস্তুতকারকের নাম, প্রস্তুত স্থান, তারিখ, পণ্যের উপাদান, ব্যবহারবিধি ইত্যাদি বিষয় লেবেলে সংযুক্ত থাকে এবং (গ) প্রসার (Promoting): আকর্ষণীয় লেবেল পণ্য বা সেবার প্রসারে সহায়তা করে ।

পণ্য সহায়ক সেবা
Product Support Services
পণ্য কৌশলের আরেকটি দিক হচ্ছে ক্রেতা সেবা। এ পর্যায়ে পণ্য সমর্থন সেবার মধ্যে সংস্থাপন, বিক্রয়োত্তর সেবা,ওয়ারেন্টি, বাসায় সরবরাহ, কিস্তিতে বা বাকিতে পণ্য বিক্রয় ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে এসব সেবাকে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগীতামূলক সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
সারসংক্ষেপ:
বিপণনকারীকে পণ্য উন্নয়ন ও বিপণনের কার্যক্রম গ্রহণ করার জন্যে একক পণ্য ও সেবা সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সিদ্ধান্তসমূহ হলো – পণ্য বিশেষণসমূহ, ব্র্যান্ডিং, লেবেলিং, ও পণ্য সহায়ক সেবা ।
