পণ্য ও ক্রেতার শ্রেণী ভেদে এবং পণ্যের জীবন চক্রের স্তর ভেদে প্রসার মিশ্রণ

পণ্য ও ক্রেতার শ্রেণী ভেদে এবং পণ্যের জীবন চক্রের স্তর ভেদে প্রসার মিশ্রণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ৩৫০৫ বিপণন প্রসার” এর  “বিপণন প্রসারের সূচনা” ইউনিট ১ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

Table of Contents

পণ্য ও ক্রেতার শ্রেণী ভেদে এবং পণ্যের জীবন চক্রের স্তর ভেদে প্রসার মিশ্রণ

 

আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে পণ্যের প্রকৃতি বা ভোক্তার প্রকৃতি অনুযায়ী একটি কোম্পানির প্রসার মিশ্রণ আলাদা হয়ে থাকে। পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী ভোগ্য ও শিল্প পণ্যের জন্য প্রসার মিশ্রণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। আবার চুড়ান্ত ক্রেতার জন্য যে বিজ্ঞাপন ভালো ফল দেবে, শিল্পীয় ক্রেতার জন্য সেই একই বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ অকার্যকর প্রমাণিত হতে পারে। এছাড়া, একই পণ্যের জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তরভেদেও প্রসার মিশ্রণ বিভিন্নরকম হতে পারে। এই পাঠে আমরা কীভাবে পণ্যের শ্রেণীভেদে, ক্রেতার শ্রেণীভেদে, কিংবা পণ্য জীবনচক্রের পর্যায় ভেদে প্রসার মিশ্রণ আলাদা হয়ে থাকে, সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানবো ।

 

পণ্যের শ্রেণীভেদে প্রসার মিশ্রণ (Promotion Mix Based on the Types of Products):

পণ্য হল এমন কিছু যা গ্রাহকের অভাব, চাহিদা, প্রয়োজন বা চাওয়া মেটানোর জন্য বাজারে অর্পণ করা যেতে পারে। তাই পণ্য বলতে দৃশ্যমান পণ্যদ্রব্য, সেবা বা ধারণা সবকিছুকেই বোঝায়। প্রতিটি পণ্যেরই দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য কিছু বৈশিষ্ট্য এবং সুবিধা রয়েছে যার জন্য ক্রেতারা সেই পণ্য কিনতে উৎসাহিত হয়। পণ্যের প্রকৃতি প্রসার মিশ্রণ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা প্রসারের মিশ্রণ পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়ে থাকে। যেমন- ভোগপণ্যের জন্য সাধারণত ব্যাপক হারে বিজ্ঞাপন প্রয়োজন হয়। কিন্তু শিল্প পণ্যের জন্য মূলতঃ ব্যক্তিক বিক্রয়, সীমিত বিজ্ঞাপন, প্রদর্শনী ইত্যাদির প্রয়োজন হয়।

আবার যেসব পণ্য তুলনামূলকভাবে জটিল এবং প্রযুক্তিগত পণ্য, সেসবের জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় প্রয়োজন। কিন্তু অ-প্রযুক্তিগত পণ্যের প্রচারমূলক হাতিয়ার হিসেবে বিজ্ঞাপন বেশি প্রয়োজন। ব্র্যান্ডের পার্থক্য না থাকলে ব্যক্তিক বিক্রয় প্রচারের জন্য সর্বাধিক গুরুত্ব পেলেও, যেখানে ব্র্যান্ডের মধ্যে সহজেই পার্থক্য করা যায় সেখানে বিজ্ঞাপনের উপর জোর দিতে হবে। নিম্নের চিত্রের সাহায্যে পণ্যের শ্রেণীভেদে প্রসার মিশ্রণ কিভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে তা সহজভাবে দেখানো হলো ।

 

 

বিপণনকারীর দৃষ্টিকোণ থেকে পণ্যকে মূলতঃ দুই ভাগে ভাগ করা যায়, যথা- ভোগ্য পণ্য ও শিল্প পণ্য। নিম্নে পণ্যের শ্রেণীভেদে একটি কোম্পানির প্রসার মিশ্রণ কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

 

ক) ভোগ্য পণ্যের প্রসার মিশ্রণ (Promotion mix for consumer goods):

চুড়ান্ত ভোক্তা কর্তৃক নিজস্ব ভোগ বা পারিবারিক ব্যবহারের জন্য যেসব পণ্য ক্রয় করা হয়, তাকেই সাধারণত ভোগ্য পণ্য বলে। ভোগ্য পণ্য হল চুড়ান্ত ভোক্তাদের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কেনা পণ্য। তাই অনেক সময় ভোগ্য পণ্যকে চূড়ান্ত পণ্যও বলা হয়। জামাকাপড়, খাদ্য পণ্য, সাবান বা ডিশওয়াশারগুলো সাধারণ ভোগ্য পণ্যের উদাহরণ। ভোগ্য পণ্য বিভিন্ন ধরণের হয়ে থাকে বলে একেক ধরণের ভোগ্য পণ্যের জন্য একেক রকম প্রসার মিশ্রণ ব্যবহার করতে হয়। নিম্নে বিভিন্ন প্রকার ভোগ্য পণ্য এবং ভোগ্য পণ্যের শ্রেণীভেদে প্রসার মিশ্রণের ধরন সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো :

১. সুবিধা পণ্য (Convenience goods ):

