মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ

মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর  “মূল্য নির্ধারণের কৌশলসমূহ” ইউনিট ১০ এর অন্তর্ভুক্ত।

 

মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ

 

পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ

Steps of Determining Price

বিপণনকারীকে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করার জন্য কতগুলো ধাপ অনুসরণ করে যা চিত্র নং ১০.২ এ দেখানো হয়েছে। প্রথমত মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয়। এরপর বর্তমান বিক্রয়ের পরিমাণ যাচাই করে ভবিষ্যতের চাহিদা নিরূপন করা হয়। পণ্য প্রস্তুতের জন্য যেসব ব্যয় সংঘটিত হয় তা মূল্যায়ন করা হয়। এরপর প্রতিযোগীদের ব্যয়, মূল্য এবং অর্পন বিশ্লেষণ করা হয়। মূল্য নির্ধারণেল পদ্ধতিসমূহকে পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

 

 

ক) মূল্যের উদ্দেশ্য (Objectives of Pricing):

নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিপণনকারি মূল্য নির্ধারণ করে। মূল্য স্থির করার পূর্বেই বিপণনকারিকে মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্য ঠিক করে নিতে হয়। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিকট মূল্য নির্ধারণের উদ্দেশ্য বিভিন্ন প্রকার হতে পারে। বিনিয়োগ বা নিট বিক্রয়ের উপর নির্দিষ্ট শতকরা হারে মুনাফা অর্জনের জন্য কোন প্রতিষ্ঠান পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে মুনাফার হার একই রকম থাকতে পারে; তবে বিক্রিত পণ্যের পরিমাণে হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে সাথে মোট মুনাফার পরিমাণে তারতম্য হয়। পণ্যের মূল্যে স্থিতিশীলতা বজায় রেখে মুনাফা অর্জন কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্য থাকে।

যেসব শিল্পে চাহিদা ঘন ঘন, এমনকি মাঝে মাঝে ব্যাপকভাবে উঠানামা করে, সেসব শিল্পের অন্তর্গত বৃহৎ ফার্মসমূহ তাদের মূল্য নির্ধারণে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে। ক্ষুদ্র এবং বৃহৎ সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের অনেক ক্ষেত্রে মূল্য নির্ধারণের অন্যতম লক্ষ্য হলো বর্তমানে দখলীকৃত বাজার অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টা করে কিংবা বাজারের পরিধি আরও বিস্তৃত করার চেষ্টা করা। একটি প্রতিষ্ঠান কতটুকু বাজার তার দখলে আছে তা বিভিন্ন উপায়ে নির্ণয় করতে পারে। সে যদি দেখে যে, বর্তমান বাজার বজায় রাখতে পারলেই তার জন্য যথেষ্ট। তবে সে এমনভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করতে পারে যেন তার বাজার বিঘ্নিত না হয়। পণ্যের বিক্রির পরিমাণ বৃদ্ধি করাও মূল্য নির্ধারণের অন্যতম উদ্দেশ্য।

অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেরই বিক্রয় বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে সঠিকভাবে মূল্য নির্ধারণের জন্য প্রচেষ্টা চালায়। তারা এমনভাবে মূল্য নির্ধারণ করে যাতে পণ্যের বিক্রয় বৃদ্ধি পায়। অনেক প্রতিষ্ঠান, তা বড় কিংবা ছোট যাই হোক না কেন, শুধুমাত্র প্রতিযোগিতা মোকাবেলা করার জন্য সচেতনভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। একই জাতীয় পণ্য উৎপাদকের প্রতিযোগিতা প্রতিহত করার উদ্দেশ্য নিয়েও অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। অধিক পরিমাণ মুনাফা অর্জনের জন্যে অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্য হিসেবে অধিক মুনাফা সম্ভবত অন্যান্য পলিসির চেয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বেশি পছন্দনীয় ও অধিক ব্যবহৃত ।

