ভোক্তার আচরণ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ও এসবিবিএ ২৪০৫ বিপণন ব্যবস্থাপনা” এর “ভোক্তা বাজার বিশ্লেষণ” ইউনিট ৪ এর অন্তর্ভুক্ত।
ভোক্তার আচরণ
ভোক্তার আচরণ
Consumer Behavior
বিপণনে ভোক্তা এবং ক্রেতা অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে এদের মধ্যে ধারণাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। যারা পণ্য বা সেবা ক্রয় করে তাদেরকে ক্রেতা বলে এবং যারা চূড়ান্ত পণ্য বা সেবা ভোগ করে তাদেরকে ভোক্তা বলা হয়। সুতরাং একজন ভোক্তা পণ্য ক্রয় করে নিজেই ভোগ করলে সে ক্রেতা এবং ভোক্তা উভয়ই হতে পারে। আর, ভোক্তা বাজার হলো ব্যক্তিগত ভোগের জন্য পণ্য ও সেবাসমূহ ক্রয় বা সংগ্রহ করে এমন সকল ব্যক্তি ও পরিবারের সমষ্টি। প্রত্যেক ভোক্তাই পণ্য বা সেবা ক্রয়, অর্জন, ভোগ, ব্যয়, হার বা বর্জনের সময় নিজস্ব প্রকৃতিসুলভ বিভিন্ন ধরনের মনোভাব বা প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে।
পণ্যসামগ্রী বা সেবাকর্ম ক্রয়ের সময় একজন ক্রেতা যে সকল কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে সে সকল কাজের সাথে সম্পর্কিত সকল আচরণকে ভোক্তার আচরণ বলে। প্রত্যেক ভোক্তা বা ক্রেতাই ভিন্ন ভিন্ন। একই পণ্য ক্রয় করার সময় একজন ক্রেতা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন আচরণ করতে পারে। একারণে ভোক্তা আচরণ বিপণনকারীর জন্য কঠিন, একইসাথে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। Philip Kotler & Gary Armstrong ভোক্তা আচরণকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এভাবে, “ভোক্তার ক্রয় আচরণ হলো চূড়ান্ত ভোক্তা-নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের ক্রয় আচরণ যারা ব্যক্তিগত ভোগের জন্য পণ্য ও সেবাসমূহ ক্রয় করে।” সুতরাং ভোক্তা আচরণ সম্পর্কে বলা যায় যে, পণ্যদ্রব্য ও সেবা সামগ্রী নির্বাচন, ক্রয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তব ক্রয় এবং ভোগ বা ব্যবহারের সময় ভোক্তা যে আচরণ করে থাকে তাকেই ভোক্তা আচরণ বলা হয় ।
ভোক্তা আচরণের মডেল
Model of Consumer Behavior
ভোক্তা আচরণের মডেল বলতে ভোক্তার আচরণ প্রক্রিয়াতে যে বিষয়সমূহ নিয়মিত ঘটে তার সংক্ষিপ্ত উপস্থাপনকে বলে। ক্রয় প্রক্রিয়াতে ভোক্তারা বিভিন্ন ধরনের সিদ্ধান্তগ্রহণ করে থাকে। কোন পণ্যটি ক্রয় করবে, কখন ক্রয় করবে, কতগুলো ক্রয় করবে, কোন সময় ক্রয় করবে, কোথা হতে ক্রয় করবে; ভোক্তাদের এ মৌলিক বিষয়গুলো সম্বন্ধে বিপণনকারী সবসময়ই জানার চেষ্টা করে এবং তার ওপর ভিত্তি করে বিপণন কার্যক্রম নির্ধারণ করে। কারণ এ তথ্যগুলো জানা হলে বিপণনকারী বুঝতে পারে পণ্যের বৈশিষ্ট্য, মূল্য, বিজ্ঞাপণের আবেদন ইত্যাদির প্রতি ভোক্তারা কীভাবে সাড়া দিতে পারে। যারফলে অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় বিপণনকারী সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে।
এ জন্য বিপণনকারী ভোক্তা মডেলের প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে। চিত্র নং ৪.১ এ ভোক্তা আচরণের একটি মডেল উপস্থাপন করা হলো। চিত্রটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে বিপণন উদ্দীপক কীভাবে ক্রেতার জগতে প্রবেশ করে এবং এর ফলে ক্রেতার মাঝে কীভাবে নির্দিষ্ট সাড়া সৃষ্টি হচ্ছে। এ মডেলের উপাদানসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো-
১. বিপণন ও অন্যান্য উদ্দীপক (Marketing and Other Stimuli): বিপণন উদ্দীপক বলতে বিপণন মিশ্রণের চারটি মূল উপাদান যেমন- পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও প্রসারকে বোঝানো হয়েছে যা বিপণনকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে । বিপণনকারী বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে; যেমন-পণ্যের গুনগত মান, মূল্য পরিবর্তন অথবা আক্রমণাত্মক প্রসার কৌশলের মাধ্যমে ভোক্তাকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যান্য উদ্দীপকসমূহ বিপণনকারী নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না কিন্তু এ উদ্দীপকসমূহ যে কোনো সময় ক্রেতাকে প্রভাবিত করতে পারে। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ।

