কার্যকর বিপণন যোগাযোগ উনড়বয়নের পদক্ষেপসমূহ আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “ভোক্তা ভ্যালু যোগাযোগ” ইউনিট ৯ এর অন্তর্ভুক্ত।
কার্যকর বিপণন যোগাযোগ উনড়বয়নের পদক্ষেপসমূহ
বিপণনকারী যোগাযোগের মাধ্যমে ভোক্তার সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে ও তা ধরে রাখতে পারে। বিপণন যোগাযোগের এ পর্যায়ে বাস্তব অবস্থায় একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে তার বিপণন যোগাযোগ মিশ্রণকে সঠিক বিপণন কর্মসূচিতে রূপান্তর করতে পারে তার একটি রূপরেখা তুলে ধরা হয়। এই প্রয়াসের অংশ হিসেবে কার্যকর বিপণন যোগাযোগ উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হয়। বিপণনকারী এবং তার লক্ষ্যায়িত বাজার-এর মাঝে যোগাযোগ কর্মকাণ্ড সফল হলে তাকে কার্যকর বিপণন যোগাযোগ বোঝায় । নিচে চিত্র ৯.৩ এ কার্যকার যোগাযোগ উন্নয়নের পদক্ষেপসমূহ চিত্রের মাধ্যমে দেখানো হলো-

লক্ষ্যায়িত শ্রোতা শনাক্তকরণ
Selecting Target Audience
নির্দিষ্ট লক্ষ্যায়িত শ্রোতা বা টার্গেট অডিয়েন্সের ওপর ভিত্তি করেই বিপণন যোগাযোগ গড়ে ওঠে। লক্ষ্যায়িত শ্রোতা বলতে একটি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানের ক্রেতা অথবা ভবিষ্যৎ ক্রেতার ক্রয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা ক্রয় বিক্রয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিকে বোঝায়। এছাড়াও কোনো ব্যক্তি, দল, বিশেষ জনগোষ্ঠী বা সাধারণ জনগোষ্ঠীও টার্গেট অডিয়েন্স হতে পারে । মূল কথা, যাদের উদ্দেশ্য করে পণ্য এবং সেবা সম্পর্কিত বার্তা উপস্থাপন করা হয় তারাই টার্গেট অডিয়েন্স। টার্গেট অডিয়েন্সের প্রয়োজন, রুচি, পছন্দ, মনোভাব, অগ্রাধিকার, জীবনধারা, সামাজিক শ্রেণি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে বিপণনকারী যোগাযোগ বার্তা প্রস্তুত সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে। যেমন: কনডেন্সড মিল্ক কোম্পানিগুলো ছোট ছোট চায়ের দোকানসমূহকে টার্গেট অডিয়েন্স হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের পছন্দ অনুযায়ী যোগাযোগ হতিয়ারসমূহ নির্ধারণ করে ।
যোগাযোগের উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারণ
Determining the Communication Objectives
লক্ষ্যায়িত ভোক্তা শ্রেণি খুঁজে বের করার পরবর্তী সিদ্ধান্ত হলো যোগাযোগের উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারণ করা। যোগাযোগের উদ্দেশ্য বলতে বার্তা প্রেরণের প্রেক্ষিতে বিপণনকারী কীরূপ সাড়া (Response) প্রত্যাশা করে তাকে বোঝায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিপণনকারীর যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো টার্গেট অডিয়েন্সকে পণ্য বা সেবা ক্রয়ে উৎসাহিত করা। কিন্তু ক্রেতা বা ভোক্তা বর্তমানে ক্রয় প্রস্তুতি গ্রহণের কোন স্তরে অবস্থান করছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। একজন ক্রেতা বা ভোক্তা ক্রয় প্রস্তুতি গ্রহণের ছয়টি স্তরের যে কোনোটিতে অবস্থান করতে পারে এবং স্তরগুলো অতিক্রমের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে পণ্য ক্রয় করে থাকে। চিত্র ৯.৪ এ দেখানো হলো-

১. অবগতি (Awareness): বিপণনকারীর টার্গেট অডিয়েন্স পণ্য বা সেবা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ বা ধারণাহীন হতে পারে। এ পর্যায়কে অবগতি বলা হয় এবং এক্ষেত্রে যোগাযোগের উদ্দেশ্য হলো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে ক্রেতাসাধারণকে অবহিত করা।