 

খ) চাহিদা নির্ধারণ (Determining Demand)ঃ

১. বাজার ও চাহিদা (Market and Demand): যেকোনো পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করার পূর্বে বিপণনকারীকে মূল্যের সাথে চাহিদার সম্পর্ক জানতে হয়। ভোগ্য ও শিল্প পণ্যের ক্ষেত্রে চাহিদা ও মূল্যের সম্পর্ক ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। চাহিদা ও মূল্যের সম্পর্ক বিভিন্ন ধরনের বাজারে আলাদা হয়ে থাকে।

প্রথমত, পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক (Pure competition market) বাজারে অসংখ্য ক্রেতা ও বিক্রেতা থাকে এবং প্রত্যেক বিক্রেতা একই ধরনের পণ্য বিক্রয় করে থাকে। এই বাজারে পণ্যের মূল্য সব জায়গায় একই থাকে এবং বিক্রেতা এককভাবে পণ্যের চাহিদা ও মূল্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।

দ্বিতীয়ত, একচেটিয়া প্রতিযোগিতামূলক (Monopolistic competition market) বাজারে অসংখ্য ক্রেতা-বিক্রেতা থাকে এবং পণ্যের একক মূল্যের পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট একই মূল্য পরিসরে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। এ ধরনের বাজারে প্রতিযোগীর থেকে গুণগত মান, বৈশিষ্ট্য, স্টাইল বা সেবায় ভিন্নতা বা পার্থক্য রেখে স্বতন্ত্রভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।

তৃতীয়ত, অলিগোপলি বাজারে (Oligopoly market) সীমিত সংখ্যক বিক্রেতা থাকে এবং প্রত্যেকেই সমজাতীয় বা বিকল্প পণ্য বিক্রয় করে থাকে। এই বাজারে প্রতিযোগীর বিপণন কৌশল বিবেচনা করে মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয়। সর্বশেষে, পূর্ণ একচেটিয়া বাজারে (Pure monopoly market) একজন মাত্র বিক্রেতা থাকে। এই বাজারে বিক্রেতা তার ইচ্ছানুযায়ী মূল্য নির্ধারণ করে এবং ক্রেতা সেই নির্ধারিত মূল্যে পণ্য ক্রয় করে থাকে ।

২. মূল্য ও চাহিদার সম্পর্ক (Analyzing Price Demand Relationship): মূল্যের পরিবর্তনে পণ্যের চাহিদায় ভিন্নতা আসতে পারে। মূল্যের সাথে চাহিদার সম্পর্ককে চাহিদা বিধি বলে। সাধারণত এই সম্পর্ক বিপরীতমুখী অর্থাৎ পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলে চাহিদা হ্রাস পায় আবার মূল্য কমলে চাহিদা বৃদ্ধি পায়। একটি নির্দিষ্ট সময়ে ধার্যকৃত বিভিন্ন মূল্যে বাজার কত একক ক্রয় করে তা যে রেখার মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় তাকে চাহিদা রেখা বলে । চিত্র নং ১০.৩-এর (ক) ও (খ)-এ চাহিদা রেখার সাহায্যে পণ্যের মূল্য ও চাহিদার সম্পর্ক দেখানো হলো। চিত্র ১০.৩ (ক)-এ দেখানো হয়েছে যে মূল্য থেকে কমানো হলেও বাজারে পণ্যের বিক্রয় সেই হারে বাড়েনি। এই সম্পর্ককে অস্থিতিস্থাপক চাহিদা বলে।

যেমন: নিত্যব্যবহার্য পণ্য চাল, ডাল ইত্যাদির চাহিদা হলো অস্থিতিস্থাপক চাহিদা। অন্যদিকে চিত্র ১০.৩ (খ)-এ দেখানো হয়েছে যে পণ্যের মূল্য থেকে কমানোর ফলে দাম যে হারে কমেছে চাহিদা তার চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। যেমন: বিলাসবহুল পণ্য দামি আসবাবপত্র, গাড়ি ইত্যাদি। এ ধরনের চাহিদাকে স্থিতিস্থাপক চাহিদা বলে।