সুবিধা পণ্যগুলো হল ভোক্তা পণ্য এবং সেবা যা গ্রাহকরা সাধারণত তাৎক্ষনিকভাবে সুবিধাজনক স্থান হতে সুবিধাজনক সময়ে ঘন ঘন এবং নূন্যতম তুলনা ও ক্রয় প্রচেষ্টার মাধ্যমে ক্রয় করে। সুবিধা পণ্যের মধ্যে রয়েছে সাবান, লন্ড্রি ডিটারজেন্ট, ক্যান্ডি, সাময়িকী এবং ফাস্ট ফুড ইত্যাদি। সুবিধা পণ্যের ভিন্নতা অনুসারে কোম্পানির প্রসার মিশ্রণও আবার ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। নিম্নে সুবিধা পণ্যের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী প্রসার মিশ্রণ আলোচনা করা হলো।

১) অত্যাবশ্যকীয় পণ্য (Staple goods):

দৈনন্দিন জীবনযাপন বা বেঁচে থাকার জন্য যেসব পণ্য সামগ্রী অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তাকে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য বলে। এ পণ্যের ক্রেতারা বিস্তৃত এলাকায় বসবাস করেন। তাই এসব পণ্যের জন্য বিজ্ঞাপন সবচেয়ে আদর্শ প্রসার কৌশল হতে পারে। আবার এসব পণ্য সাধারণত ভোক্তারা খুচরা বিক্রেতার কাছে থেকে ক্রয় করে থাকেন। তাই খুচরা বিক্রেতাকে প্রভাবিত করার জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় প্রচেষ্টা ভালো ফল দিতে পারে। পাশাপাশি খুচরা ব্যবসায়ীর পক্ষ থেকে সাধারণ ক্রেতাদের প্রভাবিত করতে বিক্রয় প্রসারের কৌশল হিসেবে পণ্যের বিবরণ সংবলিত সাইনবোর্ড ব্যবহার করা যেতে পারে।

২) জরুরি পণ্য (Emergency goods):

জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন মেটানোর জন্য যেসব পণ্য ক্রয় করা হয় তাকে জরুরি পণ্য বলে। অর্থাৎ, জরুরি প্রয়োজন হলে জরুরি পণ্য কেনা হয়। যেমন- বর্ষাকালে বাইরে যাওয়ার সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলে ছাতা কেনা হয়, তাই ছাতা এক্ষেত্রে জরুরি পণ্য। এ ধরণের পণ্য সাধারণত বিভিন্ন ধরণের আউটলেট বা দোকানে বিতরণ করা হয় যাতে প্রয়োজনের সময় ক্রেতারা সহজেই সেগুলো কিনতে পারেন। এ ধরণের পণ্যের পরিচিতির জন্য বিজ্ঞাপন দেওয়ার পাশাপাশি ব্যক্তিক বিক্রয়ের উপর জোর দেওয়া হয়।

৩) লোভনীয় পণ্য (Impulse goods):

লোভনীয় বা তাৎক্ষনিক পণ্যগুলো হলো এমন পণ্য যা লোকেরা পরিকল্পনা ছাড়াই আবেগ বা ঝোঁকের মাথায় ক্রয় করে। খুচরা বিক্রেতারা তাই সাধারণত এই ধরণের পণ্যগুলোকে সুপারমার্কেট, ফিলিং স্টেশন এবং অন্যান্য খুচরা আউটলেটের চেকআউট কাউন্টারের কাছে রাখেন যাতে সহজেই সেগুলো চোখে পড়ে যায়। খেলনা, ম্যাগাজিন, চকোলেট, স্ন্যাকস, চুইংগাম, ঝালমুড়ি, ফুচকা এবং ক্যান্ডির মতো পণ্যগুলো হলো লোভনীয় পণ্যের উত্তম উদাহরণ। যেহেতু ক্রেতারা ঝোঁকের বশে সাধারণত এসব পণ্য কিনে থাকে, তাই এক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের তেমন কোন ভূমিকা থাকে না বরং ব্যক্তিক বিক্রয় ও বিক্রয় প্রসার কৌশল ভালো কাজ দেয় ।

 

২. শপিং পণ্য (Shopping goods):

পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পণ্যের গুনাগুণ, সুবিধা- অসুবিধা, মূল্য ইত্যাদি যাচাই- বাছাই করে বিভিন্ন দোকানে দোকানে ঘুরে যেসব পণ্য ক্রয় করা হয়, তাকে শপিং বা যাচাই পণ্য বলা হয়। নিম্নে শপিং পণ্যের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী প্রসার মিশ্রণ আলোচনা করা হলো।

১) শৌখিন পণ্য (Fashion goods):

পণ্যের চাকচিক্য বা স্টাইল দেখে আকৃষ্ট হয়ে যেসব পণ্য ক্রয় করা হয়, তাকে শৌখিন পণ্য বলে। ভোক্তার রুচি বা পণ্যের বৈশিষ্ট্যের ঘন ঘন পরিবর্তনের কারনে শৌখিন পণ্যের চাহিদাও ঘন ঘন পরিবর্তিত হয়। যেমন- গহনা, স্মার্টফোন, দামি বাইক ইত্যাদি। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন খুবই কার্যকরী। পাশাপাশি বিক্রয় প্রসার কার্যক্রমও ব্যবহার করা যেতে পারে।

২) সেবা পণ্য (Service goods):

