কৌশলগত পরিকল্পনা আমাদের আজকের আলোচনার বিষয়। এই পাঠটি “বাউবি ওএসবিবিএ ১২০৫ বিপণন নীতিমালা” এর “কোম্পানি ও বিপণন কৌশল” ইউনিট ২ এর অন্তর্ভুক্ত।
কৌশলগত পরিকল্পনা
বিশ্বায়ন, মুক্তবাজার অর্থনীতি ও প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে বৃহদায়তন প্রতিষ্ঠানের প্রভাব ক্রমাগত বাড়ছে, ফলে ব্যবসায় জগতে প্রতিযোগিতার পরিমাণ অস্বাভাবিক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বাজারে সকল প্রতিষ্ঠানই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য ক্রেতার সাথে সু-সম্পর্ক তৈরি করে, ক্রেতাকে দীর্ঘদিন ধরে রাখার চেষ্টা করে এবং নতুন ক্রেতা সংগ্রহের চেষ্টা করে। এ কাজগুলোর জন্য বিপণনকারীকে নিত্যনতুন কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হয় আর দক্ষতার সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করতে হয়। এই পাঠে কৌশলগত পরিকল্পনা প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা করা হবে।
কৌশলগত পরিকল্পনা
Strategic Planning
বিপণন ব্যবস্থাপনায় কৌশলগত পরিকল্পনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ইতিপূর্বে আলোচনা করা হয়েছে যে, একটি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানে তার অন্তর্গত বিভিন্ন বিভাগ (Departments) একসাথে কাজ করে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন করার জন্য এসব বিভাগগুলোকে একসাথে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কাজ করার প্রয়োজন হয়। কোনো এক বিভাগের কার্যসম্পাদনের অসমর্থ্যতার কারণে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নাও হতে পারে। কারণ এক বিভাগের কাজের সাথে আরেক বিভাগ পারষ্পরিকভাবে জড়িত থাকে।
প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন পরিস্থিতিতে পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এখানে কৌশলগত পরিকল্পনা হলো প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও সামর্থ্যের সাথে ব্যবসায় পরিবেশের পরিবর্তনশীল সুযোগগুলোর কৌশলগত সমতা বিধানের প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের প্রক্রিয়া। সহজ ভাষায় কৌশলগত বিপণন পরিকল্পনা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সামর্থ্যের সাথে পরিবর্তনশীল বিপণন সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো যায়। কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করার সময় চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয় যা চিত্র নং ২.১ এ দেখানো হয়েছে।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠানকে তার মিশন নির্বাচন ও সংজ্ঞায়িতকরণ করা, দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা; তৃতীয়ত, ব্যবসায়ের পোর্টফোলিও (Portfolio) নকশা করা; এবং সর্বশেষে বিপণন ও অন্যান্য কার্যকর কৌশল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রথম তিনটি কাজ কর্পোরেট (Corporate) পর্যায়ে এবং পরিকল্পনা ব্যবসায়, পণ্য ও বাজার পর্যায়ে বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

