ভোক্তার ক্রয় সিদ্ধান্ত আচরণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “ভোক্তা বাজার বিশ্লেষণ” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।
ভোক্তার ক্রয় সিদ্ধান্ত আচরণ
ক্রয় সিদ্ধান্ত আচরণের ধরণ
Types of Buying Decision Behavior
পণ্যের ধরণ অনুযায়ি ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্তের আচরণ পরিবর্তিত হয়। ক্রেতা কিছু পণ্য ক্রয় করে যার মূল্য খুব বেশি হয় যেমন- গাড়ি, বাড়ি ইত্যাদি। আবার কিছু পণ্য ক্রয় করে যাদের মূল্য অনেক কম যেমন- সাবান অথবা টুথপেস্ট। এ সকল পণ্যের গুরুত্ব ও বৈশিষ্ট্যর কারণে ক্রয় সিদ্ধান্ত ভিন্নতা তৈরি হয়। চিত্র ৪.৭ এ এ ধরণগুলো দেখানো হলো-

ক) জটিল ক্রয় আচরণ (Complex Buying Behavior): ক্রেতা যখন ক্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে ও পণ্যের গুরুত্ব উপলদ্ধি করে যেধরনের আচরণ করে তাকে জটিল ক্রয় আচরণ বলে। ব্যয়বহুল, ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতারা এ ক্রয় আচরণ করে থাকে। এসকল পণ্যের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ক্রেতা সহজে বুঝতে পারে। এধরনের পণ্য ক্রেতারা সাধারণত অনিয়মিতভাবে ক্রয় করে থাকে। এ সকল পণ্য ক্রয়ে তাদের তথ্য সংগ্রহ এবং মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে হয়। যেমন- দামি বাড়ি, গাড়ি, জমি ইত্যাদি।
খ) অনৈক্য হ্রাসপ্রাপ্ত ক্রয় আচরণ (Dissonance Reducing Buying Behavior) : দামি পণ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য দেখা যায় এবং ক্রেতা এ পার্থক্য অনেকসময়ই বুঝতে পারেন না। যারফলে পণ্য ক্রয় করার পর ক্রেতার মধ্যে ক্রয়োত্তর অনৈক্য (Post – purchase dissonance) তৈরি হতে পারে যখন ক্রয়কৃত পণ্যের অসুবিধা বা সমস্যা সে বুঝতে পারে বা অন্য ব্র্যান্ড সম্পর্কে ভালোদিকগুলো জানতে পারে। এ ক্ষেত্রে পণ্যের সঠিক মূল্য, সুবিধাজনক স্থান, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য, বিক্রয়োত্তর সেবার নিশ্চয়তা ইত্যাদি সম্পর্কে ক্রেতাদের অবহিত করে বিপণনকারীকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়।
গ) অভ্যাসগত ক্রয় আচরণ (Habitual Buying Behavior): কম দামি পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতার ঝুঁকির পরিমান একেবারেই কম থাকে এবং পণ্য ক্রয়ে ক্রেতা অভ্যস্ত থাকে। সেকারণে অনেক সময়ই কম দামি পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে ক্রেতার তথ্য সংগ্রহ এবং মূল্যায়ণের প্রয়োজন পড়ে না। এ ধরনেরে পণ্যের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও ক্রেতা এক্ষেত্রে ধরতে পারে না। ক্রেতা আগে থেকে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে থাকে কোথা থেকে পণ্যটি ক্রয় করা হবে, কীভাবে ক্রয় হবে এবং কত মূল্যে ক্রয় করবে। এ সকল পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতার অভ্যাসগত ক্রয় আচরণ পরিলক্ষিত হয়। সাধারণত নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য যেমন- তেল, সাবান, পেষ্ট ইত্যাদি জাতীয় পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতাদের অভ্যাসগত ক্রয় আচরণ বিদ্যামান।
ঘ) বৈচিত্রময় ক্রয় আচরণ (Variety Seeking Buying Behavior): এ ক্ষেত্রে ক্রেতার ঝুঁকি কম থাকে, পণ্য সমূহের একক মূল্য কম, পণ্য ব্যবহারে ক্রেতা অভ্যস্ত থাকে এবং পণ্যের বিভিন্নতা ক্রেতা পচ্ছন্দ করে। এ ক্ষেত্রে ক্রেতারা ব্যাপক জড়িত না হলেও ব্র্যান্ডের পার্থক্যকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে। সাধারণ প্রচলিত পণ্যকে যখন ক্রেতা সর্বাধিক ব্র্যান্ড বিবেচনায় নিয়ে আসে তখন ক্রেতাদের বৈচিত্রময় ক্রয় আচরণ পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে একজন ক্রেতা বাজার তথ্য এবং মূল্যায়ন ছাড়াই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই পণ্য ক্রয় করে, যা তিনি ভোগের সময় মূল্যায়ন করে থাকেন। পরবর্তী সময়ে একঘেয়েমি পরিহার করার জন্য ও বৈচিত্রতার জন্য তিনি অন্য ব্রান্ডের পণ্য ক্রয় করতে পারেন।
যেমন- চকোলেট, বিস্কুট ইত্যাদি। এ সকল পণ্যের ক্ষেত্রে বাজারে কোম্পানিগুলির মধ্যে ব্যাপক প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এখানে বিভিন্ন ধরনের সৃষ্টিশীল বিপণন প্রোগ্রাম প্রণয়ন করে ক্রেতাদের ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।
নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া
Buyer Decision Process for New Products
যে পণ্য, সেবা অথবা ধারণা বাজারে আগে ছিল না এবং যাকে সম্ভাব্য ক্রেতা নতুন বলে মনে করে তাকে নতুন পণ্য বলা যায়। একটি নতুন পণ্য বাজারে আসার পর শুরু হয় এর গ্রহণ প্রক্রিয়া। প্রকৃত পক্ষে ক্রেতার এ নতুন পণ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াটি একটি মানসিক প্রক্রিয়া। একটি নতুন পণ্য বাজারে আসার প্রথম খবর পাওয়া থেকে চূড়ান্ত ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত ক্রেতাকে অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করতে হয়। গ্রহণ প্রক্রিয়ার ধাপসমূহ চিত্র নং ৪.৬ এ দেখানো হলো-