যেসব দীর্ঘস্থায়ী শপিং পণ্য ভোক্তারা প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার জন্য কিনে থাকে কিন্তু মাঝে মাঝে সেসবের প্রয়োজনীয় মেরামত বা সার্ভিসিং এর প্রয়োজন হয়, তাকে সেবা পণ্য বলে। যেমন-ফ্রিজ, টিভি, ওয়াশিং মেশিন, এয়ার কন্ডিশনার ইত্যাদি। এসব পণ্যের পরিচিতির জন্য বিজ্ঞাপন প্রয়োজনীয় হলেও, যেহেতু এসব পণ্য বিক্রি ও সার্ভিসিং করার জন্য কারিগরী জ্ঞানের দরকার হয় তাই এক্ষেত্রে ব্যক্তিক বিক্রয় খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে ।

৩. বিশিষ্ট পণ্য (Specialty goods):

বিশিষ্ট পণ্য হলো একটি ভোগ্য পণ্য যার অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্য বা ব্র্যান্ড পরিচিতি রয়েছে। এই অনন্য বৈচিত্র বা বিশেষ আকর্ষণের জন্য ক্রেতাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিশিষ্ট পণ্যটি ক্রয়ের জন্য একটি বিশেষ ক্রয়ের প্রচেষ্টা চালায়, এমনকি যথেষ্ট অর্থ ব্যয় করতে বা কষ্ট করে অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েও পণ্যটি ক্রয় করতে ইচ্ছুক হয়। যেমন- বগুড়ার দই, কুমিল্লার মাতৃভাণ্ডারের রসমালাই, রংপুরের শতরঞ্জি ইত্যাদি। এসব পণ্যকে ভোক্তাদের নিকট পরিচিত করাতে বিজ্ঞাপন বেশি ব্যবহৃত হয়। তবে বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ব্যক্তিক বিক্রয় কৌশলও প্রয়োগ করা যায়।

৪. অযাচিত পণ্য (Unsought goods):

যেসব ভোগ্য পণ্য সম্পর্কে ভোক্তা হয় জানেন না বা জানেন কিন্তু সাধারণত কিনতে আগ্রহী হন না, তাকে অযাচিত পণ্য বলে। যেমন- জীবন বীমা পলিসি, পূর্বপরিকল্পিত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সেবা, কাফনের কাপড়, কিংবা রেড ক্রসে রক্তদান। এ ধরণের পণ্যের প্রসারের জন্য বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিক বিক্ৰয় খুবই ফলপ্রসূ হতে পারে।

 

খ) শিল্প পণ্যের প্রসার মিশ্রণ (Promotion mix for industrial goods):

যেসব পণ্য চুড়ান্ত ভোগের জন্য কেনা হয় না বরং প্রক্রিয়াজাতকরণ বা পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ভোগ্য পণ্য বা অন্য শিল্প পণ্য উৎপাদনের কাজ করা হয়, তাকে শিল্প পণ্য বলে। নিম্নে বিভিন্ন প্রকার শিল্প পণ্য এবং শিল্প পণ্যের শ্রেণীভেদে প্রসার মিশ্রণের ধরণ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

১. মালামাল ও যন্ত্রাংশ (Materials and parts):

মালামাল ও যন্ত্রাংশ হলো সেসব শিল্প পণ্য যা চূড়ান্ত পণ্য উৎপাদন বা প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ নিজের বিশেষত্ব হারিয়ে পুরোপুরি ভাবে উৎপাদনকারীর পণ্যে প্রবেশ করে। যেমন- ময়দা, তুলা, পাট, তামাক, গ্যাস, সুতা ইত্যাদি। নিম্নে মালামাল ও যন্ত্রাংশের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী প্রসার মিশ্রণ আলোচনা করা হলো।

১) কাঁচামাল (Raw materials):

প্রক্রিয়াকরণ করা হয়নি এমন সব মূল পণ্য যা পরবর্তীতে উৎপাদিত পণ্যের অংশে পরিণত হয়, তাকে কাঁচামাল বলে। কাঁচামালের মধ্যে রয়েছে খামারে উৎপাদিত পণ্য যেমন- গম, তুলা, পশুসম্পদ, ফলমূল, শাকসবজি ইত্যাদি এবং প্রাকৃতিক পণ্য যেমন- মাছ, কাঠ, অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, লোহার আকরিক ইত্যাদি। এসব পণ্যের জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় খুবই কার্যকরী। তবে সীমিত পরিসরে শিল্প সংক্রান্ত ম্যাগাজিনে বিজ্ঞাপনও দেওয়া যেতে পারে।

২) প্রস্তুতকৃত মালামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ (Manufactured materials and parts ):

যেসব শিল্প মালামাল ও যন্ত্রাংশ সরাসরি চুড়ান্ত পণ্যের উপাদান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় তাকে প্রস্তুতকৃত মালামাল ও খুচরা যন্ত্রাংশ বলে। মালামাল উপাদান গুলোকে রুপান্তর করে চুড়ান্ত পণ্য তৈরি হয়, যেমন- আটা, ময়দা, সুতা, সিমেন্ট ইত্যাদি। আর খুচরা যন্ত্রাংশগুলোকে রূপান্তর ছাড়াই চুড়ান্ত পণ্যের রূপ দেওয়া হয়, যেমন- ছোট মোটর, টায়ার ইত্যাদি। এসব পণ্যের জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় ভালো কৌশল হতে পারে। তবে সীমিত পরিসরে বিজ্ঞাপন এবং প্রত্যক্ষ বিপণনও ব্যবহার করা যেতে পারে।

 

২. মূলধন জাতীয় পণ্য (Capital items):