২.ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্য (Buyer’s Psychology and Characteristics): বিপণন উদ্দীপকসমূহ বিভিন্নভাবে ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও নিজের বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। ক্রেতা তার নিজস্ব বিবেচনায় এদের মূল্যায়ন করে। একজন ক্রেতা থেকে অন্য ক্রেতার মূল্যায়ন ভিন্ন হয়ে থাকে কেবলমাত্র তাদের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে। একজন ক্রেতা কোন পণ্যের বিজ্ঞাপনকে সৃষ্টিশীল মনে করতে পারেন, অন্যদিকে আর একজন ক্রেতা একই বিজ্ঞাপনকে বিরক্তিকর মনে করতে পারেন। ক্রেতার মানসিকতা তার প্রেষণা, প্রত্যক্ষণ, শিক্ষণ ও আবেগ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এবং ক্রেতা যে সংস্কৃতি, উপ-সংস্কৃতি ও সামাজিক শ্রেণিতে অবস্থান করে তার ওপর নির্ভর করে ক্রেতার বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়। এসবকিছুই ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ও সাড়ায় প্রভাব বিস্তার করে ।
৩. ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া (Buyer’s Decision Making Process) : সাধারণত ক্রেতা নতুন পণ্য ক্রয়ের সময় পাঁচটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। ক্রেতা সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন পূরণের জন্য পণ্য ক্রয় করে থাকে। তাই ক্রেতা প্রথমত পণ্য ক্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সনাক্ত করে। এরপর প্রয়োজন পূরণের জন্য কোন কোন পণ্য বাজারে রয়েছে সেই সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধান করে। বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে ক্রেতা যেসব পণ্য বা ব্র্যান্ডের নাম জানতে পারে তাদের মধ্যে মূল্যায়ন করে বোঝার চেষ্টা করে কোন বিকল্প পণ্যটি তার জন্য যথোপযুক্ত হবে।
মূল্যায়নের পর ক্রেতা নির্দিষ্ট পণ্য কোনো স্থান থেকে, কত মূল্যে পণ্য ক্রয় করবে তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সর্বশেষে, পণ্য ক্রয় করার পর ক্রেতা তার প্রত্যাশা অনুযায়ি পণ্য থেকে কতটা সুবিধা বা উপযোগিতা পেয়েছে তার মধ্যে তুলনা করে। এ তুলনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে ক্রেতার সন্তুষ্টি বা অসন্তুষ্টি নির্ধারিত হয় এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি ধনাত্মক বা ঋণাত্মক মনোভাব ও আচরণ তৈরি হয়।
৪. ক্রেতার প্রতিক্রিয়া (Buyer’s Responses ) : বিপণন ও অন্যান্য উদ্দীপক এবং ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে ক্রেতা বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এ প্রতিক্রিয়াসমূহ ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক হতে পারে। ক্রেতার সাড়া বিভিন্ন রকম হতে পারে যেমন- পণ্য পছন্দ, ব্র্যান্ড পছন্দ, ডিলার পছন্দ, ক্রয়ের সময়, ক্রয়ের পরিমাণ ইত্যাদি।

সারসংক্ষেপ :
পণ্যসামগ্রী বা সেবাকর্ম ক্রয়ের সময় একজন ক্রেতা যে সকল কার্যাবলি সম্পাদন করে থাকে সে সকল কাজের সাথে সম্পর্কিত সকল আচরণকে ভোক্তার আচরণ বলে। ভোক্তা আচরণের মডেলে দেখানো হয়েছে বিপণন উদ্দীপক ও অন্যান্য উদ্দীপক কীভাবে ভোক্তাকে প্রভাবিত করে। বিপণন উদ্দীপক বলতে বিপণন মিশ্রণের চারটি মূল উপাদান যেমন- পণ্য, মূল্য, বণ্টন ও প্রসারকে বুঝানো হয়েছে যা বিপণনকারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। বিপণন উদ্দীপকসমূহ বিভিন্নভাবে ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও নিজের বৈশিষ্ট্য দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। একজন ক্রেতা থেকে অন্য ক্রেতার মূল্যায়ণ ভিন্ন হয়ে থাকে কেবলমাত্র তাদের ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের কারণে। বিপণন ও অন্যান্য উদ্দীপক এবং ক্রেতার মনস্তত্ত্ব ও | বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে মূল্যায়নের মাধ্যমে ক্রেতা বিভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। মডেলে সর্বশেষে দেখানো হয়েছে ক্রেতা নতুন পণ্য ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিলে সাধারণত পাঁচটি পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে ।