২. জ্ঞান (Knowledge): এ পর্যায়ে টার্গেট অডিয়েন্স বা নির্দিষ্ট ক্রেতারা পণ্য সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা বা আংশিক তথ্য ধারণ করে। বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে পণ্য সম্পর্কিত সঠিক জ্ঞান সৃষ্টি করাই যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য ।
৩. পছন্দ (Liking): অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ক্রেতা সমষ্টি পণ্য সম্পর্কে অবগত বা পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও পণ্যের প্রতি অনুকূল মনোভাব পোষণ করে না। বিপণন যোগাযোগকারী এক্ষেত্রে ক্রেতার মনে পণ্য সম্পর্কে অনুকূল ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা চালায়।
৪. অগ্রাধিকার (Preference): কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রেতারা নির্দিষ্ট পণ্য বা সেবা পছন্দ করলেও ক্রয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করে না। এ পর্যায়ে বিপণন যোগাযোগকারী প্রতিযোগী পণ্যের তুলনায় নিজের পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের মনে অগ্রাধিকার সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ।
৫. প্রত্যয় (Conviction): নির্দিষ্ট ক্রেতা সমষ্টি পণ্যটিকে অগ্রাধিকার প্রদান করলেও ক্রয়ের ব্যাপারে প্রত্যয়ী নাও হতে পারে। বিপণনকারীর এক্ষেত্রে যোগাযোগের উদ্দেশ্য হলো ক্রেতাদের মাঝে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি করা, যাতে নির্দিষ্ট পণ্যটি ক্রয় করে।
৬. ক্রয় (Purchase): শেষ পর্যায়ে বিপণন যোগাযোগের মূল উদ্দেশ্য হলো একজন ক্রেতাকে ক্রয় সিদ্ধান্তে উপনীত হতে সাহায্য করা। কেননা দৃঢ় প্রত্যয় থাকা সত্ত্বেও ক্রেতার পক্ষে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পণ্য ক্রয় সিদ্ধান্ত নিতে সন্দিহান হওয়া বা বিলম্ব করতে দেখা যায়। মূল্যহ্রাস, অতিরিক্ত সুবিধা, পণ্য যাচাইয়ের সুযোগ ইত্যাদি সুবিধা ক্রেতার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধাপকে সহজ করে ।

বার্তা প্রস্তুতকরণ
Designing the Message
তৃতীয় পর্যায়ে কার্যকর বিপণন যোগাযোগ উন্নয়নের লক্ষ্যে বিপণনকারী একটি আদর্শ বার্তা প্রস্তুত করতে সচেষ্ট হয়। একটি বার্তা এমন হওয়া উচিত, যা ক্রেতার মনোযোগ আকর্ষণ করবে, ক্রেতার মাঝে আগ্রহ সৃষ্টি করবে এবং ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করবে। বার্তা প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিপণন যোগাযোগের মূল তিনটি বিষয় হলো-বিষয়বস্তু নির্ধারণ, বার্তার কাঠামো এবং বার্তার ধরন নির্ধারণ করতে হয়।
১. বার্তার বিষয়বস্তু (Message content) নির্ধারণ: বার্তার বিষয়বস্তু নির্ধারণের জন্য যোগাযোগকারীকে সঠিক আবেদন (Appeal) বা ধরন (Theme) নির্ধারণ করতে হবে, যার মাধ্যমে প্রত্যাশিত সাড়া সৃষ্টি সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে তিন ধরনের আবেদন ব্যবহৃত হয়।
i. যৌক্তিক আবেদন ( Rational Appeal): যৌক্তিক আবেদনের মাধ্যমে ক্রেতাকে যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করে পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করা হয়। যেমন: DHA সমৃদ্ধ পাউডার দুধ, যা শিশুর বুদ্ধিমত্তা তৈরিতে সহায়তা করে জাতীয় বিজ্ঞাপন ।
ii. আবেগময়ী আবেদন (Emotinal Appeal): এক্ষেত্রে ভোক্তাকে পণ্য সম্পর্কে আবেগাপ্লুত করে তোলাই অবেদনের কাজ। যেমন: স্যান্ডালিনা রূপচর্চায় আভিজাত্য বিজ্ঞাপনটিতে আবেগময়ী আবেদন ব্যবহৃত হয়েছে।
iii. নৈতিক আবেদন (Ethical Appeal): এ আবেদনের মাধ্যমে নীতিকথা উপস্থাপন করে ক্রেতাদের মনে অনুকূল মনোভাব সৃষ্টির প্রয়াস করা হয়। যেমন: বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে নকল হতে সাবধান, ভেজালমুক্ত পণ্য ইত্যাদি বিষয় উপস্থাপন করা হয়।
