নতুন পণ্য ও পণ্য মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণের কৌশলসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “মূল্য নির্ধারণের কৌশলসমূহ” ইউনিট ১০ এর অন্তর্ভুক্ত।
নতুন পণ্য ও পণ্য মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণের কৌশলসমূহ
আমরা পূর্বের পাঠে আলোচনায় জেনেছি যে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা, পরিবেশগত এবং প্রতিযোগিতামূলক সকল বিষয় বিবেচনা করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রতিষ্ঠান কোনো পণ্যের জন্য একক মূল্য নির্ধারণ করে না বরং একটি মূল্য কাঠামো তৈরি করে যা পণ্যের জীবনচক্র; দাম ও চাহিদার তারতম্য; ক্রেতার বৈচিত্রতা এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশের সাথে পরিবর্তিত হয়। এই পাঠে বিভিন্ন মূল্য পরিস্থিতিতে পণ্যের মূল্য কীভাবে নির্ধারণ করা হয় তার কৌশলসমূহ আলোচনা করা হয়েছে।
নতুন পণ্যের মূল্য নির্ধারণ কৌশলসমূহ (New-Product Pricing Strategies):
পণ্যের জীবনচক্রের প্রতিটি পর্যায়ের সাথে সাথে পণ্যের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ কৌশল পরিবর্তিত হয়। নতুন পণ্যের ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের কৌশল সাধারণত দুই রকম হয়ে থাকে, তা নিচে আলোচনা করা হলো-
১. বাজার স্কিমিং মূল্য কৌশল (Market-Skimming Pricing):
এই কৌশলে নতুন পণ্য প্রবর্তনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের জন্যে উচ্চ মূল্য ধার্য করে এবং বাজারের আয়ের অংশটুকু তুলে নেয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান এমনভাবেই তার বাজার লক্ষ্যস্থিত করে যেন নির্দিষ্ট সেই বাজার বিভাগ উচ্চ মূল্যে পণ্য ক্রয় করতে সক্ষম ও আগ্রহী থাকে। বাজার স্কিমিং কৌশলে প্রতিষ্ঠান অল্প সংখ্যক বিক্রয়ে জোর দেয় কিন্তু প্রতিটি বিক্রয়ই লাভজনক বিক্রয় হয়ে থাকে ।
উদাহরণ হিসেবে অ্যাপল ( Apple Inc.)-এর কথা বলা যায়। আইফোন, আইপ্যাড বা ম্যাকের প্রতিটি নতুন প্রজন্মের নতুন মডেল উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করে বিক্রয় করে। বাজার স্কিমিং মূল্য কৌশলের নির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে, কারণ সব প্রতিষ্ঠান এই কৌশল অবলম্বন করে লাভবান হবে না। প্রথমত, পণ্যের গুণমান এবং ব্র্যান্ড ইমেজ অবশ্যই এর উচ্চতর দামকে সমর্থন করবে এবং পর্যাপ্ত ক্রেতা পণ্যটি উচ্চ মূল্যে ক্রয় করতে চাইবে। দ্বিতীয়ত, অল্প সংখ্যক পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেশি হবে না এবং সর্বশেষে প্রতিযোগীরা সহজেই বাজারে প্রবেশ করতে সক্ষম হবে না।
২. বাজারে প্রবেশ মূল্য কৌশল (Market-Penetration Pricing):
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্যের সূচনা পর্বে বাজারের গভীরে দ্রুত প্রবেশের জন্য কম মূল্য ধার্য করার কৌশলকে বাজারে প্রবেশ মূল্য কৌশল বলে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্রুত প্রচুর সংখ্যক ক্রেতাকে আকর্ষণ করা এবং বৃহত্তর বাজার অংশ দখল নিশ্চিত করা। প্রতিষ্ঠান এই কৌশলটি অনুসরণ করে, বেশি পরিমাণে বিক্রয়ের জন্য তারা কম মূল্য ধার্য করে বা বাট্টা দেয়। বিক্রয় বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের খরচ কমে আসে, তখন তারা আরো কম দামে পণ্য বিক্রয় করতে পারে। যেমন: সিম্ফনি (Symphony) মোবাইল সেট কোম্পানি কম মূল্যে স্মার্টফোন বাজারে নিয়ে আসার মাধ্যমে নির্দিষ্ট বাজারে একটি স্থান দখল করে নেয়।
বাজারে ঢোকা মূল্য কৌশল নির্দিষ্ট শর্ত পালন করলে ফলপ্রসূ হয়। পণ্যের বাজারটি অত্যন্ত মূল্য সংবেদনশীল হতে হবে, যাতে কম মূল্যে পণ্য বিক্রয় করার মাধ্যমে আরো বাজার প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। বিক্রয় বৃদ্ধির সাথে সাথে উৎপাদন ও বণ্টন খরচ অবশ্যই হ্রাস পেতে হবে এবং নিম্ন মূল্য কৌশলটি প্রতিযোগীদের দূরে সরিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট হবে।