 

 

৩. চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা (Price Elasticity of Demand): পণ্যের মূল্য পরিবর্তনের সাথে সাথে চাহিদার যে পরিবর্তন হয় তাকে চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা বলে। চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতার সূত্র হলো-

চাহিদার মূল্য স্থিতিস্থাপকতা = চাহিদার পরিবর্তনের শতকরা হার/মূল্য পরিবর্তনের শতকরা হার

পণ্যের চাহিদা স্থিতিস্থাপক বা অস্থিতিস্থাপক হতে পারে। যেমন: ১০% মূল্যের বৃদ্ধিতে ৩০% চাহিদা হ্রাস পেল আবার ১০% মূল্যের বৃদ্ধিতে কোনো পণ্যের চাহিদা অপরিবর্তিত বা সামান্য পরিবর্তন হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানকে স্থিতিস্থাপকতা বিবেচনা করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন ।

গ) ব্যয় নিরূপন (Estimating Cost )

মূল্য নির্ধারণের জন্য ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের সংঘটিত সকল ব্যয়কে গণনা করতে হয়। এর জন্য ব্যয়ের প্রকারভেদ, উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয়ের ধরন ও উৎপাদন অভিজ্ঞতার চলক হিসেবে ব্যয় বিষয়গুলো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়।

১. ব্যয়ের প্রকারভেদ: সাধারণত স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল ব্যয়ের মাধ্যমে মোট ব্যয়কে গণনা করা যায়। স্থায়ী ব্যয় (Fixed Cost) হলো উৎপাদন ও বিক্রয়ের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে যে ব্যয়ে কোনো পরিবর্তন হয় না এমন সকল ব্যয়ের সমষ্টি। পরিবর্তনশীল ব্যয় (Variable Cost) হলো উৎপাদন ও বিক্রয়ের পরিমাণ হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে সাথে যে ব্যয়ের পরিবর্তন হয় তাদেরকে বোঝায়। আর স্থায়ী ও পরিবর্তনশীল ব্যয়ের সমষ্টি হলো মোট ব্যয় (Total Cost )।

২. উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয়ের ধরন: উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো পণ্যের ব্যয় কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে জানতে হয়। উৎপাদনের পরিমাণ বেশি হলে এককপ্রতি উৎপাদন ব্যয় কম হয়। ফলে কোম্পানি কম মূল্যে পণ্য বিক্রয় করতে পারে। আবার উৎপাদনের পরিমাণ কম হলে এককপ্রতি উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, এর ফলে পণ্যের মূল্য বেশি ধার্য করতে হয়।

চিত্র ১০.৪-এর (ক)-তে দেখানো হয়েছে যে, ২০ এককের বেশি উৎপাদন হলে পণ্যের এককপ্রতি ব্যয় বেড়ে যায় আবার ২০ এককের কম উৎপাদন হলে পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়। সুতরাং প্রতিষ্ঠানটি সবচেয়ে কম ব্যয়ে ২০ একক পণ্য উৎপাদন করতে পারে। এই অবস্থাকে স্বল্পকালীন গড় ব্যয় রেখা দিয়ে প্রকাশ করা হয়। আবার (খ) নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে যে, ২০ একক পণ্য উৎপাদন করলে যে খরচ হয়, ৩০ একক পণ্য উৎপাদন করলে খরচ আরো কম হয়। সুতরাং উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সাথে দীর্ঘ মেয়াদে এককপ্রতি গড় ব্যয় কম হয়। এ বিষয়টিকে দীর্ঘকালীন গড় ব্যয় রেখা বলে।

 

 