যেসব দামী এবং দীর্ঘস্থায়ী শিল্প পণ্যের সাহায্যে মূল উৎপাদন কার্য পরিচালনা করা হয়, তাকে মূলধন জাতীয় পণ্য বলে। এসব পণ্যের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী স্থাপনা এবং কিছুটা স্বল্পমেয়াদী আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি রয়েছে ।

১)v (Installations):

স্থাপনা গুলো দীর্ঘমেয়াদী মূলধন পণ্য যেমন- কারখানা, অফিস ইত্যাদি এবং স্থির সরঞ্জাম যেমন- জেনারেটর, ড্রিল প্রেস, বড় কম্পিউটার সিস্টেম, লিফট ইত্যাদি এর মত বড় কেনাকাটাকে নির্দেশ করে। এসব পণ্যের প্রসারের জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় খুবই কার্যকরী। পাশাপাশি পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রত্যক্ষ বিপণন এবং সীমিত পরিসরে শিল্প বিজ্ঞাপনও ব্যবহার করা যেতে পারে।

পণ্য ও ক্রেতার শ্রেণী ভেদে এবং পণ্যের জীবন চক্রের স্তর ভেদে প্রসার মিশ্রণ

২) আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতি (Accessory equipments):

আনুষাঙ্গিক যন্ত্রপাতিগুলোর মধ্যে রয়েছে বহনযোগ্য কারখানার সরঞ্জাম এবং হাতিয়ার যেমন- হ্যান্ড টুল, লিফট ট্রাক ইত্যাদি এবং অফিসের সরঞ্জাম যেমন- কম্পিউটার, ফ্যাক্স মেশিন, ডেস্ক ইত্যাদি। এগুলো স্থাপনার তুলনায় স্বল্পমেয়াদী এবং সহজভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। এসব পণ্যের প্রসারের জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় সবচেয়ে ভাল ফল দেয়। তাছাড়া সীমিত পরিসরে বিজ্ঞাপনও ব্যবহার করা যেতে পারে। এর পাশাপাশি প্রত্যক্ষ বিপণনও কিছুটা কার্যকারিতা দেখাতে পারে।

 

৩. সরবরাহ ও সেবা পণ্য (Supplies and services ):

যেসব শিল্প পণ্য কোনভাবেই চূড়ান্ত পণ্যের অংশ নয়, মেয়াদকাল স্বল্প, এবং যেগুলো দৈনন্দিন ব্যবসা পরিচালনা করতে ও ভারী যন্ত্রপাতিগুলোকে কর্মক্ষম রাখতে ব্যবহার করা হয় তাদের সরবরাহ ও সেবা পণ্য বলে ।

১) সরবরাহ (Supplies):

সরবরাহের মধ্যে অপারেটিং সাপ্লাই বা পরিচালন সরবরাহ যেমন- লুব্রিকেন্ট, কয়লা, কাগজ, পেন্সিল ইত্যাদি এবং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সরঞ্জাম যেমন- পেইন্ট, তুলি, ঝাড়ু ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। সরবরাহ গুলোকে শিল্প ক্ষেত্রের সুবিধার পণ্যের সাথে তুলনা করা যায় কেননা সেগুলো সাধারণত নূন্যতম প্রচেষ্টা বা তুলনা করে কেনা হয় ।

২) ব্যবসায় সেবা (Business services):

ব্যবসায় সেবা গুলোর মধ্যে রয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত সেবা যেমন- দরজা বা জানালা পরিষ্কার, কম্পিউটার মেরামত ইত্যাদি এবং ব্যবসায়িক পরামর্শ সেবা যেমন- আইনি পরামর্শ, ব্যবস্থাপনা পরামর্শ, বিজ্ঞাপনী সেবা ইত্যাদি। এসব সেবা সাধারণত চুক্তির অধীনে সরবরাহ করা হয়ে থাকে ।

 

সরবরাহ ও সেবা পণ্যের প্রসারের জন্য ব্যক্তিক বিক্রয় ও প্রত্যক্ষ বিপণন বেশ কার্যকর। এসব পণ্যের ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের ভূমিকা খুবই নগণ্য। তবে পণ্যের পরিচিতির জন্য সীমিত পরিসরে বিজ্ঞাপন দেওয়া যেতে পারে ।

 

ক্রেতার শ্রেণীভেদে প্রসার মিশ্রণ (Promotion Mix Based on the Types of Customers):

ক্রেতারা তাদের চাহিদা বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য পণ্য কিনে থাকেন। আমরা ইতোমধ্যে জেনেছি যে, পণ্যের শ্রেণীভেদে প্রসার মিশ্রণ আলাদা হয়ে থাকে। অনুরূপ ভাবে ক্রেতার শ্রেণীভেদেও আলাদা প্রসার মিশ্রণের প্রয়োজন পরে। অর্থাৎ, ভোক্তার বা বাজারের প্রকৃতি অনুযায়ীও একটি কোম্পানির প্রসার মিশ্রণ আলাদা হয়ে থাকে। যেমন- চুড়ান্ত ভোক্তাদের জন্য ব্যাপকহারে বিজ্ঞাপন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু শিল্প বাজারের ক্রেতাদের ক্ষেত্রে কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজনে ব্যক্তিক বিক্রয় সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করা হয়। কেননা শিল্পীয় ক্রেতাদের জন্য বিজ্ঞাপন মূলতঃ তথ্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, কিন্তু চুড়ান্ত ক্রেতাদের ক্ষেত্রে এটি একইসাথে তথ্যপূর্ণ এবং প্ররোচনামূলক ভূমিকা ও পালন করে।