2. বার্তার কাঠামো (Message Structure) নির্ধারণ: বার্তার বিষয়বস্তু সাজানোর কৌশলকে বার্তার কাঠামো বলে । এক্ষেত্রে বিপণনকারীকে তিন ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়।
→ প্রথমত, বার্তার উপসংহার টানা হবে নাকি ক্রেতার বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে। গবেষণা অনুযায়ী ক্রেতার ওপর উপসংহার ছেড়ে দেওয়াই অধিক ফলপ্রসূ। যেমন: স্পিকারের (Snickers) চকলেটের বিজ্ঞাপনে ‘Hungry নাকি?’ কথার মাধ্যমে ক্রেতার ওপর উপসংহার ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
⇒ দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপনার ক্রমানুসারে নির্ধারণ সর্বোত্তম যুক্তিটি বিজ্ঞাপনের প্রথমে উপস্থাপিত হবে নাকি শেষে? গবেষণায় দেখা গেছে, সর্বোত্তম যুক্তি প্রথমে উপস্থাপন ক্রেতার মনোযোগ এবং আগ্রহ তৈরিতে সহায্য করে। যেমন: Fly Ash বিহীন সিমেন্টের বিজ্ঞাপনে শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপনার মাধ্যমে ক্রেতাকে পণ্য ক্রয়ে উৎসাহিত করতে দেখা যায়।
⇒ সর্বশেষ, বার্তা প্রদানের ক্ষেত্রে একমুখী বা দ্বিমুখী, কোন ধরনের যোগাযোগ পন্থা অবলম্বন করা হবে সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একমুখী উপস্থাপনায় শুধু পণ্যের অনুকূল দিকগুলো তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে দ্বিমুখী উপস্থাপনায় পণ্যের অনুকূল ও প্রতিকূল উভয় দিক সম্পর্কেই অলোকপাত করা হয়। সাধারণত একমুখী প্রচারণাই অধিক কার্যকার, যদি না টার্গেট অডিয়েন্স উচ্চ শিক্ষিত এবং পণ্যের প্রতিকূল দিক সম্পর্কে সচেতন হয়। এক্ষেত্রে দ্বিমুখী প্রচারণা প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় অধিক কার্যকর।
৩. বার্তার ধরন (Message format): বিপণন যোগাযোগকারীকে এ পর্যায়ে বার্তার জন্য নির্দিষ্ট এবং আকর্ষণীয় ধরন নির্বাচন করতে হয়। বার্তার বিষয়বস্তু তৈরিতে যে সমস্ত প্রতীক, চিহ্ন বা সংকেত ব্যবহৃত হয় তাকে বার্তার ধরন বলা হয়। মুদ্রিত বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে শিরোনাম, প্রতিলিপি, চিত্র গ্রহণ ও রঙের ব্যবহার সম্পর্কে যোগাযোগকারীকে সতর্কতার সাথে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। টেলিভিশন বা রেডিও বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে তথ্য বিশ্লেষণ, শব্দ চয়ন, সাউন্ড নিয়ন্ত্রণ, উপস্থাপনার গতি, ধারাবাহিকতা ইত্যাদি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রণযোগ্য।
যেমন: ইউটিউব (Youtube) নিজস্ব বিজ্ঞাপন বিভিন্ন মাধ্যমে প্রদানের ক্ষেত্রে প্লে চিহ্ন এবং লাল রংকে প্রাধান্য দেয়। আবার গ্রামীণফোন নিজস্ব বিজ্ঞাপন প্রদানের ক্ষেত্রে ‘Stay connected’ স্লোগান, নির্দিষ্ট সুর ও নীল রং ব্যবহার করে। মোটকথা, বিপণন যোগাযোগকারীকে প্রতিটি সূক্ষ্ম বিষয় সংক্রান্ত সিদ্ধান্তসমূহ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাবধানতার সাথে পরিকল্পিতভাবে উপস্থাপন করতে হবে।
যোগাযোগের মাধ্যম নির্বাচন
Chossing Communication Channels and Media
বার্তা প্রস্তুতকরণের পর বার্তাটি কীভাবে এবং কোন মাধ্যমে সহজে টার্গেট অডিয়েন্স বা নির্দিষ্ট ভোক্তাদের নিকট পৌছানো যায় তা যোগাযোগকারীর জন্য প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সঠিক মাধ্যমে বার্তা প্রণয়ন কার্যকর যোগাযোগ উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগ মাধ্যম মূলত দুই ধরনের হতে পারে। যথা :
১. ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রণালি (Personal Communication Channels): ব্যক্তিগত যোগাযোগ প্রণালিতে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি একে অপরের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে। এক্ষেত্রে যোগাযাগকারী নিজে অডিয়েন্সের সামনে উপস্থিত হতে পারে অথবা টেলিফোন, ডাক মারফত, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কথোপকথনের দ্বারাও যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। এক্ষেত্রে তিন ধরনের প্রণালি ব্যবহৃত হতে দেখা যায় ।
i. সমার্থক প্রণালি (Advocate Channel): সমার্থক প্রণালিতে প্রতিষ্ঠানের নিজেস্ব বিক্রয়কর্মী বা প্রতিনিধিরা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় টার্গেট অডিয়েন্সের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে। সমার্থক প্রণালি প্রতিষ্ঠান দ্বারা পরিচালিত হয়। যেমন: কল সেন্টার বা কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস সেন্টারের মাধ্যমে যোগাযোগ ।
ii. সামাজিক প্রণালি (Social Channel): সামাজিক প্রণালিতে পারিবারিক সদস্য, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী বা অন্যান্য ভোক্তার দ্বারা সরাসরি অথবা সমাজিক মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এ ধরনের যোগাযোগকে মৌখিক প্রভাব বা Word of Mouth Influence ও বলা হয়।
iii. বিশেষ প্রণালি (Expert channel): কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে বিশেষ ব্যক্তি কর্তৃক ব্যক্তিগতভাবে নির্দিষ্ট ভোক্তাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের প্রয়াসকে বিশেষ প্রণালি বলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ব্র্যান্ডের জন্য বিশেষ মতামত প্রদানকারীদের নিয়োজিত করে ভোক্তা যোগাযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করে। এ ধরনের বিপণন পদ্ধতিকে Buzz Marketing বা গুঞ্জন বিপণন বলা হয়। বর্তমান যুগে ব্যক্তিগত যোগাযোগ মাধ্যমগুলো প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে অনেক বেশি সহজলভ্য এবং ফলপ্রসূ। কিছু কিছু পণ্যে বা সেবা যেমন দর্শনীয়, দামি, ঝুঁকিপূর্ণ ইত্যদির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ মাধ্যম অধিক কার্যকর।
২. নির্ব্যক্তিক যোগাযোগ প্রণালি (Non-personal communication channels): নির্ব্যক্তিক যোগাযোগ প্রণালি বলতে সেসব মাধ্যমকে বোঝায় যেগুলো সরাসারি যোগাযোগ ব্যতীত টার্গেট অডিয়েন্সকে পণ্য ক্রয়ে প্রভাবিত করে। যেমন: মুদ্রণ মাধ্যম (সংবাদপত্র ম্যাগাজিন, ডাক মারফত, বিভিন্ন সাময়িকী) প্রচার মাধ্যম (টেলিভিশন, রেডিও) প্রদর্শনী মাধ্যম (বিলবোর্ড, সাইন, পোস্টার) এবং অনলাইন মাধ্যম (ই-মেইল, প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, ব্র্যান্ড টেলিফোন এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) ইত্যাদি। এছাড়াও বিভিন্ন বিশেষ অনুভূতি সৃষ্টিকারী প্রতিষ্ঠান (পরিবেশ অধিদপ্তর, ভোক্তা সংগঠন, অন্যান্য সামজিক সংগঠন) এবং বিভিন্ন ঘটনা বা ইভেন্টস অয়োজন (সংবাদ সম্মেলন, শুভ উদ্বোধেন, ক্রীড়া অনুষ্ঠানের স্পন্সর)-এর মাধ্যমেও টার্গেট অডিয়েন্সকে বার্তা প্রেরণ করা হয়।
বার্তার উৎস নির্ধারণ
Selecting the Message Source
একটি বার্তার প্রভাব ভোক্তার মনে কতটুকু ফলপ্রসূ হবে তা অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে টার্গেট অডিয়েন্স যোগাযোগকারীকে কীভাবে মূল্যায়ন করে তার ওপর। উচ্চ মাত্রায় বিশ্বাসযোগ্য এবং আকর্ষণীয় উৎস হতে বার্তা প্রেরণ করা হলে ক্রেতারা সহজেই আকর্ষিত হয় এবং ক্রয় সিদ্ধান্ত উপনীত হতে নিশ্চিত হয়। যেমন: লাইফবয় (Lifebuoy) কোম্পানি তাদের বার্তার উৎস হিসেবে ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে উপস্থাপন করে। এক্ষেত্রে সাকিব আল হাসানের আকর্ষণীয়তা ক্রেতাদের লাইফবয়ের পণ্য ক্রয় সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার জন্য মূল উপাদান হিসেবে কাজ করে।