৩. উৎপাদন অভিজ্ঞতার চলক হিসেবে ব্যয়ঃ উৎপাদন ব্যয়ের ওপর অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা প্রভাব ফেলে। কারণ পণ্য উৎপাদনে অভিজ্ঞতা বাড়ার সাথে সাথে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পেতে থাকে। যার ফলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানও কম মূল্যে পণ্য বাজারে বিক্রয় করতে পারে। চিত্র নং ১০.৫-এ দেখা যাচ্ছে যে, ৩০ একক উৎপাদনের ক্ষেত্রে একক প্রতি গড় ব্যয় ২৫০ টাকা। পর্যায়ক্রমে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বাড়ার সাথে সাথে পণ্যের উৎপাদন খরচ কমছে। যখন প্রতিষ্ঠান ৪০ একক পণ্য উৎপাদন করছে তখন ১৫০ টাকা। এভাবে পণ্য উৎপাদনে অভিজ্ঞতা বাড়ার কারণে তার উৎপাদন বৃদ্ধি পায় এবং এককপ্রতি উৎপাদন খরচ কমতে থাকে। ফলে বিপণনকারী তুলনামূলকভাবে কম মূল্যে পণ্য বিপণন করতে পারে।

 

 

ঘ) প্রতিযোগীদের ব্যয়, মূল্য ও প্রদেয় সুবিধা বিশ্লেষণ (Analyzing Competitors’ Cost, Price and Offer) বিপণনকারী প্রতিযোগিতামূলক বাজার মূল্যের ভিত্তিতে নিজের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। এক্ষেত্রে পণ্যের ব্যয় বা ক্রেতাদের ইচ্ছা সরাসরি বিবেচনা না করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শর্তের দিকে নজর দেওয়া হয়। এই পদ্ধতিতে অন্য প্রতিযোগীরা যে দামে পণ্য বিক্রয় করছে সে দামকে ভিত্তি ধরে নিজ পণ্যের মূল্য স্থির করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগী দামের সমান, ওপরে বা নিচে নিজ পণ্যের দাম স্থির করতে পারে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি অনুসরণ করে। এ ধরনের বড় প্রতিষ্ঠান বাজার নেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরা যখন মূল্য : পরিবর্তন করে, তখন ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের পণ্যের মূল্য পরিবর্তন করে।

ঙ) মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নির্ধারণ (Selecting a Pricing Method)

১. ব্যয়-যোগ মূল্য নির্ধারণ (Cost-Plus Pricing): এই পদ্ধতি অপর নাম মার্কআপ মূল্য নির্ধারণ (Markup pricing) বলা হয়। এই পদ্ধতি অনুসারে মোট উৎপাদন ব্যয়ের সাথে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা যুক্ত করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি উৎপাদন করতে যদি ২০ টাকা খরচ হয় এবং উৎপাদক যদি উৎপাদন ব্যয়ের ওপর ১০% মুনাফা প্রত্যাশা করে, তাহলে একটি পণ্যের বিক্রয় মূল্য হবে ২২ টাকা (২০+২)। এ পদ্ধতি খুবই সরল এবং সহজে প্রয়োগ করা যায়। এ পদ্ধতি ব্যবহার করার সময় বিভিন্ন প্রকার ব্যয় যথা, প্রান্তিক ব্যয় (Merginal costs), গড় মোট ব্যয় (Average total cost), গড় পরিবর্তনশীল ব্যয়, গড় স্থায়ী ব্যয় ইত্যাদি বিবেচনা করা হয় না।