তাছাড়া লক্ষ্যস্থিত ক্রেতার বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, আয়, ধর্ম, সংস্কৃতি ইত্যাদির উপর নির্ভর করে প্রসারের কৌশলও পরিবর্তিত হয় । কোন উদ্দেশ্যে ক্রেতারা পণ্যটি ক্রয় করছেন, তার ভিত্তিতে ক্রেতাদেরকে মূলতঃ চারভাগে ভাগ করা যায় । যথা- চুড়ান্ত ক্রেতা বা ভোক্তা, খুচরা কারবারি, পাইকারি কারবারি, এবং শিল্পীয় ক্রেতা। নিম্নে চিত্রের মাধ্যমে বিভিন্ন রকম ক্রেতার শ্রেণী বিভাগ এবং সে অনুযায়ী প্রসার মিশ্রণের বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হলো ।

 

 

১) চুড়ান্ত ক্রেতা বা ভোক্তা (Final consumers):

যেসব ক্রেতা নিজের বা পারিবারিক ব্যবহারের জন্য কোন পণ্য ক্রয় করে থাকেন এবং পণ্যের উপযোগীতা নিজেরাই নিঃশেষ করেন, তাদেরকে চুড়ান্ত ভোক্তা বা ক্রেতা বলা হয়। এই ধরণের ক্রেতারা সাধারণত সংখ্যায় অনেক বেশি বা অগণিত হয়ে থাকেন এবং তারা বিস্তৃত অঞ্চলে বসবাস করে থাকেন। তাই এই বিপুল সংখ্যক ক্রেতার কাছে কোম্পানির পণ্যের সংবাদ উপস্থাপন করার জন্য, অর্থাৎ তাদেরকে পণ্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্য এবং পণ্য ক্রয়ের জন্য তাদেরকে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য ব্যাপক আকারে বিজ্ঞাপন ব্যবহার করতে হয়। তাছাড়া ক্ষেত্রভেদে বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ব্যক্তিক বিক্রয়, প্রচার, এবং বিক্রয় প্রসার ইত্যাদি প্রসার হাতিয়ারও ব্যবহার করা যেতে পারে।

২) খুচরা কারবারি (Retailers):

খুচরা ব্যবসায়ীরা ক্রেতার চাহিদা, রুচি ও পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ক্রেতাদেরকে প্রয়োজন অনুসারে তুলনামূলক ছোট ছোট লটে পণ্য সরবরাহ করে থাকে। চূড়ান্ত ক্রেতারা চাইলেই কোম্পানির কাছে থেকে অল্প পরিমাণে পণ্য কিনতে পারেন না। খুচরা কারবারি বা ব্যবসায়ীরা কোম্পানি বা পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে থেকে বেশি পরিমানে পণ্য কিনে এনে চূড়ান্ত ক্রেতাদের কাছে প্রয়োজন অনুসারে পণ্য সরবরাহ করে থাকেন। খুচরা ব্যবসায়ীরা সাধারণত তাদের পণ্যের প্রসারের জন্য নিজস্ব বিজ্ঞাপন প্রদান করেন না। ক্রেতাদেরকে নতুন পণ্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোম্পানি প্রদত্ত বিজ্ঞাপনই এক্ষেত্রে কার্যকর হয়। তবে এক্ষেত্রে ব্যক্তিক বিক্রয় প্রসারের খুবই ফলপ্রসূ একটি কৌশল হতে পারে ।

৩) পাইকারি কারবারি (Wholesalers):

একজন পাইকারি বিক্রেতা হলেন এমন একজন ব্যবসায়ী যিনি কোম্পানি বা উৎপাদকের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে পণ্য পুনঃবিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করেন এবং খুচরা বিক্রেতাদের কাছে অল্প পরিমাণে বা ছোট ছোট লটে বিক্রি করেন। পাইকারি ব্যবসায়ী উৎপাদক এবং খুচরা বিক্রেতার মধ্যে একটি সংযোগ হিসেবে কাজ করেন। সাধারণত একেকজন পাইকারি কারবারি একেকটি পণ্য লাইনের উপর দক্ষ হয়ে থাকেন যেমন- স্টেশনারি, খাদ্যশস্য ইত্যাদি। তারা যেহেতু মানসম্পন্ন পণ্য ক্রয়ের দিকে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তাই পণ্যের মান সম্পর্কে উচ্চ ধারণা তৈরি করতে কোম্পানি গুলো সুনাম সম্পন্ন সাময়িকীগুলোতে তাদের পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি কোম্পানি নিজস্ব বিক্রয় কর্মীদের ব্যক্তিক বিক্রয় প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে ভালো ফল এনে দিতে পারে।

৪) শিল্পীয় ক্রেতা (Industrial buyers):

শিল্পীয় ক্রেতা বলতে সেসব ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক ক্রেতাকে বুঝায় যারা নিজেদের ব্যবহারের জন্য পণ্য না কিনে বরং সেসব পণ্য পুনরায় ব্যবসায়িক কাজে লাগানোর জন্য বা সেসব পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ব্যবসা করার জন্য পণ্য কিনে থাকেন। শিল্পীয় ক্রেতারা কোম্পানির জন্য যে কাঁচামাল কিনেন তা ব্যবসা পরিচালনার জন্য বা ভোক্তাদের জন্য চুড়ান্ত পণ্য তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই শিল্পীয় ক্রেতাদের ক্রয়ের ধরণ সাধারণত পাইকারি, খুচরা বা চুড়ান্ত ক্রেতাদের মতো অতটা সরল হয় না।