১. অবগতি (Awarness): এ স্তরে ভোক্তা পণ্যটি সম্পর্কে অবগত হয় কিন্তু বিস্তারিত তথ্য জানে না। বিজ্ঞাপন অথবা বিক্রয়কর্মী ইত্যাদির মাধ্যমে ক্রেতা পণ্য সম্পর্কে অবগত হয়ে থাকে ।
২. আগ্রহ (Interest): এ স্তরে ক্রেতা পণ্য সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহে আগ্রহী হয়। পণ্যটির নানা দিক সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করে ।
৩. মূল্যায়ন (Evaluation): পণ্যটির বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ক্রেতা মূল্যায়ন করে। পণ্যটি গ্রহণ করা যুক্তিযুক্ত হবে কিনা সেটা সে বিবেচনা করে। পণ্যটি সম্পর্কে ক্রেতার ইতিবাচক মনোভাবের জন্ম নিলে যাচাই করার চিন্তা করে, নয়তো পণ্যটি ক্রয় করা থেকে বিরত থাকে।
৪. যাচাইকরণ (Trial): এ স্তরে পণ্যটি স্বল্প পরিমাণে গ্রহণ করে পণ্যটির গুণাগুণ যাচাই করে। পণ্যটি ক্রেতা হাতে কলমে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে বুঝতে চেষ্টা করে আসলেই পণ্যটি উপযোগী কিনা ।
৫. গ্রহণ (Adoption): যাচাই প্রক্রিয়ায় যদি ক্রেতা সন্তুষ্ট হয় তবে সে পণ্যটি গ্রহণ করে এবং নিয়মিতভাবে ব্যবহারের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়।
উল্লেখিত আলোচনা থেকে দেখা যায় একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অতিক্রম করে ক্রেতা নতুন পণ্য ক্রয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। এ প্রক্রিয়ায় প্রত্যেকটি স্তরে কীভাবে ক্রেতাকে সাহায্য করা যায় তা বিপণনকারীকে বিভিন্ন বিপণন কার্যক্রমের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
সারসংক্ষেপঃ
ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তিত হয় পণ্যের ধরণ অনুযায়ি। ক্রেতা যখন ক্রয় প্রক্রিয়ায় ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে ও পণ্যের গুরুত্ব উপলদ্ধি করে যেধরনের আচরণ করে তাকে জটিল ক্রয় আচরণ বলে। দামি পণ্য এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মধ্যে বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য দেখা যায় এবং ক্রেতা এ পার্থক্য অনেকসময়ই বুঝতে পারেন না। এরফলে যে আচরণ ক্রেতা করে থাকে তাকে অনৈক্য হ্রাসপ্রাপ্ত ক্রয় আচরণ বলে। কম দামি পণ্যের ক্ষেত্রে ক্রেতার ঝুঁকির পরিমান একেবারেই কম থাকে এবং ক্রেতা অভ্যস্ততা থেকে পণ্য ক্রয়ে যে আচরণ করে তাকে অভ্যাসগত ক্রয় আচরণ বলে।
সর্বশেষে বৈচিত্রময় ক্রয় আচরণের ক্ষেত্রে ক্রেতার ঝুঁকি কম থাকে, পণ্য সমূহের একক মূল্য কম, পণ্য ব্যবহারে ক্রেতা অভ্যস্ত থাকে এবং পণ্যের বিভিন্নতা ক্রেতা পচ্ছন্দ করে। যে পণ্য, সেবা অথবা ধারণা বাজারে আগে ছিল না এবং যাকে | সম্ভাব্য ক্রেতা নতুন বলে মনে করে তাকে নতুন পণ্য বলা যায়। ক্রেতার এ নতুন পণ্য গ্রহণ প্রক্রিয়াটি একটি মানসিক প্রক্রিয়া। একটি নতুন পণ্য বাজারে আসার প্রথম খবর পাওয়া থেকে চূড়ান্ত ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যন্ত ক্রেতাকে অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করতে হয়। সেই স্তরগুলো হলো-অবগতি, আগ্রহ, মূল্যায়ন, যাচাইকরণ এবং গ্রহণ।


১ thought on “ভোক্তার ক্রয় সিদ্ধান্ত আচরণ”