অথচ উৎপাদনের হ্রাস-বৃদ্ধির সাথে সাথে এসব ব্যয়ও প্রভাবিত হয়। এ পদ্ধতির সমর্থকরা মনে করে যে, উৎপাদিত সামগ্রী সবই বিক্রয় হয়ে যাবে। যদি উৎপাদনের পরিমাণ কম হয়, তবে সব ব্যয় মিটিয়ে মুনাফা দেখানোর জন্য প্রত্যেকটা ইউনিট বেশি দামে বিক্রয় করতে হবে। কিন্তু ব্যবসায়ের মন্দার কারণে উৎপাদন হ্রাস পেলে এককপ্রতি মূল্য বাড়ানো উচিত হবে না। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, এ পদ্ধতিতে বাজারে চাহিদার প্রতি মনোযোগ দেওয়া হয় না। এ কারণে উৎপাদকদের জন্য এ পদ্ধতির উপযোগিতা বিশেষভাবে সীমিত। একটি উদাহরণের সাহায্যে ব্যয়-যোগ বা মার্কআপ পদ্ধতিতে মূল্য নির্ধারণ দেখানো হলো—

 

 

২. লক্ষ্যস্থিত মুনাফাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ (Target Return Pricing) : মূল্য নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে আরেকটি উপায় সমচ্ছেদ বিশ্লেষণ। সমচ্ছেদ বিশ্লেষণের প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো সমচ্ছেদ বিন্দু নির্ণয় (Break-even point) করা। সমচ্ছেদ এমন একটি বিন্দু যেখানে পণ্যের বিক্রয়লব্ধ আয় মোট ব্যয়ের পরিমাণ সমান হয় (একটি আনুমানিক বিক্রয়-মূল্যের ভিত্তিতে)। ফলে ভিন্ন ভিন্ন বিক্রয়-মূল্যের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সমচ্ছেদ বিন্দুর উদ্ভব হয়। সমচ্ছেদ বিন্দুর ওপরে পণ্য বিক্রয় হলে মুনাফা হয় আর এর নিচে বিক্রয় হ্রাস করা হলে লোকসান হয়। সমচ্ছেদ বিশ্লেষণে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

এর মাধ্যমে শুধু বলা যায়, যদি (একমাত্র যদি) বিশেষ মূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বিক্রি করা যায়, তবেই বিক্রেতা সমচ্ছেদ বিন্দুতে পৌছতে পারবে। সমচ্ছেদ চিত্র থেকে আমরা বলতে পারি না, বিক্রেতা বাস্তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বিক্রয় করতে পারবে কি না। বাজারে নির্ধারিত মূল্যে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রি হবে তা সমচ্ছেদ বিন্দুর অনেক নিচেও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: ১০.৬ নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠান যখন পণ্যের ৩০০০০ একক বিক্রি করেছে তখনই সমচ্ছেদ বিন্দুতে আসতে পেরেছে। কিন্তু বাজারে যদি ১০০০০ বা ২০০০০ একক বিক্রি হয় তাহলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ব্রেক ইভেন করা সম্ভব হবে না তাকে লোকসান দিতে হবে। এ পদ্ধতিতে কীভাবে মূল্য নির্ধারণ করা হয় তা উদাহরণের সাহায্যে নিচে দেখানো হলো—

 

 

 

মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ

 

সুতরাং চিত্রের সাহায্যে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, সমচ্ছেদ বিন্দুতে মোট আয় ও মোট ব্যয়ের পরিমাণ সমান। তা হলো ৬০০০০০ টাকা এবং প্রতিষ্ঠান এই ৩০,০০০ একক উৎপাদন করলে এই বিন্দুতে পৌঁছতে পারবে। ৩০,০০০ এককের বেশি উৎপাদন করলে প্রতিষ্ঠানটি লাভ করবে এবং এর কম উৎপাদন করলে ক্ষতির সম্মুখীন হবে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটি ২০ টাকা মূল্যে ৫০০০০ একক বিক্রয় করে তাহলে তার ১০,০০,০০০ টাকা বিনিয়োগের উপর ২,০০,০০০ টাকা মুনাফা অর্জন করতে পারবে যেখানে তার মোট ব্যয় হচ্ছে ৮,০০,০০০ টাকা ।

মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ

৩. ব্যবসায়িক মর্যাদাভিত্তিক মূল্য পদ্ধতি (Pricing based on Trade Position): পণ্যের ক্রেতার ব্যবসায়িক মর্যাদার ভিত্তিতে ভিত্তিমূল্যের তারতম্য ঘটতে পারে। একজন ক্রেতা পাইকারও হতে পারেন, আবার খুচরা বিক্রেতা বা শিল্প ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকও হতে পারেন। উৎপাদক যদি পাইকার এবং খুচরা বিক্রেতা উভয়ের নিকট পণ্য বিক্রয় করার নীতি অনুসরণ করে তাহলে তিনি খুচরা বিক্রেতার তুলনায় পাইকারের জন্য কম মূল্য নির্ধারণ করবেন। এভাবে মূল্য পার্থক্য সৃষ্টি করে তিনি বন্টন প্রণালিতে পাইকারের স্বার্থ রক্ষা করেন।

8. ভ্যালুভিত্তিক মূল্য-নির্ধারণ (Value-based Pricing): এরূপ পদ্ধতিতে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয় গ্রাহক কর্তৃক পণ্যের মূল্য-সম্পর্কিত ধারণার ভিত্তিতে, উৎপাদকের ব্যয়ের ভিত্তিতে নয়। গ্রাহকরা একটি পণ্যের উপযোগিতাকে কতটুকু মূল্যবান মনে করে, তার ওপর ভিত্তি করে উৎপাদক পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে । এক্ষেত্রে গ্রাহকদের বা ভোক্তাদের প্রয়োজন ও ভ্যালু-সম্পর্কিত ধারণা বিশ্লেষণ করার পর ভোক্তাদের ধারণাকৃত মূল্য হিসাব করা খুবই কঠিন কাজ। তবে গবেষণার মাধ্যমে তাদের ধারণা সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব। তবে এরূপ পদ্ধতির ব্যাপারে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

কারণ উৎপাদক যদি ভোক্তাদের অনুমানের তুলনায় অধিক মূল্য ধার্য করে, তাহলে বাজার হারাতে পারে। আবার যদি মূল্য কম নির্ধারণ করা হয়, তাহলে মুনাফার পরিমাণ কমে যাবে। তাছাড়া, সমচ্ছেদ বিশ্লেষণে আরও কতিপয় অনুমিতি গ্রহণ করা হয় যা ব্যবসা-জগতে অসম্ভব। এতে অনুমান করা হয় যে, ব্যয়সমূহ স্থির। তাই যে প্রতিষ্ঠানে গড় একক ব্যয় ঘন ঘন উঠানামা করে সেখানে সমচ্ছেদ বিশ্লেষণের মূল্য তেমন থাকে না। অনুরূপভাবে, বাজারে চাহিদা হিসেব করার সময় সমচ্ছেদ বিশ্লেষণে চাহিদা পরিস্থিতিকে খুব সহজভাবে গ্রহণ করা হয় যা বাস্তবে জটিলও হতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, প্রতিযোগিতা ও অন্যান্য কারণে সমচ্ছেদ বিন্দুর পরিমাণ পণ্য প্রতিষ্ঠান বিক্রি করতে সক্ষম নাও হতে পারে।

৫. প্রতিযোগিতাভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ (Competitive Pricing): কোনো কোনো উৎপাদক প্রতিযোগিতামূলক বাজার মূল্যের ভিত্তিতে নিজের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে থাকে। এক্ষেত্রে পণ্যের ব্যয় বা ক্রেতাদের ইচ্ছা সরাসরি বিবেচনা না করে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার শর্তের দিকে নজর দেওয়া হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দু’ধরনের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি আছে। এ পদ্ধতি দুটো হলো-