তারা খুবই যৌক্তিকভাবে প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা করে অনেক সরবরাহকারীদের মধ্যে থেকে পণ্যের গুনাগুণ, দাম, উৎস, সরবরাহ পদ্ধতি ইত্যাদির উপর ভিত্তি করে সবচেয়ে কাম্য সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে থাকেন। এই ধরণের ক্রেতারা সাধারণত সংখ্যায় অনেক কম হয় এবং একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত হয়। তাই এক্ষেত্রে বিক্রয় প্রসারের কৌশল হিসেবে ব্যক্তিক বিক্রয় ক্রেতাদের পণ্য সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত করতে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব ক্রেতার কাছে পণ্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিজ্ঞাপন খুব একটা কাজে আসে না । উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, বিভিন্ন রকম ক্রেতারা বিভিন্ন রকম উদ্দেশ্যে পণ্য ক্রয় করে থাকেন। তাই ক্রেতাদের শ্রেণীভেদে কোম্পানিকে বিপণন প্রসার মিশ্রণ নির্ধারণ করতে হয়।

 

পণ্যের জীবন চক্রের বিভিন্ন স্তরভেদে প্রসার মিশ্রণ (Promotion Mix at Different Stages of Product Life Cycle):

পণ্য বাজারে ছাড়াই হয় ভোক্তাদের প্রয়োজন, অভাব বা চাহিদার মেটানোর জন্য। একটি পণ্য বাজারে ছাড়ার পর থেকে শুরু করে বাজার থেকে পণ্যটি তুলে নেওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়ে পণ্যটি যেসব পর্যায় বা স্তর অতিক্রম করে, তাকে পণ্যের জীবনচক্র বলে। অর্থাৎ, একটি পণ্যের জীবনচক্র হল পণ্যটি প্রথম ভোক্তাদের কাছে উপস্থাপিত হওয়ার পর থেকে এটি বাজার থেকে সরিয়ে নেওয়া পর্যন্ত সময়ের দৈর্ঘ্য। পণ্যের জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়ে বিপণনের উদ্দেশ্য এবং কৌশল ভিন্ন হয়ে থাকে। পণ্যের জীবনচক্রের সূচনা পর্যায়ে পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অধিক হারে বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ব্যক্তিক বিক্রয়, বিক্রয় প্রসার ও জনসংযোগ প্রয়োজন।

প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে বাজারের অংশীদারিত্ব বাড়াতে বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিক বিক্রয়ের ধারাকে অব্যাহত রাখা উচিত। পূর্ণতার পর্যায়ে প্ররোচক বিজ্ঞাপন এবং বিক্রয় প্রসারের কৌশলগুলি খুবই উপকারী ভূমিকা পালন করে। কিন্তু পতনের স্তরে বিজ্ঞাপন এবং বিক্রয় প্রসার হ্রাস করে নূন্যতম পর্যায়ে নিয়ে আসা হয় এবং বেশি বেশি জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পণ্যের জীবনচক্রের স্তরভেদে প্রসার মিশ্রণ কেমন হতে পারে, তা চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো।

 

 

১) পণ্য উন্নয়ন স্তর ( Product development stage):

পণ্যের জীবনচক্রের প্রথম স্তর হলো পণ্য উন্নয়ন স্তর। এখানে কোম্পানি একটি পণ্য বাজারে নিয়ে আসার জন্য বাজার গবেষণা শুরু করে। পণ্যটি বাজারে আসার আগে, কোম্পানি পণ্য ধারণা তৈরি করে, ধারণাটি পরীক্ষা ও পরিমার্জন করে এবং একটি আবির্ভাব কৌশল তৈরি করে। পণ্য উন্নয়ন স্তরে যেহেতু পণ্যটির কোন বাস্তব অস্তিত্ব থাকে না, তাই এই স্তরে বিক্রয় শূন্য হয় এবং কোম্পানির প্রচুর বিনিয়োগ খরচ হয়।

প্রকৃত সম্ভাব্য ব্যবহারকারীদের সাথে পণ্য ধারণা পরীক্ষা করা এই স্তরের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ । তাই কিছু প্রাথমিক প্রসারমূলক প্রচেষ্টা কোম্পানি এই স্তরে গ্রহণ করতে পারে। যদিও পণ্য উন্নয়ন স্তরে একটি পণ্যের জন্য নিবিড় বিক্রয় প্রচেষ্টার প্রয়োজন হয়না, তবুও পণ্যটি নতুন হলে কিছু মাত্রার প্রসারের প্রয়োজন হতে পারে। যেমন- সোশ্যাল নেটওয়ার্কে সম্ভাব্য পণ্য নিয়ে টিজিং পোস্ট দেওয়া, প্রেস রিলিজ, বিলবোর্ড বা রাস্তায় ইন্টারেক্টিভ প্রচারণাও চালানো যেতে পারে ।

২) সূচনা স্তর (Introduction stage):

কোম্পানি একটি পণ্য তৈরি করে এটিকে বাজারে আবির্ভাবের জন্য প্রস্তুত হলে, পণ্যটির জীবনচক্রের একটি নতুন স্তর শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ, একটি পণ্য যখন প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ক্রেতা চাহিদা মেটানোর জন্য বাজারে প্রবেশ করে, তখন তাকে পণ্যের জীবনচক্রের সূচনা স্তর বলে। সূচনা স্তরে পণ্যটি বাজারে প্রথমবারের মতো প্রবর্তিত হয় বলে বিক্রয় বৃদ্ধি ধীর হয়। পণ্য প্রবর্তনের অত্যধিক ব্যয়ের কারণে এই পর্যায়ে কোম্পানির মুনাফা থাকেনা বললেই চলে। একটি নতুন পণ্য চালু করা যে কোন কোম্পানির জন্যই একটি বিশাল বিপণন প্রচেষ্টা।