সঠিক উৎস নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ নির্বাচিত উৎসের ব্যক্তিগত অনুকূল ভাবমূর্তির সাথে সাথে যেকোনো ধরনের প্রতিকূল ঘটনাও ব্র্যান্ডের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে যায়। সাধারণত উৎস সংক্রান্ত চুক্তিগুলো দীর্ঘমেয়াদি হয়ে থাকে এবং ব্র্যান্ড ইমেজ যেকোনো প্রতিকূল ঘটনার জন্য বৃহৎ ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে। অতএব বার্তার উৎস নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ব্যক্তির দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা, ভোক্তাদের পছন্দনীয়তা, যাচাই এবং যেকোনো প্রতিকূল ঘটনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তসমূহ পূর্বপরিকল্পনা অবলম্বন করে গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ
Collecting Feedback
বিপণন যোগাযোগ বাস্তবায়নের পর বিপণনকারীর প্রধান কাজ হলো বাস্তবায়িত কর্মসূচি টার্গেট অডিয়েন্স বা নির্দিষ্ট ভোক্তা শ্রেণির মনে কতটুকু প্রভাব বিস্তার করছে অথবা যোগাযোগের উদ্দেশ্য কতখানি অর্জিত হয়েছে সে সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ করা। প্রতিক্রিয়ার গবেষণাই যোগাযোগব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি ও সফলতার মাপকাঠি প্রকাশ করে, যাতে পরবর্তী বিপণন যোগাযোগসমূহ অধিক কার্যকর হয়। এক্ষেত্রে টার্গেট অডিয়েন্সের ওপর বিভিন্ন ধরনের মতামত জরিপ, পণ্যের বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ এবং বার্তার প্রতি ভোক্তাদের বিভিন্ন সাড়া প্রদানমূলক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয় এবং সে অনুযায়ী রিপোর্ট প্রস্তুতের মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
জনসচেতনতায় প্রচারাভিযান
পথচারীদের ট্র্যাফিক নিয়ম এবং বিধিবিধান সম্পর্কে নগরবাসীকে অবহিত করা ও মেনে চলার প্রতি উৎসাহ দেওয়ার জন্য অ্যাপেক্স ঢাকা শহরের জেব্রা ক্রসিং-এ ২০১৯ সালে প্রথম ‘অ্যাপেক্স স্ট্রিট ফ্যাশন শো’ এর আয়োজন করেছিল। অ্যাপেক্স বাংলাদেশের বৃহত্তম ফুটওয়্যার কোম্পানিগুলোর মধ্যে একটি। এই প্রচারাভিযানে ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করার জন্য ঢাকা শহরের রাস্তার জেব্রা ক্রসিং-কে র্যাম্প হিসেবে ব্যবহার করে মডেলরা ঈদ কালেকশনের ফ্যাশন শো করেছিল। মডেলরা শুধুমাত্র ট্র্যাফিক স্টপেজের সময় জেব্রা ক্রসিংয়ের উপর দিয়ে হেঁটেছিল।
সেসময় তাদের হাতে ট্র্যাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতার বার্তা লেখা বিভিন্ন ধরণের প্ল্যাকার্ড ছিল। এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে তাদের জীবনের মূল্য সম্পর্কে এবং রাস্তায় ট্র্যাফিক আইন অনুসরণ করার প্রতি আগ্রহী করে তোলা। এই প্রচারাভিযানটি সোশ্যাল মিডিয়া, পত্রিকা ও সাধারণ জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল ও প্রশংসিত হয়েছিল।

সারসংক্ষেপ
বিপণনকারী এবং তার লক্ষ্যায়িত বাজার বা target market-এর মাঝে যোগাযোগ কর্মকাণ্ড সফল হলে তাকে কার্যকর | বিপণন যোগাযোগ বোঝায়। কার্যকার যোগাযোগ উন্নয়নের পদক্ষেপসমূহ হলো-লক্ষ্যায়িত শ্রোতা শনাক্তকরণ, যোগাযোগের উদ্দেশ্যসমূহ নির্ধারণ, বার্তা প্রস্তুতকরণ, যোগাযোগের মাধ্যম নির্বাচন, বার্তার উৎস নির্ধারণ ও প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ।

১ thought on “কার্যকর বিপণন যোগাযোগ উনড়বয়নের পদক্ষেপসমূহ”