পণ্য মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণ কৌশলসমূহ (Product Mix Pricing Strategies):
একটি পণ্য মিশ্রণের অংশ হিসেবে পণ্যের দাম নির্ধারণের কৌশল জটিল ও ভিন্ন হয়। পণ্য মিশ্রণে বিভিন্ন পণ্য রয়েছে, যাদের একে অপরের চাহিদা ও ব্যয়ের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে আবার বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করতে হয়। পণ্য মিশ্রণের কৌশলগুলো নিচে আলোচনা করা হলো-
১. পণ্য সারি মূল্য নির্ধারণ ( Product Line Pricing):
এই কৌশলে একটি পণ্য সারির মধ্যে বিভিন্ন পণ্যের মধ্যে উৎপাদন ব্যয়ের পার্থক্য, পণ্যের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রতি ক্রেতার মূল্যায়ন এবং প্রতিযোগীদের মূল্য বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে যেমন: কোনো ক্রেতা কোহিনূর কোম্পানির স্যান্ডালিনা সাবান ক্রয় করতে চাইলে এই পণ্য সারির বিভিন্ন সাবান থেকে তার পছন্দ মতো সাবান ক্রয় করতে পারে। ক্রেতা ৭৫, ১০০ বা ১২৫ গ্রামের সাবান যথাক্রমে ২৬, ৩৪ ও ৪৪ টাকায় ক্রয় করতে পারবে।
২. ঐচ্ছিক পণ্য মূল্য নির্ধারণ (Optional Product Pricing):
এই কৌশলে বিপণনকারী প্রধান বা মূল পণ্যের সাথে ঐচ্ছিক বা আনুষঙ্গিক পণ্যের মূল্য বিবেচনা করে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করে। যেমন: গাড়ির সাথে সাউন্ড সিস্টেম (Sound sytem) বা জিপিএস (GPS) বিক্রয় করার ক্ষেত্রে ঐচ্ছিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

৩. ক্যাপটিভ পণ্য মূল্য নির্ধারণ (Captive Product Pricing):
এই কৌশলে এমন পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয় যা মূল পণ্য ব্যবহার করার জন্য অবশ্যই প্রয়োজন হয়। যেমন: কার্টিজ (Cartridge), যা প্রিন্টার (Printer) ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন; ই-বুক (E-book), যা পড়ার জন্য ই-বুক রিডার ( E-book reader) দরকার হয় এবং ভিডিও গেমস, যা ভিডিও গেমস কনসোল (Video games console) দিয়ে ব্যবহার করতে হয়।
৪. উপজাত পণ্য মূল্য নির্ধারণ (By Product Pricing):
প্রধান পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক করার জন্য বিপণনকারী উপজাত পণ্য মূল্য নির্ধারণের কৌশল অবলম্বন করে। এই কৌশলের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনের পর বিপুল পরিমাণের উপজাত হতে রেহাই পাওয়ার জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান এমন কোনো বাজার খোঁজ করে বিক্রয় করে যে বাজারে উপজাতটি পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব হয়। এতে বিপণনকারীর খরচ কমে অনেক সময় লাভবানও হতে পারে। যেমন: নারিকেল তেল প্রস্তুতকারী ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান নারিকেলের উপজাত হিসেবে নারিকেলের আঁশ বা খোসা বিক্রয় করতে পারে রশি, তোশক তৈরিকারী ব্যবসায়ীর কাছে।
৫. বান্ডেল পণ্য মূল্য নির্ধারণ ( Product Bundle Pricing):
বিপণনকারী এই কৌশলের মাধ্যমে কয়েকটি পণ্যের সংমিশ্রণ করে একটি বান্ডেল তৈরি করে হ্রাসকৃত মূল্যে একসাথে পণ্যগুলো বিক্রয় করে। যেমন: রাঁধুনীর ১০০ গ্রামের হলুদ ও মরিচ গুঁড়া আলাদাভাবে ক্রয় করলে দাম যথাক্রমে ৪৮ ও ৫০ টাকা। রাঁধুনী বান্ডেল পণ্য মূল্য নির্ধারণ করে ১০০ গ্রামের হলুদ ও মরিচ গুঁড়া বিক্রয় করতে পারে ৯০ টাকায়। এতে ক্রেতা আলাদাভাবে ৯৮ টাকায় ক্রয় করার পরিবর্তে ৯০ টাকায় ক্রয় করতে বেশি উৎসাহী হবে, যদিও তার হয়তো দুটি পণ্যের মধ্যে একটির প্রয়োজন ছিল।

নতুন পণ্য ও পণ্য মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণের কৌশলসমূহ পাঠের সারসংক্ষেপ:
নতুন পণ্যের মূল্য নির্ধারণ কৌশলগুলো হলো- বাজার স্কিমিং মূল্য কৌশল ও বাজারে ঢোকা মূল্য কৌশল। পণ্য | | মিশ্রণের মূল্য নির্ধারণ ৫টি কৌশল রয়েছে; সেগুলো হলো- পণ্য সারি; ঐচ্ছিক পণ্য; ক্যাপটিভ পণ্য; উপজাত পণ্য; এবং বান্ডেল পণ্য মূল্য নির্ধারণ।