কোম্পানিকে এই পর্যায়ে একটি অভীষ্ট বাজার তৈরি করতে হয় এবং বিস্তৃত সচেতনতা তৈরির মাধ্যমে তাদের কাছে পৌছানোর জন্য উল্লেখযোগ্য ভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। টিভি বিজ্ঞাপন এই পর্যায়ে খুবই কার্যকর হতে পারে। পাশাপাশি দেশের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র, সাময়িকী, রেডিও বা অনলাইন মাধ্যমে ব্যাপক বিজ্ঞাপন প্রচার করা যেতে পারে। তাছাড়া পণ্যের প্রদর্শনীর ব্যবস্থা, বিনামূল্যে নমুনা বিতরণ, জনসংযোগ ইত্যাদি প্রসার কার্যক্রমও গ্রহণ করা যেতে পারে।

৩) প্রবৃদ্ধি স্তর (Growth stage):

পণ্য জীবনচক্রের তৃতীয় স্তরটি প্রবৃদ্ধির স্তর। এই স্তরে পণ্যের বিক্রি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং এটি বাজারে একটি প্রতিষ্ঠিত পণ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধি হলো দ্রুত বাজারের গ্রহনযোগ্যতা এবং মুনাফা বৃদ্ধির একটি সময়। এই পর্যায়ে বিপণন প্রসারের লক্ষ্য ভোক্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা থেকে বাজারে পণ্য বা ব্র্যান্ডের উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করার দিকে ঘুরে যায়। যেহেতু প্রতিযোগী পণ্য এই স্তরে বাজারে পুরোদমে প্রবেশ করতে থাকে, তাই এই স্তরে ক্রেতাদের দেখাতে হবে কেন তারা প্রতিযোগী পণ্যের তুলনায় কোম্পানির পণ্যটিই বেছে নেবেন।

বিক্রয় বৃদ্ধির সাথে সাথে বিপণনকারীরা তাদের পণ্যে নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করতে পারে, বিক্রয়োত্তর সেবাগুলোকে বাড়িয়ে দিতে পারে, সহায়তা সেবার পরিধি বাড়াতে পারে, কিংবা নতুন বিতরণ প্রণালী খুলতে পারে। পাশাপাশি বিক্রয় বৃদ্ধির ধারাকে ধরে রাখার জন্য ব্যাপক মাত্রায় বিজ্ঞাপন দিতে হবে। সেই সাথে নিজস্ব পণ্য বা ব্র্যান্ডের প্রতি আনুগত্য ধরে রেখে প্রতিযোগীদের মোকাবেলা করার জন্য বিভিন্ন ধরণের বিক্রয় প্রসার কৌশল যেমন- প্রিমিয়াম, কুপন, নমুনা বিতরণ, রিবেট ইত্যাদি গ্রহণ করা যেতে পারে।

৪) পূর্ণতা স্তর (Maturiy stage):

পূর্ণতা হলো পণ্য জীবনচক্রের সর্বোচ্চ শিখর বা বিন্দু। পণ্যটির বিক্রি যখন সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছে যায় এবং ক্রমে স্থিতিশীল হতে শুরু করে, ফলে বিক্রি ও মুনাফা ধীর গতিতে অব্যাহত থাকে তখন তাকে পূর্ণতা বলে। অন্যভাবে বলা যায়, পূর্ণতা হলো বিক্রয় বৃদ্ধিতে ধীরগতির সময় কারন ইতোমধ্যে পণ্যটি বেশিরভাগ সম্ভাব্য ক্রেতাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছে। তাই প্রতিযোগী পণ্যের বিরুদ্ধে কোম্পানির পণ্যকে রক্ষা করার জন্য বিপণন ব্যয় বৃদ্ধির কারনে মুনাফা বন্ধ হয়ে যায় বা মুনাফার হার হ্রাস পেতে থাকে।

এমতাবস্থায় কোম্পানির বিপণন প্রচারাভিযানগুলো গ্রাহক সচেতনতার পরিবর্তে পণ্যের স্বতন্ত্র গুনাগুণ বা উচ্চতর পণ্য বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রচার করে পণ্য বা ব্র্যান্ডের পৃথকীকরণের উপর ফোকাস করে। এই স্তরে তাই ব্যাপক মাত্রায় বিক্রয় প্রসার কৌশলের প্রয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিযোগিতার মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞাপনের ব্যবহারও বাড়াতে হবে। এছাড়া পণ্যমূল্য হ্রাস করা, বাণিজ্যিক প্রসার অফার দিয়ে মধ্যস্থকারীদের আনুগত্য বাড়ানো, দোকানের সামনের সারিতে পণ্য প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি প্রসার কৌশলের দিকে গুরুত্ব দিতে হবে।

৫) পতন স্তর (Decline stage):

ঠিক মানুষের জীবনের মতো প্রতিটি পণ্যেরও জীবনকাল একসময় শেষ হয়ে যায়। এমনকি সর্বাধিক প্রতিষ্ঠিত পণ্যগুলোর বিক্রিও একসময় কমে যায় এবং জনপ্রিয়তা হ্রাস পায়। একেই পণ্য জীবনচক্রের পতন বলা হয়। পতন হলো জীবনচক্রের সেই সময়কাল যখন পণ্যের বিক্রয় এবং মুনাফা কমে যায়।