কর্পোরেট মিশন সংজ্ঞায়িতকরণ
Defining Corporate Mission
প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনায় কর্পোরেট মিশন অনুযায়ী নীতি কৌশল এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে একটি কাঠামো গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ এবং ব্যবসায় ইউনিট তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি করে। কর্পোরেট বলতে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান অফিসকে বোঝায়। কর্পোরেট হেডকোয়ার্টারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো মিশন এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করা। মিশন হচ্ছে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের আনুষ্ঠানিক বিবৃতি যা ব্যবস্থাপককে সিদ্ধান্তগ্রহণের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। বৃহত্তর পরিবেশে কোম্পানি কী করতে চায় তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিকে মিশন বিবৃতি ( Mission Statement) বলে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে মিশন তৈরি করতে হয়। মিশন নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জানা প্রয়োজন; আমাদের ব্যবসায়কী, ক্রেতা কে, ক্রেতার নিকট এ ব্যবসায়ের মূল্য কতটুকু, ব্যবসায়ীর ভবিষ্যৎ কী হবে; ভবিষ্যৎ কী হওয়া উচিত ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের উত্তর জানা হলে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের জন্য মিশন সংজ্ঞায়িত করা সহজ হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান সাধারণভাবে পণ্য ও উৎপাদনের উপর জোড় দিয়ে মিশন বিবৃতিকে নির্ধারণ করে। যেমন- ‘আমার প্রতিষ্ঠান কলম তৈরি করে ও বিক্রয় করে’।
কিন্তু মিশন বিবৃতি বাজারমুখী ও ক্রেতামুখী হওয়া প্রয়োজন, যা ক্রেতা ও ভোক্তার মৌলিক চাহিদা কিভাবে সন্তুষ্ট করছে তা বর্ণনা করবে। যেমন- কোকাকোলা কোমলপানীয় ব্র্যান্ড-এর মিশন বিবৃতি হলো- ‘To refresh the world. To inspire moments of optimism and happiness. To create value and make a difference.’ যেকেনো সুস্পষ্ট ও সুচিন্তিত মিশন বিবৃতি অবশ্যই ব্যবস্থাপক, কর্মী, অনেকসময় ক্রেতাদের সাথে নিয়ে সহযোগিতামূলক মনোভাব রেখে নির্ধারণ করা হয় এবং এর মাধ্যমে সামষ্টিক উদ্দেশ্য, নির্দেশনা ও সুযোগ প্রকাশ পায়। ভালো মিশন বিবৃতির পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্য রয়েছে-
- সীমিত সংখ্যক লক্ষ্যের প্রতি আলোকপাত করা হয়;
- প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রধান নীতি ও ভ্যালুর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়;
- প্রধান প্রতিযোগিতামূলক বলয় বা ক্ষেত্র নির্ধারণ যার মধ্যে ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালিত হবে
- দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ;
- সংক্ষিপ্ত, স্মরণীয় এবং অর্থপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন এবং
- মুনাফা বা বিক্রয় বৃদ্ধির প্রতি গুরুত্বারোপ না করে ক্রেতার ও ক্রেতার অভিজ্ঞতার প্রতি জোড় দিয়ে ক্রেতা ভ্যালু তৈরির প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ।
প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ
Setting Company Objectives and Goals
মিশন বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিষ্ঠানকে ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে সহায়ক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয়। এই উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যসমূহ অনেক তথ্যসম্বলিত ও বিস্তারিত হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকরা প্রতিটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জন করার জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা গ্রহণ করেন। এইক্ষেত্রে উদ্দেশ্যগুলো গুরুত্বের ক্রম অনুসারে সাজানো হয়; বাস্তবভিত্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হয়।

সারসংক্ষেপ :
ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য অর্জন করার জন্য সকল বিভাগকে একসাথে সমন্বয়সাধনের মাধ্যমে কাজ করার প্রয়োজন হয়। কৌশলগত বিপণন পরিকল্পনা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য সামর্থ্যের সাথে পরিবর্তনশীল বিপণন সুযোগগুলোকে কাজে লাগানো যায়। কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করার সময় চারটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়।
প্রথমত, প্রতিষ্ঠানকে তার মিশন নির্বাচন ও সংজ্ঞায়িতকরণ করা, দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা; তৃতীয়ত, ব্যবসায়ের পোর্টফোলিও (Portfolio) নকশা করা; এবং সর্বশেষে বিপণন ও অন্যান্য কার্যকর কৌশল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। প্রথম তিনটি কাজ কর্পোরেট (Corporate) পর্যায়ে এবং পরিকল্পনা ব্যবসায়, পণ্য ও বাজার পর্যায়ে বিবেচনা করে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
প্রাতিষ্ঠানিক ও বিভাগীয় কৌশলগত পরিকল্পনায় কর্পোরেট মিশন অনুযায়ী নীতি কৌশল এবং উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে একটি কাঠামো গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগ এবং ব্যবসায় ইউনিট তাদের নিজস্ব পরিকল্পনা তৈরি করে। মিশন বাস্তবায়ন করার জন্য প্রতিষ্ঠানকে ব্যবস্থাপনার প্রতিটি পর্যায়ে সহায়ক উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ করার প্রয়োজন হয়।


১ thought on “কৌশলগত পরিকল্পনা”