(i) চলমান হার পদ্ধতি (Going Rate Pricing): এই পদ্ধতিতে অন্য প্রতিযোগীরা যে দামে পণ্য বিক্রয় করছে। সে দামকে ভিত্তি ধরে নিজ পণ্যের মূল্য স্থির করা হয়। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগী দামের সমান, ওপরে বা নিচে নিজ পণ্যের দাম স্থির করতে পারে। ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি অনুসরণ করে। এ ধরনের বড় প্রতিষ্ঠাননেতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এরা যখন মূল্য পরিবর্তন করে, তখন ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের পণ্যের মূল্য পরিবর্তন করে। চলমান হার মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি এ কারণে ভালো যে, এর ফলে মূল্য-যুদ্ধ বন্ধ হয় ও সম্মিলিত প্রজ্ঞা প্রকাশিত হয়। কেননা সবাই একই মূল্য অনুসরণ করে। ফলে একটা যুক্তিযুক্ত মুনাফা সবাই লাভ করতে পারে। একই শিল্পের অন্তর্গত সকল প্রতিযোগীর মধ্যে এই ধরনের পণ্য-মূল্য নির্ধারণ করতে দেখা যায়।

(ii) সিলকৃত দর পদ্ধতি (Sealed-Bid Pricing): এ ধরনের মূল্য পদ্ধতি সাধারণত প্রতিযোগিতামূলকভাবে যখন মূল্য প্রদান করতে হয় তখন ব্যবহার করা হয়। এই পদ্ধতিতে প্রতিযোগী কী মূল্য দিতে পারে, তার অনুমানের ভিত্তিতে পণ্যের মূল্য স্থির করা হয়। এক্ষেত্রে নিজ পণ্যের ব্যয় বা চাহিদা কোনটাই বিবেচনায় আনা হয় না। এখানে প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠান কন্ট্রাক্ট বা চুক্তিটা পেতে চায়। সেক্ষেত্রে তাকে অন্য প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কম দামই দিতে হবে। সাধারণত কোন কাজ পাওয়ার জন্য টেন্ডার বা দরপত্র জমা দেওয়ার সময় এ পদ্ধতিতে পণ্যের মূল্য স্থির করা হয়।

 

চ) চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারন (Selecting the Final Price):

বিভিন্ন আনুষাঙ্গিক বিষয়সমূহ বিবেচনা করে প্রতিষ্ঠানকে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা হয়। সেই বিষয়গুলো হলো-

১. বিপণনের উদ্দেশ্য ও বিপণন মিশ্রণ (Competitive Reactions) : বিপণনের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বিপণনের উদ্দেশ্য বাজারে টিকে থাকা; মুনাফা সর্বোচ্চকরণ, বাজার শেয়ার সর্বোচ্চকরণ, বিক্রয়ের পরিমাণ বাড়ানো বা পণ্যের গুণগত মানে শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি হতে পারে। বিপণনের উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। বিপণনের মিশ্রণের সকল উপাদান-পণ্য, বণ্টন ও প্রসার বিবেচনা করে মূল্য ধার্য করা প্রয়োজন হয়।

২. সাংগঠনিক বিবেচনাসমূহ (Organizational Considerations) : মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছোট বা বড় প্রতিষ্ঠানভেদে কখনো উচ্চ ব্যবস্থাপক বা বিভাগীয় ব্যবস্থাপক পণ্য মূল্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আবার অনেক সময় শিল্প পণ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বিক্রয়কর্মী বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করে মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক শুধু নির্ধারিত মূল্যের অনুমোদন দিয়ে থাকে।

 

সারসংক্ষেপ

প্রতিষ্ঠান নানা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। প্রথমত মূল্যের উদ্দেশ্য নির্ধারণ, দ্বিতীয়ত চাহিদা নির্ধারণ, তৃতীয়ত ব্যয় নিরূপন, চতুর্থত প্রতিযোগীদের ব্যয়, মূল্য ও প্রদেয় সুবিধা বিশ্লেষণ, পঞ্চমত মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি নির্বাচন এবং সর্বশেষে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ।

১ thought on “মূল্য নির্ধারণের ধাপসমূহ”

Leave a Comment