যখন কোন পণ্য এমন একটি অবস্থায় পৌঁছে যায়, তখন বিপণনকারীকে অবশ্যই পণ্যটি বন্ধ করা, এটির নতুন কোন ব্যবহার খুঁজে বের করা, পণ্য বা কোম্পানি বিক্রি করা, বা নতুন পণ্য তৈরি করে একটি নতুন বাজারে টিকে থাকার চেষ্টা করা ইত্যাদির দিকে নজর দিতে হবে। বিপণনকারীকে প্রতিটি সম্ভাব্য বিকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সুবিধা ও অসুবিধাগুলো যত্ন সহকারে যাচাই করে দেখতে হয়। এই স্তরে বিজ্ঞাপন দিয়ে খুব একটা লাভ হয়না। তবে বিক্রয় প্রসারের কিছু কৌশল যেমন- বাট্টা প্রদান, অ্যালাউন্স প্রদান, বা মূল্যছাড় ইত্যাদি দিয়ে পণ্যের বিক্রিকে আরো কিছুদিন ধরে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে।

উপরের আলোচনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, পণ্যের জীবনচক্রের বিভিন্ন স্তরের জন্য কোম্পানিকে বিভিন্ন রকম প্রসার কৌশল নিতে হয়। তবে এক্ষেত্রে একটি কথা খুব গুরুত্ব সহকারে মনে রাখতে হবে যে, কোম্পানি বা পণ্যের ধরণ অনুযায়ী একেকটি পণ্যের জীবনচক্রের স্তরগুলোকে পৃথকভাবে বিবেচনা করে সেই অনুযায়ী প্রসার মিশ্রণের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।

 

পাঠের সারসংক্ষেপ:

পণ্যের প্রকৃতি প্রসার মিশ্রণ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক। পণ্যের প্রকৃতি অনুযায়ী ভোগ্য ও শিল্প পণ্যের জন্য | প্রসার মিশ্রণ পরিবর্তিত হয়ে থাকে। ভোগ্য পণ্য হল চুড়ান্ত ভোক্তাদের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যবহারের জন্য কেনা পণ্য। ভোগপণ্যের জন্য তাই সাধারনত ব্যাপক হারে বিজ্ঞাপন প্রয়োজন হয়। পক্ষান্তরে শিল্প পণ্য চুড়ান্ত ভোগের জন্য কেনা হয় না বরং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে ভোগ্য পণ্য বা অন্য শিল্প পণ্য উৎপাদনের কাজে ব্যবহার করা হয় । শিল্প পণ্যের জন্য তাই মূলতঃ ব্যক্তিক বিক্রয়, সীমিত বিজ্ঞাপন, প্রদর্শনী ইত্যাদির প্রয়োজন হয়। আবার ক্রেতার শ্রেণীভেদেও প্রসার মিশ্রণ আলাদা হয়ে থাকে।

চুড়ান্ত ভোক্তা, খুচরা বিক্রেতা, পাইকার, বা শিল্পীয় ক্রেতার জন্য আলাদা আলাদা প্রসার মিশ্রণের প্রয়োজন হয়। যেমন- চুড়ান্ত ভোক্তাদের জন্য ব্যপকহারে বিজ্ঞাপন ব্যবহার করা হয়। কিন্তু শিল্প বাজারের ক্রেতাদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিক বিক্রয় সর্বাধিক ব্যবহৃত হয়। আবার খুচরা ব্যবসায়ীদের জন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে কোম্পানি প্রদত্ত বিজ্ঞাপন এবং ব্যক্তিক বিক্রয় প্রসারের খুবই ফলপ্রসূ একটি কৌশল হতে পারে। কিন্তু পাইকারি বিক্রেতারা উৎপাদকের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে পণ্য পুনঃবিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ক্রয় করে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে অল্প পরিমাণে বিক্রি করেন বলে কোম্পানির নিজস্ব বিক্রয় কর্মীদের ব্যক্তিক বিক্রয় প্রচেষ্টা এক্ষেত্রে ভালো ফল এনে দিতে পারে।

আবার শিল্পীয় ক্রেতারা কোম্পানির জন্য যে কাঁচামাল কিনেন তা ব্যবসা পরিচালনার জন্য বা ভোক্তাদের জন্য চুড়ান্ত পণ্য তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়। তাই এক্ষেত্রে বিক্রয় প্রসারের কৌশল হিসেবে ব্যক্তিক বিক্রয় সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পণ্যের জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়ে বিপণনের উদ্দেশ্য এবং কৌশল ভিন্ন হয় বলে প্রসার মিশ্রণও ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন-পণ্যের জীবনচক্রের সূচনা পর্যায়ে পণ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য অধিক হারে বিজ্ঞাপন, প্রবৃদ্ধির পর্যায়ে বাজারের অংশীদারিত্ব বাড়াতে বিজ্ঞাপন ও ব্যক্তিক বিক্রয়, পূর্নতার পর্যায়ে প্ররোচক বিজ্ঞাপন এবং বিক্রয় প্রসার, এবং পতনের স্তরে বেশি বেশি জনসংযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।

১ thought on “পণ্য ও ক্রেতার শ্রেণী ভেদে এবং পণ্যের জীবন চক্রের স্তর ভেদে প্রসার মিশ্রণ”

Leave a Comment